Home অনুবাদ হারুকি মুরাকামি / অদ্ভুত এক লাইব্রেরি > অনুবাদ : আফসানা বেগম

হারুকি মুরাকামি / অদ্ভুত এক লাইব্রেরি > অনুবাদ : আফসানা বেগম

প্রকাশঃ February 19, 2017

হারুকি মুরাকামি / অদ্ভুত এক লাইব্রেরি > অনুবাদ : আফসানা বেগম
0
0

প্রথম পর্ব

সেদিন লাইব্রেরিটা ছিল অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই চুপচাপ।

আমার নতুন চামড়ার জুতো লাইব্রেরির ধূসর লিনোলিয়ামের মেঝেতে খসখস শব্দ করছিল। ঘষাঘষির গম্ভীর আর শুকনো শব্দটা আমার সবসময়ের হাঁটার পরিচিত শব্দের মতো নয়। যতবার নতুন জুতো কিনি, তার নতুন শব্দের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগে যেত আমার।

বই দেয়া-নেয়ার টেবিলে এমন একজন মহিলা বসে ছিলেন যাকে আমি আগে কখনো দেখিনি, মোটাসোটা একটা বই পড়ছিলেন তিনি। বইটা কেন যেন অতিরিক্ত চওড়া। তাকে দেখতে এমন লাগছিল যেন তিনি তার ডান চোখ দিয়ে বইটার ডান দিকের পাতা আর বাম চোখ দিয়ে বাম দিকের পাতা পড়ছেন।

“মাফ করবেন,” আমি বললাম।

তিনি বইটা ঠাস করে বন্ধ করে ধপ করে টেবিলে রাখলেন তারপর সরু চোখে আমার দিকে তাকালেন।

“আমি এসেছিলাম এই বইগুলো ফেরত দিতে,” কাউন্টারের উপরে আমার হাতের বই দুটো রাখতে রাখতে বললাম আমি। একটা বইয়ের নাম সাবমেরিন কী করে বানায় আর আরেকটা হলো মেষপালকের স্মৃতি।

বই দুটো ফেরত দেবার তারিখ জানার জন্য লাইব্রেরিয়ান তাদের উপরের পাতা উলটে ভেতরের দিকটা দেখে নিলেন। ফেরত দেবার তারিখ পেরিয়ে যায়নি। এসব ব্যাপারে আমি বরাবর সতর্ক, কোনো কিছুই সময় পার করে হাতে রাখি না। আমার মা আমাকে এভাবেই শিখিয়েছেন। আমার পড়া বইটিতে মেষপালকদের অবস্থাও আমার মতো। তারা যদি তাদের নিয়মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে তাহলে ভেড়াগুলো একেবারে হাতছাড়া হয়ে যায়।

বই দুটোয় জমা দেবার নকশাওলা কার্ডের উপরে লাইব্রেরিয়ান “ফেরত পাওয়া গেছে” সিল মেরে দিয়ে নিজের চওড়া বই পড়ায় মনোযোগ দিলেন।

“আমি আসলে কিছু বইয়ের খোঁজে এসেছিলাম,” আমি বললাম।

“ওই সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে ডানদিকে ঘোরো,” বই থেকে চোখ না উঠিয়েই তিনি বলে গেলেন। “তারপর সোজা করিডোর পেরোলে দেখবে রুম নম্বর ১০৭।”

 

অনেক লম্বা একটা সিঁড়ি ধরে আমি নীচে নেমে এলাম, ডানদিকে ঘুরলাম, তারপর অন্ধকার একটা করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলাম যতক্ষণ না নিশ্চিত হয়েছি যে আমি ১০৭ নম্বর রুমের সামনে এসে পৌঁছেছি। ওই লাইব্রেরিতে আমি আগে বহুবার গিয়েছি, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী সেখানে যে মাটির নীচেও একটা তলা আছে এটা আমার কাছে ছিল নতুন খবর।

