Home সাক্ষাৎকার “সৃজনশীল কাজ মানে হচ্ছে যা আগে কেউ দেখে নাই…” > সাক্ষাৎকারে হাসান আজিজুল হক [পর্ব ৩]

“সৃজনশীল কাজ মানে হচ্ছে যা আগে কেউ দেখে নাই…” > সাক্ষাৎকারে হাসান আজিজুল হক [পর্ব ৩]

প্রকাশঃ April 23, 2017

“সৃজনশীল কাজ মানে হচ্ছে যা আগে কেউ দেখে নাই…” > সাক্ষাৎকারে হাসান আজিজুল হক [পর্ব ৩]
0
2

[সম্পাদকীয় নোট : ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় প্রকাশিত লিটল ম্যাগ ‘চিহ্ন’ পত্রিকার রিভিউ করতে গিয়ে আমরা এর আগে ওই পত্রিকায় প্রকাশিত হাসান আজিজুল হকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করেছিলাম। আজ প্রকাশিত হলো ওই সাক্ষাৎকারের তৃতীয় পর্ব। সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘ বলে আমরা কয়েকটা পর্বে এটি প্রকাশ করছি।]

“আমাদের ভাষা, আমাদের বর্ণ অসম্ভব রকমের বৈজ্ঞানিক একটা ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপরেও আমরা এই ভাষা নিয়ে লোকের কাছে মন ছোটো করে-করে ঘুরে বেড়াই, এটা ঠিক না। সে জন্যই ভাষার উপরে আমি এতোটা গুরুত্ব দিয়ে থাকি। লেখার সময় বারবার ওই কথাটাই মনে হয় আরকি, আমি যতদূর পারি অন্তত করি।”

পর্ব ৩

চিহ্ন : স্যার, এখানে একটা প্রশ্ন আমার। আপনার কথাসাহিত্যের কথকতা (১৯৮১) নামে যে বইটা আছে সেখান থেকে আমরা বোধটা কালেক্ট করি। এ বইয়ের একটা প্রবন্ধে আপনি বলেছেন, সাতচল্লিশের পর ষাটের দিকে একটু ডেকোরেশন, অর্থাৎ সুন্দর সুন্দর চেয়ার, ডাইনিং টেবিলসহ বিভিন্ন ফার্নিচার দিয়ে সাজানো ঘরটা, খাবারও সাজানো আছে কিন্তু খাবারগুলো সব বাসি, খাওয়া যাচ্ছে না। কথাটা আপনি ৬০-এর প্রসঙ্গে বলেছিলেন। আরেকটা জিনিস হলো, আপনি বলেছিলেন, কাব্য-কবিতার ক্ষেত্রে কিছু হচ্ছে না। এরপর বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ার অনুবাদ করলেন। তখন তাঁরা একটু ভাষা পেলেন, ভাবলেন এভাবে বলা যায়, এভাবে লেখা যায়। কিংবা লোকনাথ ভট্টাচার্য র‌্যাঁবো অনুবাদ করলেন। এটা কিন্তু আমাদের ঐ সময়ের তরুণদের মধ্যে সাড়া জাগায়। বিশেষ করে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরীদের মধ্যে একধরণের প্রেরণাও আসলো। তবে বিশেষ করে বুদ্ধদেব বসুর মাধ্যমে। এখন যেটা বলি সেটা হচ্ছে আপনি স্যার যে ‘রাজহাঁসে’র কথা বললেন, কিংবা হেমিংওয়ে, মার্কেজ, ফকনার বা ও হেনরি, অ্যালেন পোর গল্পের অনুবাদ আপনার মধ্যে তৈরি হচ্ছে এবং এখন আপনার হাতের অনুবাদটাই মনে হচ্ছে সৃজিত গল্প। তো সেগুলোর অনুবাদের ভেতর দিয়ে যদি আমরা আপনার গল্পের টেস্টটা পেতে চাই, সেটা হয়তো আপনি মনেও করছেন। কিন্তু অন্যরা যারা গল্প লিখছেন তারা তো বাইরের অনুবাদ পড়া বা অন্য কিছু করা- এমনটা ভাবছেন কি?

