Home ছোটগল্প হামিম কামাল >> চক্র পূর্ণ করো চন্দ্রাবতী >> ছোটগল্প

হামিম কামাল >> চক্র পূর্ণ করো চন্দ্রাবতী >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ July 18, 2018

হামিম কামাল >> চক্র পূর্ণ করো চন্দ্রাবতী >> ছোটগল্প
0
0

হামিম কামাল >> চক্র পূর্ণ করো চন্দ্রাবতী >> ছোটগল্প

‘চন্দ্রাবতী কয় শুন গো অপুত্রার ঘরে
সুন্দর ছাওয়াল হইল মনসার বরে…’
“সেই সেলিম, আমি দেখেছি ওর ছায়া পড়ে না রোদে। সেই চন্দ্রাবতী। চক্র পূর্ণ করল কি এবার? এ নিয়ে কতবার? মানুষের হিসেবে নিকেশ করতে গিয়ে ঠেকে যাই। কিন্তু হাওয়া কিছু বলছে।”

চন্দ্রাবতী তখন কিশোরী। তাকে পাশে রেখে সূর্যসেন দীর্ঘসময় আমার ছায়ায় বসে পুঁথি পড়ে সময় কাটাত।
একদিন দস্যু কেনারামের পালা পড়বে বলে পুঁথি খুলল সূর্যসেন। ওপরপাতার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল চন্দ্রাবতী।
‘বাবা একি! এ পুঁথির গায়ে আমার নাম লেখা! কেন? আমিই বুঝি লিখেছি এটা? কখন!’
সূর্যসেন হেসে মেয়ের মাথার চুলো এলো করে দিতে দিতে বলল, ‘হ্যাঁ, তুই নিজেই তো লিখেছিস মা! এই তো সেদিন, এই অশথের নিচে সারাদুপুর বসে। মনে নেই?’
কথা শুনে হেসে উঠল মেয়ে। তার ডান পাশের ছেদন দাঁতটা বাকি দাঁতের সারির ফাঁকে নিজেকে ভাসিয়ে রেখে হাসিটাকে বাবার চোখে বিশিষ্টতা দিয়েছিল। আমার চোখেও।
সেদিনই প্রথম ওদের হাতে সময় ছিল কম। হঠাৎ উত্তরপুবে তাকিয়ে সূর্যসেন দেখতে পেল পাঠশালায় তার পড়াতে যাওয়ার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। শুধুই কি পড়াতে?
‘চন্দ্রাবতী, মা? আজ আমরা খুব অল্প করে পড়েই ছেড়ে দেবো, কেমন?’

‘… চন্দ্রাবতী কয় শুন গো অপুত্রার ঘরে
সুন্দর ছাওয়াল হইল মনসার বরে’

কেনারামকে সাত মাসের রেখে মা যখন মরল, চন্দ্রাবতীর গালে নোনা জল গড়াল। বলল, ‘বাবা, আমিই তো লিখেছিলাম। আমার যে সব মনে পড়ে যাচ্ছে বাবা!’
সূর্যসেন সেদিনের মতো পুঁথি বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে আমাকে একা করে দিয়ে ওরা চলে গেল বাড়ির দিকে।
চন্দ্রাবতীর সঙ্গে আমি আবেগে বাধা পড়েছিলাম। মেয়েটা একা এলে আমাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। খসখসে কাণ্ডের গায়ে ওর কোমল কান পেতে দিতো, ওর ছোট্ট নরম বুকটা চেপে ধরত। আমিও ওকে ভালোবাসা দিয়ে খুব উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম দেখব বলে যে ও আমার প্রেম বুঝতে পেরেছে।
মানুষে নারী পুরুষ আলাদা। আমার ভুবনে আমিই নারী আমিই পুরুষ। কিন্তু চন্দ্রাবতী যখন আমার দিকে ধীরে হেঁটে আসে, ভেতরে মাতৃসত্ত্বা জেগে ওঠে। মনে হতে থাকে ওর মা নেই কে বলে? আমিই তো ওর মা।
ওর মা ইন্দুকে ধরে নিয়ে যেতে আমিই কেবল দেখেছিলাম আর কেউ নয়। কিন্তু মানুষের কেউ আমার কথা বোঝেনি, কখনো বোঝে না। কেবল সূর্যসেন একবার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ করেই তার মনে হয়েছিল- চন্দ্রাবতীর মাকে বেনিয়াবন্ধু মিত্তির ধরে নিয়ে গেছে। কেন? তাকে শক্তিহীন করার জন্য।
