Home ছোটগল্প হামিম কামাল > পাটক্ষেতের লাশ >> ছোটগল্প

হামিম কামাল > পাটক্ষেতের লাশ >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ July 24, 2017

হামিম কামাল > পাটক্ষেতের লাশ >> ছোটগল্প
0
0

পাটক্ষেতের লাশ >> ছোটগল্প

এক

সিড়িঘরের হলুদ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে ত্রিশছোঁয়া সলিল। ঘন ঘন টোকা দিয়ে চলেছে কাঠের দরজায়। ঘেমে পিঠের সঙ্গে সেঁটে আছে পরনের ঘিয়ে রঙা পাঞ্জাবি। ঘর্মাক্ত নাক থেকে খয়েরি ফ্রেমের চশমাটা পিছলে পড়ছে বারবার।

শুধু টোকায় হচ্ছে না কাজ। তাই এবার কণ্ঠও সচল হলো।

‘শুভ্রা, শুভ্রা!’

টোকা এবং ডাক- দুটোই একযোগে চলল কিছুক্ষণ। একসময় দরজার আইহোলটা একবারের জন্য কালো হলো। তারপরই খুলল কপাট।

সিঁড়িঘরের আলো পড়ে স্পষ্ট হলো শাড়ি পরিহিতা শুভ্রার ত্রিকোণ লম্বাটে মুখ। চোখ দুটো ঘুম ঘুম। চুলগুলো পেছনে আঁচড়ে বেঁধেছিল শোবার আগে। অনেকটাই আলগা হয়ে গেছে এখন। চুলের নরম কিছু ঘূর্ণি সাদা কপালের ওপর এসে পড়েছে। সলিলকে দেখে তার বড় বড় চোখজোড়া আর পাতলা ঠোঁট দু’টি যেন ভাষা পেলো। দয়িতের দশা দেখে পরমুহূর্তে তা হারালো আবার। ভাষার স্থানটি দখল করে নিলো তখন নীরব উদ্বেগ।

স্যান্ডেলজোড়া বাইরে খুলে ভেতরে এসে দরজার ছিটকিনি আটকে দিলো সলিল। উদ্বিগ্ন তরুণীর মুখোমুখি দাঁড়াল। মুখের ভাবে কুণ্ঠা দৃঢ় আসন গেড়েছে। শুনতে উন্মুখ হয়ে থাকা শুভ্রার দুটি বাহু ধরে রাখল সলিল কিছুক্ষণ। কিছু একটা যেন তাকে ভীষণ আঘাত করেছে, এখন সে আশ্রয় চায়। এদিকে আশ্রয় যে চায় তা আবার বলতেও সংকোচ। কোনোক্রমে অস্ফূটে বলল, ‘ঘুম কেমন হয়েছে শুভ্রা?’

‘ভালো হয়েছে,’ শুভ্রা দ্বিধান্বিত কণ্ঠে উত্তর দেয়। ‘তুমি ঠিক আছ তো? কী হয়েছে তোমার? খুব বেশি বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে।’

সলিল নীরব।

‘কথা বলো? শরীর খারাপ করেছে? শোনো, তোমার এই রাতের পর রাত এভাবে জাগা কিন্তু আমার একদমই পছন্দ হচ্ছে না। এই নাইট শিফট ব্যবস্থাটা বদলাও কতবার বলেছি। আর অফিস যদি এতো চাপ দিতে থাকে তো ছেড়ে দাও এ চাকরি। নতুন এসব অনলাইন-টাইন আমার একেবারেই পছন্দ নয়, অসুস্থ ইঁদুরের দৌড়।’

কণ্ঠে দ্বিধা রেখেও চোখে দৃঢ় ক্ষোভ ফুটে উঠল শুভ্রার, আবার মিলিয়েও গেল। উৎকর্ণ হয়ে উঠেছে আবার। একটা কিছু বলতে যাচ্ছে সলিল।

‘যা হয়েছে নতুন নয়। অনেক দিন ধরেই হচ্ছে এসব।’ সলিলের শ্বাসপ্রশ্বাস আগের চেয়ে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

‘কী হচ্ছে বলো?’ শুভ্রার প্রশ্ন। ‘ওরা খুব বেশি দুর্ব্যবহার করছে?’

‘না, ঠিক তা নয়। দুর্ব্যবহার তো অভ্যাস হয়ে গেছে, এখন সয়ে যায়। কিন্তু ইদানিং যা ঘটছে তা কখনও ঘটবে বলে ভাবিনি। আর বিপরীতে আমি যা করেছি, তাও করব বলে ভাবিনি।’ শুভ্রার হাতটা নিজ হাতে তুলে নিয়ে বলতে থাকল সলিল, ‘তোমাকে কখনও কিছু বলা হয়নি। কিন্তু না বলে লাভ কি হলো বলো? দিনের পর দিন আমি ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম, তুমি বুঝতে পেরেছ কখনও? হয়ত পেরেছ। কিন্তু পেরেছ-যে সেটিও বোঝার মতো মনও আমার ছিল না। সবশেষে আজ যা হলো তা তো সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে শুভ্রা। একদম সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে। নিরুপায় হয়ে এতোদিন কামড়ে ধরে রাখলেও আজকের পর চাকরিটা ছেড়ে দেবো বলেই ঠিক করেছি। আর একদিনও নয়।’

সলিল থামল। চোখজোড়া তখনও বাঙ্ময়। শুভ্রা চুপ করে থেকে তাকিয়ে রইল সলিলের চোখে। বলার সুযোগ দিলো আরো। সলিল আবারও ধরল কথার খেই।

‘কারণ এভাবে চলতে থাকলে বেঁচে থাকাই আমার জন্যে মুশকিল হয়ে উঠবে। কিন্তু একবার ছাড়লে এরপর হবেটা কী? আবার কোথায় চাকরি খুঁজব? কবে পাব? কিছুরই তো ঠিক নেই। আমি ছাড়লে তোমার একার হাল ধরতে হবে। খুব কঠিন হয়ে যাবে না? এসব ভেবে হাল ছাড়িনি এতোদিন। আর তোমাকেও বলিনি কিছু। কিন্তু আজ যা হলো—’

শুভ্রার মাথার ওপর দিয়ে সলিলের চোখ গেল ঘরের শেষ প্রান্তে বারান্দায়। সকাল পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। বারান্দাপথে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করছে সূর্যের সাদা আলো। দরজার কাঠামোকে ঝাপসা করে দিয়েছে আলোর প্রবেশ। বাক্যটা শেষ না হয়ে ঝুলেই থাকল। ছেদ যখন পড়েছেই, তো থাক। হাত তুলে বলায় বাধ সাধল শুভ্রা।

‘আগে হাতমুখ ধুয়ে নাও। নাস্তা করে নাও। এরপর সব শুনছি। ডিম কিভাবে ভালো লাগবে বলো, আজ আমি করে আনছি।’

‘বাদ দাও শুভ্রা! তোমার অফিস কখন? কিছু করতে গিয়ে নিজের দেরি করো না।’ খাবার ঘরের বেসিনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল সলিল, ‘আমিই করে নিচ্ছি। তুমি কেমন কেমন খাবে বলো। ভেতরটা নরম তো?’