হা. আ. হ. : কেউ না! কেউ-ই না! পড়ছেও না। কোনো খবরই রাখছে না এইসব গল্পের কি হয়েছে, এমন কি বাংলা সাহিত্যেরও কি হয়েছে না হয়েছে একটু উঁকি দিয়ে দেখা। সেটাও কেউ করছে না। পশ্চিম বাংলায় এখনো তো কিছু লেখা হয়। তাঁদের লেখা, আমাদের লেখা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা দেখো? কোনো লেখক কোনো আলোচনার মধ্যে যায়? লেখকরা মনে করে যে, ওরে বাবা! আমার নিজের জনপ্রিয়তা চলে যায় নাকি? সেখানে লেখকরা সাহিত্য সম্পর্কে কিছু লিখতে চায় না, খেয়াল করছো তো? তাঁরা ভাবে, ও যারা সমালোচক আছে তারা করুক। আমাদের এই বিষয়ে কোথাও কোনো মন্তব্য করতে গেলে ঝামেলা হয়ে যাবে, এই মনে করছে কিনা? তরুণরা সাহসী হবে, এগুবে এই জানি। কিন্তু তরুণরা আমার দেশে এমন মনমরা এবং তেজহীন কি করে হলো, জানি না আমি!

চিহ্ন : আপনি গল্প লিখতে লিখতে কিছু প্রবন্ধ লিখছেন, চিন্তাশীল কিছু কথা বলছেন, চিন্তাশীল কিছু বলতে বলতেই কালচার-সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করছেন। তারপর রাজনৈতিক কিছু দায়িত্বও পালন করছেন, এখন অনুবাদ করছেন। অর্থাৎ লেখার যে জার্নি, সেটা চলছে। কিন্তু আমি গল্প লিখি জন্যে আমার সমালোচনা বলে কিছু নেই, গল্প লিখি জন্যে আমার কোনো অবজারভেশন নেই, গল্প লিখি জন্যে আমার সাহিত্য হলো কি-না হলো সে বিষয়ে আমার কোনো মেনুসক্রিপ্ট নেই, এটা তো কোনো কাজের কথা নয়?

হা. আ. হ. : হবে না! আনফরচুনেটলি হবে না! আমাদের সামনে এই দৃষ্টান্তগুলো উঠছে না। আমি কার কথা বলবো, ওয়াসী লিখছে কিছু গল্প, লিখছে উপন্যাস। হয়তো মেনশন করা যাবে। অসাধারণত্ব বলা যাক না যাক, কিন্তু মেনশন করা যাবে। তারপরে…কই তেমন তো দেখছি না! প্রশান্ত মৃধা কিছু গল্প লিখছে, কিছু উপন্যাসও লিখছে।

চিহ্ন : আমার কাছে এটা একটা রিপিটেশন মনে হয়। আমি প্রশান্ত মৃধার লেখা পড়েছি স্যার।

হা. আ. হ. : রিপিটেশন হয়! সেলিনাও তো লিখে যাচ্ছে। কিন্তু এখন একটা পড়ন্ত বেলা মনে হচ্ছে! ওয়াসীও তো এখন প্রবীণদের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। সুশান্ত মজুমদার (রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও, সন্দেহ ও নতুন কুটুমর লেখক) লিখছে। জাকিরকেও আমরা গণ্য করতে পারি। সে যেহেতু কতোগুলোর বিষয়, যেমন- পিতৃগণ, মুসলমানমঙ্গল লিখে আলোচিত হয়েছে। তবে সে সাহিত্যচর্চায় বিষয়ের দিক থেকে একটা আলাদা জায়গা তৈরি করেছে।

চিহ্ন : মামুন হুসাইন সম্পর্কে একটু?

হা. আ. হক : মামুন সম্বন্ধে আমার অতি উচ্চধারণা। তার লেখাপড়া ভালো।

চিহ্ন : ইমতিয়ার শামীম?