দরজায় টোকা দিলাম আমি। প্রতিদিন যেভাবে কোনো দরজায় টোকা দেই, তেমনই হালকা টোকা দিয়েছিলাম, তবু কেন যেন এমন কর্কশ শব্দ হলো যে মনে হচ্ছিল কেউ বেসবল খেলার ব্যাট দিয়ে বাড়ি মেরে নরকের দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। ভয়ানক শব্দটা করিডোরে ঘুরে ঘুরে প্রতিধ্বনি হতে লাগল। দৌড়ে পালিয়ে যাবার জন্য আমি যেই ঘুরতে গেলাম, এক পা-ও এগোতে পারলাম না, যদিও আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। কারণ এই শিক্ষা দিয়ে তো আমাকে বড়ো করা হয়নি। আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন যে তুমি যদি কোনো দরজায় টোকা দিয়ে ফেল, ভেতর থেকে কেউ উত্তর না দেয়া পর্যন্ত তোমাকে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

“ভেতরে আসুন”, ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে এল। শব্দটা তেমন জোরে নয় অথচ আমার কানে ভয়ানকভাবে বাজল।

আমি দরজা ঠেলে খুললাম।

ঘরের ঠিক মাঝখানে দেখলাম ছোট্ট আর পুরোনো এক টেবিলের পেছনে ছোটোখাটো এক বুড়ো মানুষ বসে আছে। বিন্দু বিন্দু অসংখ্য কালো তিলে ঠাসা তার মুখটা দেখতে অজস্র মৌমাছি শান্ত হয়ে বসে থাকা মৌচাকের মতো। বুড়ো লোকটির মাথাভরা টাক আর চোখে পুরু কাচের চশমা। তবে তার মাথার টাকটা মনে হলো অসম্পূর্ণ; কারণ বেশ কিছু কোঁকড়ানো সাদা চুল দেখলাম তার মাথার দুপাশে আলগাভাবে আটকানো আছে। ভালোভাবে বলতে গেলে তার মাথাটা দেখতে পর্বতের উপরে দাবানলে পোড়া কোনো জঙ্গলের মতো।

“আসো, ভেতরে আসো, খোকা,” বুড়ো লোকটি বললেন। “বলো তো আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?”

“আমি কিছু বই খুঁজছিলাম,” ধীরে ধীরে বললাম। “কিন্তু আমি বুঝতে পারছি যে আপনি এখন ব্যস্ত। আমি আবার পরে কখনো আসব না-হয়…”

“বোকা ছেলে,” বুড়ো লোকটা জবাব দিল। “এটাই তো আমার কাজ- আমার পেশা- আমি কখনোই তত ব্যস্ত নই! বলো, কী ধরনের বই তুমি খুঁজছ, আমি যেমন করেই পারি সেসব কোথায় পাবে না-পাবে তোমাকে জানাব।”

কথা বলার সময়ে কী হাস্যকরই না দেখতে লাগে লোকটাকে, ভাবলাম আমি। আর তার মুখের প্রতিটি বিন্দু ভারি অদ্ভুত। তার কান থেকে কিছু লম্বা লম্বা চুল বেরিয়ে এসেছে। থুতনির নীচে কিছু কোচকানো চামড়া এমনভাবে ঝুলছে যেন বাতাস বেরিয়ে চুপসে যাওয়া বেলুন।

“কী হলো ছোট্ট বন্ধু, এখন বলো দেখি, তুমি ঠিক কী বই খুঁজছ?”

“আমি জানতে চাচ্ছি অটোম্যান রাজ্যে কর কী করে আদায় করা হতো,” আমি উত্তর দিলাম।

বুড়ো লোকটার চোখদুটো সঙ্গে সঙ্গে চকচক করে উঠল।

“ও, আচ্ছা,” সে বলল। “অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম। পড়ার জন্য এমন মজাদার বিষয় পৃথিবীতে আর যদি একটিও থাকত!”

