Home পাঠসূত্র স্বকৃত নোমান >> ইবিকাসের বংশধর রচনার ইতিবৃত্ত >> পাণ্ডুলিপির কথা

স্বকৃত নোমান >> ইবিকাসের বংশধর রচনার ইতিবৃত্ত >> পাণ্ডুলিপির কথা

প্রকাশঃ December 3, 2017

স্বকৃত নোমান >> ইবিকাসের বংশধর রচনার ইতিবৃত্ত >> পাণ্ডুলিপির কথা
0
0

স্বকৃত নোমান >> ইবিকাসের বংশধর রচনার ইতিবৃত্ত >> পাণ্ডুলিপির কথা

 

গ্রিসে ইবিকাস নামে এক জনপ্রিয় কবি ছিলেন। অজ্ঞাত কারণে এক দস্যুর দল তাকে নির্জন জায়গায় ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কবির মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক বক উড়ে যাচ্ছিল। কবি তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা হলে আমার হত্যার একমাত্র সাক্ষী। আমার হত্যার প্রতিশোধ তোমাদের নিতে হবে।’

আমি মূলত উপন্যাস লিখি। উপন্যাসের প্রতিই আমার সমস্ত মনোযোগ। কিন্তু মাঝেমধ্যে গল্পের দিকেও মনোযোগ দিতে হয়। কখন দেই? যখন ভালো কোনো গল্প পড়ি। সেই পাঠ যদি আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে, তখন ভাবি, আচ্ছা, আমিও তো লিখতে পারি একটি গল্প। এছাড়া ছোট ছোট নানা ঘটনা আমাকে নাড়া দিয়ে যায়। ভীষণ নাড়া দেয়। তখন ভাবি, এই নাড়া দিয়ে যাওয়া ঘটনাটিকে তো আমি একটা শিল্পরূপ দিতে পারি। গল্পের মধ্য দিয়ে সেই ঘটনার শিল্পরূপ দিয়ে দেই। নাড়া দিয়ে যাওয়া সব ঘটনার কিন্তু শিল্পরূপ দাঁড়ায় না। গল্পের তো কিছু শর্ত আছে। যখন বুঝতে পারি সেই শর্তগুলো আমি পূরণ করতে পারব, তখনই গল্প রচনায় হাত দেই।

আমার লেখালেখির শুরুটা উপন্যাস দিয়ে। প্রথম প্রকাশিত বইটি উপন্যাস। ছয়টি উপন্যাস প্রকাশের পর প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পের বই, নিশিরঙ্গিনী। দুই বছর পর প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পের বই, বালিহাঁসের ডাক। আরো দুই বছর বিরতি দিয়ে আগামী বইমেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তৃতীয় গল্পের বই, ইবিকাসের বংশধর

ইবিকাসের বংশধর গল্পটি বইয়ের নাম গল্প। গল্পটির আইডিয়া মাথায় আসে প্রায় দেড় বছর আগে, যখন আমি সমরেন্দ্রনাথ চন্দের ‘জীবজগতের লোকশ্রুতি’ বইটি পড়ছি। বইটিতে বক বা সারস সম্পর্কে একটি অধ্যায় আছে, যেখানে প্রসঙ্গক্রমে লেখা আছে গ্রিসের কবি ইবিকাসের কথা। প্রাচীন গ্রিক লোককথায় হত্যা কখনো লুকানো যায় না। মার্ডার উইল বি আউট―এই আপ্তবাক্য সম্বন্ধে একটি রোমাঞ্চকর ঘটনার কথা জানা যায়। যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচ শ বছর আগের কথা। গ্রিসে ইবিকাস নামে এক জনপ্রিয় কবি ছিলেন। অজ্ঞাত কারণে এক দস্যুর দল তাকে নির্জন জায়গায় ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কবির মাথার ওপর দিয়ে এক ঝাঁক বক উড়ে যাচ্ছিল। কবি তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা হলে আমার হত্যার একমাত্র সাক্ষী। আমার হত্যার প্রতিশোধ তোমাদের নিতে হবে।’

