Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ হামীম কামরুল হক > শওকত আলী : পথিকৃতের দায় >> প্রবন্ধ

হামীম কামরুল হক > শওকত আলী : পথিকৃতের দায় >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ January 29, 2018

হামীম কামরুল হক > শওকত আলী : পথিকৃতের দায় >> প্রবন্ধ
0
0

হামীম কামরুল হক > শওকত আলী : পথিকৃতের দায় >> প্রবন্ধ

 

 

শওকত আলী বাংলাদেশের উপন্যাসে একটি বিশেষ কালগ্রন্থি নির্মাণের অন্যতম নায়ক। এই পর্বটিতে ইতিহাস ও সমাজের প্রেক্ষাপটে রেখে ব্যক্তিকে দেখা হয়। এখানো পর্যন্ত বাংলা উপন্যাসে দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে ব্যক্তি কখনো তার দেশ-কাল-সম্পর্ক ছাপিয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেনি। ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকেরা যতটা ব্যক্তির এভাবে ছাপিয়ে ওঠার দিকে জোর দিয়েছেন, বাংলা উপন্যাস সেখানে আশ্চর্য ব্যতিক্রম। ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা ও অস্তিত্বের সংকট যখন ইউরোপীয় উপন্যাসে অন্বিষ্ট বাংলা উপন্যাস সেখানে সমাজের গ্যাঁড়াকলে পড়া ব্যক্তিকে মিশিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। সমাজবদল, মূল্যবোধের অবক্ষয়, আর্দশহীনতা, উৎকেন্দ্রিকতার কথা যতই বলা হোক বাংলা উপন্যাস ব্যক্তিকে দিয়ে কোনো নৈরাজ্যময় পরিস্থিতির সূচনা করতে এখানো অবধি উদ্যোগী নয়। এর কারণ সাহিত্যের ভেতরে দিয়ে আগে তো সমাজটাকে আগাগোড়া চিনে নিতে হবে, তারপর সেই সমাজকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যক্তি কী ভূমিকা পালন করতে পারে- সেটি বুঝে নেওয়া সম্ভব হয়। ফলে উপন্যাসের বহুকথিত সমাজবাস্তবতার ধারা এখনো চলমান। এরই সঙ্গে আছে নানান দোলাচল। নাগরিক না গ্রামীণ, পারলৌকিক জীবনদৃষ্টি না একান্ত পার্থিব বিশ্ববীক্ষা- এই সব দ্বিধার এখানো সমাধান হয়নি। উপন্যাসের মাধ্যমে সেই অনুসন্ধানটিও সমান তালে চলমান। সমাজ-ইতিহাসের আবছাপনা যতদিন সরানো সম্ভব হবে না, ততদিন ব্যক্তির প্রবল ভূমিকা নিয়ে উপন্যাসের নতুন যুগ নির্মিত হতে সময় নিবে। শওকত আলীর মতো লেখকরা সমাজ-ইতিহাসের আবছাপনা সরিয়ে দেওয়ার দায় বহন করে চলেছেন।

সবদেশের উপন্যাসে যে-ঘটনা ঘটে আমাদের দেশেও তাই ঘটেছে। উপন্যাসের প্রথম দিককার পাত্রপাত্রী ও বিষয়বস্তু রাজতান্ত্রিক সমাজের মধ্য থেকে উদ্ভূত, পরবর্তীকালে তা আসে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে, এর পর মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ থেকে এবং তারপর আসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে। রীতির দিক থেকে যথাক্রমে এগুলো হয়েছে- ক্ল্যাসিক, রোমান্টিক, রিয়ালিস্ট এবং ন্যাচারালিস্ট। বর্তমানে এই রীতিগুলো বৈশ্বিকভাবে বিচারের মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে। ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের বিবেচনায় গদ্যকাহিনীর ভেতরে কোনটা কথা ও কোনটা আখ্যায়িকা, প্রকৃতি বিচারে কীভাবে রস, ধ্বনি, ভাব তৈরি হতে পারে সাহিত্যে- তুলানামূলক বিচারের ক্ষেত্রে এসবের লক্ষণগত মিলও আছে।