হা. আ. হ. : ইমতিয়ার শামীমও তাই। ভেরি শার্প! কিন্তু এদের ব্যাপার হচ্ছে, কোথায় এরা আটকায় জানি না? কিছু করতে শুরু করলে মনে হয় ভীষণ ইমপ্রেস করলো। তারপরে তিন-চারটে জিনিস লেখার পরে মনে হয়, ঠেকে গেছে কোথাও! আর মামুন তো অনেককাল আগে থেকে প্রায় একই রকম। মামুনের লেখা এতো সুন্দর, এতো নলেজেবল। কিন্তু কিছুতেই কম্প্যাক্ট হয় না! আমি সেই দিন (মামুনকে) বলেছি যে, তুমি গল্পবাজ হও, গল্পও দিতে হবে না আমাকে; আমি গল্পও চাই না। কিন্তু কম্প্যাক্ট হতে হবে তো! বিশাল সবুজ মাঠে প্রত্যেক ঘাসের মাথায় যদি শিশিরের কণা থাকে, তাহলে মাঠটা বড় ঝকঝক করে। কিন্তু তুমি যদি মনে করো যে, একফোঁটা পানি আমি খাবো, তাহলে তো পারা যাবে না, ক্ষতি আছে। এটা হতে পারে হীরক কণা! এরকম অবস্থা। তবে ও খুব নিষ্ঠাপরায়ণ, নির্লোভ, নিস্পৃহ, তারপরও কোনো কিছুর পিছনে ছুটছে না, সে দৌড়াচ্ছে না, একেবারেই না। ‘বাংলা একাডেমি’ পুরস্কার -টুরস্কার কিছুই এখনো তাকে দেওয়া হয়নি। পায়নি কে? এই শাহীন আখতার থেকে শুরু করে সকলেই পেয়েছে। সেখানে মামুনকে দেওয়া হয়নি!

চিহ্ন : শামীমও কিন্তু স্যার অনেক লিখছে।

হা. আ. হ. : শামীম বাংলা একাডেমি পুরষ্কার পেয়েছে?

চিহ্ন : না, পায়নি।    

হা. আ. হ. : অনেক লিখছে, আর আমি দেখতে পাইনি। সাম্প্রতিক তার কোনো লেখা আমি দেখিনি। উপন্যাস-টুপন্যাস যদি দেখা যেতো, তাহলে আলাদা কথা। কেমন লিখছে জানি না। কেমন লিখছে?

চিহ্ন : তার একটা জায়গা আছে এবং লেখার হাতও আছে। কিন্তু উত্তাপটা…

হা. আ. হ. : ওটাই তো ব্যাপার গো! লেখায় নতুন বাঁক, নতুন কর্নার না দেখতে পেয়ে তুমি তো বিরক্ত হয়ে যেতে পারো। সব বড় লেখকরাই কিন্তু শেষের দিকে তাই করেছে এবং তাতে করে তারা গেছে। হলুদ নদী সবুজ বন, বা প্রাণেশ্বরীর উপাখ্যান এখন কে পড়ে বলো তো? কিন্তু পুতুলনাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি, আরোগ্য এইসব উপন্যাস তো কিছুতেই ছাড়তে পারবে না মানুষ। প্রচুর উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন। কিন্তু একেবারে প্রথম দিকের উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫) পড়েই তো বুঝতে পেরেছি যে, দ্যা গ্রেট রাইটার ইজ কামিং। যাদের নাম আমরা করছি তারা লিখছে ঠিকই। লেখার একটা স্টাইল, একটা রীতি, একটা বৈচিত্র্যও ধরলাম তাদের আছে। কিন্তু ‘চট করে মনে রাখা’ বা দাগ কেটে গেছে, ভুলতে পারছি না, কথা বলতে গেলেই তাদের কথা চলে আসছে, এমন ব্যক্তিকে খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে! পেছনের দিকে না অন্য কিছু…ভূতের মতো আর কি! খুঁজতে হয়।