ইন্দুকে তুলে নিয়ে হত্যার ওই মন্ত্রণা মিত্তিরকে চিবুক উঁচিয়ে দিয়েছিল জাহাজটুপি মাথার লর্ড ওয়ে। নীল চোখের ধূর্ত শেয়াল।
পাশ দিয়ে রুপালি মধুবালা বয়ে যেত কুলকুল শব্দে। নিজের মতো করে কথা বলতে বলতে চলেছে। সে ভাষা বোঝার নয়। হঠাৎ একদিন মনে হয়েছিল, মধুবালার সবুজাভ মধুভাসা জলে চন্দ্রাবতীর মা ইন্দুর ছায়া কেন আর পড়ে না- নদী আমাকে তা বুঝি জিজ্ঞেস করছে। অনুভব করতে পেরে নদীর দিকে আমি যেভাবে তাকিয়েছিলাম, সূর্যসেনও ঠিক একই ভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিল সেদিন।
আমরা এভাবে অচেতনে ভাব বিনিময় করি। তাই কেউ কারো জন্য কিছু করার ক্ষমতা রাখি না। পরস্পরের জন্যে কিছু করতে হলে চাই সচেতন ভাব বিনিময় যা আবার আমার কেবল হাওয়ার সাথে হয়।
চন্দ্রাবতী বড় হলো। সূর্যসেনের ছাত্রদের একজনার সঙ্গে হলো তার মন বিনিময়। ছেলেটা ধর্মে চন্দ্রাবতীর বিপরীত।
মানুষের এই ধর্মের ব্যাপারটা আমি বুঝি না। আমি বুঝতে খুব করে চেয়েছি সূর্যসেনের কাছে। কিন্তু হঠাৎ একদিন মনে হয়েছে, সূর্য নিজেও ব্যাপারটা বোঝে না। যদি বুঝত তো ওর মাথার ভেতরকার ঝোড়ো হাওয়ার ওঠানামা থেকে আমি তা ঠিকই জেনে নিতে পারতাম। হাওয়ার সঙ্গে আমাদের ভালো যোগ।
কিছুদিন পরই বুঝতে পারলাম যে আমার এ অনুধাবন সত্য। চন্দ্রাবতীর মনে প্রেম যতো রেখাপাত করতে থাকল, ধীরে ধীরে তার মুখ তত শুকিয়ে যেতে থাকল। দেখতে দেখতে একরত্তি হয়ে গেল মেয়েটা। চোখের নিচে কালি পড়ল, চুল পড়ে যেতে থাকল সব। মুসলমান ছেলেটা আর সনাতনী মেয়েটা আমার কাছ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে রাতভর অনেক কথা বলে।
একরাতে হাতে হাত রেখে ওরা অনেক কাঁদল। ওদের কথা কিছু বুঝতে না পারলেও অনুমান করলাম মুসলমান ছেলেটা চলে যেতে চায়, আর আসতে চায় না।
শুনলাম চন্দ্রাবতী বলছে, ‘আমার বাবার কাছে এসব কিছুই না।’
ছেলেটি বলছে, ‘আমি তাঁর ছাত্র চন্দ্রা। আমিও তাঁর দীক্ষায় দিক্ষিত তাই খুব ভালো করেই জানি। কিন্তু এরপরও আমি চলে যেতে চাই। যাওয়ার ভেতরই আমার উত্তর লুকোন আছে।’
‘এটা কেমন কথা?’
‘তুমি দেখো, লোকে কি তাকে সুখে থাকতে দিয়েছে? আমি চাই না ওই দুঃখ আরো বাড়ুক। সামনে তাঁর অনেক কাজ। আমাদের সবাইকে সুসংগঠিত হতে হবে। নীলচোখোদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছি। পিছু হঠার উপায় নেই। এ দেশ থেকে তাড়াতে হবে ওদের! স্যার আমাদের নেতা, আমাদের দীক্ষাগুরু। জ্ঞানের, যুদ্ধের।’
‘আমি তবে মরব।’
‘আমিও কি বাঁচব চন্দ্রা? শোনো, গুরুর দিকে সবাই চেয়ে আছে। মানুষের কাছে তার কথার দাম আছে। সবাই মুক্তমনা না। এ অবস্থায় তুমি আমি এসে যদি এমন আদরে চোখবদল করি, লোকে কথা ছড়াবে। সবাই তাঁর মতো না। তাঁর কথাকে তখন দাম না দিয়ে নিজের পায়ে নিজেরাই কুড়াল চালাবে। তাতে তাদের কিছু না এলে গেলেও আমাদের যায়। আমাদের পিছু ফেরার কোনো উপায় নেই। আর আছে আমার গোষ্ঠী। ওরা তো লড়াইয়ে আসবেই না। নীলচোখোরা এখনও ওদের বিশ্বাস করে। কী লজ্জা!’