চরিত্র নির্মাণের দিক থেকে এই পর্বগুলোতে ইতিহাস ও সমাজই মুখ্য হয়ে থাকে। ফলে উপন্যাসে ব্যক্তির যে উন্মেষ, যা প্রকৃত-উপন্যাসের প্রধানতম লক্ষণ, সে-পথে বাংলা উপন্যাস এখানো তেমন করে যেতে পারেনি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর তিনিটি উপন্যাসে সেই লক্ষণ থাকার পরও সমাজ ও ইতিহাসের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট সেখানে আসেনি। তার ওপর সেই সময়ের যেভাবে বাংলা উপন্যাস লেখা হচ্ছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সেখানে বিরল ব্যতিক্রম। এর একটা কারণ এখন বোঝা যায় যে বাংলা উপন্যাসের মূল ধারায় রুশ উপন্যাসের প্রভাবই যেন তলে তলে কাজ করেছিল। আর রুশ উপন্যাস যে ইউরোপীয় উপন্যাসের একটি নিরাকরণ- সেটি তলস্তয়ের মতো লেখক নিজের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিসে’র শেষের লেখা পরিশিষ্টে স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেছেন। ফলে ইউরোপীয় এবং পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা উপন্যাসের ক্ষেত্রে যে-ভূমিকা পালন করেছে সেদিকে বাংলা উপন্যাসের লেখকরা মোড় ফেরেননি। এর পেছনে কমিউনিজমের প্রতি টান এবং পুঁজিবাদী সভ্যতার প্রতিনিধিত্বকারী ইউরোপ ও আমেরিকার শিল্পকৃতির প্রতি একটা অনাগ্রও বোধ করি দায়ী। দস্তয়েভস্কির একটা প্রভাব আমাদের উপন্যাস চর্চায় থাকলেও পরবর্তীকালের তার অনুসারী ইউরোমেরিকান লেখকদের দিকে যাওয়া হয়নি আমাদের। ফলে উইলিয়াম ফকনার ও ভøাদিমির নবকভের মতো প্রখরমাত্রায় আধুনিক লেখকদের দিকে আজও আগ্রহ গড়ে ওঠেনি। তার আগে আধুনিকতাবাদী উপন্যাসের ভেতর প্রবল প্রভাব সৃষ্টিকারী মার্সেল প্রুস্তু, জেমস জয়েস, টমাস মান, ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাসে চর্চার দিকে বাংলা উপন্যাসের লেখকরা খুব এটা এগোননি। এগোবার প্রয়োজনও মনে করেননি, কারণ তাদের চোখে চোখ মিলিয়ে বাংলাদেশের মতো আধা-সামন্তবাদী দেশকে দেখতে গেলে একটা বিপদ থেকেই যায়। ফলে চোখে চোখ রাখলেও চোখাচোখিটা জমে না। আর জমে না বলে বাংলা উপন্যাস নিজের মতো পথ খুঁজতে আগ্রহী হয়, যার সূচনা বিভূতিভূষণে, একধরনের পরিণতি অদ্বৈত মল্লবর্মণের হাত দিয়ে; মধ্যিখানে অন্নদাশঙ্কর রায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদারের মতো লেখকরা এসেছেন, অতঃপর সতীনাথ ভাদুড়ী হয়ে কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণের হাতে ভিন্নধর্মী একটি খাতে বয়েছে বাংলা উপন্যাস- যেধারাটি এখনও বহুচর্চিত নয়, তাদের লেখার ভারতীয় ও ইউরোপীয় মেজাজের মিশ্রিত রসায়নের সঙ্গে বাঙালি পাঠক খুব একটা তাল মেলাতে পারেননি, এখানো পারছেন না। এরা এখানো গুটিকয়েক পাঠকের লক্ষ্য, তাদের সংজ্ঞায়িত করা হয় লেখকদের লেখক হিসেবে। এখান থেকে বাংলা উপন্যাসের একটি দ্বিধা তৈরি হয়। ঠিক কোন কাঠামোতে উপন্যাস লেখা হবে- তাতে দৃঢ়ভাবে এঁটে উঠতে পারেননি লেখকেরা। তারপরও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, অসীম রায়, দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হকের মতো লেখকরা আমাদের সাহিত্যের আধুনিকতার নিজস্ব বলয় তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। শওকত আলী তাঁদেরই সহযাত্রী।