শুভ্রা কিছু না বলে ফ্রিজ খুলে প্রয়োজনীয় এটা-ওটা বের করতে থাকল। চোখে পানি ছিটিয়ে আয়নার দিকে তাকাল সলিল। আয়নায় শুভ্রা ফ্রিজের স্ফীত দরজাটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছে।

‘আজ ফোন করে দেবো অফিসে। তোমার কাছ থেকে শুনব সব। তোমার এমন মুখ আমি আর কোনোদিন দেখিনি সলিল। তুমি বুঝতে পারছ?’

‘দুজন দ্রুত নাস্তাটা সেরে নিই। এরপর তুমি তোমার মতো চলে যাও, আমিও বিছানায় যাই। আমার তো আজ আর অফিস নেই। সন্ধ্যায় তুমি এসো, এরপর তোমাকে বলব সব। আজ  আর কিছুই লুকোবো না। আর তোমার সঙ্গ, তোমার পরামর্শ আমার খুব দরকার শুভ্রা। এখন নয়। এখন আমি গুছিয়ে কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। কিন্তু বলতে আমাকে হবেই। আমি নাচার হয়ে পড়েছি। ব্যাপারটাকে কী বলব— আধিভৌতিক নয়; কিন্তু অমনই। আমার মনেই ঘটছে সব, নির্ঘাৎ, অবশ্যই। হতে পারে, নিজের ওপর এতো বেশি চাপ নিতে হচ্ছে যে আমার মতো মানুষও নুয়ে পড়ছে। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারছে না।’ সলিল হাসলো।

শুভ্রা সে হাসিতে পরিচিত সলিলকে পেল না। পেল ভীষণ দুর্বল এক মিত্রকে।

হাতমুখ ধুয়ে স্নানঘরে গিয়ে পা ধুয়ে বেরোলে রঙ ও রোঁয়া দুটোই ওঠা একটা পুরনো তোয়ালে তার দিকে এগিয়ে দিলো শুভ্রা। কপালের ওপর একবার ছুঁইয়েই নামিয়ে আনলো সলিল। কিছুটা শান্ত হয়ে আসা মুখটি তখনও ভেজা রয়ে গেছে।

স্বগোতোক্তির মতো বলল, ‘এভাবেই থাকুক, ভালো লাগে। বাতাসেই বরং শুকোক, কী বলো।’

চেয়ারের হেলানে তোয়ালেটা রেখে খাবার টেবিলে বসে পড়ল সলিল। শুভ্রা তোয়ালেটা চেয়ার থেকে তুলে নিয়ে শোবার ঘরের দরজার ওপর নেড়ে দিয়ে ফিরে এলো। চেয়ার টেনে বসল সলিলের পাশে।

খাবারের ঘরটা অন্ধকারে পড়ে যাওয়ায় দিনের বেলায়ও জ্বলে বৈদ্যুতিক আলো। মরচে আর খানিক ময়লা-জমা মধ্যবিত্ত পাখাটি সে আলো কেটে ঘুরছে ধীরে ধীরে। এর নিচে টুংটাং শব্দ উঠছে চামচের। গ্লাসের সঙ্গে গ্লাস যাচ্ছে ঠুকে।

খেতে খেতে বলে চলল সলিল, ‘শুভ্রা তোমাকে আমি বলেছিলাম না, মন্দের ভালো হিসেবে সাংবাদিকতার চাকরিটাই আমি করে যাব? সবই আমার লেখার শত্রু, কিন্তু এ শত্রুটাকে সবচেয়ে ছোট বলে ভেবে এসেছিলাম। কিন্তু আমার এই ভাবনা ধরে রাখার আর কোনো কারণ দেখছি না শুভ্রা। নিজেও বুঝতে পারিনি, ভেতরে ভেতরে এটা আমাকে এভাবে শেষ করে দিয়েছে। আমি তো মফস্বল বিভাগে আছি আজ  অনেকদিন। এই মফস্বলের মতো ভয়ঙ্কর বিভাগ সংবাদপত্রে আর একটিও নেই জানবে। প্রথম প্রথম আমি নিতে পারতাম খবরগুলো। কিন্তু ক্রমেই অসুবিধা হতে থাকল, সমস্যা বাড়তে থাকল, পড়ে যেতে থাকল আমার বুকের বল। আঘাত যদি উপর্যুপরি আসতে থাকে, মাত্র দু’হাতে নিরস্ত্র তুমি ক’টা ঠেকাবে বলো? আমার দশাও হলো তেমন।

তুমি কল্পনাও করতে পারবে না গোটা দেশের মফস্বল এলাকাগুলোয় কী ঘটে চলছে। তুমি দিনের শুরুতে শুধু কাগজে একবার চোখ বোলাও, কিছু দেখো, কিছু না-দেখার মতো করে দেখো। প্রতিদিন যতো খবর আসে তার সত্তরভাগ আড়ালে রেখে বড়জোর ত্রিশভাগ তোমাদের কাছে পৌঁছোয়। মানুষের নীচতা, হিংস্রতা কোন শিখরে পৌঁছে গেছে এ দেশে, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না শুভ্রা। একজন মফস্বলের সাংবাদিক তো তার বলয়ের সংবাদ আমাকে দেয়। আর আমি এদিকে দেখি চোষট্টিটি জেলার যাবতীয় অস্বাভাবিকতা, হিংস্রতা, নীচতা, একযোগে, সারাদিন, দিনের পর দিন। ভাবতে পারো? তুমি কি জানো সংবাদপত্রের পাতায় যতোগুলো মফস্বলের খবর তুমি দেখো তা টোটাল যে খবর আসে আমাদের কাছে তার দশ ভাগের একভাগও নয়? জানো না। যারা জড়িত নয়, তারা জানবে কী করে। তারা তো শুধু ততটুকু জানে যতোটুকু তাদের জানানো হয়।’

সলিলের কণ্ঠস্বর ক্রমে উত্তেজিত হয়ে উঠতে শুরু করলে শুভ্রা তার পিঠে হাত রাখল। এরপর শান্ত চোখে ইশারায় উত্তেজিত না হতে অনুরোধ করে সরিয়ে নিলো হাত। সলিলও নিজের ভেতর সামলে নিলো নিজেকে।

‘বেশ। দেখেছ, কেমন উত্তেজিত হয়ে পড়ছি? দিনের ওপর দিন এসবের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমি পাগল হয়ে উঠছি শুভ্রা। রাতে আমার চোখে ঘুম নেই। দিনভর ডিল করা এসব তথ্য মগজ তো জমাতে চায়। ঘুমোলেই এসব নিয়ে গল্প তৈরি করতে শুরু করে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। মানে দুঃস্বপ্ন। রাতের পর রাত আমার দুস্বপ্নে কাটছে। মাঝে মাঝে বিছানায় উঠে বসে হাসতে শুরু করি। বলি ও স্বপনবুড়ো, নিয়ন্ত্রণ তোমার হাতে নাও! আমার হাত থেকে সব ফসকে যাচ্ছে, সব!’

শুভ্রা বলল, ‘তুমি আমাকে এসব কিছু বলোনি। কিন্তু আমি বুঝতে ঠিকই পেরেছিলাম।’

‘তাই বুঝি?’