এরপরই হাওয়া অন্য দিকে ঘুরে গেল বলে আর কিছু শোনা হলো না। এদিকে নদীর দিক থেকে একটা রাতপাখির নকল ডাক ভেসে এলে ওরা দুজন দ্রুত আলাদা হয়ে গেল।
এর দিনকয়েক পর রাতের আঁধারে বাড়িতে হামলে প’ড়ে সূর্যকে কিছু লোক এসে খুব পিটিয়ে বাঁধল। এরপর তুলে নিয়ে চলে গেল চোখের আড়ালে। পরদিন কোথা থেকে এসে আমার গুঁড়ি ধরে দাঁড়াল সূর্য। বোধহয় পালিয়ে এসেছিল। থেঁতলে যাওয়া আঙুলগুলোয় একটাও নখ অবশিষ্ট নেই। হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল শেকড়ে। আমার শেকড়ে আলো ঠেকিয়ে যেভাবে পশ্চিমের সূর্য অস্ত যায়, আমার আপন মানুষ সূর্যও ওভাবে ধীরে অস্ত গেল। আর তখনই দেখতে পেলাম গলায় একটা গভীর ক্ষত হাঁ করে আছে।
ওর কাঠ হয়ে পড়ে থাকা লাশটা দেখে কেউ কেঁদে উঠল। কারো মনে ভয় জাগল খুব।
ক’দিন পেরোলে মুসলমান ছেলেটার লাশ মধুবালার উত্তরের বাঁকে যখন দেখা দিয়েছে, চন্দ্রা ঠিক তখনই মুখ ফিরিয়ে ঢালু পাড় বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেছিল তাই দেখতে পেল না। পেলেও বুঝতে পারত না কার দেহ অমন উপুড় হয়ে ভেসে যায়। গভীর নদী হিসেবে জানা মধুবালার জলে তখন ভাটার টান। দেখতে দেখতে দক্ষিণের বাঁকে হারিয়ে গেল ক্ষ্যাপাটা।
মধুবালাই বকবকিয়ে বলে যাচ্ছিল সব। একাধটু বুঝি না ওর কথা তা নয়। নদীর ওপর তখন হাওয়া খেলছিল খুব। হাওয়াই আমার বার্তাবহ বেতার।
‘ও অশথ, বোকা অশ্বথ? জানো এটা কোন ছেলেটা? জানো এটা কোন ছেলেটা? এটা হলো ওই ছেলেটা। চেনো একে- ওই ছেলেটা। জেনো একে- সেই ছেলেটা। চন্দ্রার হৃদয়েশ্বর। কুলকুল সরসরসর। চন্দ্রার হৃদয়েশ্বর। গলগল সরসরসর। চন্দ্রার হৃদয়েশ্বর। ভেসে গেল ওই ছেলেটা।’
সূর্যসেন মারা যাওয়ার পর তার শিষ্যরা এসে চন্দ্রাবতীকে কোথায় নিয়ে গেল বলতে পারি না। কেউ কোনো কথা বলেনি যাওয়ার বেলায়।
সবাই চলে যাওয়ার পর ঘরটা ওভাবেই পড়ে ছিল। অপঘাতে মারা-পড়া সূর্যসেনকে এলাকার অনেকেই দেখতে পেত রাতে বিরাতে। লোকে তাকে ভালোবাসত বলে ঘরটা ওভাবেই রেখে দিয়েছিল, কেউ সেখানে ওঠেনি। শুধু থেকে থেকে ভবঘুরে কেউ এলে লোকে রাতটা ওই ঘরের বারান্দায় কাটানোর ব্যবস্থা করে দিতো। উটকো নেশারুর তখন উটকোমি দেখানোর পরিবেশে ছিল না। আর পরিবেশ যখন এলো তখন চন্দ্রাবতীও ফিরে এসেছে।
কালে নীলচোখোরা বিদায় হলে চন্দ্রাবতী- তখন আরো পরিণত তরুণী- ফিরে এলো নিজ ঘরে। একা নয়। সঙ্গী তার সহযোদ্ধা- বিক্রম। ক্রুর চোখের সুঠাম সুপুরুষ। সেলিমের মতো কোমল দেহের কমললোচন নয়।