 

২.

আমাদের বাংলাদেশের উপন্যাসের একেবারে সূচনালগ্নে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সেই দ্বিধা কাটিয়ে বেছে নিয়েছিলেন ইউরোপীয় উপন্যাসের কাঠামো। আর অন্যদিকে চার্চিত হয়েছে রুশ উপন্যাসের কাঠামো। ইউরোপীয় কাঠামোতে ব্যক্তিই প্রধান এবং তাকে ঘিরেই উপন্যাসের যাবতীয় আয়োজন। অন্যদিকে রুশ কাঠামোতে ব্যক্তির প্রাধান্য বজায় থাকার পাশাপাশি সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটিও প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়। শওকত আলী অনেকটাই এই ধারার লেখক।

তাঁর বই প্রকাশ পেতে শুরু করে বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকের একবারে শেষ দিকে। সে দিক থেকে তিনি ষাট দশকের প্রথম পর্বের লেখক। ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জে তাঁর জন্ম। দেশভাগের পর ১৯৫১ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৫৫ সালের কলকাতার ‘নতুন সাহিত্যে’ তাঁর একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। প্রথম বই ‘উন্মূল বাসনা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। মোট কথা পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি পর্যায় থেকে তাঁর লেখকজীবন শুরু হয়েছে ধরে নিলে তার লেখকজীবন প্রায় পঞ্চাশ বছরের মতো। এই পঞ্চাশ বছরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের যে ইতিহাস-রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজকাঠামোর নানান অদলবদল ও এর সঙ্গে শওকত আলীর লেখার একটি পালটাপালটি ব্যাপার ঘটে গেছে।  সমাজবিবর্তনের ধারা প্রবেশ করেছে তাঁর লেখার ভেতর, তাঁর লেখা প্রবেশ করেছে সমাজবির্বতানের ধারার ভেতর। তিনি তাঁর লেখা দিয়ে বুঝতে চেয়েছেন বাংলাদেশের সমাজবিবর্তনের ধারাকে, ফলে এখন বলতে হয় বাংলাদেশে সমাজ বিবর্তনকে বুঝতে হলে শওকত আলীর সাহিত্য আমাদের জন্য একটি বিশ্বস্ত সহায় হয়ে উঠেছে।

