Home অনুবাদ হারুকি মুরাকামি / অদ্ভুত এক লাইব্রেরি [শেষ পর্ব] > অনুবাদ : আফসানা বেগম

হারুকি মুরাকামি / অদ্ভুত এক লাইব্রেরি [শেষ পর্ব] > অনুবাদ : আফসানা বেগম

প্রকাশঃ March 1, 2017

হারুকি মুরাকামি / অদ্ভুত এক লাইব্রেরি [শেষ পর্ব] > অনুবাদ : আফসানা বেগম
0
1

[তৃতীয় পর্ব ও শেষ পর্ব]

১০

আমি বিছানায় ধপাস করে বসে পড়লাম আর হাত দিয়ে আমার মুখ ঢেকে ধরলাম। এরকম একটা মারাত্মক ঘটনা কি আমার সাথেই ঘটবার প্রয়োজন ছিল? আমার অপরাধ কী, আমি একমাত্র যা করেছি তা হলো লাইব্রেরিতে এসেছিলাম কিছু ভালো বইয়ের আশায়।

“আমার কথায় কষ্ট পেও না,” ভেড়ামানুষটা আমাকে সান্ত¦না দেবার চেষ্টা করল। “আমি যাই, তোমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি। গরম গরম রাতের খাবার তোমার মন ভালো করে দেবে।”

“ভাই, ভেড়ামানুষ,” আমি পেছন থেকে ডাকলাম তাকে, “আমাকে বলতে পার বুড়ো লোকটা আমার মগজটা খেতে চায় কেন?”

“কারণ যে মগজে অনেক জ্ঞান ঠুসে ঠুসে ভরা হয় সেটা খেতে অনেক মজা, এই জন্য। নানান তথ্যে ঠাসা মগজ হলো গিয়ে সুস্বাদু আর ক্রিমে ভরা। আবার ক্রিমের নরম ভাবের মধ্যে কিছুটা আঁশ আঁশ ভাবও থাকে।”

“এইবার বুঝলাম। মানে এজন্যেই সে চায় যে এক মাস ধরে আমি আমার মাথার মধ্যে নানান তথ্য ঢুকাই যেন শেষে গিয়ে সে খুব মজা করে আমার মগজটা খেতে পারে?”

“একদম ঠিক ধরেছ।”

“আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না যে এটা ভীষণ নিষ্ঠুর একটা ব্যাপার?” আমি ভেড়ামানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম। “মানে আমি তার নিষ্ঠুরতার কথা বলছি যে আমার মগজটা চিবিয়ে চিবিয়ে চুষে চুষে খাবে।”

“সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ, তবে এ আর এমন কী, এ ধরনের ব্যাপারস্যাপার তো পৃথিবীজুড়ে সমস্ত লাইব্রেরিতেই কমবেশি হয়ে আসছে। মানে তুমি জানতে কি না ঠিক জানি না, ঘটনাগুলো বলতে গেলে এমনই।”

ভেড়ামানুষের বলা এই কথাটা আমাকে বিভ্রান্ত করে ফেলল।

“পৃথিবীর সবখানে? সব লাইব্রেরিতেই?” আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।

“একটা জিনিস চিন্তা কর, সমস্ত লাইব্রেরিগুলো যদি বিনা পয়সায় শুধু জ্ঞান বিতরণ করতেই থাকে তবে বিনিময়ে তাদের প্রাপ্য কী?”

“কিন্তু জ্ঞান বিতরণ করছে বলে কি তারা মানুষের মাথার খুলিটা ভেঙে তাদের মগজ চিবিয়ে খাওয়ার অধিকার পেয়ে যাবে? তোমার কি মনে হয় না এটা জ্ঞানের বিপরীতে খুবই বিরাট চাওয়া?”

ভেড়ামানুষ আবারও বিষণœ হয়ে আমার দিকে তাকাল। “তোমার ভাগ্য খারাপ, ভাই। সত্যিকার অর্থে ভেতরের অবস্থাটা আসলে এমনই। এরকম ঘটনা খুবই সাধারণ ব্যাপার।”

“কিন্তু আমার মা যে আমার কথা ভাবতে ভাবতে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ভাই, ভেড়ামানুষ, তুমি কি আমাকে এখান থেকে লুকিয়ে বের হয়ে যেতে সাহায্য করতে পার না?”

