Home ছোটগল্প হামীম ফারুক > এক রাতে >> ছোটগল্প

হামীম ফারুক > এক রাতে >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ July 8, 2018

হামীম ফারুক > এক রাতে >> ছোটগল্প
0
0

হামীম ফারুক > এক রাতে >> ছোটগল্প

 

“বাইরে পীরু এবার একটি জামরুল গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করতে থাকে তালেবরের জন্যে। ঠিক এই সময় কুকুরটা যেন অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। তার লিকলিকে বাদামি শরীরের মধ্যে শুধু লম্বাটে মুখটাই চোখে পড়ে আগে। পীরুকে দেথতে পেয়েছে ওটা। পাথরের মতো জমে যায় পীরু। ঠিক কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। কুকুরটির দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। কুকুরটি এক পা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটে। পীরুর দিকে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করে পরিচিত মানুষ কি না।”

 

 

১.

মাঠ জুড়ে অন্ধকার। চাঁদের ম্লান জ্যোৎস্নায়ও সেই আঁধার কাটেনি। দূর থেকে ঘুমিয়ে থাকা গ্রামটিকে দেখে মনে হয় আততায়ীর মতো। যেন কালো চাদরে শরীর ঢেকে ঘাপটি মেরে আছে। পীরুর বুক ঢিবঢিব করে। ভয়ের সাথে যোগ হয় পায়ের ব্যথা। অনেকখানি পথ হেঁটেছে আজ। তা মাইল পাঁচেক হবে। সঙ্গী তালেবরের দিকে তাকায় সে। রওয়ানা হয়েছে পর্যন্ত এখনো কোনো কথা বের হয়নি তার মুখ থেকে। শুটকো মতো মানুষটা শুধু হেঁটেই চলেছে।

পায়ের নিচে এবরো-থেবড়ো জমি। কেটে নেয়া ইরি ধানের গোছা এখনো বেরিয়ে আছে। হাঁটতে গেলে সেগুলো বিঁধছে পায়ে। ভেতর ভেতর উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপে। সারা শরীর ঘামে জবজব করছে দুজনেরই। শংকায় না এতদূর হাঁটার পরিশ্রমে, ঠিক বুঝতে পারে না পীরু। শুধু দ্রুত কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করে সে। তাদের হাঁটার গতি বাড়তে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে একটা হাত পীরুর দিকে বাড়িয়ে দেয় তালেবর, আগুনডা দে’।

দেশলাই জ্বেলে কানের কাছে গুঁজে রাখা বিড়ি ধরায় সে। দুইটান দিয়ে পীরুর দিকে বাড়িয়ে দেয় সেটা। ধোঁয়া পাতলা কুয়াশার সাথে মিশে যেতে থাকে। কদিন ধরে সর্দিকাশিতে কষ্ট পাচ্ছে পীরু। গলার কাছে সবসময় কেমন খুশখুশে ভাব। বিড়ির ধোঁয়া সেখানে পৌঁছে ঝামেলা পাকায়। বেদম কাশি ওঠে তার। কাশির দমকে বুক চেপে ধরে পীরু। খিঁচিয়ে ওঠে এতক্ষণ চুপ করে থাকা তালেবর- ‘হালার পো হালা, কাশ থামা, থামা কাশ।’

কাশি চাপতে গিয়ে ফল হলো উল্টো। উবু হয়ে আরো উচ্চকিত স্বরে কাশতে থাকে পীরু।

তালেবরের ভ্রূ কুঁচকে যায়। দাত কিড়মিড় করে বলে, ‘হালার কি জাউড়ামি যাত্রার সোমায়।’ পীরুর জন্যে থামতে হয় তাকে। পিছিয়ে আসে কিছুটা। এবার কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্ন চোখে অপেক্ষা করে পীরুর কাশি থামার জন্যে। বিড়ি এখন তার হাতে। সেটাতে ঘন ঘন টান দিতে থাকে সে।

অবশেষে কিছুটা বমি করে বুক হালকা হয় পীরুর। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দুপুরে কুটুর মা গরম তেল মালিশ করে দিয়েছিল বুকে। তখন খুব আরাম হয়েছিল। সন্ধ্যেয় রওয়ানা হওয়ার আগে নিষেধ করেছিল বাইরে বেরোতে। তারও যে খুব ইচ্ছে ছিল তা নয়। তালেবরের চাপাচাপিতেই রওয়ানা হওয়া।