তিনি সমাজকে বুঝেছেন রাজনীতির পালাবদলের সূত্রে। সেদিক থেকে শওকত আলীর সাহিত্যের মূল প্রবণতা রাজনৈতিক। যদিও তাঁর সূচনালগ্নে তিনি ‘উন্মূল বাসনা’র মতো লেখা লিখেছেন, যাতে ব্যক্তি-অস্তিত্বের দোলাচলকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে ‘যাত্রা’, ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কূলায় কালস্রোত’, ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’, ‘ওয়ারিশ’, ‘উত্তরের খেপ’ পর্যন্ত শওকত আলীর লেখকসত্তার মূল দিকটি পরিস্ফূটিত। তাঁর অন্য ধাঁতের লেখাও আছে, যার মধ্যে আমরা পাই ‘অপেক্ষা’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’, ‘পতন’, ‘প্রেমকাহিনী’ প্রভৃতি। তিনি পরবর্তীকালে যে ‘দলিল’ বা ‘বসত’-এর মতো উপন্যাস লিখলেনÑ এতে মনে না হয়ে পারেই না বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা এবং এর পশ্চাৎপটে থাকা রাজনৈতিক নানান প্রণোদনার সন্ধানে তিনি তাঁর উপন্যাসকে ব্যবহৃত হতে দিয়েছেন। কিন্তু এর ফলে সাধিত হয়েছে বাঙালি-সত্তার সন্ধান ও স্বদেশ স্বভূমির সাহিত্যিক-বীক্ষার স্বরূপ। ফলে এক প্রখর বাস্তবাদী দৃষ্টির বাইরে তিনি যতটা বেরুতে চেয়েছেন তা তাকে দিয়ে ‘অপেক্ষা’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’, ‘পতন’, ‘প্রেমকাহিনীর’ মতো লেখা লিখিয়ে ছেড়েছে।

তিনি সব সময়ের বড় ক্যানভাসে কাজ করতে চেয়েছেন। সবসময় জোর দিয়েছেন বিষয়বস্তুর ওপর। তার সেই জোর এতটাই যে, তিনি অনেক সময় চরিত্রনির্মাণের মতো দিকটিকে তনিষ্টভাবে জোর দেননি। আঙ্গিকের অভিনবত্ব, ভাষানির্মাণের বিচিত্র কলাকৌশেরর নানান আবেদন তৈরির দিকেও তিনি ততটা আগ্রহী নন। যদিও ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কিন্তু কাহিনী বর্ণনায় আদি-মধ্য-অন্তের ধারাবাহিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখার প্রতিই তিনি বরাবরই আগ্রহী থেকেছেন। তিনি এক অর্থে প্রথাবিরোধিতারই বিরোধিতা করে গেছেন।

ঘটনাচক্রের প্রবাহ ও এর সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া যাওয়া মানুষজনের সংশ্লেষ-বিশ্লেষই তাঁর এক একটি উপন্যাসের আদল গড়ে তুলেছে। প্রথাগত উপন্যাসের কাঠামো আর বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতাকে এর ভেতরে এঁটে তিনি বার বার একটি বিশেষ স্তরে নিয়ে যেতে চেয়েছেন। দেশভাগ, পাকিস্তানের শাসনকাঠামোতে অবদমিত বাঙালি সত্তা, ভাষা আন্দোলন পর হয়ে স্বাধিকারের স্বপ্ন এবং পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ তাঁর রচনায় প্রামাণ্য বিষয়বস্তু হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার ছাঁচটি পরিষ্কার না হওয়ায় তিনি ‘দলিল’ ও ‘বসতে’র মতো উপন্যাস লিখে ফের তাকাতে চেয়েছেন বাঙালির খ-িতসত্তার বেদনাবিধুর ইতিহাসের দিকে। তাঁর মনে হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে নতুন করে দ্বিধাবিভক্তির সূচনা হয়েছে, ইতিহাসের বাস্তবতাকে চিনিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রগতি ও প্রতিক্রিয়াশীলতার দ্বন্দ্বের উৎসের মূল জায়গাটি চিনিয়ে দেওয়াই এখন জরুরি। তিনি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষের, বিশেষ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার মানুষকে, দেখিয়ে দিয়ে একটি সমবেত প্রতিবাদের প্রণোদনা এনেছেন তাঁর রচনায়। তাঁর বিবেচনায় মানুষে মানুষে প্রেম ও আর্থসামাজিক বিপর্যয়ে প্রতিরোধই হচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

 

৩.