“নাহ্, কোনো বুদ্ধিই এখানে কাজ করে না আসলে। আমি যদি সেটা চেষ্টা করেও ফেলি, আমাকে শুঁয়োপোকাভরা একটা বৈয়ামের ভেতরে রাখা হবে। একটা বিশাল বৈয়াম, সেখানে থাকবে দশ হাজারেরও বেশি শুঁয়োপোকা, আর বৈয়ামটার ভেতরে কাটাতে হবে পুরো তিনটে দিন।”

“কী বিশ্রী ব্যাপার,” বললাম আমি।

“সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমি তোমাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারব না, বাবু। আমি সত্যিই দুঃখিত।”

 

১১

জেলখানার ওই ছোট্ট ঘরটিতে আমাকে একা ফেলে ভেড়ামানুষ চলে গেল। আমি শক্ত বিছানাটাতে ধপাস করে শুয়ে পড়লাম। শক্ত তক্তপোষে মুখ লুকিয়ে পুরো এক ঘণ্টা কাঁদলাম আমি। সেখানে আমার জন্য রাখা নীল বালিশটা যবের খোসায় ভরা, আর বালিশটার একটা কোণের দিকে কেন যেন ভেজা। পায়ের দিকে তাকালাম। আমার পায়ের সঙ্গে আটকানো চেনটার ওজন কমপক্ষে এক টন।

আমি অন্য কিছু করতে না পেরে নিজের ঘড়িতে চোখ রাখলাম, ঠিক সাড়ে ছয়টা বাজে। আমার মা এতক্ষণে নিশ্চয় রাতের খাবার বানিয়ে ফেলেছেন আর আমার ফেরার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমি স্পষ্ট দেখতে পচ্ছিলাম যে মা রান্নাঘরের মেঝে বরাবর পায়চারি করছেন আর ঘনঘন ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। খাবারের সময়ের কথা বাদ দিলাম, রাতে ঘুমানোর সময়ের আগেও যদি আমি বাড়িতে না ফিরি তবে তার দুশ্চিন্তা চরমে উঠে যাবে। আমার মা ঠিক এমনই। কোথাও কিছু হলে আর সেটা না জানলে তিনি কল্পনা করার জন্য সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাটাকেই বেছে নেন, আর তারপর সেটাকে বাড়িয়ে চড়িয়ে ভয়ানক চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সুতরাং এই মুহূর্তে হয় তিনি নানারকম খারাপ সম্ভাবনার চিন্তার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন অথবা নিজেকে সোফায় এলিয়ে দিয়ে টেলিভিশনের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

ঠিক সাতটায় দরজায় কে যেন হালকা দুটো টোকা দিল। শব্দটা খুব আস্তে অথচ দ্রুত।

“ভেতরে আসুন,” আমি বললাম।

দরজার তালায় চাবি ঘোরানোর শব্দ পেলাম, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটি মেয়ে হাতে চা-নাস্তার ট্রলি নিয়ে আমার ঘরে ঢুকল। মেয়েটা দেখতে এত সুন্দর যে তার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ টনটন করছিল। তাকে দেখতে আমার বয়সীই মনে হলো। তার গলা, হাতের কব্জি, পায়ের গোড়ালি এতই সরু যে দেখে মনে হলো সামান্য চাপ দিলেই সেগুলো ভেঙে যেতে পারে। তার লম্বা আর ঝরঝরে সোজা চুলগুলো এত চকচক করছিল যেন নানারকমের রতœ দিয়ে সাজানো। মনে হলো কিছু বোঝার জন্য সে আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আর তারপর ট্রলি থেকে খাবারের থালাগুলো উঠিয়ে সে টেবিলটার উপরে লাইন করে সাজিয়ে রাখল, একের পর এক রাখতে লাগল কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই। আমি নিজেও একেবারে চুপ, তার রূপ দেখলে এমনিতেও মুখে কথা জোটার কথা নয়।