অনেক দিন চলে গেল। কবির মৃত্যু একটা রহস্য হয়ে রইল। একদিন এক উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চে কোনো এক নাটকের অভিনয় চলছিল। এমন সময়ে হঠাৎ এক ঝাঁক বক মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখেই একজন অভিনেতা নিজের পাঠ বলার বদলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠে, ‘এই যে ইবিকাসের হত্যার প্রতিশোধকারীরা উড়ে যায়।’ এই উক্তি শোনামাত্র সচকিত রাজকর্মচারীরা সেই অভিনেতাকে আটক করে ইবিকাস হত্যা মামলা নতুন করে আরম্ভ করে। অবশেষে আসল হত্যাকারীরা ধরা পড়ে। কবির মৃত্যু রহস্যের কিনারা হয়।

আমি যখন ‘জীবজগতের লোকশ্রুতি’ বইটির বককে নিয়ে অধ্যায়টি পড়ছিলাম, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তখন গুপ্তঘাতকরা কোনো এক বাউলকে হত্যা করে। আমার মাথায় তখন খেলে যায় ইবিকাসের কথা। তাকেও অজ্ঞাত কারণে গুপ্তঘাতকরা হত্যা করেছিল, বহু বছর পর হাজার হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের বাউলটিকেও গুপ্তঘাতকরা হত্যা করল। দুই হত্যাকাণ্ডের একটা ঐক্য খুঁজে পেলাম আমি। গ্রিসের ইবিকাসকে কীভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ফেলে একটা গল্প লেখা যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। এটাকে বিনির্মাণ বলা যেতে পারে। আমি ভাবতে ভাবতে থাকি…ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে চলতি বছরের জুন মাসের কোনো একদিন আমার মাথায় গল্পটির একটা অবয়ব দাঁড় করিয়ে ফেললাম। সেদিনই গল্পটি লিখতে শুরু করি। লিখতে দুদিনের বেশি লাগল না।

মাস দুয়েক পর দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সাহিত্য পাতায় গল্পটি ছাপা হলো। ছাপা হওয়ার হওয়ার পর ফেসবুকে, মেইলে এবং ফোনে আমি প্রচুর পাঠপ্রতিক্রিয়া পাই। কেউ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। কেউ বললেন, এই গল্পে নাটকীয়তা বেশি। আবার কেউ বললেন, আমার অন্য গল্পগুলোর তুলনায় এটি দুর্বল একটি গল্প। আবার একজন নাট্যপরিচালক গল্পটি অবলম্বনে একটি নাটক নির্মাণের ইচ্ছার কথাও ফোন করে আমাকে জানালেন। পরে অজ্ঞাত কারণে তিনি আর যোগাযোগ করেননি। হয়ত পরে কখনো করবেন।

ইবিকাসের বংশধর গল্পটি চলতি বছরে লেখা আমার সর্বশেষ গল্প। এর আগে আমি দশটি গল্প এ বছরেই লিখেছি। এক বছরে এগারটি গল্প রচনা লেখক হিসেবে আমার জন্য খানিকটা বিস্ময়কর। কারণ আমি কষ্টলেখক। অর্থাৎ কষ্ট করে করে, আস্তে-ধীরে লিখি। বেশি বেশি লেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। বেশি লিখতে পারাটাকে আমি লেখককের বড় গুণ, বড় যোগ্যতা বলে মনে করি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার সংখ্যা এত বেশি যে, একজীবনে তা পড়ে শেষ করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তরাশঙ্কর-মানিক-বিভূতি-তলস্তয়-দস্তয়ভস্কি-মার্কেস-সিরাজ-সন্দীপনের মতো লেখকরাও কম লেখেননি। তাঁদের রচনার পরিমাণ বিপুল। জীবনানন্দের লেখার পরিমাণও কি কম? বড় বড় লেখকদের লেখার সংখ্যা আসলে বেশি। মহামতি হুমায়ূন আজাদ যে কথাটি বলেছেন, ‘ইতর প্রাণী বেশি প্রসব করে’―কথাটির সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত নই। লেখকের সঙ্গে ইতর প্রাণীর প্রসবের তুলনাটা ঠিক যায় না। একজন লেখক ক্ষমতা থাকলে অসংখ্য অসংখ্য লিখবেন। ক্ষমতা না থাকলে অবশ্যই জোর করে লিখবেন না। জোর করে লেখা আর যাই হোক, শিল্প হয়ে ওঠে না। সেই অসংখ্য লেখার মধ্যে কোনটা পাঠক গ্রহণ করবে, কোনটা কালের বিচারে টিকে যাবে, তা তো আগে থেকে বলে-কয়ে রাখা যায় না।