ওরা পরস্পরকে ভালোবাসতো। আমার নিচে এসে চন্দ্রাবতী খুব নিচু কণ্ঠে বিক্রমকে তার শৈশবের কথা বলে যেত। সব তো জানাই আমার। শুনে শুনে ঝালিয়ে নিতাম। ওর শৈশব মানে মানুষের সঙ্গে আমারও বোঝাপড়ার শৈশব।
ওদের কথা থেকেই একদিন জানলাম- সেই মুসলমান ছেলেটার নাম ছিল সেলিম। নদীর ধারে ভ্রাম্যমাণ ফাঁসিকাঠে নীলচোখোরা তাকে ঝুলিয়ে মেরে লাশ তখন তখনই মধুবালায় ভাসিয়ে দিয়েছে। ওই প্রসঙ্গ খুব বেশি সময় ওরা ধরে রাখল না দেখে আমিও বাঁচলাম।
ওদের একটা ছেলে হলো- অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধ এসে আমার কাণ্ডে ধারাল ছুরি দিয়ে আঁকিবুকি করত। খুব ব্যথা পেতাম। নেহাত পালানো আমাদের ধর্ম নয় তাই ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে সহ্য করে যেতাম।
একদিন নদীর দীর্ঘ ঢালের কাছে বিক্রম এসে দাঁড়ালে ওকে বলতে চেষ্টা করলাম- অনিরুদ্ধকে থামাও। নয়ত ওর মনটা আড়ভাবে বাড়বে।
বিক্রম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। দেখে কিছু বুঝেছে কিনা বোঝা গেল না। পরিস্থিতির কোনো বদল ঘটল না। পরদিনও অনিরুদ্ধের একই ব্যাপার। সবার সঙ্গে যোগ ঘটানো যায় না বোধয়।
বিক্রম মারা গেল তার দ্বিতীয় যৌবনে। চন্দ্রাবতী তার ছেলে অনিরুদ্ধকে নিয়ে বেঁচে থাকল।
দেশের অবস্থা আবারও খারাপ হয়ে উঠল। বহু দূরের আরো কিছু সুঠাম শোষক ভিনভাষীল দল খুব গটগটিয়ে ক’দিন আমার নিচ দিয়ে হেঁটে আসা যাওয়া করল- লেফট রাইট লেফট রাইট! ওদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু মোসাহেব জুটেছে। কারও চোয়াল ভাঙা, কারো দাড়ি হাওয়ায় পতাকার মতো ওড়ে।
ওদের ঠিক বিরোধী একটা তরুণ দল ক্রমশ জড় হতে থাকল এবং জোটে বাড়ত থাকল। ওদের বড় নেতা নাকি রূপোসনগরে যুদ্ধের ডাক দিয়েছে! অনিরুদ্ধ যুদ্ধে গেল না।
শুনতাম চন্দ্রাবতী তাকে বলছে, ‘তুমি দেখছি একেবারেই তোমার বাবার বিপরীত। তোমার বয়েসী একটা ছেলে ঘরে বসে নেই। আমি কি ঠিক বলেছি? নাকি ভুল।’
অনিরুদ্ধ কোনো কথা না বলে চুপ করে থাকত। কখনো একটা কোনো ডাল নিয়ে আমাকে পেটাত বেদম। ওর ওই পিটুনি আমার শরীরে লাগত না, লাগত মনে। অনিরুদ্ধকে আমি ভালোও বাসতে পারতাম না আবার শাপ দিতেও পারতাম না। ও যে আমার মেয়ে চন্দ্রাবতীর সন্তান।