‘নয়? আমার এমন হতে থাকলে তুমি বুঝতে না?’ শুভ্রার চোখে কপট অভিমান। ‘আমি অপেক্ষায় ছিলাম কবে তুমি নিজ থেকে আমাকে সব বলবে। আমি তো তোমাকে জানি। নিজে বলার আগে যতোই অনুরোধ করি একটা শব্দও বেরুবে না। প্রথম প্রথম তো পণ্ডশ্রম আমার কম হয়নি, হাহাহা! কিন্তু এখন আমি সচেতন। বুদ্ধিও খুলেছে বলতে পারে,। যাহোক। আজকের এই দিনটার অপেক্ষায় আমি অনেকদিন ধরেই ছিলাম। বলো, এরপর?’

‘এর আর পর নেই শুভ্রা। যা আছে তা শূন্য। একটা বড় শূন্য। শেষমেষ গতরাতে কী হলো তোমাকে একমন বলতে চাইছে তো আরো দশ মন বাধা দিচ্ছে।’

‘দশ মনের বাধা তুমি শুনবে কেন? ওই এক মনই আমার পক্ষ নিচ্ছে। আমার পক্ষ মানে তোমারও পক্ষ। এতোদিন তো ওই দশ মনের কথা শুনেছ। লাভ কী হয়েছে?’

‘হয়নি।’ সলিলের প্রতিরোধহীন স্বীকারোক্তি।

‘তুমি যখন একটু আগে আধিভৌতিকতার কথা বলে হাসলে না? তোমার হাসি এতো দুর্বল দেখাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এ পৃথিবীতে, এই নতুন দুঃখকষ্টের ভেতর তুমি একটা আনাড়ি লোক। যা বলছো তা তোমার নিজের কাছেই খেলো লাগছে, তবু বলছ। বলে পরমুহূর্তে বুঝতে পারছ বোকামো করছো, নিজেকে খেলো করছো, তবু বলছো, তবুও বলছো। আমি তোমাকে বুঝতে পেরেছি সলিল। আমাকে বলো, কী হয়েছে গতরাতে।’

‘বেশ, বলছি। তুমি শোবার ঘরে যাও। আমি চা করে নিয়ে আসছি।’

‘পারবে?’

‘একশবার।’

‘তোমার পা টলছে।’

‘মোটেই না।’

কেটলিতে জল ফুটল, চায়ের পাতা পড়ল, টগবগালো, চা হলো। সারাটা সময় সলিলের পাশে শুভ্রা দাঁড়িয়ে রইল। ‘তোমাকে আর কাছছাড়া করছি না।’

‘কল্পনাও করো না।’

শোবার ঘরটা বারান্দার সঙ্গে লাগোয়া। জানালা দিয়ে বারান্দার অপরাজিতা লতা চোখে পড়ছে সলিলের। শুভ্রা সেদিকে পিঠ পেতে বসেছে। তার চোখজোড়ায় কৌতূহল।

 

 

দুই

 

সাততলা ভবনের চতুর্থ তলার বেশির ভাগ বাতিই ততক্ষণে নিভে গিয়েছিল। সিঁড়িঘরের আলো ছাড়া নেভেনি কেবল দুটি। একটা জ্বলছিল মাথার ওপর, অপরটা রেস্ট রুমের করিডোরে। করিডোরের মাঝামাঝি অফিসে প্রবেশের পথ, কাচের দু’পাল্লা দরজা। দরজার বাইরে টুলের ওপর বসেছিল তরুণ প্রহরী আনোয়ার। ময়মনসিংহের ছেলে। বয়েসের তুলনায় চুল বেশ কম তার। নিরাপত্তারক্ষীর টুপি ব্রহ্মতালু থেকে বাহুমূলে চলে গেলে তখন কেবল চোখে পড়ে। দেহের আকার খর্ব, পেশল। স্বভাবটি চঞ্চল এবং অপ্রহরীসুলভ। পা দুটিতে যেন স্প্রিং আঁটা, সারাক্ষণ নড়ছে ওপর-নীচ।

‘এই ছেলেটার একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবার বলতে যাচ্ছি তোমাকে’, এই বলে ক’ সেকেন্ডের ছেদ টানল সলিল।

‘যেদিন রাতের ডিউটি থাকে, আর প্রহরী থাকে আনোয়ার, সেদিন আমার মনটা খুব খারাপ হয়। আনোয়ার ছেলেটি আমাকে ভালোবাসে আর ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে সে আমাকে চা করে দিতে চায়। সবাইকে নয়, আমি দেখেছি। আমাকেই শুধু। কিন্তু ওর চায়ের ভেতর বিচিত্র এক দুর্গন্ধ আমি টের পাই। আমার বিশ্বাস চা সে খুব ভালোবেসেই বানায়। কিন্তু ভালোবাসা অন্তরে থাকলে তার প্রকাশও যে দক্ষ উপায়ে ঘটবে তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। আনোয়ার টি-ব্যাগ দেবে একটি। আর বড় একটা মগ একদম ভরে পানি দেবে। হয়ত কোনোভাবে তার ধারণা হয়েছে আমি বেশি চা খেতে পছন্দ করব। পানির এই পরিমাণকে বশ মানাতে এবার অকৃপণ হাতে ঢালবে চিনি। এরপর বুটজুতোয় মচমচ করে ধীর পায়ে হেঁটে খুব গর্বিত মুখ করে নিয়ে এসে টেবিলে ঠক করে রাখবে। প্রথমদিন আমি খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু চা মুখে দিয়ে যখন প্রাণ তিতিয়ে উঠল, নিষেধ করে দিলাম। কিন্তু হায়, আমার দুর্ভাগ্য। আমার নিষেধ করার ভঙ্গি থেকে ওর ধারণা হলো, বুঝি ওর কষ্টের কথা ভেবেই আমি চা দিতে নিষেধ করছি। জবাব দিলো, ভালোবাসে বলেই করে; কোনও কষ্ট হয় না। এমন কথা যে বলে তাকে আমি আরো ভেঙেও বা কী করে বলি?’

শুভ্রার ঘামে ভেজা কপালের ওপর লেপ্টে থাকা ক’গাছি চুল আঙুলের ডগায় তুলে সাদরে পেছনে পাঠিয়ে সলিল বলল, ‘আনোয়ার কিন্তু নিরাপত্তা প্রহরী। চা করা তো ওর কাজের ভেতর পড়ে না। তবুও যে চা সে করতো এ নিয়ে ওর ভেতর গোপন অহম ছিল, সন্দেহ আমার। ঊর্ধ্বতনের প্রতি যে সেবা তা প্রায়ই অহমপ্রসবা, তুমি লক্ষ করে দেখবে। ওটুকু অহম অধঃস্তনকে সান্ত্বনা দেয়। এই সান্ত্বনাটুকু হারাতে সে চায় না। চাওয়া না-চাওয়ার এই বিরোধটা ঘটে অবচেতনে। যাহোক, আমার নীরবতাকে চাচা দরদ ধরে নিয়ে চা বানানোর কাজে দ্বিগুণ উৎসাহে পেল ছেলেটা। পেল না বলে, বলি বরং নিলো।’

কণ্ঠ ধীরে ধীরে সোৎসাহ হয়ে উঠছিল সলিলের, হাত পাও নড়ছিল বেশ। উৎসাহ আর হাতঘোড়া, দুটোর মুখেই সে লাগাম পরাল।