সাহিত্যশিল্প নিয়ে পাশ্চাত্যে যে-নানান মতবাদ তার ভেতরে রিয়ালিজম এবং ন্যাচারালিজম ছাড়া অন্যকোনো ধারায় বাংলা উপন্যাসকে মেলানো যায় না। অথচ সিম্বলিজমের মতো মতবাদ উপন্যাসের আধুনিকতায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তী সমস্ত শিল্প আন্দোলনই বলতে গেলে কোনো না কোনো ভাবে সিম্বলিজম থেকে জরিত হয়েছে। মার্সেল প্রুস্ত এবং জেমস জয়েসের মতো লেখককেও সিম্বলিজমের ধারায় শনাক্ত করা হয়। কিন্তু উপন্যাস সেই আধুনিকতার জায়গটিও পেরিয়ে এসেছে। পরবর্তীকালে অস্তিত্ববাদী মতবাদ ও নব-উপন্যাসের ধারায় ফরাসি উপন্যাসে যেভাবে নিসিক্ত হয়েছে, বিশ্বউপন্যাসে তার যে প্রভাব পড়েছে- সেটি আমরা খুব একটি খতিয়ে দেখিনি। সাহিত্যে এই সব মতবাদ ভার বাড়িয়েছে না ধার বাড়িয়েছে- সেব্যাপারটিকেও আমরা বেশিরভাগক্ষেত্রে স্পষ্ট করে নিতে পারিনি।