খাবারগুলো দেখতে চমৎকার। সামুদ্রিক শাকের ধোঁয়া ওঠা স্যুপ আর আঁচে পোড়ানো স্প্যানিশ ম্যাকারেল মাছের সঙ্গে টক ক্রিম, সাদা অ্যাসপারাগাসের উপরে তিল দিয়ে সাাজানো, পাশে শশা-লেটুসের সালাদ আর মাখনে মাখা একটা রুটির রোল। এসব ছাড়াও একটা বড়ো গ্লাসে আঙুরের জ্যুস। সমস্ত থালা, বাটি আর গ্লাস সাজানো শেষ হয়ে গেলে মেয়েটি আমার দিকে ফিরল। আর তারপর নিজের হাত দিয়ে নানান ভঙ্গি করে কথা বলা শুরু করল : এবারে চোখ মুছে ফেল দেখি। তোমার খাবারের সময় হয়েছে।

 

১২

“তুমি কি কথা বলতে পার না?” আমি জানতে চাইলাম তার কাছে।

নাহ্, আমি কথা বলতে পারি না। আমার গলার কথা বলার যন্ত্রটা ছোটোবেলাতেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

“নষ্ট করে ফেলা হয়েছে মানে?” আমি বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলাম। “কে করেছে এই কাজ?”

সে কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেবার বদলে সে বরং একটু হাসল। তার ছোট্ট হাসিটা এতই মধুর যেন মনে হলো আশেপাশের বাতাস ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে।

বোঝার চেষ্টা করো, মেয়েটি বলল। ভেড়ামানুষটা কিন্তু খারাপ না। তার মনটা খুব নরম। কিন্তু ওই যে বুড়ো লোকটা, সেই তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখে।

“আমি জানি,” আমি বললাম। “কিন্তু তারপরেও . . .”

মেয়েটি আমার কাছে এগিয়ে এল আর তার একটা হাত আমার হাতের উপরে রাখল। তার হাতটা ছোটো আর খুবই নরম। আমার মনে হলো আমার হৃদয় ভেঙে দুটো টুকরো হয়ে গেল।

তোমার খাবারটা গরম থাকতে থাকতেই খেয়ে ফেলো, সে বলল। গরম গরম খেলে তুমি শরীরে শক্তি পাবে।

মেয়েটি দরজা খুলে চা-নাস্তার ট্রলিটা ঠেলে বের করল, তারপর নিজেও ঘরের বাইরে চলে গেল। তার নড়াচড়া এতই দ্রুত অথচ ¯িœগ্ধ যেন বসন্তের হাওয়া।

খাবারগুলো সত্যিই খুব মজার ছিল কিন্তু আমি সেসবের অর্ধেকটা কোনোরকমে গলা দিয়ে নামাতে পারলাম। আমি যেহেতু এখনো বাসায় যাইনি, চিন্তায় চিন্তায় আমার মা কী যে ভেঙে পড়বেন!  আর তিনি নিশ্চয় দুশ্চিন্তা করতে করতে আমার পোশা পাখি স্টার্লিংকেও খাওয়াতে ভুলে যাবেন। স্টার্লিং না খেয়ে থাকতে থাকতে একসময় মরে যাবে।

কিন্তু তাতে কী, আমি কি আর এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারব? আমার পায়ের গোড়ালির সঙ্গে ভীষণ ভারী একটা ধাতব বল চেন দিয়ে বাঁধা আর ঘরের দরজায়ও তালা। কোনোরকমে দরজাটা খুলে ফেলতে পারলেও, পায়ে এই ওজন নিয়ে আমি কি গোলকধাঁধাঁর মতো প্যাঁচানো ওই লম্বা লম্বা করিডোরগুলো পেরোতে পারব? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁদতে শুরু করলাম আমি। কিন্তু বিছানায় গোল হয়ে শুয়ে থেকে আর পড়ে পড়ে কেঁদে তো কোনো লাভ হবে না, তাই আমি নিজেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার উঠে বসলাম আর খাবারগুলো শেষ করলাম।

 