এক শেয়াল এসে পড়ে ওদের সামনে। মানুষ দেখে হকচকিয়ে যায় ওটা। দেরি না করে দ্রুত ঝাঁ করে পাশের ধানখেতে ঢুকে পড়ে। হাসি পায় পীরুর। তার ঝিমোনো ভাব কেটে যায়। হাসতে হাসতে বলে, ‘মোরাওতো হিয়ালের মতই বাইর হইছি, কি কন তালেবর ভাই?’

‘হ, হিয়াল না খাডাশ।’ বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয় তালেবর। কাজের সময় পীরুর রসিকতা তার পছন্দ হয়না। ‘হাট্ ব্যাডা হাট্, আউজগা আর কাম হইবে না।’ বলতে বলতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পা চালাতে থাকে সে।

অগত্যা পীরুও তাকে অনুসরণ করে।

 

২.

দুজনেই কোন কথা না বলে আবার হাঁটতে থাকে। ঝিঁঝির একঘেয়ে ডাক আর তাদের শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। চাঁদের ক্ষীণ আলো থাকতে থাকতেই গ্রামটিতে পৌঁছাতে হবে। তালেবরের হাতের বিড়ি অনেকক্ষণ আগেই নিভে গেছে। এখন সেটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় সে। গলার নতুন গামছাটা খুলে পীরুর দিকে বাড়িয়ে দেয় সে- ‘নে, গলায় প্যাচায়া ল’ব্যাডা। আরাম লাগবেয়ে নে। কাশ কইম্যা যাইবে।’

রাত্রি জাগরণের অভ্যাস তার পুরনো। বহু আগে কাজ করতো ইটের ভাটায়। তখনো বিয়ে করেনি। বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার পর সংসার বড় হলো। ইটের ভাটার শ্রমিকের কাজ আর পোষাল না। সেটা ছেড়ে দিয়ে থানা সদরে রিক্সা চালালো বছর খানেক। পরে ট্রাকের ধাক্কায় রিক্সার ক্ষতি হলে মালিকের লোক তাকে এমন পেটালো যে পরে কোনমতে সুস্থ হয়ে আর রিক্সা চালাতে পারল না। এ অবস্থা আর কতদিন সহ্য করা যায়। না খেতে পেয়ে মরমর অবস্থা। অগত্যা নেমে পড়ে নতুন কাজে।

পীরুর দিকে আড়চোখে তাকায় তালেবর। ছেলেটা ভাল। তাকে কখনো প্রশ্ন করে না। যেটা বলে শুনে যায়। শুধু একটাই সমস্যা। একাজটা সে পছন্দ করছে না। তারপরও সে তার সাথে রয়ে গেছে। কারণ, পীরুর বউ তার শ্যালিকা। কিন্তু দু বোন এখনো ঠাহর করে উঠতে পারেনি, তাদের স্বামীদের কাজ কি।

 

৩.

সামনে খাল। দুজনেই বোকা বনে যায়। এদিকটায় খাল আছে আগে বুঝতে পারে নি। এখান দিয়ে আসাটা ঠিক হয়নি। পীরুর কাছে একটু লজ্জ্বাও পেল তালেবর। এখন ঘুর পথে যাবে সে সময় নেই। খালটি বেশি বড় নয়। তবে বর্ষার সময় কোশা নৌকো লাগে পার হতে। এখন অবশ্য পানি কম। বাতাসে কাদা, শ্যাঁওলার আঁশটে গন্ধ। লুঙ্গিতে কাছা মেরে সে নেমে যায় নিচে। গায়ের কালো গেঞ্জিটা খুলে মাথায় পেঁচিয়ে নেয়। পেছন পেছন পীরুও নেমে আসে। নরম কাদায় তার পা দেবে যায়। অসহায়ের মতো বলে, ‘অহন পার হমু ক্যামনে?’