যাই হোক, এ বছর তো লিখলাম এগারটি গল্প, আগের বছরে লেখা ছিল পাঁচটি গল্প। মোট গল্প সংখ্যা দাঁড়াল ষোল। এবার তো চাইলে একটা বই করা যায়। চলতি বছরের শুরুতে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.-এর প্রকাশক কামরুল হাসান শায়ক ভাই আমার উপন্যাস প্রকাশের আগ্রহ ব্যক্ত করলেন। আমি তখনো লিখতে থাকা উপন্যাসটি শুরু করিনি। কীভাবে শুরু করব ভাবছি কেবল। শায়ক ভাইকে বললাম, উপন্যাস দিতে পারব কিনা সন্দেহ, একটা গল্পের পাণ্ডুলিপি করার ইচ্ছে আছে। চাইলে এটি বের করতে পারেন। তিনি রাজি হলেন। আমিও ধীরে ধীরে গল্পগুলো লিখতে থাকি। অক্টোবরের মধ্যে পান্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেল। পড়তে দিলাম কলকাতার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক অমর মিত্রকে। আমি তাঁর স্নেহধন্য এবং তাঁর গল্প-উপন্যাসের একজন নিবিষ্ট পাঠক। আমার গল্পগুলো পড়ে তিনি একটা মন্তব্য আমাকে মেইল করে পাঠালেন।

অমর মিত্র লিখেছেন, “স্বকৃত নোমানের গল্প বাংলাদেশের গল্প। এক একটি গল্প বাংলাদেশের হৃদয়কে ছুঁয়েছে। গ্রাম, নদী, বাওড়, দিঘি, গাছগাছালি, বন-বাদাড়, বান-বন্যা, অনাবৃষ্টি নিয়ে বাস করা দরিদ্র মানুষের জীবনের রূপকার স্বকৃত। নিম্নবর্গের মানুষ স্বকৃত নোমানের গল্পের মানুষ। তাদের কথা লিখতে লিখতে স্বকৃত যেন বাংলাদেশের আত্মাকে দেখিয়ে দেন। তার গল্পের মানুষ ক্ষুধার্ত বাংলার মানুষ। সমস্ত জীবন কাটায় যেন ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য। স্বকৃতর গল্পের মানুষ ভাত আর মাংসের কথা ভাবে। স্বপ্ন দেখে। তবুও তাদের এক জীবন-দর্শন আছে। তা তাদের জীবন এবং জন্ম থেকে উপলব্ধ। জীবন আর ধর্মের নিগড় দুই যে মেলে না তা স্বকৃতর গল্প আমাদের দেখিয়ে দেয়। এই গ্রন্থে আছে যে ক্ষিদরের গল্প (বাঙাল), তা আমাদের সাহিত্যের সম্পদ। কী অনায়াসে ক্ষিদর অগ্রাহ্য করে বড়হুজুর, মোল্লার ফতোয়া, সতর্কতা। নদীর ওপারে মৌলবি যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে, তা নদীর ওপারেই রেখে আসে ক্ষিদর। তাকে খেটে খেতে হয়। তার নিজস্ব জীবনে অনধিকার প্রবেশ করা সহজ নয়। স্বকৃত নোমানের লেখায় যে দার্শনিকতা আছে, তাইই তাকে বিশিষ্ট করেছে। ঔপন্যাসিক স্বকৃতর গল্পের অনুরাগী না হয়ে থাকা যায় না। প্রতিটি গল্প চিনিয়ে দেয় অবারিত এক বাংলাদেশ এবং তার মানুষজনকে।”
এরই মধ্যে বইটির প্রচ্ছদ হয়ে গেল। প্রচ্ছদ করলেন শিল্পী ধ্রুব এষ। আমার বেশিরভাগ বইয়ের প্রচ্ছদ এই গুণী শিল্পীর করা। শ্রদ্ধেয় অমর মিত্রের ছোট মন্তব্যটি প্রচ্ছদের ব্লার্বে যুক্ত করে দিলাম। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লেখক নিজেই নিজের বইয়ের প্রচ্ছদের ব্লার্ব লিখে থাকেন। এটা আমার জন্য খুব কঠিন একটা কাজ মনে হয়। এই কঠিন কাজটা সাধারণত আমি করি না। কখনো আমার কোনো অগ্রজ লেখককে দিয়ে, কখনো কোনো লেখকবন্ধুকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নেই। কখনো ব্লার্বে তাদের নাম যায়, কখনো যায় না। তারাই নিষেধ করেন বলে নাম দেওয়া হয় না। অমর মিত্রের পাঠপ্রতিক্রিয়াটি ব্লার্বে যুক্ত করতে পেরে ভালো লাগল। এই সুযোগে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখি। প্রিয় অমরদা, আজীবন পেতে চাই আপনার স্নেহাশীষ।