চন্দ্রাবতীও একদিন রোগে শোকে মরে গেল। আমি কেন বেঁচে থাকলাম কে জানে। আমি কবে জন্মেছিলাম তা মানুষের হিসেবে নিকেশ করতে গিয়ে ঠেকে যাই। এদিকে আমার ভুবনে তো কোনো হিসেব-নিকেশের বালাই নেই। আমার অন্তর্তন্তু কী বহন করছে তা নিয়ে আমরা মানুষের মতো মাথা ঘামাই না। শুধু জানি- চলছে, ওরা নিজেদের মতো চলছে। আমি কেবল জলের কাছে-দূরের হিসাব রাখি। মধুবালা আমার কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। আমার ভারি দুঃখ।
ভীষণ এক যুদ্ধ বাঁধল এরপর। মধুবালার বুকের ওপর এবার যত লাশ উত্তরের বাঁক ধরে দক্ষিণের বাঁকে গিয়ে হারাল, ততো লাশ আমি আর কখনো ভেসে যেতে দেখিনি। সারাটা রাত কাঁদল নদীটা, শুধু কাঁদল। ওর ভাষা বুঝে বিপদ হয়েছে আমার।
অনিরুদ্ধ যুদ্ধের সারাটা সময় ঘরে লুকিয়ে থেকেছে। আমার নিচে এসে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে লাশ ভেসে যেতে দেখে একেকদিন স্বগোতোক্তি করত। ওর ওই অসংলগ্ন কথার আমি কোনো মানে খুঁজে পেতাম না। তবে একদিন পেলাম।
বলছিল, ‘ওই তো ভেসে যাচ্ছে পবন। ওটা কে রে? আসাদ না? আরে ওটা তো ফারুকের শার্ট আমি চিনি! আর ওটা? নতুন এসেছিল। একবারই দেখেছিলাম, তবু চিনেছি।’
এরপর বলল, ‘আমি আমার যুদ্ধ ঠিকই করছি। কারণ আমি পালাই নাই। আমি ওপারে যাই নাই। আমার যুদ্ধে যাওয়ার সাহস নাই কিন্তু আমার এখানে থেকে যাওয়ার সাহস আছে। অনেকে পালাল, কই, আমি তো পালাই নাই! দেখো মা, দেখো বাবা, আমি তোমাদের মতো হতে পারি নাই। কিন্তু তোমরা আমার ভেতর কোনো না কোনো ভাবে আছো। কী। আমি ঠিক না ভুল? তোমরাই বলো?’
আরো অনেক আবেগের কথা। বলতে বলতে প্রথমবারের মতো আমার কাণ্ড জড়িয়ে ধরল অনিরুদ্ধ আর প্রবল শাওনি কান্না। আমার ক্ষতে হাত বুলোতে থাকল। কী যে ভালো লাগল আমার কিভাবে বোঝাই। আমি আমার সূক্ষাগ্র নন্দন ওই পাতাগুলো হাওয়ায় দোলাতে থাকলাম।
যুদ্ধ শেষ হলো। অনিরুদ্ধ আমার গোড়া পাকা করিয়ে থান বানাল। একজোড়া পাঁঠার গলা এক কোপে কেটে একটা ঘটে রক্তটা ধ’রে আমার গোড়ায় ঢেলে দিলো। আমি শিউরে উঠলাম! টের পেলাম আমার সারা শরীরে এতোদিন যে মাখনের মতো একটা ঘনায়িত শান্তি ছিল তা নেই। কেমন একটা জ্বলুনি কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ছে। ও এমন কেন করল? এ ছেলে কি আমাকে জ্বালাতেই জন্মেছে? ইচ্ছে হচ্ছিল ফেটে লোকের মাথা ফাটিয়ে দিই।
আমি গলা ছেড়ে ডাকলাম, ‘মধুবালা! ও মধুবালা? তুমি কেন সরে গেলে অতো দূরে? তুমি আজ কাছে থাকলে আমার সঙ্গে এমন করতে পারতো না ওরা। কাজ তুমি ঠিক করো নাই মধুবালা! কাজ তুমি ঠিক করো নাই!’