 

বিষয়টা বলার পর থেকেই আমার ভেতরে অস্বস্তি শুরু হলো। সত্যি কথা বলতে কী, অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম কানুন জানার বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না- ঘটনাটা হয়েছিল কী, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমার মাথায় কেন যেন হুট করে এই বিষয়টা এল। আমি ভাবছিলাম, আচ্ছা, অটোম্যান রাজ্যে কর আদায় করত কীভাবে? এরকম একটা সাধারণ চিন্তা থেকে প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল। ঘটনা হলো সেই ছোটোবেলা থেকে আমার মা আমাকে বলতেন, যখনই তোমার মনে কোনো প্রশ্ন আসবে যার উত্তর তোমার কাছে নেই, তুমি সোজা লাইব্রেরিতে যাবে আর সেই বিষয়ের উপরে বই খুঁজে বের করবে।

“থাক, দয়া করে ওই বিষয়ের উপরে বই খুঁজবেন না,” আমি বললাম। “আমার মনে হয় আমার জন্য ওটা অত দরকারি না। আর বিষয়টা বলতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক, হাজার হলেও…” আমি আসলে ওই থমথমে, ভয়ে গা ছমছম করা ঘরটা থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিলাম।

“আমার সঙ্গে ফাজলামো কোরো না,” বুড়ো লোকটা দুম করে বলে দিল। “অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম কানুনের উপরে বিশাল ভলিউম বইয়ের সংগ্রহ আছে আমাদের কাছে। তুমি কি এখানে লাইব্রেরিতে খামোখা খেলাধুলো করতে এসেছ? এরকম কোনো ভাবনা ছিল নাকি তোমার?”

“তা নয়, স্যার,” আমি মিনতি করে বললাম। “বিশ্বাস করেন, তেমন এক ফোঁটা ইচ্ছেও আমার ছিল না। ভয়াবহ কোনো বিষয় নিয়ে আমি কখনো হাসি তামাশা করি না।”

“ঠিক আছে, তাই যদি হয়, তবে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত ঠিক এইখানে লক্ষ্মী ছেলে হয়ে অপেক্ষা করো।”

“নিশ্চয়, স্যার,” আমি বললাম।

বুড়ো লোকটা নড়েচড়ে তার চেয়ার থেকে উঠল। চেয়ারের পেছন দিকে ঘুরে গেল, তারপর ঘরটির পেছনের দেয়ালের একটা স্টিলের দরজার দিকে এগোতে লাগল। দরজাটা খুলে ফেলল আর পরপরই সেদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি টানা দশ মিনিট সেখানে একভাবে দাঁড়িয়ে থাকলাম, অপেক্ষা করছিলাম কখন সে ফিরে আসে। ঘরের ছাদে বাতির ছায়ার নীচের দিকটায় কতকগুলো কালো পোকা সমানে আঁচড় কাটছিল।

শেষ পর্যন্ত বহুক্ষণ বাদে বুড়ো লোকটা ঘরে ফিরে এল, তার হাতে তিনটা মোটা মোটা বই। প্রত্যেকটা বই সাংঘাতিক পুরোনো আর সেগুলোর কারণে ঘরের বাতাসে কাগজে বানানো কৃত্রিম গোলাপের প্রাচীন গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

“নাও, এসব নিজেই দেখেশুনে নাও,” বুড়ো লোকটা বলল, তার মুখে তৃপ্তি লেগে ছিল। “আমাদের কাছে অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়ের নিয়ম কানুনের উপরে বিস্তর বই আছে। তার মধ্যে অটোম্যান রাজ্যে কর আদায়ের নিয়ম, অটোম্যান রাজ্যের কর আদায়কারীর ডায়রি আর অটোম্যান-টার্কিশ রাজ্যে কর অনাদায় ও তার শাস্তি- এই তিনটি বই গুরুত্বপূর্ণ। খুবই চমৎকার সংগ্রহ, তোমাকে স্বীকার করতেই হবে।”

“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ,” আমি ভদ্রভাবে বললাম। বইগুলো হাতে নিয়ে আমি দরজার দিকে এগোলাম।

“অত তাড়া কেরো না,” বুড়ো লোকটা পেছন থেকে হুঙ্কার দিয়ে উঠল। “এই বই তিনটি এখানে বসেই পড়তে হবে- কোনো কারণেই এগুলো এই লাইব্রেরির বাইরে নেয়া যাবে না।”

 

লোকটি সত্যি বলেছে, প্রত্যেকটা বইয়ের মেরুদণ্ড বরাবর এটা লাল লেবেল লাগানো, “কেবলমাত্র লাইব্রেরিতে ব্যবহারযোগ্য।”