‘তো, আগেই একবার বলেছি সে মচমচ করে আসতো বুট জুতোয়। এক বৃষ্টির রাতে ওর জুতো ভিজে গিয়েছিল। বিটকেল গন্ধ আসছিল তা থেকে। এ অবস্থায় যখন সে চা নিয়ে এলো, আমার মনে হলো ওর জুতো ভেজানো পানি ও চায়ে মিশিয়ে দিয়েছে। মানুষের মন বিচিত্র। এমন মনে হওয়ার কী কারণ থাকতে পারে, কিন্তু মনে হলো আমার। সে যে কী বিতৃষ্ণা আমার জাগলো শুভ্রা এরপর! তার কোনো তুলনা এখনো পাইনি।’

শুভ্রার প্রশ্নালু চোখের দিকে তাকিয়ে সলিল বলল, ‘এই বিতৃষ্ণা, বিবমিষাটাকে তুমি একটা যোগসূত্র হিসেবে আবিষ্কার করবে, পরে।’

দেখা গেল, পড়ে থাকা খবরের সংখ্যা কম নয়। এর ভেতর একটি খবর আবার প্রতিনিধির কাছ থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গে তুলে দেওয়ার মতো। ফরিদপুর জেলায় এক নারী নৃশংস উপায়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার, ঘটনাস্থল ভাঙ্গার কুমার নদের তীরবর্তী সদরদি গ্রাম। প্রাধান্য বিচারে শুরুর দিকে থাকার মতো খবর। কিন্তু যে করেই হোক আরো অনেক খবরের স্তূপে এটি চাপা পড়ে গিয়েছিল।

বিছানা ছেড়ে এবার উঠে দাঁড়াল সলীল। ওদিকে টি-টেবিলের ওপর চা ঠাণ্ডা হতে লেগেছে। একটা গত হয়ে যাওয়া বিয়ের কার্ড দিয়ে শুভ্রা কাপটা ঢেকে রাখল।

‘তোমাকে মফস্বলী নৃশংসতার কথা বলছিলাম না? নৃশংসতার এই ছবিগুলো কিন্তু পানির ঢাল বেয়ে নামার মতো স্বাভাবিক এখন শুভ্রা।’ কাছে এসে শুভ্রার আয়ত চোখের দিকে তাকিয়ে সলিল বলল, ‘মানুষকে মেরে ফেলা কিন্তু একদম কঠিন কিছু নয়। তার শরীর এতো নরম, সংবেদনশীল, একেকসময় মনে হয় যেন মরবার জন্যই শরীরটা মুখিয়ে আছে। এমন মানুষকেই মারবার কত বিচিত্র কঠিন উপায় খোদ মানুষই খাটায়, কল্পনা করতে পারবে না। যখন পেশাদার খুনে এসে মেরে যায়, যথাসম্ভব সংক্ষেপে সারে কাজ। কিন্তু যখন অপেশাদার প্রতিহিংসাপরায়ণ মানুষ এ কাজে নামে, কাজটা সংক্ষেপে সারতে পারে না। কারণ মেরে ফেলাটাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে না। তার উদ্দেশ্য থাকে মেরে ফেলা তো বটেই, সঙ্গে ঘৃণার তীব্র প্রকাশ ঘটানো। এই ঘৃণা কখনও কখনও ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে যায় জানো? ব্যাপারটা কী করে ব্যাখ্যা করি? হতে পারে শুরুটা ব্যক্তি থেকেই, তবু ক্রমে ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে কোনও এক বিশেষ জাতের ওপর বিদ্বেষে গড়ায়। ওই নারীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। ব্যক্তিগত ঘৃণা ছিল ধরে নাও। কিন্তু ওই যে? প্রতিহিংসা যখন চরিতার্থ হচ্ছিল, তখন ব্যক্তিগত ঘৃণার সীমাও ছাড়িয়ে গিয়েছিল!’

ক্রমে আবেগমথিত হয়ে উঠছিল সলিলের কণ্ঠ। নিচের ঠোঁটের কাঁপন ঠেকিয়ে চলেছিল বহু কষ্টে। সলিলের এই রূপের সঙ্গে বরাবরই পরিচিত শুভ্রা। মুখে একটা কান্নার মতো হাসি ফুটে আছে তারও।

‘সদরদির ওই নারী মারা যাওয়ার পর কম হলেও আঠারো ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছিল। প্রতিবেদক খবরটা পাঠাবার পর কেটে গেছে আরো ছ’ ঘণ্টা। গ্রামে বংশানুক্রমে সুদের কারবার করে আসছিল তার বর। মাস ছয় হয় সে নিখোঁজ। নাম কসিম। কসিম নিরুদ্দেশ হওয়ার পর কারবারের হাল ধরে হত্যাকাণ্ডের শিকার এই নারী, তার স্ত্রী। নামটি চমৎকার। তার ভাগ্যের ঠিক বিপরীত। সোফি।’

এর আগে কখনও কসিম কাউকে না বলে নিরুদ্দেশে যায়নি। সুতরাং যেতে পারে এমনটাও কেউ আশা করেনি। এ অবস্থায় দেশে যা চলমান, সেই গুমের ঘটনাই ঘটেছে বলে প্রথমটায় ধারণা করতে হলো। ধারণা এখন অব্দি বদলায়নি। পুলিশকে জানানো হলো। ডায়রি করা হলো; মামলা নয়। সোফি মামলা করতে চেয়েছিল, কিন্তু মামলা নিতে চাইছিল না পুলিশ। ফিরিয়ে দিচ্ছিল বারবার, বলছিল এটা পারিবারিক ব্যাপার। পুলিশের গ্রাহ্য করবার মতো কিছু নয়।

কসিমের অনেক টাকা পাওনা ছিল অনেকের কাছেই, এর সূত্র ধরে কোনও দুর্ঘটনা কেউ ঘটিয়েছে কিনা— এই ছিল সোফির ভাবনা। কারবার হাতে নেয়ার পর থেকে সেও তটস্থ থাকত। সংসারে আর ছিল একটিমাত্র মেয়ে, রোকসানা নাম। ছোট বাচ্চা, দশ কি বারো হবে তার বয়স।

‘এতো ছোট কোনও শিশুকে কোনও মার্ডার কেসের ক্ষেত্রে প্রশ্ন যেন করা না হয়, এটা বারবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছিল ফরিদপুর প্রতিনিধিকে।’ সলিলের কণ্ঠে হতাশা। ‘কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। যাক, হয়তো সে নিরুপায় ছিল। যা জানা গেল—’

সোফি মেয়ে রোকসানাকে একা রেখে কোথাও যেতো না। মায়েতে মেয়েতে ঘরের দরজা-জানালায় বাঁই আড়াআড়ি বসিয়ে দিতো ঘুমোনোর আগে। তাতে করে বাহির থেকে দরজা বা জানালা খোলা হয়ে উঠত প্রায় অসম্ভব। ঘটনার দিন সকালে পাওনা টাকা দেয়ার কথা বলে দু’জন লোক এসে সোফিকে বাইরে নিয়ে গেল।