মধুবালার কাছ থেকে কোনো জবাব এলো না। আমি ওর ভাষা বুঝি, সে বোধয় এখনও আমার ভাষা বোঝে না।
অনিরুদ্ধেরও বিয়ে হলো। মেয়েটার মনে কোনো অসুখ থাকবে; প্রায় রাতেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে যেত। খোলা চুলে, এলো আঁচলে। অনিরুদ্ধ ওর পেছন পেছন ছুটত আর শান্তি, শান্তি বলে ডাকত চিৎকার করে। আমি বহুদূর থেকে শুনতে পেতাম। বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে আসত তার ডাক। আমার সূর্যসেনের কথা মনে পড়ত।
অনিরুদ্ধের দেহে ওই মানুষের রক্ত বইছে, যে মানুষ আমাকে ‘মানুষ’ সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিল না চাইতেই, সবার আগে। এখানে লোকবসতির পত্তন যারা ঘটিয়েছিল সূর্য ছিল তাদেরই একজন। ওই প্রাণীর সঙ্গে এর আগে আমার পরিচয় ছিল কিন্তু হৃদয়ে তাদের জন্যে কোনো স্থান ছিল না। সেই স্থান কেউ আমার ভেতর গড়ল আর কাউকে আমি নিজের ওপর জোর খাটিয়ে তাতে রাখলাম- কী আশ্চর্য। অনিরুদ্ধ ছিল ওই দ্বিতীয় দলে।
শান্তি তার গর্ভকাল সম্পূর্ণ করে একটা মেয়েকে পৃথিবীর আলো দেখিয়ে এক রাতে এক বিদঘুটে ছায়ার সঙ্গে কোথায় পালিয়ে গেল। আমি দেখেছি, ওটার কোনো কায়া ছিল না স্রেফ একটা কালো ছায়া। এসে দাঁড়াল আর খানিক বাদে শান্তির চুপসাড়া মুখটা নক্ষত্রের আলোয় চিনতে পারলাম। ওই ছায়ার কাছে দাঁড়িয়ে তার উচ্ছ্বাসের সীমা ছিল না!
ভোরে কিছু একটা আঁচ করে থাকবে অনিরুদ্ধ। বেরিয়ে শান্তির নাম ধরে ডেকে অনেক ছোটাছুটি করল। এ দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়। কিন্তু পরিণতিটা নতুন। প্রতিবার মেয়েটাকে বুঝিয়ে নিয়ে আসতে পারত অনিরুদ্ধ। সেবারই প্রথম একা ফিরে এলো। মেয়েটাকে ভালোবেসেছিল ছেলেটা। ওর ব্যথা আমার ভেতর সঞ্চারিত হলো। থানের ওপর অনেকক্ষণ বসে থেকে থেকে ওর মাকে ডাকল, শুনতে পেলাম। ওর মা তো আমার মেয়ে। আমিও তো তাকে ডাকি। কিন্তু কই, সে তো আসে না!
হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। মনে হলো কেউ আমার ডাকে সাড়া দিয়েছে। তাকিয়ে দেখি অনিরুদ্ধের নড়চড়ও থেমে গেছে। সেও কি কিছু টের পেয়েছে? ছেলেটা দৌড়ে ঘরের দিকে ছুটে গেল। আমার পাতারা তিরতিরিয়ে কাঁপতে থাকল নক্ষত্রের আলোর নিচে। আকাশে চাঁদ তখনো ফোটেনি। চন্দ্রাবতী কি ফিরে এলো?
হ্যাঁ। চন্দ্রাবতী ফিরে এসেছিল। অনিরুদ্ধ আমার চোখের সামনে বুড়ো হলো আর নতুন চন্দ্রাবতী চোখের সামনে বড় হতে থাকল যেভাবে চাঁদ বড় হয়।
একদিন পুরনো এক পুঁথি হাতে নিয়ে একা একা এসে বসল আমার গোড়ায়। থানের ওপর লোকে তেমন বসে না। এক অনিরুদ্ধ আর দুই ওর ছোট্ট চন্দ্রাবতী- এখন আর ছোট নেই যদিও- এ দুজনের সঙ্গেই কেবল আমার যোগ।
পুঁথির পাতা খুলে বসে ওল্টাতে থাকল ধীরে ধীরে। শিহরণ! এ যে সেই দস্যু কেনারামের পালা!
অনিরুদ্ধ উত্তরের ওই কাঁচাবাজারের দিক থেকে হেলেদুলে হেঁটে আসছিল একহাতে ভারী চটের থলে। ভেতরে উঠানে কাপড় নেড়ে দিতে থাকা হনু উঁচু মালেকার মায়ের পায়ের কাছে থলেটা রেখে ফিরে থানে এসে বসল। কাপড় নাড়া শেষে মালেকার মা থলে থেকে গোমড়া মুখে এটা ওটা বের করতে লেগে গেল।
অনিরুদ্ধ কাছে আসতেই চন্দ্রাবতী বলল, ‘বাবা দেখো আমার নাম লেখা!’
অনিরুদ্ধ বিস্মিত। ‘তুই পুঁথি পড়ছিস! কোথায় ছিল এটা?’
