Home পঠন-পাঠন হাসান আজিজুল হক > গলিত সোনার ভাষাপ্রবাহ

হাসান আজিজুল হক > গলিত সোনার ভাষাপ্রবাহ

প্রকাশঃ January 1, 2018

হাসান আজিজুল হক > গলিত সোনার ভাষাপ্রবাহ
0
0

হাসান আজিজুল হক > গলিত সোনার ভাষাপ্রবাহ

[সম্পাদকীয় নোট : ২০১৭ সাল। বিগত এই বছরটি ছিল গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সিয়েন আনোস দে সোলেদাদ উপন্যাস প্রকাশের ৫০ বছর। অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ওই উপন্যাসটি ২০১৭ সালে প্রকাশনার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করে। উপন্যাসটির প্রভাব এরই মাঝে ছড়িয়ে যায় সারা বিশ্বে। এই উপন্যাসটি নিয়ে তীরন্দাজের আয়োজন হিসেবে প্রকাশিত হবে বেশকিছু লেখা, আগেই আমরা সেটা ঘোষণা করেছিলাম। আজ এরই অংশ হিসেবে প্রকাশিত হলো আমাদের প্রধান কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ‘গলিত সোনার ভাষাপ্রবাহ’ শীর্ষক লেখাটি।]

স্প্যানিস ভাষা জানি না, ভরসা শুধু ইংরেজি। এখানকার বেশিরভাগ পাঠকের মতো আমাকেও বিদেশি ভাষায় লেখা সব সাহিত্যই পড়তে হয় ইংরেজি অনুবাদে। আমাদের সক্ষম বাংলা ভাষায় এখানে মার্কেজের রচনা অল্পবিস্তর অনূদিত হতে শুরু করেছিল আশির দশক থেকে। তাঁর সবগুলো রচনার চমৎকার ইংরেজি অনুবাদ মিললেও, ঢাকায় বাংলা অনুবাদের জন্য তেমন কেউ এগিয়ে এলেন না। যতদূর মনে পড়ে, মার্কেজ নোবেল পুরস্কার পাবার পরে-পরেই কবি বেলাল চৌধুরী ক্রনিকল অব এ ডেথ ফোরটোল্ট-এর অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন পরিচিত একটি দৈনিক পত্রিকার সপ্তাহান্তিক সাহিত্য-পাতায়। তারপর আলী আহমদ অনুবাদ করলেন উপন্যাস অব অ্যান্ড আদার ডিমনস্ আর স্ট্রেঞ্জ পিলগ্রিমস গল্পগুচ্ছ। ইনোসেন্ট এরোন্দিরা অ্যান্ড আদার স্টোরিজ-এর একটি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছিল বলে মনে পড়ে। ভারতের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত  মানবেন্দ্ৰ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে নাসরলা এরোন্দিরা-র এমন উৎকৃষ্ট অনুবাদ এর মধ্যে পেয়েছি যে মূলভাষা সম্বন্ধে কিছু না-জেনেও মনে হয় মূলের স্বাদ অবিকৃত পাওয়া গেছে ।