চিহ্ন : এখন তো আর ডিফেন্সিভ নেই। অর্থাৎ পাকিস্তান নেই, ব্রিটিশ নেই। আমাদের নিজের দেশ এবং এই দেশ নিয়ে আমাদের একটা স্বপ্নও আছে। দেশে নানা রকম দল-মত থাকবে এটা ঠিক। কিন্তু একটা ড্রিম তো আছে। আমাদের জাতিসত্তা আছে। আমরা মুক্তবাতাসে চলতে পারছি, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছি। সেটার যে এনজয়মেন্ট, সেই এনজয়মেন্টটা লেখকরা কেন দিতে পারছে না? যেটা শিল্প হয়ে ওঠার জায়গা সেটা তো হচ্ছে না। হ্যাঁ লেখকরা লিখছেন, লেখেন বিচিত্রভাবে। যেমন শহীদুল জহির মুখচোরা মানুষ ছিলেন। তাঁকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অনেকেই হয়তো চিনতো না, জানতো না। একটা-দুইটা গল্প হয়তো অনেকেই পড়েছে। তাঁর দহ নামের গল্পটি প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় বেরিয়েছিলো। এ গল্পে এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের একটা বিষয় আছে। নীলক্ষেতে পুলিশবক্সে পুলিশ দাঁড়িয়ে। ছাত্ররা মিছিল করে আসছে। সে মিছিলে গ্রাম থেকে আসা এক কৃষক যাচ্ছে। তার সাথে পুলিশের কথা হচ্ছে। পুলিশও অসহায়। তারও কিছু বলার নেই। সে তাকে মারবে না রাখবে? আবার তার চাকরি রক্ষা এমন অনেক বিষয়ে ভাবছে। গল্পটা পাঁচ-সাত পৃষ্ঠার মতো। এর মূল বক্তব্য হলো যে, পুলিশ তাকে তো আমরা প্রতিপক্ষই মনে করি কারণ, রাষ্ট্রের হয়েই তারা কাজ করে। অথচ এই গল্পে পুলিশকে একটু সিগনিফিকেন্ট করে তার মধ্যে একটা মানবিক বোধ  দেখানো হয়েছে। এই গল্পের বয়ানভঙ্গি থেকে শুরু করে সবকিছু ভালোই হয়েছে। তারপরে তিনি একে একে লিখলেন সে রাতে পূর্ণিমা ছিল, ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প, কাঠুরে ও দাঁড়কাক। এসব গল্পের মধ্যে একধরনের জড়ানো-প্যাঁচানো ভঙ্গি, জীবনের জটিলতা ও বাস্তবতা রয়েছে। তবে তিনি বাস্তবতাটাকে নির্মম করে গড়ে তুলেছেন। এই সমস্ত লেখকের মধ্যে টাচিং বা মন ছুঁয়ে দিলো ব্যাপারটা নেই। শকুন আমি প্রথম পড়ি ১৯৯২-১৯৯৩’র দিকে। পড়ার পর মাথায় ঢুকেছে আর বেরোয়নি! এই যে আশ্চর্য একটা বিষয় অর্থাৎ দাগ কেটে যাওয়ার জায়গাগুলো- এখন তো কোনো গল্পকারের মধ্যে তেমন একটা নেই। আপনি দীর্ঘ সময় ধরে গল্প নিয়ে কাজ করেছেন, এ বিষয়ে আপনার দার্শনিক বোধ-বুদ্ধিও প্রচুর। আপনি বললেন যে, গল্প লেখার আগে আমি তেমন অর্থে গল্প পড়িনি। শকুন লেখার জন্য আমার সেই অর্থে দীক্ষা নাই বা প্রস্তুতিও ছিলো না। এটা একেবারেই কাণ্ডজ্ঞানের একটা ফিলোসফি।

হা. আ. হ. : হ্যাঁ। ট্রান্সেলেশন অফ এন এক্সপ্রিয়েন্স …

চিহ্ন : সেই এক্সপ্রিয়েন্সটা আমাদের লোকদের মধ্যে আমরা পেতে চাই। এখনকার প্রজন্ম তো গল্প করতে চায়, কারা গল্পকার সেটা জানতে চায়। সেই রবীন্দ্রনাথ, মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতি কেউ পুরোনো হয়নি। পড়তে গিয়ে ভালো লাগছে, খারাপ লাগছে না। এমনকি আমরা রাজশাহী শহরে গল্প বিষয়ক কিছু একটা হলে হাসান আজিজুল হককেই নিয়ে আছি। আমরা এখন ধরেই নিই হাসান আজিজুল হক একটা ‘কাল্ট ফিগার’। কিন্তু ‘ফিগার’ তো আমরা এ প্রজন্মে দেখি না!