বইটি প্রকাশের আগে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে আমাকে জানানো হলো যে, প্রতিটি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে বইটি সম্পর্কে ছোট্ট করে একটি মন্তব্য দেওয়া হয়। আমাকেও সেরকম একটি লেখা লিখে দিতে বলা হলো। কিন্তু আমি তো নিজের বই সম্পর্কে নিজে কিছু লিখতে পারি না। নিজের সম্পর্কে এক শব্দও আমার কলমের ডগা গিয়ে বেরোয় না। শ্রদ্ধেয় অগ্রজ, প্রিয় বন্ধু, শক্তিমান লেখক হামীম কামরুল হককে বললাম, ভাই, আপনি কিছু লিখে দিন। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী হামীম ভাই লিখলেন, “স্বকৃত নোমানের স্নায়ুতে ইতিহাস-চেতনা আর মর্মে রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার দোলাচল। সেখানে সমকালকে চিরকালে নিয়ে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য। আবার সমকালকে সমকালেই ছেনে দেখার লীলাও তাঁকে নাড়িয়ে দেয়। তিনি সাড়া দেন ছোটগল্প লিখে। এজন্য হয়ত চলার পথে তিনি একটি একটি করে ছোটগল্পের খুঁটি গাঁড়েন। সমকাল ও চিরকালের ঠোকাঠুকিতে তাঁর গল্পগুলিতে বার বার দেখা দেয় জীবনের ফুল ও ফুলকি। তাঁর গল্পগুলি আমাদের স্বস্তি দেয় না, বরং প্রশ্নকাতর করে, আঘাত করে আমাদের প্রচলিত জীবনযাত্রা, রীতিনীতি ও জীবনভাবনায়।”

তার মন্তব্যটি নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। মন্তব্য করবেন বিজ্ঞ পাঠকরা। আমি চেয়েছিলাম হামীম ভাইর নামসহ লেখাটি প্রচ্ছদে যাক। কিন্তু পাঞ্জেরী থেকে জানানো হলো, এক্ষেত্রে সাধারণত নাম দেওয়া হয় না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন প্রচ্ছদটি আমাকে মেইল করা হলো, দেখলাম, লেখকের নামটি যথারীতি আছে। দেখে ভালো লাগল। কবি ও প্রাবন্ধিক ড. মাসুদুজ্জামান বর্তমানে পাঞ্জেরীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। তিনিও হামীম ভাইর নামটি রাখার পক্ষপাতী। শুনে ভালো লাগল। আমাদের দেশে এই রীতিটা চালু হওয়া উচিত বলে মনে করি যে, একটা পাণ্ডুলিপি পড়ে সমসাময়িক লেখকরা মন্তব্য করবেন এবং তাদের মন্তব্যগুলো বইয়ের প্রচ্ছদে ছাপা হবে। এতে বইটি সম্পর্কে একটা মূল্যায়ন হয়, পাঠকদের কাছে একটা ইতিবাচক বার্তা যায়।