“এই বইগুলো পড়তে হলে তোমাকে ভেতরের একটা ঘরে বসে পড়তে হবে,” বুড়ো লোকটি জানিয়ে দিল।

আমি চট করে আমার ঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। তখন ৫:২০ বাজে। “কিন্তু লাইব্রেরি বন্ধের সময় তো প্রায় হয়েই এসেছে, আর আমি যদি রাতের খাবারের আগে বাড়িতে উপস্থিত না হই তবে আমার মা-ও খুব চিন্তায় পড়ে যাবেন।”

জঙ্গলের মতো ঘন দুটো ভুরু কুচকে এক লাইনে নিয়ে এল বুড়ো লোকটা।

“লাইব্রেরি কখন বন্ধ হবে সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না,” খানিকটা রেগে গিয়ে উচ্চারণ করলেন তিনি। “ওরা তখনই দরজা বন্ধ করবে যখন আমি তাদের তা করতে বলব- যদি বলি খোলা থাকবে, তবে খোলাই থাকবে। কিন্তু কথা সেটা নয়, এখানে আসল কথা হলো, এই যে আমি তোমাকে বইগুলো পড়ার জন্য এত সাহায্য করছি, তার কোনো মূল্য তোমার কাছে আছে কি নেই? তুমি কী মনে করো, প্রচণ্ড ভারী এই তিনটা বই আমি আমার নিজের জন্য এই ঘরে বয়ে আনলাম? আমি কি শরীরচর্চা করছি?”

“মাফ করবেন,” আমি তাড়াতাড়ি তার কাছে ক্ষমা চাইলাম। “আমি কখনোই কাউকে এতটা বিরক্ত করতে চাইনি। আমি আসলে বুঝতেই পারিনি যে এই বইগুলো আমি বাড়ি নিয়ে যেতে পারব না।”

বুড়ো লোকটা জোরেসোরে একটা গলা খাকারি দিয়ে উঠল। তারপর একটা টিস্যুর মধ্যে এক দলা কফ ফেলল। তার নাকের উপরের কালো মোটা ফ্রেমের চশমাটা মনে হলো রাগের চোটে কয়েকটা লাফ দিল।

“তুমি কী জানতে আর কী জানতে না, সেসব নিয়ে এখন কথা বলা অর্থহীন,” উপরের ঠোঁট ফুলিয়ে বুড়ো লোকটা চিৎকার করে উঠল। “আমার বয়স যখন তোমার মতো ছিল, সামান্য কিছু পড়ার সুযোগ পেলে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম। আর সে জায়গায় তোমাকে দেখ, আমাকে বিড়বিড়িয়ে সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছ, বাড়িতে রাতের খাবারের জন্য দেরি হবে বলে আফসোস করছ। কত্ত সাহস!”

“আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি এখানেই থাকব আর পড়ব,” আমি বললাম। “তবে আমি ঠিক তিরিশ মিনিট পড়ব।” আমি আসলে কাউকে মুখের উপরে না বলতে পারি না। “আর আমি কিন্তু তিরিশ মিনিটের বেশি একদম থাকতে পারব না। আমি যখন খুব ছোটো ছিলাম, স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে আমাকে একটা কালো কুকুর কামড়ে দিয়েছিল, আর তারপর থেকে আমি যদি বাড়িতে সামান্য দেরি করেও ফিরি মা আমার সঙ্গে অদ্ভুত ব্যবহার করেন।”

বুড়ো লোকটার মুখটা সামান্য প্রসন্ন দেখাল।

“যাই হোক, তুমি এখন পড়ার জন্য থাকছ তো?”

“অবশ্যই, তবে মাত্র তিরিশ মিনিটের জন্য।”

“ঠিক আছে, পড়তে চাইলে আমার পেছনে পেছনে আসো,” বুড়ো লোকটি হাঁটা শুরু করল। ভেতরের দিকের স্টিলের দরজার পরে প্রায় অন্ধকার একটা করিডোর, সেখানে কাঁপা কাঁপা আলো দেয়া একটি মাত্র ইলেকট্রিক বাতি। প্রায় নিভুনিভু সেই আলোর মধ্যে আমরা দুজন হাঁটতে লাগলাম।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close