‘ওমা, এতো আমি রোজ পড়ি, আজকের কথা!’
‘জানি তো মা! তবু বললাম। তোর নাম লিখেছে ওখানে?’
‘হ্যাঁ বাবা, আমার নাম। আমি এই পালাটা লিখেছি। দেখো?’
অনিরুদ্ধ হাসতে হাসতে মেয়ের মাথাটা তার বুকে টেনে নিলো। দূরে তাকিয়ে আনমনে বলল, ‘কোনো সন্দেহ নেই তুই আমার মা। তুই আমার হারিয়ে যাওয়া মা চন্দ্রাবতী।’
‘হ্যাঁ আমি তো চন্দ্রাবতী!’
‘জানি তুই চন্দ্রাবতী। তুই চন্দ্রাবতী, আবার তুই চন্দ্রাবতীও।’
গায়ে মানুষ এখন অনেক বেড়েছে। এখন সনাতনীদের ঘরের চেয়ে মুসলমান ঘর বেশি। জায়গাটায় কী এক জরিপ হলো, সে বছর থেকেই শুরু হলো চেয়ারের ভোটাভুটি। চেয়ারে কে বসবে তার লড়াই। মাথামুণ্ডু বোঝার উপায় নেই।
আমার গায়ে কার কার মুখ লাগানো কাগজ সাঁটানো হলো, তার কিছুক্ষণের ভেতর অনিরুদ্ধ এসে টেনে ছিঁড়ে ফেলল। ‘এটা থানের অশ্বথ! এটার গায়ে কেউ কিছু লাগাতে পারবে না!’ অনিরুদ্ধ কাঁপা গলায় শূন্যে কার দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করল সেই বলতে পারে।
একদিন বাজারে কোন মুসলমানের যেন দোকান পুড়িয়েছে কারা- তা নিয়ে ওরা আর সনাতনী লোকে লাগল গণ্ডগোল। চন্দ্রাবতীদের বাড়ির টিনের দেয়ালগুলো কারা রাতের অন্ধকারে কুপিয়ে রেখে গেল।
ঘরের চারধারের রুপালি টিন ফালি ফালি হয়ে ঝুলে আছে, লোকে এসে দেখল সকালে। দেখল একপাশে চুপ করে বসে আছে অনিরুদ্ধ আর দূরে দাঁড়িয়ে তার মেয়ে চন্দ্রা। ‘চন্দ্রা? ভেতরে যা!’ বলল অনিরুদ্ধ।
লোকে এসে ভিড় করে দাঁড়ালে গলা উঁচিয়ে বলল, ‘তোমরা ভেবেছ কী! আমি যাব না। আমি পালাব না। আমি অনেক বড় যুদ্ধের সময় পালাই নাই। আমি পালাই নাই। আমার বাপ-মার দেশ! তোমাদেরে চিনি না! আমি তখনও যাই নাই এখনও যাব না। যাব না, দেখি আর কী কর।’
রূপোসনগর বলে অনেক দূরে এক শহর আছে। সেখানে নাকি খুব খুনখারাবির কোনো রাতদিন নেই। তারই ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে দক্ষিণের এই গাঁয়ে। ভুম ভুম করে শোর তুলে খুব ধোঁয়া ছেড়ে দুই চাকার সব গাড়ি চলাচল করে আজকাল। সব মেটে পথের ওপর আড়াআড়ি লাল ইট বসানো হয়েছে। লোকের চলাচল বাড়ায় আমার আর শান্তি নেই। পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে। এতো মানুষ, কিন্তু কাউকে আমি চাই না। মন কেবল সূর্যকে খোঁজে। মন শুধু চন্দ্রাবতীকে চায়।
মধুবালার দিকে তাকিয়ে দেখি, ওই দূরে গিয়ে স্থির পড়ে আছে। বহুদিন কোনো নড়চড় নেই।
ওর দূর কূলে নৌকা ভেড়ে। নৌকার কাছি চুরি করতে গিয়ে এক তরুণ একদিন থানের ওপর এসে বসা চন্দ্রাবতীর দিকে তাকিয়ে আর চোখ ফেরাতে পারে না।
কাছে এসে ভাব জমাতে চাইলো ছোকরা তারও এক সপ্তাহ পর। সেদিন চন্দ্রাবতীর খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থেকে গলা ঝেড়ে বলল, ‘সত্যবাদীর দাম আছে নারীর কাছে, সেই ভরসায় বলি। আমার নাম সেলিম। ভালো পেতাম আরেক নারীকে, স্বীকার করি। কিন্তু এও বলি, সে আমারে ভালো পেতো না। তারে বশ করব তাই কাছি চুরি করতে এলাম। দেখি কে একজনা বসে আছে। চোখ কেবল ধায়, ফেরে না। মন কেবল ধায়, ফেরে না। কে আপনি? মনে হলো এতোদিন যারে চেয়েছি, তারে চাই নাই। যারে চেয়েছিলাম সে ওই নারী না। জানি না আমার সামনের এই নারী কিনা। বলবেন? আপনি কে? কী নাম। অধমের নাম সেলিম। আসসালাম।’
এরপর খানিক বিরতি নিয়ে বোধয় জবাব পেতে চাইলো। না পেয়ে বলল, ‘জানি নারীর কাছে সৎসাহসের দাম আছে তাই বললাম এতো কথা। থাক, গেলাম।’
এই বলে উল্টো দিকে ঘুরতেই চন্দ্রাবতী সেদিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ‘এখনও কাছি চুরির যুগ আছে? মানুষ এখন যন্ত্রের মানুষ বানায় জানেন না?’