ইংরেজি অনুবাদে মার্কেজের যাদুকরী উপন্যাসটি প্রকাশিত হল ১৯৭০ সালে, ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচুড নামে। ১৯৬৫, সূর্যের বাকমকে আলো মাখানো উন্মুক্ত এক উপত্যকার মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসতে-আসতে হঠাৎ ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচুড-এর সমস্ত জগৎটি তার চােখের সামনে ভেসে ওঠে, পুরো উপত্যকাই মাকোন্দোর জগতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। বাড়ি ফিরেই তিনি সরাসরি উঠে যান তাঁর লেখার ঘরে, দরোজা বন্ধ করে দু’বছরের জন্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেন ওই কক্ষে। শুরু হয় এক মহাদেশীয় কথনের অন্তর্বয়নের কাজ। দুবছর পরে ১৯৬৭তে প্রকাশিত হয় সিয়েন আনোস দে সোলেদাদ। তখন সে-উপন্যাসের খবর রাখিনি, এগিয়ে-থাকা সাহিত্য-পাঠকদের কথা আলাদা, আমাদের মতো পিছিয়ে-থাকা সাধারণ পাঠকদের কথা বলছি। খবর যেমন রাখিনি, লাভও কিছু ছিল না খবর রেখে। তবে তারপরও এমন দাবি আমি করতে পারি না যে প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গে উপন্যাসটি আমার হাতে পৌঁছে গিয়েছিল। না, তার জন্যেও আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল কয়েকটি বছর। এই ভুবনের অন্ধকার অংশের মানুষ আমরা, তৃতীয় বিশ্ব, আলো পৌঁছোয় দেরিতে বা পৌঁছোয় না। অন্ধকারই রাজত্ব করতে থাকে। পরে জেনেছি। ঝানু-সাংবাদিক হিসেবে মার্কেজ নানাধরনের লেখা লিখে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পেলেও ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচুড-এর আগে উপন্যাস লিখেছিলেন গোটা চারেক। এসবের মধ্যে নো ওয়ান রাইটস টু দ্য কর্নেল উপন্যাসটি যেমন ছিল, বেশ প্রশংসিত এবং পুরস্কৃত উপন্যাস ইন ইভল আওয়ার-ও তেমনি ছিল। মীনচক্ষু বিদ্ধ হয়নি তখনও। পলাতকা শিল্প ধরা দেয়নি যেন। সেই ঘটনা ঘটল শতবর্ষের নিঃসঙ্গতায়। সব পাঠকের পক্ষ থেকে কথা বলার অধিকার আমার নেই, বোধহয় কারো নেই, বাধ্য হয়ে নিজের কথাকেই সকলের কথা বলে চালিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। আমার সীমিত পাখনা-কাটা অভিজ্ঞতা বলে, মার্কেজের এই উপন্যাস মহৎ উত্তুঙ্গ শিল্পসিদ্ধি জিতে নিয়েছে, অতুলনীয় চিরজীবী এক সাহিত্য সবকালের মানুষের জন্যে রেখে গেছেন—এ ধরনের কথা বলাই যথেষ্ট নয়—এই রচনা, আমার মতে, আমাদের উপন্যাস পাঠরুচিই বদলে দিয়েছে এবং সে-কাজ করেছে মহাআড়ম্বরে সব ভেঙেচুরে নয়, নতুন বৃষ্টিতে শুকনো প্রান্তরকে প্রায়-অলক্ষ্যে রসসিক্ত করে তোলার মতো করে। পশ্চিমে যেখানে উপন্যাসের জন্ম-বৃদ্ধি-শ্রীবৃদ্ধি সবই ঘটেছে, মনে হল এইবার সেই উপন্যাসের মৃত্যু ঘটেছে : জরায় তাকে জীৰ্ণ করে দিয়েছে। অন্য এক মহাদেশ কথা বলবে এবার, অবরুদ্ধ, ক্ষমতাপিষ্ট জন-জনপদ অবিরাম অবিশ্রান্ত কথনে কথনে নৈঃশব্দ্যকে পূর্ণ করে তুলবে। নতুন উপন্যাস থেকে এইবার নায়ক-নায়িকা নিষ্ক্রান্ত হল, গোলালো-গল্প বিদায় নিল।

এই প্রশ্ন অবান্তর যে ১৯৮২ সালে মার্কেজ কেন নোবেল পুরস্কার পেলেন। তাঁকে পুরস্কার দিয়ে নানা কলুষের দাগে দাগী পুরস্কারটি বরং খানিকটা গৌরব লাভ করল। সত্তর-আশি-নব্বইয়ের দশকে মার্কেজ আরও উপন্যাস লিখেছেন, সেইসবও তাঁর অসামান্য কীর্তি বটে। সারাবিশ্বই এখন আলোচিত-পঠিত হচ্ছেন তিনি, জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে তাঁর। তবে মনে হয়, তাঁর ঔজ্জ্বল্যে এখন আর নতুন চমক নেই, বরং আমরা ক্রমেই তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এখন আমরা বুঝতে পারি শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা তাঁর কাছেও অনতিক্রম্য রয়ে গেছে। আমার কেবলই মনে হয় যে, যাদুময়, নমনীয়, গলিত সোনার মতো এক বিশাল উজ্জ্বল ভাষাপ্রবাহ ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস্ অব সলিচ্যুডে বয়ে চলেছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close