Home ছোটগল্প হাবীবাহ নাসরীন / এবার তবে যাই

হাবীবাহ নাসরীন / এবার তবে যাই

প্রকাশঃ February 15, 2017

হাবীবাহ নাসরীন / এবার তবে যাই
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : একজন নতুন গল্পকারের গল্প এটি। তীরন্দাজ পত্রিকা প্রকাশের শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ হচ্ছে সম্ভবনাময় কবি-লেখক-প্রাবন্ধিক-অনুবাদকদের অনুসন্ধান করে তাদের লেখা প্রকাশ করা। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, আজকের নতুন লেখকরাই হবেন ভবিষ্যতের এক-একজন বড় লেখক। বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখার জন্যে নতুন সম্ভাবনাময় লেখকদের লেখা প্রকাশ করা তাই জরুরি বলে আমরা মনে করি। সেই লক্ষ্যেই ‘আখ্যানের শিলালিপি : গল্পের ফলকে নারীমুখ’ সিরিজের চতুর্থ গল্প হিসেবে প্রকাশিত হলো এই গল্পটি।]

মেঘলা আকাশ দেখলেই মনটা খারাপ হয়ে যায় আমার। আকাশভর্তি থমথমে মেঘগুলোকে বৃষ্টির পূর্বাভাস না ভেবে বরং মন খারাপের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করি। ইদানিং মন-খারাপ করে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। আমি তো চলেই যাবো, কী হবে এত আনন্দ, এত হাসি দিয়ে! তারচে’ বরং মন খারাপ করে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে কবি কবি একটা ভাব আসে। নিজেকে কেন যেন সুকান্ত ভট্টাচার্য্যর মত ভাবতে ইচ্ছা হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যদি লিখে যেতে পারতাম, ‘হে মহাজীবন! আর এ পদ্য নয়…!’ আমারও মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে। মানুষের স্থান তো হয় শুধু মানুষের হৃদয়েই। তবে আমি জানি, আমার জায়গা হবে না কোথাও। ক’দিন পরে যখন মরে যাবো তখন বাবা আর মা ছাড়া আমাকে কে-ই বা মনে রাখবে! আমি ক্যান্সার আক্রান্ত একজন রোগী। কিশোরী নই, তরুণী নই, প্রৌঢ়াও নই। জীবনের মেয়াদকাল ফুরিয়ে গেলে বয়সের হিসেব করাটাও অর্থহীন হয়ে যায়! সুকান্ত তো একুশ বছর বেঁচে ছিলেন। আমার কত? আর ছ’টা মাস বাঁচতে পারলে একুশ ছুঁযে দিতাম। কিন্তু তা আর হওয়ার নয়। ডাক্তারের নির্দিষ্ট করা তিন মাস হতে আর দেড় মাস বাকি। সময় যে ফুরিয়ে এসেছে সেটা বাবার বিষণ্ন মুখ আর মায়ের চোখের পানি দেখলেই বুঝতে পারি। হায়! মা-বাবার জন্য যদি কিছু করে যেতে পারতাম! আমার চিকিৎসার চাকা সচল রাখতে গিয়ে আমাদের স্বচ্ছল পরিবারটি এখন ঋণগ্রস্ত, অস্বচ্ছল হয়ে পড়েছে। বাসার দামী দামী আসবাব পর্যন্ত বিক্রি করা হয়ে গেছে! আমি যাওয়ার আগেই দৈন্যদশা এসে আমার সম্ভাব্য শূন্যস্থান পূর্ণ করে দিয়েছে!

আজ দুপুরে, বলা নেই কওয়া নেই কোথ্থেকে একরাশ কালো মেঘ এসে আকাশটাকে দখল করে নিলো! প্রথমে হুংকার, গর্জন আর তারপরে অঝোর ধারায় কান্না, ইনিয়েবিনিয়ে কান্না। আগে বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগত। মায়ের কাছে বৃষ্টিতে ভেজার বায়না ধরতাম। এখন কেন যেন বৃষ্টি দেখলেই ভীষণ ভয় হয়। দৌড়ে গিয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকাই। মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। খুব চাপাস্বরে জানিয়ে দেই মনের কথা, আমি চলে যাওয়ার পরে আবার যখন এমন করে চারদিক অন্ধকার করে দিয়ে আকাশটা কান্না শুরু করবে তখন মা যেন আমার কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকে। সেই সুনসান নীরবতার মাটির ঘরে একলা শুয়ে থেকে আকাশের এমন কান্না শুনলে নিশ্চয়ই আমার ভয় করবে! আমার কথা শুনে মা চোখের জলে গা ভাসায়। আকাশ আর মা, দুজনেই পাল্লা দিয়ে কাঁদে!