‘জানি,’ বলল ছেলেটা। ‘কিন্তু আমি তো প্রেমিক বেপরোয়া। প্রেমিকের মতো বেকুব আর কেউ হয়? তাই বনলাম চোর। কিন্তু ভুল লোকের জন্য চোর বনতে গিয়ে আসল লোককে পেয়ে গেলাম, স্রষ্টার লীলা। কাছি কিন্তু সরাই নাই। চোর হতে হয় নাই আমাকে। যার জন্যে চোর আর হতে হলো না, তার তরে আবার আসিব। পরের সপ্তাহে, ফের আসিব আবার।’
চন্দ্রাবতীর দিক থেকে কিছু আর শোনা গেল না সেদিন। গেল পরের সপ্তাহে। ‘তুমি সেলিম বুঝলাম। কোথায় ধাম? পড়ালেখা জানো?’
‘ধাম নদীর ওপারে। লোকে বই কেন পড়ে চন্দ্রাবতী?’
‘লোকে বই পড়ে কারণ… মনের ক্ষুধা বোঝো?’
‘কে না বোঝে? পেটের ক্ষুধা বোঝারও সরল মনের ক্ষুধা বোঝা।’
‘বাহ, এতোদূর জেনে আর অতোটুকু মাত্র জানো না?’
‘জানি বললে তো কেউ কথা বলে না। বলায়। বরং জানি না বললে যারা জানাতে চায় তারা দু’কথা বেশি বলে। আর মন তো ওই বেশিটুকুর লোভে এসেছে এতোদূর!’
‘ভালোই সেয়ানা। শোনো, কী পড়ি। যদি ভালো লাগে তো এরপর আসবে পরের প্রশ্ন- হঠাৎ যদি আর নারী ভালো লাগে?’
‘সেই উৎকণ্ঠা তো আমার। যদি আর পুরুষ ভালো লাগে অদেখায়?’
গীত হলো-

‘চন্দ্রাবতী কয় শুন গো অপুত্রার ঘরে
সুন্দর ছাওয়াল হইল মনসার বরে…’

সেই সেলিম, আমি দেখেছি ওর ছায়া পড়ে না রোদে। সেই চন্দ্রাবতী। চক্র পূর্ণ করল কি এবার? এ নিয়ে কতবার? মানুষের হিসেবে নিকেশ করতে গিয়ে ঠেকে যাই। কিন্তু হাওয়া কিছু বলছে।
ওদের মন দেওয়া-নেওয়া হয়েছিল কিনা জানি না। কিন্তু সে রাতের পর সকালে আলো ফুটলে দেখি লোকালয় মুছে গেছে। কিছুরই চিহ্ন নাই। দূরে মধুবালা শুয়ে আছে কেবল, তার ওপারে বন আর এপারে ধু ধু।
‘ব্যাপার কী হে?’
মধুবালা সুর করে বলল, ‘নতুন প্রজাতি আসে নতুন প্রজাতি। মানুষের নিভে গেছে বাতি।’
মানুষের নিভে গেছে বাতি কাল রাতে, তুমি জানো না? তুমি জানো না? মধুবালা ফিরে ফিরে এই এক প্রশ্ন আমায় বারবার করে গেল।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close