দুহাতের তালু থুথু দিয়ে ঘষে নেয় তালেবর। এটি তার পুরনো অভ্যাস। আগে ভাল হা-ডু-ডু খেলোয়াড় ছিল সে। দুয়েকবার থানা সদরে হায়ারে খেলতে গিয়েছিল। জিততে না পারলেও ভাল খেলোয়াড় হিসেবে বেশ নাম কুড়িয়েছিল। প্রতিপক্ষের কোর্টে যাওয়ার আগে এভাবে থুতু দিয়ে দুহাতের তালু ঘষে নিত। পীরুর প্রশ্নে তাকে বিচলিত দেখায় না। বলে, ‘ব্যাডা, কথা না কইয়া নাইমা পড়। গায়ে পানি লাগলে, তোর ঐ পচা কাশ ভালা হইয়া যাইবেএনে।’ বলে পীরুর উত্তরের অপেক্ষা না করে পানিতে নেমে পড়ে সে।

তালেবরের দেয়া গলার গামছা কোমরে পেঁচিয়ে গায়ের ফতুয়া খুলে নেয় পীরু। মৃদু বাতাসে উদোম গা শিরশির করে ওঠে। খালের পানিতে সেও নেমে পড়ে। পানির নিচটা ওপরের তুলনায় ঠাণ্ডা। পীরু ঠাণ্ডায় কাঁপতে থাকে। নিশ্চয় শরীরে জ্বর আছে। নাহলে শরীরে কাঁপুনি আসার কথা না। ওপরে কালচে আকাশ। দুএকটি নক্ষত্র খুব উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে, চোখে পড়ে তার।

মাঝখানে বুক সমান পানি। চাঁদের ম্লান, অপার্থিব আলোয় খাল সাঁতরে পার হলো দুজনেই। ওপারে উঠে হাঁপাতে থাকে। লুঙ্গি খুলে তালেবর পুরো দিগম্বর হয়ে যায়। তারপর লুঙ্গিটি দুহাত দিয়ে মুচড়ে পানি বের করে আবারো পরে ফেলে সে। পীরুকেও একই কাজ করার জন্যে তাগাদা দেয়। কিন্তু পীরু চট করে কাজটি করতে পারে না। তালেবরের সামনে দিগম্বর হতে তার লজ্জ্বা হয়। খালের এদিকটায় আড়ালে যাওয়ার মতো কোন গাছপালাও নেই।অবশেষে পেছন দিকে ফিরে কাজটি দ্রত সমাধা করার চেষ্টা করে সে।

গ্রামের কাছাকাছি এসে যেন তালেবর অপেক্ষা করার ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে। পীরুকে তাড়া দিতে থাকে- ‘ওরে ব্যাডা, লুঙ্গি ঠিক হরতে এ্যাতো সোমায় লাগে? তরতরি কর।’ কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে, ‘হোন্, ভয়ের কিসু নাই। মুই আছি। শুধু ঢুকমু, আর বাইর হমু।’

পীরু মাথা ঝাঁকায়। বুঝেছে সে। আবার হাঁটতে থাকে সে তালেবরের পেছন পেছন। তালেবরের সাথে কাজ করতে গিয়ে এ কয়দিনে তার মনে হয়েছে, লোকটার মাথা খুব পরিষ্কার। তবে আগে যখন সে রিক্সা চালাতো, সেসময়ের তালেবরের সঙ্গে এখনকার মানুষটার যেন তেমন মিল খুঁজে পায়না সে। পেছন থেকে তালেবরকে ভালভাবে লক্ষ করে। লম্বা, সরু পা ফেলে কেমন ভূতের মতো বাতাস শুঁকতে শুঁকতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। যে কেউ তাকে এ অবস্থায় দেখলে ভয় পাবে।

 

৪.

গাঁয়ে ঢুকতেই একটি বড় জলাশয়। নামে জলাশয়, কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময়ই এতে কোন পানি থাকে না। ফলে সবসময়ই নানা জাতের বুনো গাছ আর লতাপাতায় ভর্তি জায়গাটি। অন্ধকারে চট করে মনে হয় বড় কোন সব্জীবাগান।