আমরা যেটা স্যার একটু ভাবছি সেটা হলো এরকম যে, আপনিতো এখন একটা অনুবাদের কাজ করছেন কিংবা অনুবাদের প্রয়োজন অনুভব করছেন কিংবা এই যে অনুবাদের কাজ করছেন কিংবা দীর্ঘসময়ে যে বিচিত্র বিষয়ে ক্রিয়েটিভ কাজ করেছেন, এখন আবার আপনি যে অনুবাদের কাজ শুরু করলেন এইটা আসলে কি এই প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে না আসলে একদম নিজের ভেতরে কিছু তাগিদও তৈরি হয়েছে?

হা. আ. হ. : তাগিদ, প্রধানত নিজের ভিতরে তাগিদ। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অনুবাদ আমি করছি, আর্নেস্ট হেমিংওয়েও তো পুরনো লেখক হয়ে গেছেন। উনি তো মারা গেছেন গত শতাব্দীর ষাটের দশকে, নিজেই আত্মহত্যা করে মারা গেছেন। তাহলে এই মুহূর্তে যাঁরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড় লেখক রয়েছেন, জ্ঞানে হোক কিংবা লাতিন আমেরিকান-ই হোক তাঁদের সাথে আমাদের পরিচয়টা একটু ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিৎ। তাতে হবে কি, আমাদের মনের দিগন্তটা একটু প্রসারিত হবে। আমার একটাই বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে অভিযোগ, এর দিগন্তটা বড্ড ছোট। বাংলা কথা যেমন বাংলা ভাষা ত্রিশ কোটি লোক বলে অথচ সেই হিসেবে এই ভাষার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠা নেই, এটা খুব দুঃখের বিষয়। তা এই ভাষাটি কত যে সুন্দর এবং কত যে শক্তিশালী ভাষা সেটা প্রমাণ করাও দরকার আছে। তা আমি সেই জন্যে এইসব গল্প অনুবাদ করে…বাংলা সাহিত্য কিন্তু আসলে এসব জিনিসগুলোকে মূল থেকে বাংলা ট্রান্সফার করা বা নিয়ে আসা এ বিষয়গুলোও কিন্তু খুব চমৎকার কাজের ভাষা…

চিহ্ন : স্যার এখানে আমার একটা অবজারভেশন এরকম যে, আপনি কিন্তু এই বয়সে এসে এই তাগিদটা বোধ করছেন। এবং ষাট থেকে লিখছেন, ষাট-সত্তর-আশি-নব্বই-শূন্য এই যে দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর লেখালেখির মধ্যে থাকা বা এই চিন্তা জ্ঞানের বা ক্রিয়েটিভিটির চর্চা করা। আপনার ভিতর দিয়েও কিন্তু বাংলা ভাষা একটা দিকে এগিয়ে গেছে, সেটা নানাভাবে নানা আঙ্গিকে, হয়তো কখনো উপন্যাসের ভাষা, কখনো গল্পের ভাষা, কখনো প্রবন্ধের ভাষা, কখনো স্মৃতিকথা যখন লিখছেন এটা কিন্তু একটা দিকে এগিয়েছে। এখন আপনি স্যার যেটা বলছেন যে, আমি এর আগেও শুনেছি অনেকদিন কথা বলতে যে, আপনি ফাকনার পড়ছেন, আপনি হেমিংওয়ে পড়ছেন, তারপর আপনি ও হেনরি পড়ছেন, কিংবা আপনি রুশ সাহিত্যের দস্তোয়ভস্কি পড়ছেন…

হা. আ. হ. : অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান একটা শর্ট সিরিজের কালেকশন পেয়েছি। অনেক পুরনো, সেখানেও সাহিত্য সম্পর্কে আমরা কোনো খবর রাখি না, একটু খবর রাখা যাক- এই আর কি?