১৩

ভেবে দেখলাম সবচেয়ে ভালো যে কাজটা আমি ওই ঘরে বসে করতে পারি তা হলো ওই টেবিলে বই নিয়ে বসা আর পড়াশোনা শুরু করা। আমাকে যদি পালানোর কোনা পথ খুঁজতেই হয় তবে প্রথমে আমার শত্রুর সমস্ত কথা মেনে নিতে হবে আর তাকে খুশি করতে হবে। আমি তার প্রতিটা কথা মেনে চলব। আমার কাছে মনে হলো ওই কয়টা কথা মেনে চলা তেমন কোনো কঠিন কাজ হবে না। আর এমনিতেও আমি হলাম গিয়ে সেই ধরনের ছেলে যে সব আদেশ সহজেই মেনে চলে।

আমি তিনটি বইয়ের মধ্যে অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়কারীর ডায়রি বইটা হাতে তুলে নিলাম আর পড়তে শুরু করলাম। বইটা প্রাচীন তুর্কি ভাষায় লেখা; কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো তারপরেও আমার মনে হলো পড়ে সহজে বোঝার জন্য দারুণ একটা বই। আর কেবল সহজে পড়ে বোঝার ব্যাপার নয়, প্রতিটা পাতায় যা পড়ছিলাম তাই যেন সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখস্ত হয়ে যাচ্ছিল, একেবারে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর। কোনো আশ্চর্য কারণে কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই আমার মাথা কেন যেন আমি যা পড়ছিলাম সবকিছু জমিয়ে ফেলছিল ভেতরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মনে হলো আমি তুর্কি কর আদায়কারী, ইবনে আরমাত হাসির হয়ে গেছি, যে কিনা কোমরে একটা একদিকে ধারওলা বাঁকানো তলোয়ার ঝুলিয়ে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত আর কর আদায় করত। আমার ঘরের বাতাসে কেন যেন ফলমুল, মুরগির মাংস, তামাক আর কফির গন্ধ ভেসে বেড়াতে লাগল তখন; ইস্তানবুলের পুরো শহরে একই গন্ধ, নদীর পানি এক জায়গায় জমে থাকলে যেমন হয় তেমন জমাট গন্ধওলা বাতাস সেখানকার সব রাস্তায়। সমস্ত রাস্তায় ফেরিওলারা বিভিন্ন জিনিস নিয়ে বসত, যে যা বিক্রি করত তারই নাম ধরে চিৎকার করে ডাকত, যেমন খেজুর, তুর্কি কমলা, আরো কত কিছু। হাসির সেখানে গম্ভীর হয়ে হাঁটত, তবে এমনিতে তেমন কোনো চিন্তাভাবনা থাকত না তার মাথায়, তার বউ ছিল তিনজন আর ছেলেমেয়ে ছয়টা। হাসিরের ছিল একটা পোষা টিয়া যে কিনা সব দিক থেকেই দেখতে একদম আমার পোষা পাখি স্টার্লিঙের মতো।

নয়টা বাজার সামান্য পরে ভেড়ামানুষকে দেখা গেল। সে ট্রেতে করে আমার জন্য কোকা আর বিস্কিট নিয়ে ঘরে ঢুকল।

“বাহ্, তুমি তো ভীষণ ভালো ছেলে!” সে বলল। “তবে শোনো, এই গরম কোকার জন্য পড়াশোনা থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিতে পার না?”

আমি বই বন্ধ করে রাখলাম আর গরম কোকায় চুমুক দিয়ে নিয়ে বিস্কিট খেতে শুরু করলাম।

“আচ্ছা, ভাই, ভেড়ামানুষ,” আমি বললাম। “তোমাদের এখানে ওই স্ন্দুরী মেয়েটা কে যে তখন আমাকে খাবার দিতে এসেছিল?”

“মানে? আবার বলো তো? কোন সুন্দরী মেয়ে?”

“আরে যে আমার জন্য রাতের খাবার নিয়ে এল খানিক আগে।”

“খুবই অদ্ভুত কথা বলছ তো,” ভেড়ামানুষ বোকা বোকা দৃষ্টি নিয়ে বলল। “তখন আমিই না তোমার জন্য রাতের খাবারের ট্রলি নিয়ে এলাম। তুমি তো বিছানায় শুয়ে ছিলে, ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলে। আর তুমি আমার দিকে তাকালেই দেখতে পাবে, আমি কোনো সুন্দরীও নই, মেয়েও নই, আমি কেবলই একটা ভেড়ামানুষ।”

“এমন কি হতে পারে যে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম?”

[আংশিক]

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close