যাওয়ার সময় রুকসানাকে আদর করে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘরে রেখে গিয়েছিল সোফি। টাকার ব্যাপারটা বলেছিল তাকে। বলেছিল, ‘ওরা তোমার আব্বুর কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল এই এত্তগুলো। ওই টাকাটা এখন ফেরত দেবে আমাকে। আমি যাচ্ছি। এখনই চলে আসবো সোনা!’ এটুকুন মেয়ে ঠিক সব মনে রেখেছে। ‘তুমি ততক্ষণ লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থেকো কেমন? বাইরে যেও না। বাঁইটা তুলে দিও।’ দরজা ছিটকিনি খোলা, কিন্তু বাঁইটা তোলাই ছিল। একা রোকসানা ঘরের ভেতর; মায়ের জন্যে অপেক্ষারতা। মা গেল টাকা আনতে। আর এলো কই? একসময় একা ঘরের ভেতর ভয় করতে থাকলে বাঁইটা তুলে বাইরে এলো রোকসানা। আর তখনই স্বজনরা সব জানলো। বেরুলো তার খোঁজে।

বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজ উত্তরে পাটক্ষেতে শেয়াল কুকুরের রগঢ়ের ভেতর খুঁজে পেল সোফিকে। মৃত।

কাপড় রাখার ছোট আলমারির ওপরে দাঁড় করানো ফুলদানির ভেতর থেকে আনমনে একটা পুরনো ব্রাশ হাতে নিয়ে তার রোঁয়াগুচ্ছে আঁচড় কাটলো সলিল। হলুদ রঙের ধুলো কুণ্ডুলির মতো বেরিয়ে এসে বাতাসে হারিয়ে গেল। সেদিকে চোখ রেখে বলে গেল, ‘পুলিশ এলো রাতেই। ঘিরে দিলো জায়গাটা। লাশ রইল পাটক্ষেতেই। সকালে হলো সুরতহাল। ময়নাতদন্ত হবে বলে এরপর ফরিদপুর সদর হাসপাতালে চলল সোফি।’

সলিল বিছানায় শুভ্রার পাশে এসে বসে পড়ল আবার। জানালার গরাদে আলো বাধা পেয়ে তৈরি হওয়া ছায়া বিছানায় নকশা তৈরি করেছে। সেখানে আনমনে আঙুল বোলাতে বোলাতে যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলে চলেছে সলিল। ‘প্রতিবেদনের সঙ্গে ছবি ছিল দুটো। ওই ছবিগুলোই আমার জন্যে কাল হলো শুভ্রা। ছবি না দেখে তো আর সিদ্ধান্ত দিতে পারব না, প্রতিবেদনের সঙ্গে তা যাবে কি না-যাবে। তাই খুলতেই হলো। নিরুপায় ছিলাম। ওটাই আমার কাল হলো।’

সলিলের চোখে বিষাদ। দৃষ্টি শুভ্রার চোখে স্থির।

‘রাত গভীরে আমি এ ধরনের ছবি সচরাচর খুলি না শুভ্রা। আমার মস্তিষ্ক নিতে পারে না। এসব আমার গা-সওয়া যদি না হয় তুমি কি আমাকে দোষ দিতে পারো শুভ্রা? শোনো একবার কী হলো—’

শুভ্রার হাতটা মুহূর্তের জন্যে তুলে ধরে আবার কোলের ওপর রেখে দিলো সলিল।

‘উদাহরণ এই একটাই দেবো, এর বেশি নয়। সেবারের পরই আমি রাতে এসব ছবি খোলা বাদ দিয়েছি। সিলেট থেকে আসা একটা সবুজ মাঠের ছবি এলো। মনে হলো মাঠের ঠিক মধ্যখানে একটা সূর্যমুখী ফুল পড়ে আছে। আমি মুগ্ধ হবো বলে খুলেছি। দেখি সূর্যমুখী ফুল নয়, ওটা এক নারীর বিচ্ছিন্ন মাথা। সবুজ ঘাসের পটভূমিতে সুন্দর ফুটে আছে। ওর ধড় কোথায় তখনও জানা নেই।

এসব ছবি সংবাদে যায় না বিধায় সরাসরি ট্র্যাশ ফোল্ডারে চলে যায়। কত ছবি আর খবর যে এই ট্র্যাশ ফোল্ডারে চলে যায় শুভ্রা, তার কোনও হিসেব নেই। না-দেওয়া কতশত করুণ খবর, মৃত্যু-নিখোঁজ সংবাদ। মৃত্যুও যে গুরুত্বপূর্ণ-অগুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা শোচনীয় উপায়ে তুমি বুঝবে যদি সংবাদপত্র কিংবা হাসপাতালে কিছুদিন কাজ করতে পারো।’

হাতটা ফের তুলে নিয়ে বলল, ‘বেশ। এবার ওই ছেলেটার কথায় আসি। আনোয়ার। নিষেধ সত্ত্বেও সে রাতে আনোয়ার এসে ঠক্ করে যখন চায়ের মগটা রেখে গেল। তখন চিন্তার ধারাবাহিকতাটা হারিয়ে ফেলল আমার মগজ, ঠিক ওই মুহূর্তে। ঘ্যাঁচ করে মগজে খুব বিঁধল ছেলেটার কাজ।

কিন্তু বরাবরের মতোই চুপ করে থাকলাম, রাগকে সামাল দিলাম।

আমি দেখেছি, জীবনে যতোবার আমি রাগ সামাল দিয়েছি ততোবার বিচিত্র এক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই বিচিত্রতার শেষ নেই। আনোয়ারের ওপর হঠাৎ তেতে ওঠা সামলে আমি ওই বিচিত্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফাঁদে পড়লাম। রেখে যাওয়া চা থেকে মোজার গন্ধ বেরোতে শুরু হলো। টেবিলে টেকাই হলো দায়।

আমার রাতের ভাগ্য ততক্ষণে নির্ধারিত হয়ে গেছে। ছবিটা খুলতেই আমার সামনে মূর্তিমতি এক দুঃস্বপ্ন ভেসে উঠল শুভ্রা, দুঃস্বপ্ন ভেসে উঠল। জানতে চাও কেমন সেই ছবি?’

গলায় ছুরি চালানো হয়েছে। দুদিকে ফাঁক হয়ে আছে পা দুটো। তাতে আঘাতের কালো কালো ছোপ আর জমাট রক্ত এমন নকশা তৈরি করেছে যেন দুটো অজগর। পেটের মতো নির্লোম একজোড়া উরু। শ্রোণি অঞ্চলে অজগর দুটোর মধ্যাংশ মিশে গেছে। লাল পেটিকোটটা গোটানো। খুলে পড়া হলদে শাড়ির একাংশে রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। শরীরসহ ধস্তাধস্তির জায়গাটিতে দুমড়ে আছে কোমল পাটক্ষেত।

‘গলায় ছুরি চালানোর আগে ক’জনে মিলে তাকে রেপ করেছে। কিছু মনে কোরো না শুভ্রা। একটু ভিনদেশি শব্দের আড়াল খুঁজছি আমি, আর কিছু না, একেবারেই না।

খবরে তো আছেই আর ছবি দেখেও আঁচ করা যায়। কী দেখে যে সে অনুমান আসে তা তোমাকে আমি বলতে পারব না শুভ্রা, সে ভাষা আমার জানা নেই। একদিকে কাপড়ওঠা উরু, তাতে কালসিটে। অপরদিকে ফাঁক হয়ে থাকা রক্তজমাট একটা গলা।

আমার চোখ শুধু ছবি জুড়ে এদিক ওদিক করছে, একটা শান্তিময় কোণ খুঁজছে, একটা কোনও সান্ত্বনার জায়গা খুঁজছে। না পেলে যে চোখ দুটি সরিয়ে বাঁচা যায় সে কথাটিই শুধু মনে পড়ছে না।