বাংলাদেশে উপন্যাসের প্রথম প্রজন্ম হিসেবে যাঁদের চিহ্নিত করা হয় তাঁরাও কমবেশি ইউরোপীয় উপন্যাসের ধারাগতির সঙ্গে ঘনিষ্টভাবেই পরিচিত ছিলেন। আবুজাফর শাসুদ্দীন, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, শওকত ওসমান, সরদার জয়েনউদ্দিন, কাজী আফসার উদ্দিন আহমেদ, আবুল ফজল, আবু রুশদ প্রমুখের হাতের বাংলাদেশের উপন্যাস নিজস্ব মানচিত্র নির্মাণের দিকে এগুতে শুরু করে। সেকালের উপন্যাসের সবচেয়ে অগ্রসর ধারাগুলোর সঙ্গে সবাই সমান ভাবে পরিচিত না হলেও তুর্গেনেভ, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, গোর্কির মতো লেখকের উপন্যাসের বিষয়-আঙ্গিক-নির্মিতির সঙ্গে পরিচয় না থেকে পারে না, কারণ এঁদের কেউ কেউ তাদের রচিত গল্প উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন, অনেকেই ফ্রয়েডীয় মতবাদ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত ছিলেন। সর্বোপরি ডারউইন, মার্কস ও ফ্রয়েডের মতবাদের সঙ্গে নিবিড়ি পরিচয়ের পরও বাংলা উপন্যাসের বড় একটা এর সম্মিলিত তেমন কোনো ছাপ পরিলক্ষিত হয় না যাতে জীবনকে তীব বস্তুবাদী দৃষ্টিতে দেখবার জোর থাকে। সর্বত্র একটা চোরাভাববাদী মোহের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। জীবনকে বস্তুবাদীভাবে পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে, ঐহিক জীবনবীক্ষায় তাঁদের বেশিরভাগ উপন্যাস সেই সিদ্ধিলাভ করতে পারেনি, তথাপি তাঁদের লেখায় ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের বাঙালি মুসলিম সমাজের সামাজিক বিবর্তনের ইতিহাসের নানান উপাত্তের সন্ধান মিলবে। পাকিস্তানি মতাদর্শ, বাঙালি না মুসলিমÑ ইত্যাদি দ্বিধায় কারণে হাজির হতে পারেনি এমন কোনো ঔপন্যাসিক-প্রত্যয়, যা থেকে পূর্বেকার সাহিত্যের প্রচলিত ছক ভেঙে ফেলে নতুন জীবনদৃষ্টি নিয়ে নতুন উপন্যাস লেখায় উদ্যোগী হওয়া যায়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সেই দ্বিধার অবসান ঘটায়। ধর্মগত পরিচয়ের চেয়ে দেশ ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী দৃষ্টি ভঙ্গিতে মোড় ফেরে সেই সময়ের বাংলা উপন্যাস। ফলে চল্লিশ-পঞ্চাশের প্রজন্মে হাত থেকে সাহিত্যকে নতুন নির্মিতি দিতে ষাটের দশকেই বাংলাদেশে আধুনিকতার চর্চা প্রকৃতভাবে শুরু হয়। শওকত আলী মূলত সেই প্রজন্মেরই প্রধান লেখকদের একজন হয়ে ওঠেন, যদিও তার বিকাশ সাধিত হয় সত্তর ও আশির দশকে। ততদিনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরই কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর নানান চক্রান্তে বাঙালির নতুন দেশ নিয়ে সমস্ত স্বপ্ন বিপুল ভাবে ধাক্কা খায়। ফলে দেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, এরই বদৌলতে পরবর্তী প্রায় দেড় যুগে সামারিক শাসনের আওতায় বাঙালি প্রায় সমস্ত মূল্যবোধের বিনাশ ঘটে। কিন্তু তারচেয়েও দুঃখজনক এই সময়ের সাহিত্য তেমন কোনো প্রতিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করতে উদ্যোগী হয়নি। লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা চললেও এই ঘোরালো পরিস্থিতি তেমন কোনো উপন্যাসে জোরালো হয়ে ওঠেনি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণে আফসান চৌধুরীর ‘বিশ্বাসঘাতকগণ’ বা শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র মতো কয়েকটি লেখা ছাড়া সেই সময়ের অন্ত্রিকপচনের কথা জোরালোভাবে উপন্যাসে পাওয়া যায় না। সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো লেখকদের প্রতিনিধিত্বশীল উপন্যাসগুলিতে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়টাই মূলত ধারণ করা হয়েছে, সমাকালীন যে বাস্তবতা সামরিক ও স্বৈরাচারী অগণতন্ত্রিক শাসনপেষণে বুটের তলায় পিষে যাওয়া সেই সময় কটি উপন্যাসে বিশ্বস্তভাবে হাজির হয়েছে? তবে এও বলে রাখা ভালো ইতিহাস ও সময়কে ধারণ করা উপন্যাসের অনেকগুলো কাজের একটি দিকমাত্র, প্রধানতম দিক নয়, কিন্তু ব্যক্তি ও সমাজের উদ্ভটদশা, মূল্যবোধহীন যে-সময়ের সৃষ্টি তখন থেকে সূচিত হয়েছিল, সেখান থেকে উঠতে আসতে পারত আমাদের দেশের সবচেয়ে আধুনিক উপন্যাসটি, যেমনটা লাতিন আমেরিকার একনায়কশাসন ব্যবস্থা ও চরম দুঃশাসনের ভেতর থেকে উঠে এসেছে সত্তর ও আশির দশকে। বাংলাদেশ পরিস্থিতি সেখান থেকে খুব একটা দূরবর্তী ছিল না বলেই লাতিন আমেরিকার সেই সব উপন্যাস অনেকক্ষেত্রে আমাদের উপন্যাস হয়ে উঠেছে. তাতে কেবল স্থান ও ব্যক্তি নাম বদলে দিলে খুব একটা তারতম হয় না। গার্সিয়া মার্কেসের ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ বা ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’, বা কর্লোস ফুয়েন্তেসের ‘আউরা’, বা ইসাবেল আয়েন্দের ‘দ্য হাউস অব দ্য স্পিরিটে’র কাহিনীর যে সার্বজনীনতা, তা আমাদেরও ছুঁয়ে যায়, কারণ এই বাস্তবতা নিহিত আছে আমাদের আর্থসামাজিক নানা ক্ষেত্রে, কিন্তু আমরা তা সেভাবে শনাক্ত করতে পারিনি।