‘ইবিকাসের বংশধর’ গল্পটি রচনার নেপথ্য গল্প আগেই বলেছি। এবার বলি আরো দুটি গল্প রচনা নেপথ্য গল্প। গত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার নাজমা ও কন্যা নিশাত আনজুম সাকিকে নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে গিয়েছিলাম। শ্রীমঙ্গলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান বাইক্কা বিল। অসাধারণ একটি জায়গা। ওখানে ভ্রমণে গিয়ে বিলের এক তরুণ প্রহরীর সঙ্গে, যে কিনা মাইমাল গোত্রের, হাওড়-বাওড়ে মাছ ধরাই যাদের পেশা, আলাপকালে সে আমাকে জানাল যে, কয়েক বছর আগে বাইক্কা বিলের মাছ লুট হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ এসে সংরক্ষিত এই বিলের মাছ লুট করে নিয়ে যায়। আমার মাথায় তখন একটি গল্পের প্লট উঁকি দিল। শ্রীমঙ্গল থেকে ফেরার কয়েকদিন পরেই ‘বাঘাইড়’ নাম দিয়ে গল্পটি লিখতে শুরু করলাম। গল্পের প্রধান চরিত্র সোনাফর আলী। এক বর্ষায় পুত্র সাজুসহ একটি গরুকে বিলের জলে গোসল করাচ্ছিল সোনাফর। হঠাৎ বিশাল আকৃতির একটি বাঘাইড় মাছ এসে সাজুর তলপেটে ঢুঁশ মেরে পেটটা ফুটো করে দিয়ে পালিয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সাজু মারা যায়। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে সোনাফর মাছটিকে খুঁজে বেড়ায়। তার পুত্রহন্তা বাঘাইড়টিকে সে হত্যা না করে ছাড়বে না। দিনের পর দিন বিলে পড়ে থাকে, অথচ মাছটিকে খুঁজে পায় না।

এক শীতের মৌসুমে হাইল হাওরে জলে টান ধরে। জল শুকিয়ে যেতে থাকে। বিলের মোকাম বাইক্যা বিলের জল তলানিতে ঠেকে। জলের অভাবে মাছেদের দাপাদাপি শুরু হয়। কিন্তু সংরক্ষিত বিল, মাছ ধরা বারণ। সোনাফরের মনে তো ক্ষোভ। পুত্রহন্তা বাঘাইড়টিকে হত্যা করতেই হবে। সোনাফর এলাকায় গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, বাইক্কা বিলের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সরকার, মাছ ধরতে এখন আর কোনো বাধা নেই। দেরিতে হলেও সরকার বুঝেছে বিলে মাছ মরে পচার চেয়ে মানুষের পেটে যাওয়া ভালো। কিন্তু বিল সংরক্ষণ কমিটির নেতারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা গোপন করছে। ইজারাদারদের সঙ্গে চুক্তি করেছে তারা। কদিনের মধ্যে মাছ ধরা শুরু হবে। সব মাছ চলে যাবে শহরে।

গুজবটি ছড়িয়ে পড়ল দিগ্বিদিক। শত শত মানুষ আসতে শুরু করল বাইক্যা বিলে। জাল, পলো ইত্যাদি দিয়ে মাছ ধরতে লাগল। অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয় প্রশাসন বিল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করল। কিন্তু এলাকার মানুষ নিষেধাজ্ঞা মানে না। পুলিশের সামনেই চলে তাদের লুটপাট। সবাই মাছ লুট করে, সোনাফর খুঁজে বেড়ায় তার পুত্রহন্তা সেই বাঘাইড়টিকে। দ্বিতীয় দিন সে সেই বাঘাইড়টির দেখা পায়। পিছু ধাওয়া করে। সারাদিন মাছটার পিছে ছোটে। কিন্তু মাছটাকে সে ধরতে পারে না। সেদিন সন্ধ্যায় একটা খালের ভেতর দেখতে পায় মাছটিকে। ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। বিশাল বাঘাইড়ের সঙ্গে শুরু হয় তার লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোনাফর হেরে যায় এবং মাছটি পালিয়ে যায়।