বৃষ্টি থেমে গেছে। বিকেলে শাফি ভাইয়া এলো। শাফি আমার মেজো কাকার ছেলে। ছোটবেলায় চকলেটের লোভ দেখিয়ে আমাকে বউ বানাতে চাইত। আড়ালে নিয়ে জিজ্ঞেস করত, ‘নেহা, তুই আমার বউ হবি? তোকে এই এতগুলো চকলেট কিনে দেবো।’ ভাইয়া দুই হাত বিস্তৃত করে চকলেটের পরিমান বোঝাত। আর তাই দেখে তো আমি হা হয়ে যেতাম! ভাইয়া বলে কী! ওই অতগুলো চকলেটের জন্য আমি সব করতে পারি, বউ হওয়া তো কোন ছার! তাই অমন স্বর্ণালী সুযোগ হাতছাড়া না করে বুদ্ধিমতির মতন তখন তখনই সম্মতি দিয়ে দিতাম। তারপর আমাকে সবার সামনে এনে ভাইয়া আবার জিজ্ঞেস করত, ‘নেহা, তুই কার বউ হবি?’ আমি ভাইয়ার প্রতিশ্রুত চকলেটগুলো পাওয়ার লোভে অথবা হারানোর আশঙ্কায় চটজলদি উত্তর দিতাম, ‘কেন, তোমার!’ আমরা কেউই এখন আর আগের মত ছোট্টটি নেই। ভাইয়া আর যখন তখন দুষ্টুমি করে চকলেট খাওয়ানোর লোভ দেখায় না। ভাইয়া রুমের দরজায় এসে ডাকল,

-নেহা, আসব?

-আরে ভাইয়া যে, এসো!

-তোকে দেখতে এলাম।

ভাইয়া কৈফিয়তের ভঙ্গিতে বলে। বলেই আবার চুপ করে থাকে। আকাশের সেই কালো মেঘ এবার আমার ছোট্ট কামরায় এসে জমতে শুরু করেছে বুঝতে পারি। ভাইয়া তো জানে না, মেঘ দেখলে আমি কী ভীষণ ভয় পাই! তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হেসে বলি,

-তুমি তো শেষমেশ বিধবাই হয়ে যাবে ভাইয়া!

-বিধবা নয় রে মুর্খ মেয়ে মানুষ! বল বিপত্নীক! বৌ মরলে ছেলেরা বিপত্নীক হয়, এটুকুও জানিস না! এই মেধা নিয়ে আবার গোল্ডেন পেয়েছিলি! ছ্যা!

নিছকই ছেলেমানুষী কথাবার্তা। পরিস্থিতি তবু স্বচ্ছ হয় না। হঠাৎ কী মনে পড়ায়, ‘জরুরী একটা কাজ আছে, ভুলেই গিয়েছিলাম রে!’ বলে ভাইয়া ছলছল চোখে উঠে চলে যায়। ভাইয়ার জরুরি কাজের সঙ্গে চোখের পানির কী সম্পর্ক, কে জানে!

নিঝুম রাত্রি। খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি সৌভাগ্যবতী, আকাশে একটুকরো অনুজ্জ্বল বাঁকা চাঁদের বিলুপ্তপ্রায় হাসিটুকু দেখতে পেলাম। আকাশের বাগান জুড়ে একটি, দুটি, অসংখ্য শাদা শাদা তারা ফুটে আছে। কোন মালি ওদের পরিচর্যা করেন, কে জানে! আমারও একটা শখের ফুলের বাগান আছে। আগে নিজেই প্রতিদিন যত্ন করতাম, এখন অসুস্থ বলে ওদের খোঁজও নিতে পারি না। এইতো আমার জানালার পাশ ঘেঁষে ছাদের দিকে উঠে গেছে প্রিয় কামিনী গাছটা। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। চলে যখন যেতেই হবে, প্রিয় কামিনী গাছের ছায়ায়ই থেকে যাই না কেন! আমাকে যেন শেষবারের মতন ওখানটাতেই শুইয়ে দেয়া হয়। কথাটা মাকে বলতে হবে।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close