তালেবরের সাথে পা মেলাতে গিয়ে ঘাম ছুটে যায় পীরুর। জলাশয়ের জায়গাটুকু পেরিয়ে সামনে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড় ঘিরে জোনাক পোকা। টিপ টিপ করে জ্বলছে, নিভছে। পীরু এসব দেখতে দেখতে ভাবে, একাজে দিনদিন ঝুঁকি বাড়ছে। গতকাল সামাদের সাথে দেখা রহমতপুরের হাটে। গায়ে নতুন শার্ট। ফট করে পকেট থেকে গোল্ডলীফ বের করে তাকে সাধে। সামাদকে দেখে সে একটু ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিল কাল। গ্রামে থাকতে মেম্বার বাড়িতে বদলা খাটতো। ঢাকায় গিয়ে তার এতো চেকনাই বাড়লো কিভাবে? প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে তার। মনে মনে ঠিক করে ফেলে পীরু, আগামীকালই সামাদকে আবার ধরতে হবে। তার সঙ্গে কিছু বুদ্ধি-পরামর্শ করতে হবে। ভাবতে ভাবতে পেটের ক্ষিধে চাগিয়ে ওঠে। সেই দুপুরে পান্তা আর মলা মাছের তরকারি দিয়ে খেয়েছিল। দুপুরের তরকারির সুগন্ধ যেন নাকের কাছে এসে ঠেকে পীরুর।

‘অক্কো-অক্কো’। আচমকা ডাকে চমকে ওঠে তালেবর, পীরু দুজনেই। এটা পাখি না সরীসৃপ জানে না পীরু। শুধু জানে এটি সারা রাত জেগে থেকে কিছুক্ষণ পরপরই গৃহস্থকে হুঁশিয়ারি জানায়। দুই চোখে এটিকে দেখতে পারে না তালেবর। পীরুর কাঁধে হাত রাখে সে।

আরো কিছু মুহূর্ত হাঁটার পর গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়ে দুজনে। ধানক্ষেতের পাশে ঝোপঝাড়, সেটি পেরিয়ে বড় পুকুর, তার পাশ কেটে বের হয়ে একটি বড় উঠোনে এসে দাঁড়ায় দুজনে। সামনে টিনের একটি দো-চালা বাড়ি। দুপাশে পাকা দেয়াল। সেমিপাকা বাড়িটি ঘিরে আরো দুতিনটি বড় ঘর। এগুলো টিনের। তালেবর এদিক ওদিক তাকায়। কোন কথা না বলে হাতের তর্জনী দিয়ে পীরুকে কথা বলতে নিষেধ করে। ফিসফিস করে বলে, ‘ডরাইস না।’

কিন্তু পীরুর শরীরে শিরশির ভাবটা আবার ফিরে আসে। জ্বরটা ফিরে আসছে নাতো?  চাঁদ বেশ আগেই ডুবে গেছে। ফলে অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। দুজনে নিঃশব্দে গোয়াল ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে পুরো বাড়িটি আবারো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তালেবর। গো-মুত্রের কড়া গন্ধ, মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে পীরুর।

তালেবর পাকা বাড়িটির খোলা জানালার দিকে এগিয়ে যায়। বেশ গরম পড়েছে। এতক্ষণ খোলা জমিতে চৈত্রের তাপ টের পায়নি। সেই তাপ বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আঁচ করে। দরদর করে ঘামতে থাকে তাদের উদোম গা। তবে সেটা আসন্ন কাজের উত্তেজনায় নাকি গরমে তা বোঝার মতো অবস্থা তখন দুজনের কারোরই নেই। আগেই ঠিক করা আছে, ভেতরে ঢুকবে তালেবর তার শুকনো প্যাঁকাটির মতো শরীর নিয়ে। আর বাইরে পাহারা দেবে পীরু।

ঠিক যেন তালেবর নয়, তার ছায়াটি গিয়ে দাঁড়ায় জানালার কাছে। ভেতরে ভালভাবে লক্ষ করে। মশারি টাঙানো বিছানায় কেউ গভীর ঘুমে। ঘরের ভেতর নানা জিনিসপত্র, বড় সুটকেস। মেম্বারের বিদেশ-ফেরত জামাইয়ের ঘড়ঘড়াৎ নাক ডাকার শব্দ বাইরে থেকেও শোনা যায়।