এই গল্পগ্রন্থের আরেকটি গল্প হচ্ছে ‘কুয়ার বাইরে’। গল্পটি লেখার পর প্রকাশের জন্য কোনো পত্রিকায় না দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম। মনে আছে, প্রায় ১৩৮৯ জন পাঠক গল্পটিতে লাইক দিয়েছিলেন, মন্তব্য করেছিলেন ৩৫৬ জন এবং শেয়ার নিয়েছিলেন ৬৮৬ জন। বাংলাদেশ, কলকাতা, আগরতলা ও আসামের বিভিন্ন অনলাইন, মাসিক পত্রিকাসহ বাংলা ভাষার মোট ১৭টি পত্রিকায় গল্পটি প্রকাশিত হয়। একজন পাঠক গল্পটির প্রিন্ট নিয়ে ৫ শ ফটোকপি করে একটি ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে পাঠিয়ে দেন। একটি গল্প নিয়ে পাঠকদের এমন উচ্ছ্বাস, এমন প্রশংসা সত্যিকারার্থেই আমাকে দারুণ আপ্লুত করেছিল। এর আগে কোনো গল্প লিখে এত সাড়া, এত প্রশংসা এবং এত পাঠক আমি পাইনি।

গল্পটির বিষয় ছিল সমমায়িক ঘটনাবলী। মাওলানা আবুল কাশেম ফেনবী গল্পের প্রধান চরিত্র। তিনি একটি কওমি মাদ্রাসার মুহতামিম (পরিচালক) এবং একটি ইসলামি মৌলবাদী সংগঠনের আঞ্চলিক নেতা। তার ছেলে থাকে ইন্দোনেশিয়ায়। ঢাকার হাইকোর্টের সামনে থেকে তখন গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য সরানোর জন্য হেফাজতে ইসলামসহ সমমনা কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে। ঠিক সেই সময়ে মাওলানা আবুল কাশেম ফেনবী ইন্দোনেশিয়ায় তার ছেলের কাছে বেড়াতে যায়। ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ, অথচ সেদেশের এয়ারলাইনসের নাম মহাভারতের পাখি গারুড়ার নামে। সেদেশে ভারতীয় পুরাণ ‘রামায়ণ’ মঞ্চস্থ হয়। সেদেশের রাজ্য বালিদ্বীপের সর্বত্র নানা ভাস্কর্য স্থাপিত। সেদেশের টাকার গায়ে হিন্দুদেবতা গণেশের মূর্তি আঁকা। মাওলানা আবুল কাশেম ফেনবীর অবাক লাগে। মুসলিম দেশ, অথচ সংস্কৃতি কিনা সম্পূর্ণ আলাদা! এইসব ঘটনা তাকে দারুণ প্রভাবিত করে। দেশে ফিরে তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। ইসলামি মৌলবাদী সেই সংগঠন থেকে পতদ্যাগ করেন। তিনি বুঝতে পারেন, ধর্ম ও সংস্কৃতি যে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়।

আগেই বলেছি, নিজের গল্প সম্পর্কে মন্তব্য করা আমার পক্ষে কঠিন। হয়ত সব গল্পকারের পক্ষেই কঠিন। সংক্ষেপে শুধু এটকু বলি, অতীতে যে দুটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে, সে দুটির ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে আমি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি। লেখকজীবনে আমি মোট চুয়াল্লিশটি গল্প লিখেছি। চুয়াল্লিশটি গল্প থেকে যদি আমাকে শ্রেষ্ঠ দশটি গল্প নির্বাচন করতে বলা হয়, তাহলে বেশিরভাগ গল্পই নিতে হবে প্রকাশিতব্য গল্পের বই ইবিকাসের বংশধর থেকে।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.-এর প্রকাশক কামরুল হাসান শায়ককে অসংখ্য ধন্যবাদ। বাংলাদেশে গল্পের বই যে খুব বেশি বিক্রি হয় তা কিন্তু নয়। এই কথাটি শায়ক ভাই জানেন। জেনেও তিনি আমার মতো অখ্যাত একজন লেখকের গল্পের বই প্রকাশের ঝুঁকি নিয়েছেন। গল্পগুলো পড়ে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে তার নাম সুপরিচিত। নিশ্চয়ই তিনি তার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার মাধ্যমে আমার বইটিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন, এই বিশ্বাস আমার আছে। আশা করছি পাঠকরা বইটিকে গ্রহণ করবেন। আগামি বইমেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হচ্ছে বইটি। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা।

০২.১২.২০১৭

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close