এমনিতে রাতের ডিউটি নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তায় থাকি তুমি তো জানো। একা আমি একদম থাকতে পারি না, একা একদম চাপ নিতে পারি না, মন আমার কেমন দুর্বল হয়ে থাকে। তবু দিনের বেলায় যেমন তেমন করে এড়িয়ে যেতে পারত মন। কিন্তু রাতের বেলায় এরকম চাপে স্রেফ ধসে পড়ল। চেতনায় ধস নামল আমার।

আর দুর্বলতার ছিদ্রপথ সেদিন আনোয়ারের গন্ধের ওই হুল দিয়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই পটও আমি নিজেই রচনা করেছি। ছেলেটার কোনও দোষ নেই।

এসময় এমন এক ঘটনা ঘটে গেল যার জন্যে এতোটুকু মানসিক প্রস্তুতিও আমার ছিল না।’

 

 

তিন

 

রক্তসোঁদা একটা গন্ধ এলো নাকে। কোরবানি ঈদের পর রাস্তার মোড়ে বাড়ির গ্যারেজে উচ্ছিষ্ট মাংস জমাট রক্ত থেকে যেমন মিলিত গন্ধ আসে ঠিক তেমন।

এসেই যে সে স্থির হয়ে রইল তা নয়। নাকের দুই ছিদ্রপথসহ কানের চ্যাপ্টা গহ্বর দিয়েও পথ করে ঢুকে পড়ে মগজ নাড়িয়ে দিলো। হৃৎপিণ্ডটার ছন্দে ঘটালো ব্যাঘাত। আঠারো ঘণ্টা আগের মড়ার ছবিতে কি তবে পচন ধরেছে? কাচের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্তে বাতাসের সঙ্গে দুলছিল আনোয়ার। এমন সময় ছবিটা থেকে হিসহিসিয়ে বেরিয়ে এলো— ‘আমার খবর এখনও তোলা হলো না কেন চাঁদ? আমার মরণ কি মরণ লাগে না তোমার কাছে?’

কথাগুলো ঠিক স্পষ্ট নয়। যেন বহুদূর থেকে অন্য কোনও কথা ছুড়ে দেয়া হয়েছে। কাছে আসতে আসতে বদলে গিয়ে হয়েছে এমন। কথা বিক্ষত; কিন্তু ঘৃণাটুকু নয়। সেটুকু অক্ষত।

‘এটা কি সত্য হতে পারে? মোটেই নয়,’ এই বলে সলিলের বিক্ষিপ্ত মনের শাসন চলল কিছুক্ষণ। এরপর প্রতিবেদনে আবার কলম-কাঁচি সচল হলো, সম্পাদনা চলল। যখন শেষ হলো, ফরিদপুরের মানচিত্র সংগ্রহ করতে নির্দিষ্ট ফোল্ডারে যাওয়া হলো।

‘মানচিত্রের ছবিটি সার্ভারে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ একটা যন্ত্রণা তার মাথার এপাশ ওপাশ হয়ে বেরিয়ে গেল শুভ্রা!’

এবার আর কোনও ভুল নয়। কণ্ঠ আর দূরে নেই। অচেনা সেই নারীকণ্ঠ তীব্র ঘৃণা ঢেলে হিসহিসিয়ে উঠল আবার, ‘আমার এই ছবিটা তোমাকে দিতে হবে চাঁদ, দিতে তুমি বাধ্য! এটা মানুষকে দেখতে দিতে হবে, দেখতে দিতে হবে যে কত কষ্ট পেয়ে মরেছি আমি। কত কষ্টে হাত পা গলা টানটান করে আমি মরেছি!’

এই ঘৃণা তো এই অনুনয়, এই অনুনয় তো পরক্ষণেই স্বরের ক্রুদ্ধ ওঠানামা। চলতেই থাকল। কণ্ঠে কুমার নদের যৌবনের মতো ভাঙা অঞ্চলের প্রবল টান।

বলে গেল, ‘এই ছবি দেখতে না পেলে মানুষের কোনো বিকার জন্মাবে না। শুধুই একটা খবর? খবরে কোনো অনুভূতি হবে না কারো, কারণ এসব অভ্যাস হয়ে গেছে। অভ্যাস হয়ে গেছে সোনা, সব তো তোদের অভ্যাস হয়ে গেছে। খবরে কী এসে যায়, বল? এই এই! তুই বরং এক কাজ কর। খবরটা দিস না মনি, তারচেয়ে এই ছবিটা তুলে দে, শুধু এই ছবিটা তুলে দে।

এই ছবিটা খবরের চেয়ে অনেক বড়! তোদের নিয়মের আমি নিকুচি করি। এই অথর্ব মানুষ, এই পশু!’

ছবির উইন্ডো বন্ধ করে দিলো সলিল। এরপরও বাতাসে অস্বাভাবিকতাটুকু ঝুলে থাকলো সব আগের মতোই। হঠাৎ চেয়ার সরানোর শব্দে আনোয়ার চমকে উঠল। চমকটা ভাঙতেই অনর্থক বুক টান করে দাঁড়ালো একবার।

ওকে পেরিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে দৌড়ে গেল সলিল।

বাথরুমের এ-দেয়াল থেকে ও-দেয়াল অব্দি টানা বিশাল এক আয়না। তার সামনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে নিজ চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে সলিল দেখতে পেল, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। চোখে মুখে পানি দেওয়া হলো অনেক। লাভ হয়ত কিছু হলো, তবে সাময়িক।

ফিরে ফিরে চলল জলচিকিৎসা। ওদিকে কোথাও থেকে এসে কানের দু’দিকে কাছে মুখ নিয়ে তীব্র স্বরে কথা বলে চলল দু’জন মানুষ।

এঁরা পত্রিকার সম্পাদক আর বার্তাকক্ষ প্রধান।

সম্পাদক বলল, ‘ওভার সেনসিটিভ! ভারি দুর্নাম তোমার।’

‘শক্ত হতে হবে, আরো শক্ত। হেহ্!’ তাচ্ছিল্য বার্তাপ্রধানের কণ্ঠে।

‘এই হৃদপিণ্ড নিয়ে মফস্বল বিট দেখতে বসা!’ বিস্মিত সম্পাদক। ‘অরুণ সাহেব, কাল ওকে স্পোর্টস ডেস্কে বসাবেন। রাসকেল! দরকার নেই ওকে এখানে!’

‘জি বস, তাই হবে। ছিঃ সলিল! আপনার জন্যে আজ মাথা হেঁট হলো!’

হাতমুখের জল ঝেড়ে বার্তাঘরে ফিরে আসবার পর টেবিলে রাখা টিস্যু পেপারের বাকশো থেকে পরপর দুটো তুলে নিলো সলিল।

মুখচোখের পানি শুষে নেওয়া হয়েছে কি হয়নি এরই মধ্যে কানের কাছে শুরু হলো আবার— যা চলছিল।

গন্ধ কিছুক্ষণের জন্য সরে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে তখন, সঙ্গে ফিরেছে প্রেতকণ্ঠ, দুটি অঙ্গাঙ্গি। বলছে, ‘শরীর এমন ছোপ ছোপ ধরে পচতে শুরু করে জানতাম না! কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে! গলায় ফাঁকে মাছি উড়ছে মাছি, লাশের মাছি। এই! মাছি সরিয়ে দে, সরিয়ে দে! নইলে বলছি তোর পেছনে লেলিয়ে দেবো!’