কিন্তু শওকত আলীর মতো লেখকরা তাঁদের সময়ের দায় পূরণ করেছেন। তাঁর দায় ছিল তাঁর নিজের প্রতিও। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দায় পূরণের দিকে নয়। সেদিক থেকে তিনি তাঁর সাধ্যমতো করেছেন। কেউ কেউ তাঁর লেখায় নান্দনিকতার অভাব, ভাষাসিদ্ধির অভাব দেখতে পান। সাম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেল, মহাশ্বেতা দেবীর মতো লেখিকা নান্দনিকতাকে শিল্পের শর্ত বলেই মনে করেন না। শিল্প তার নিজগুণেই শিল্প, আরোপিত কালকৌশল, বা কারিকুরি করে তাকে শিল্প করে তোলা যায় না- এমন একটা দৃষ্টিকোণ থেকেই বোধ করি কথাটাটি এসে পড়ে। আবদুল মান্নান সৈয়দ মনে করতেন, বিশুদ্ধ নয়, উপন্যাসের গদ্য হবে উদাত্ত। এমন আরো অনেকে মনে করেন যে জীবন কোনো একটা কাঠামোতে বাঁধা নয়, এটা প্রায় ফরমহীন একটা ব্যাপার। ফলে সাহিত্য কেন ফরমহীন হবে না? দস্তয়েভস্কির মতো লেখকের লেখাও তো ফরমহীন। দস্তয়েভস্কির মতো লেখকও দুর্বল গদ্যের জন্য অভিযুক্ত, কিন্তু উপন্যাসের বিষয়  ও বয়ান কী করে ভাষাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস তার সবচেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত।

শওকত আলীর লেখাকে সে জায়গা থেকে দেখা গেলে তাঁর বিষয়গুণ সমীহ করার মতো। এদেশের সমাজের নানান শ্রেণী ও পেশার মানুষকে তিনি যেভাবে দেখেছেন এবং দেখিয়েছেনÑতাতে ‘কীভাবে দেখিয়েছেন’ এই প্রশ্নের চেয়ে ‘কী দেখিয়েছেন’ তার উত্তর তাই সদর্থকভাবে খুঁজতে হয়। সেটি খুঁজতে গেলেই তাঁর কাজের মূল্যমান যথাযথভাবে নির্ধারিত হয়। কারণ তিনি মনে করেন, কী বলতে চান তার ওপরই নির্ভর করে কীভাবে বলতে চান। উলটো নয়। উপন্যাসের কাছে বুদ্ধিদীপ্ত, প্রগাঢ় ও অনুভূতিময় এক বিশেষ আনন্দই তাঁর প্রত্যাশা। লেখকের আন্তরিকতা তার ভাষায় ও বোধেই ফুটে ওঠে। তাঁর কাছে বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ, ফরম নয়। তিনি মনে করেন,‘‘কেবলমাত্র ফর্ম-এর উদাহরণ হিসেবে কোনো রচনা যে ক্ল্যাসিক হয় না, যুগান্তকারী শিল্পের মর্যাদাও পায় নাÑএতো আমরা সাহিত্যের ইতিহাসে নজর রাখলেই বুঝতে পারি।”