বিছানায় শুয়ে থাকা ব্যক্তিটিকে ভালভাবে দেখে নিয়ে নিশ্চিত হয় তালেবর। দৃষ্টি এবার ভেতর থেকে বাইরে আনে সে। জহুরির মতো জানালার গ্রিলের গেজ বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মাঝখানে পরীক্ষা করে। মাথা নাড়ে সে, কাজ হবে। কোমরে কালো সূতলীতে বাঁধা ছোট পাতলা একটি ধারালো করাত বের করে এবার। এসময় দূরে, কোথাও অনেকগুলো শেয়াল সন্মিলিতভাবে আর্তনাদ করে ওঠে।

কাছে দাঁড়িয়ে থাকা পীরুর শরীর আবারো কাঁটা দিয়ে ওঠে- ‘নাহ্, জ্বরডা মোনে অয় আইয়াই পোড়ছে।’ বিড়বিড় করে সে কপালে হাত দিয়ে শরীরে তাপ বোঝার বৃথা চেষ্টা করে। একবার ঢাকায় যেতে পারলে যাহোক একটা কাজ জুটিয়ে নেবে। এ কাজ আর নয়।

নৈঃশব্দ্য বিদীর্ণ করা শেয়ালের চিৎকার রাতকে পারদের মতো ভারী করে তোলে। মানুষ নয়, পীরুর ভূতের ভয় লাগে। এদিক-ওদিক তাকায় সে। উঠোন ঘিরে থাকা গাছ, ঝোপঝাড়ের দিকে ঘন ঘন তাকায়। যতক্ষণ চাঁদের আলো ছিল, ততক্ষণ এতটা খারাপ লাগেনি। দুকানের ডগা, উদোম শরীর এরই মধ্যে মশার আক্রমণে ফুলে গেছে তার। তালেবরের অবস্থা বুঝতে পারছে না। তবে কিছুক্ষণ পরপর তার পা, মাথা নাড়ানো দেখে বোঝা যাচ্ছে, মশা তার ওপরও ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমান বিক্রমে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তালেবর জানালার গ্রিলের একাংশ খুলে ফেলে। এরপর কোন শব্দ না করে হালকা শরীরটাকে ভেতরে গলিয়ে দেয় সে।

বাইরে পীরু এবার একটি জামরুল গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। অপেক্ষা করতে থাকে তালেবরের জন্যে। ঠিক এই সময় কুকুরটা যেন অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। তার লিকলিকে বাদামি শরীরের মধ্যে শুধু লম্বাটে মুখটাই চোখে পড়ে আগে। পীরুকে দেথতে পেয়েছে ওটা। পাথরের মতো জমে যায় পীরু। ঠিক কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। কুকুরটির দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। কুকুরটি এক পা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটে। পীরুর দিকে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করে পরিচিত মানুষ কি না।

এসময় যে ঘরে তালেবর ঢুকেছিল, সেঘর থেকে ভারি কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হয়। চারদিকের নৈঃশব্দ্যের মধ্যে শব্দটি বেশ কানে লাগে পীরুর। জানালা গলে ত্রস্তে বেরিয়ে আসে তালেবর। পীরুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কুকুরটি এবার তালেবরকে দেখতে পায়। দেখেই ঘেউ ঘেউ করে ছুটে যায় তার দিকে। তালেবর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দক্ষিণ দিকের টিনের ঘরের দরোজা সশব্দে খুলে যায়। টর্চ হাতে কেউ বেরিয়ে আসে। পুরুষালী কণ্ঠে চিৎকার করে জানতে চায়- ‘কেডা, কেডারে?’

তালেবর শুধু বলতে পারে, ‘ব্যাডা দৌড় দে।’ বলে নিজে পুকুরপাড় ধরে গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে। ক্রুদ্ধ কুকুরটি তাকে পেছন থেকে তাড়া করে যায়।

 

৫.

পীরুর পা চলে না। কেমন আচ্ছন্নের মতো লাগে। কুটুর মার গরম তেলের মালিশের ছোঁয়া যেন বুকের কাছে টের পায়। কোথা থেকে দমকা বাতাস ওঠে। উঠোনের পাশে বাঁশঝাড়ের পাতাগুলো সশব্দে নড়ে ওঠে।

‘কে, কেডারে? আ, কতা কয়না ক্যা?’ টর্চের আলো এবার এসে পড়ে তার গায়ে।

ঘুমন্ত বাড়িটি, হঠাৎ যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close