এইসব খাপছাড়া কথা চলতেই থাকল। বলল, ‘শোন মনি আমার কথা শোন, সরিয়ে দে না মনি, খুব অসহ্য লাগে! এ মাছির পাখা নাড়ার বোঁ বোঁ শব্দ খুব অপছন্দ আমার, আর খুব ভয়, খুব ভয়। ছবিটা কই আমার? খোল, আবার খোল, বন্ধ করেছিস যে!’

সলিল যেন একান্ত বাধ্যগত তার। সম্মোহিতের মতো আবার খুলল ছবিটা। কণ্ঠটা বলেই চলল, ‘পেশাদার না ওরা, নিজেরাও খুব চাপে ছিল রে মনি! অল্প কাটলেই চলে অথচ সবটা কেটেছে। দেখ? বেশি না একবার শুধু দেখ। দেখলে তোর ভালো হবে সোনা, এইতো। হ্যাঁ, এবার আমার মুখটা দেখ।’

‘আমার মাথার ভেতরটা নড়তে থাকল শুভ্রা। যেন ওখানে কোনো মগজ নেই। একটা পাথরখ- কেবল হেলছে আর দুলছে। ইচ্ছে হলো চিৎকার করে কাঁদি, তবু যদি মুক্তি মেলে ওর কবল থেকে!’

উন্মাদিনীর মতো হাসতে থাকল কণ্ঠটা।

‘কী! কী! কী দেখে পিছিয়ে যাচ্ছিস অমন? লাশের মুখটা কার? আমার?’

সলিল দেখল ছবিতে সোফির মুখ নয়, অবিকল শুভ্রার মুখটা দেখা যাচ্ছে।

‘হ্যাঁ, শুভ্রা! অবিকল তোমার মুখ!’

ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে আছে। তার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওপরের পাটির দাঁত, একটু সবুজাভ। সৃষ্টিকর্তাকে দেখছে; চোখজোড়া আকাশের দিকে খোলা।

মুখটা নড়ে উঠল এসময়। ধীরে শুভ্রার মৃত চোখজোড়া স্থির হলো সলিলের চোখে। ‘সলিল! সলিল দেখ ওরা আমাকে কী করেছে। তুমি কোথায় ছিলে সলিল? কত করে ডাকলাম তুমি শুনতে পেলে না। এর কোনও প্রতিকার করবে না সলিল? তুমি মহাত্মার মতো সত্যাগ্রহ কর?’

কর্কশ কণ্ঠ রাগত সোফিকে নির্দেশ করল এবার। চেহারাটা বদলেছে। শুভ্রা আবার হয়েছে সোফি। ‘হ্যাঁ শুভ্রা, সোফি, আমি সত্যাগ্রহ করব। আমি সত্যাগ্রহ করব!’

‘আজ সারা দিনে এই গোটা দেশে ক’জন—’

‘আমি জানি না! জানতে চাই না!’

‘Killed, after being raped?’

‘আমি জানি না! জানতেও চাই না!’

‘ক’টা খবর এসেছে তোমাদের কাছে?’

‘ছ’টা, ঠিক ছটা খবর। ছ’টা খবর!’

‘ক’টা গেছে?’

‘পাঁচটা, পাঁচটা গেছে! ছয়টার ভেতর পাঁচটাই গেছে। ভাবো একবার সোফি! এটা তো একবার ভাবো! শুভ্রা—’

‘মাত্র ছয় খবরের একটা খবর আমার। পাঁচজনই গতকালের খবর হতে পারলো, শুধু আমি পারলাম না। আমি কেন পারলাম না?

আমার কি মরতে কষ্ট ওদের চেয়ে কম হয়েছে? তুমি আমার ওই সুন্দর ছবিটা খবরে দিয়ে দাও না সম্পাদক? জনাব! তাহলে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো, মাছি লেলিয়ে দেবো না কথা দিচ্ছি।

আমার কথা মানো। মানবে না? মানুষের মনের ভেতরটা জানি আমি। প্রতি মুহূর্তে ওই মনের ভেতর খুব সাদাসিধা একটা পুরুষও কত নারীকে ধর্ষণ করে, আর ধর্ষণের পর হত্যা করে, তাও এখন জানি। মানুষকে বলতে যখন পারছো সোনামানিক, তখন দেখাতে দোষ কোথায় বলো? ও, অনুভূতিতে আঘাত লাগবে বুঝি!

লাগে লাগুক! চোখের ঘুম হারাম হয়ে যাক! কলিজায় ছুরি গাঁথে গাঁথুক!

শিশুরা দেখবে বলে? আ-হাহা, তাদের কুসুম কোমল মন, তাই না? ক’টা কুসুম কোমল শিশু আজ—’

‘থামো, একটু দয়া কর!’

‘তোমরা তাদের মনের কী যতনটাই না করছ! ছবি দাও। দিতে হবে। এই আমার শেষ কথা।’

সলিলের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আঁচল দিয়ে মুছে নিলো শুভ্রা। চোখের দৃষ্টিতে প্রশ্ন, ‘এরপর?’

‘আবার ছুটে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ানো ছাড়া আমার উপায় ছিল না শুভ্রা। এভাবে আমি কতবার যে ভেতর বাহির করেছি তার কোনো হিসেব নেই! একসময় আমার পেছন পেছন ডাকতে ডাকতে ছুটতে শুরু করল আনোয়ারও। ওকে মেরে ঠেলে নিজে পড়ে গিয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে পড়ে উঠে কী কাণ্ড আমার!

গোল রক্তাভ চোখে, বিবর্ণ মুখে পড়ছে পানির ছিটে। কানের কাছে দুজনের মুখ। একটা তোমার। একটা সোফির।

‘এ ছবি তোমাকে দিতেই হবে। শান্তিতে থাকতে দেবো না তোমাকে নইলে। এতো কথা বলার পরও তুমি কী করে ছবির বদলে ফরিদপুরের মানচিত্র দিলে? দিতে পারলে?’ তুমি বললে।

সোফি বলল, ‘তোর কি কোনো ভয়ডর নেই?’

আবার তুমি বললে, ‘তোমার কি বিবেক নেই?’

‘আমাকে যখন চিরছিল, ওই দলে তুইও ছিলি!’ সোফির কণ্ঠে আগুন। ‘আমার চুল মুঠোয় নিয়ে টেনে ধরলো যখন, গলাটা টানটান হয়ে গেলো, তুইও ছিলি! দুই উরুর ওপর দুজন চেপে বসলো, দুই হাতে হাঁটু চেপে বসলো দুইজন, তুইও ছিলি! আমার উরু দেখে সুখ নিচ্ছিলি তুই, এই তুই! তোকে আমি ঠিইক চিনে ফেলেছি। তোর পরানসখীর গলাও একদিন অমন ফাঁক হয়ে পড়ে থাকবে। হিহিহি! কাটা কণ্ঠনালী নিয়ে তোর মেয়ের মা ঘড়ঘড় করবে। হাত পা ছুড়তে পারবে না, কেউ চেপে বসে থাকবে। গলা কাটার আগে ওরা ব্লেড দিয়ে গোপনাঙ্গ কাটবে। আমি অভিশাপ দিচ্ছি! আমি অভিশাপ দিচ্ছি!’