সর্বোপরি তাঁর লেখা গন্তব্যহীন নয়। কোনো কানাগলিতে গিয়ে আটকে পড়া লেখা নয়। একটি সুস্পষ্ট বোধ ও ধারণা তাঁর প্রায় সব লেখা থেকে আমাদের পাওয়া হয়। ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি যুক্ত থেকেছেন মানুষের সঙ্গে। মানুষের প্রতি কল্যাণবোধ, ভালোবাসা এবং তা আন্তরিকভাবে সৃষ্টি করতে নিরন্তর প্রয়াসী এক লেখকের নাম শওকত আলী। তাঁর দ্বারা যতটুকু করা সম্ভব ছিল তিনি করেছেন। সৎলেখকমাত্রই যা করে থাকেন। আমাদের সমাকালীন সীমাবদ্ধতা দিকেও খেয়াল রেখেছেন। ‘উপন্যাস প্রসঙ্গ : লেখকের অবস্থান’ প্রবন্ধে তিনি লেখকের যে-দায়ের কথা বলেছেন, তাই তিনি নিজে পূরণ করে গেছেন। লেখককে নিজের লেখকসত্তার দায়ই পূরণ করতে হয়, অন্য কোনো কিছু দায় ও দাসত্ব লেখকের ধাতর্ব্য নয়। জীবনকে ভালোবাসাই লেখকের সৃষ্টির নিরন্তর উৎস। সেটিই তার আসল পুঁজি। এই সহজ বিষয়টি না বোঝার কারণেই আমরা নানান বিভ্রান্তিতে পড়ি। তাঁর মতে,‘‘আমাদের মতো দেশের লেখকদের নানান স্রোত ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হয়। প্রথমতঃ অন্যান্য দেশের বাতিল তাত্ত্বিক জটিলতাগুলিকে আধুনিকতার মুখোশ পরিয়ে আমাদের সামনে আনা হয়। তাতে আঙ্গিক ও প্রকরণের প্রশ্নটাই আমাদের তরুণ লেখকদের চোখে বড় হয়ে ওঠে। ফলে নতুন কিছু সৃষ্টি করার লোভ ও মোহ লেখকদের দৃষ্টির স্বচ্ছতা এবং চিন্তা ও আবেগকে আচ্ছন্ন করে দেয়। দ্বিতীয়তঃ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন গতানুগতিক কয়েকটি কাহিনী বারবার করে কেবল মাত্র মন ভোলাবার জন্য পাঠকদের উপহার দেওয়া হয়। এই দু’শ্রেণীর রচনাই আমাদের সাহিত্যকে কেবলমাত্র ভারগ্রস্তই করে চলেছে।” ফলে প্রত্যেকটি লেখককে নিজের অবস্থান বোঝা, নিজের সাধ্য ও সীমা বোঝার ভিত্তিতে কাজ করার দিকে তিনি আঙ্গুলিনির্দেশ করেন।

যদিও সাহিত্যের কোনো শর্ত নেই, তবুও বরাবরই লেখকের জন্য ‘‘থিঙ্ক গ্লোবাল, অ্যাক্ট লোকাল’’ একটি নির্দেশনা হয়ে আছে। কলমকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, অসীম রায়, দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক প্রমুখের রচনা আমাদের সাহিত্যে যে-সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে তার সঙ্গে শওকত আলীর লেখা মিলিয়ে পড়লে তাঁর বিশিষ্টতায় কোনো সন্দেহ থাকে না। বাংলা উপন্যাসের আগামীদিনের লেখকদের জন্য তাঁর লেখা জানান দিতে সক্ষম যে তিনি তাঁর সময়ের দায় পূরণ করেছেন। নতুন লেখকদের সেই দায় পরিশোধ করার জন্য যে আরো বড় ভূমিকা নিতে হবে- তাও শওকত আলী ধরিয়ে দিতে ভুলেননি। লেখকের সামনে অনেক প্রতিবন্ধকতা, সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তো লেখক নিজেই- অসীম রায়ের সেই কথাটি নতুন করে মনে করিয়ে দেন শওকত আলী, আর সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো কীভাবে ভেঙে ফেলতে হয়, অন্য অনেকের মতো তিনিও তার দৃষ্টান্ত হিসেবে আমাদের সমানে থাকেন। মানুষ, জীবন ও পৃথিবীকে সততার সঙ্গে দেখা ও দেখানোকেই সবচেয়ে বড় তত্ত্ব হিসেবে জানেন বলে তিনি আর কোনো কিছুর ধার ধারেননি। তাঁর এই প্রজ্ঞা আমাদের আগামী দিনের সম্বল হয়ে রইল।

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close