চিহ্ন : এই জিনিসটা একটা ব্যাপার সেটা হচ্ছে যে, আমরা যারা নতুন আমাদের বয়স যাদের পয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ চলছে, আমরা কিন্তু এই জায়গাগুলো ফিল না করে, জাহির করছি কিংবা আমরা কি লিখলাম, আমাদের লেখা কে পড়ে, আমাদের লেখা কেউ যদি না পড়ে- এসব করে আমরা মন খারাপ করছি। কিংবা আমাদের লেখা কেন পড়ছে না? কিংবা আমি এতদিন থেকে লিখছি, আমার তিনটা গল্পের বই বেরিয়ে গেছে আমার কথাতো কেউ বলে না! এই যে মান-অভিমানের জায়গাগুলো তৈরি হয়েছে, এখন মান-অভিমান তো লেখার জায়গায় যতটা তার চাইতে বেশি ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার জায়গায়।

হা. আ. হ. : তা ঠিক।

চিহ্ন : তো এখন এই অনুভবটা হাসান আজিজুল হক কেনো করছে যে হেমিংওয়ে- তাঁকে অনুবাদ করতে হবে? এবং আমি স্যার প্রত্যক্ষভাবেও দেখেছি অনেক সময় পড়তে পড়তে বলেছেন, ‘আহ্, কি রকম একটা জগৎ, গল্পের জগৎ! এই গল্পতো আমরা লিখতে পারি নি।’ অথচ আজকের প্রজন্ম কিন্তু এই জিনিসগুলো ভাবছে না। সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয় যে এই অনুবাদটা, যেমন আপনি হেমিংওয়ের কিলিমাঞ্জারোর তুষারপুঞ্জ অনুবাদ করেছেন, বড় গল্প। এই যে শ্রমটা দিচ্ছেন এই সময়ে এসে, এই বয়সে এসে, পড়তে হচ্ছে একবার, পড়ার পরে সেটা আপনি ট্র্যান্সলেট করছেন এবং ট্র্যান্সলেট এটাতো আক্ষরিক ট্র্যান্সলেটে কাজ হবে না, এটাতো ভাবটা উদ্ধার করার ব্যাপার আছে। কিংবা গল্পের শৈলিটাকে হৃদয়াঙ্গম করার ব্যাপার আছে, সে অনুভবটাকে স্পর্শ করারও ব্যাপার আছে। তো সেটা যে আপনি করতে পারছেন সেটা স্যার আসলে আমরা মনে করছি এখানে একটা আলাদা হাসান আজিজুল হকের জায়গা কিংবা একটা দ্বার উন্মোচন হচ্ছে যে, অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর জায়গাটা- আমাদের একধরনের আশাও আছে যে আপনি আরও কাজ করতে থাকেন, কাজ করছেন এবং যদি এভাবে আরও একটা-দুইটা-তিনটা-চারটা, দশটা গল্প, বিশটা গল্প, ত্রিশটা গল্প হয়ে যায় তখন আমরা দেখবো যে, হাসান আজিজুল হকের হেমিংওয়ে কিংবা হাসান আজিজুল হকের ফকনার কিংবা হাসান-আজিজুল হকের ও’হেনরি- কেমন হচ্ছে? কিংবা অস্ট্রেলিয়ান যে গল্পের সংকলন পেয়েছেন সেখানে হাসান আজিজুল হকের টেস্টটা কেমন? বাইরের গল্প, বাইরের যে সমস্ত জিনিসগুলো আসছে, সেক্ষেত্রে আপনার নান্দনিকতার ব্যাপারটাই বলি কিংবা আপনার আনন্দের বিষয়টাই বলি, এই কাজ করতে গিয়ে আপনার কেমন লাগছে?