আহা, আমার রোকসানা, আমার ছোট্টমনি! তোর কাছে ওরা আমাকে ফিরতে দিলো কই। তুই বাঁই খুলে বেরিয়ে এলি মা। তোর পিঠের বোতাম লাগানো নাই!

আনোয়ারকে সরিয়ে কাচের দরজাটা ঠেলে অন্ধকার সিঁড়িতে নেমে পড়ল সলিল। আনোয়ার দ্রুত বাতি জ্বেলে দিলো। জ্বলে ওঠা আলোয় দেখা গেল সিঁড়ির Collapsible দরজাটায় রুপালি তালা ঝুলছে। এদিকে সিঁড়ির ধার বরাবর হড়কে গেল পা। গোড়ালিতে চোট লাগল খুব।

‘শুভ্রা, মনে হলো এখানে বেঘোরে মরব আমি। কিন্তু তা তো হতে পারে না।’ দেখি ওপরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে আছে আনোয়ার। ‘আনোয়ার, তুমি?’

‘স্যার! আমার হাত ধরুন স্যার!’ ওর বাক্যে ময়মনসিংহের টানটা খুব চড়া। বললাম, ‘না, আমি বেশ আছি।’

‘স্যার, অফিসে এসব কী চলে স্যার?’ ও বলল।

‘বুঝতে পারছি না আনোয়ার! শরীরটা খারাপ লাগছে অনেকক্ষণ হলো।’

আনোয়ার আমাকে হাসপাতালে নিতে চাইলো। ভরসা দিলো, ভোর হতে বেশি দেরি নেই।’ আমি ওকে সরিয়ে আবার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ডেস্কের সামনে এলাম। আনোয়ারও এলো পেছন পেছন। এতো ভালো কেন ছেলেটা? হাতের ইশারায় তাকে চলে যেতে বলে চেয়ার টেনে আমি বসে পড়লাম টেবিলে।

কম্পিউটারটা কালো হয়ে ছিল। হাত রাখতেই আলো ফুটে উঠল। ট্র্যাশ ফোল্ডার থেকে ছবিটা বের করে নিয়ে এলাম শুভ্রা। আমি ঠিক জানি, আমাকে কী করতে হবে। প্যানেলে ঢুকে খবরের হালনাগাদ অংশে চাপ দিয়ে ছবিটা সার্ভারে তুললাম।

এরপর আগপিছ না ভেবে যা করব বলে একবার মন ঠিক করেছি তাই করলাম। আমার গলায় চাপ বাড়ছিল। পিঠের বাঁ দিকে ঠিক হৃৎপিণ্ড বরাবর ধারাল সূক্ষ্ম আর বিষাক্ত কোনও ছুরি বুঝি কেউ ধীরে গাঁথছিল। কোষে কোষে আগুন ধরে যাচ্ছিল শুভ্রা। পুড়িয়ে মারছিল আমাকে ওই আগুন। কী তীক্ষ্ণ সে যন্ত্রণা! আমি মানচিত্রের ছবি মুছে এই ছবিটা দিয়ে খবরটা হালনাগাদ করলাম। হ্যাঁ, সত্যিই করলাম। টের পেলাম কোরবানির রক্তসোঁদা গন্ধটা মিলিয়ে গেল যাচ্ছে। মিলিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস করো শুভ্রা! কী বলবে এটাকে? কিভাবে ব্যাখ্যা করবে? যে চাপটা গলার ওপর এঁটে বসছিল, সেটা আর নেই। তীক্ষ্ণ যে ব্যথা ধীরে হৃৎপিণ্ডের দিকে এগোচ্ছিল, সেটাও দিব্যি মিলিয়ে গেল।

সোফির কণ্ঠটা শুধু মাথার ভেতর রিনরিন করে বাজছিল। কী যে বলছিল, তা নির্ণয়ের বাইরে আমার। ভালো করেছি না বলো? এখন সকালে উঠেই মানুষ দেখবে ছবিটা। একেবারেই শুরুর পাতার সবার ওপরে, বড় করে দিয়েছি, এই এত্তো বড় করে। ভালো করেছি না শুভ্রা? এই কাজটা করব আমি কতদিন ধরে ভেবে আসছি। সোফি আমাকে এতো মরিয়া করে না তুললে আরো দেরি হতো। বলো না, ভালো করেছি না?’

শুভ্রা ভেজা চোখে তাকিয়ে ছিল। বলল, ‘আমাদের পিঠ কি এতোই দেয়ালে ঠেকে গেছে সলিল?

তোমার অনেক বিশ্রাম দরকার। অনেক বিশ্রাম। তুমি ক’দিনের ছুটি নাও। অথবা, অথবা তুমি আর যেও না সলিল। সত্যি বলছি। তুমি ঘরে থাকো, লেখো। আমি তোমাকে সব কিছু থেকে মুক্তি দেবো। তুমি শুধু সৃষ্টি করবে, আর দেখে আমার সুখ হবে খুব। খুব সুখ। বিশ্বাস করো, এটাই আমি চাই! তুমি লিখবে, আর প্রতি তিন মাসান্তে আমরা সমরেশ বসুর মতো বেরিয়ে পড়ব। পারব না বলো? এভাবে, এই এভাবে আমি তোমাকে তিলে তিলে শেষ হতে দেবো না সলিল। এই ভরসা তুমি আমার ওপর রেখো।

আমি জানি, যে চক্রে পড়ে গেছ, তা ভাঙতে তুমি পারোনি। তুমি ওই দুষ্টচক্রটাকে ভাঙতে পারোনি সলিল।’

শুভ্রার ঢলে সলিল সাঁতারবিহীন।

‘তুমি কি আমাকে ভয় পাও সলিল?’ হঠাৎ প্রশ্ন শুভ্রার। চোখে উত্তরের আকাঙ্ক্ষা নেই।

‘কেন পাও? তুমি কি আমার ওপর আস্থা হারিয়েছ সলিল? কেন হারালে? আমরা একে অপরকে কী কথা দিয়েছিলাম? তার বাইরে তুমি কখনো যাওনি, আমিও নই। তবে? কেন তোমার এতো ভয়?’

‘শুভ্রা, প্লিজ!’

সলিলের কণ্ঠটা অল্প কেঁপে উঠল। কাঁপল বাঁ চোখের নিচ। তার শ্যামল অপেশল হাতটা নিজ হাতে তুলে নিয়ে শুভ্রা বলল, ‘কেন মিছে করে বললে? কেন এভাবে তোমাকে, এই তোমাকে বলতে হলো? যা চেয়েছ তাই করে চিবুক উঁচু করে বেরোতে! তা তো পারোনি। তুমি তো আরো একবার হেরে গেলে সলিল। কী তীব্র ট্রমার ভেতর দিয়ে গেছ সারাটা রাত! এরপরও চক্রটা ভাঙতে পারলে না। ছবিটা বদলাতে পারলে না তুমি সলিল। যদি পারতে, তোমার চোখেমুখে আমি তার ছাপ দেখতে পেতাম। দেখো, ছবিটাও এখানে মুখ্য নয়। যা মুখ্য তা আরো অসাধারণ! এই তোমাকে আমি চিনি না সলিল! আমাকে কষ্ট দিলে, মনে রেখো।’

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close