হা. আ. হ. : দেখো আমার মনে হয় কি, ষাট সাল থেকে আমি মোটামুটি আনুষ্ঠানিকভাবে লেখা শুরু করি। তখন ঠিক করি যে লেখাটাই হবে আমার মুখ্য উদ্দেশ্য। সে থেকেই এ পর্যন্ত চলেছি এবং ওই জায়গা থেকে একটু বদল হয়নি বরং বলা যায় আমি ষাটে যেখানে ছিলাম, যে মনোভাব, যে কৌতূহল, যে আগ্রহ আমার ছিলো তখন, আমার মনে হয়, আমার এখনও একটুও তা থেকে কমে নাই। যেমন তেমনি আছি এখনো। এইটা যেদিন চলে যাবে সেদিন কিন্তু আমিও মনে করি যে, আমি নিজেই লেখা ছেড়ে দেবো। যখন আমি বুঝতে পারবো যে, হয় রিপেটেটিভ হয়ে যাচ্ছি অথবা ক্লান্তিকর হয়ে যাচ্ছে তখন কিন্তু আমি লেখা ছেড়ে দেবো। কিন্তু এখনো আমার মনে হয় যে, আমার মনের ওই অবস্থাটা আসে নি। যার জন্য এখনো নতুন গল্প লেখার কথা ভাবছি। ছকিয়ে রেখেছি গল্পটা আমি কাল বা পরশু লিখবো। কারণ অনুবাদ হেমিংওয়ের যা হলো তাতে একটা ছোট অনুবাদের বই হতে পারে। আর এর বেশি, খুব বেশি করতে যাবো না। অন্য কারও গল্প অনুবাদ করার কথা এখন আর ভাবছি না। আমি এখন দুটো কাজ-ই করতে থাকবো- গল্প লিখতে শুরু করবো আর হচ্ছে যে, আমি ছোটদের জন্য আমার একটা বালক বয়স সম্পর্কে বই লিখবো। এটা হতে পারে যে হাসান আজিজুল হকের শৈশবকাল…তবে এটা স্মৃতিকথাতে যেমন আছে তেমনটি নয়, একেবারে কিশোরদের…

চিহ্ন : কিশোর উপযোগী?

হা. আ. হ. : কিশোরদের উপযোগী করে আমি একটা লিখতে চাই। এ দুটো জিনিস লিখবো। এ দুটো লেখা হলে আমার মনে হয় যে, আমার তৃষ্ণা নিবারণ হয়ে যাবে। এদুটোর পরেই আমি হয়তো ভাববো যে আচ্ছা একটা উপন্যাস ধরে ফেলি দেখি-

চিহ্ন : এখানে একটা প্রশ্ন আমার কাছে মনে হয়েছে যে, গল্পকার হাসান আজিজুল হক উপন্যাস লিখছে, এখন কিন্তু উপন্যাস লিখতে চাইছেন আপনি, এটা কি স্পেস বেশি হওয়ার কারণে? কিংবা এখনকার যে রিয়েলিটির ভেতরে আমরা আছি, এখন যা চলছে, তাতে কি গল্পের চাইতে আপনার উপন্যাসের দিকটাতে ঝোঁক বেশি হচ্ছে? আপনিতো এমনটা বলতে পারতেন, ‘আমি একটা গল্প লিখবো’ কিন্তু তা না করে কেনো বলছেন যে, ‘এরপর আমি একটা উপন্যাস লিখবো?’ অলরেডি আপনারতো ছয়টা উপন্যাস হয়ে গেছে লেখা। উপন্যাসে স্বাধীনতাটা বেশি-

হা. আ. হ. : হ্যাঁ এটা ঠিক কথা যে, সাধারণভাবে দেখো তুমি ছোটগল্পের উদ্ভব হয়েছে অনেক দেরিতে। সাহিত্যের যে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার কথা বলো তাহলে উপন্যাস আর মহাকাব্য প্রায় কাছাকাছি নিয়ে বিচার করি। তার মানে উপন্যাসের খুব একটা প্রাচীনত্ব আছে তার দিক থেকে, মহাভারতকে আমি উপন্যাস বলতে পারি। সার্ভেন্টিস তো উপন্যাসের শুরুতেই এরকম আছে। কাজেই উপন্যাসের চেয়ে সত্যি করে, খোলামেলাভাবে, বিস্তৃত জীবনের যে অঙ্গনটা, সেটা কিন্তু ধরে আনা যায়। সেটা ঠিক ছোটগল্পে ঐভাবে আসতে পারবে না। ছোটগল্প ঝিলিক দিয়ে দেবে একটা, তাৎক্ষণিক একটা ছবি দিয়ে দেবে- সেটা মর্মস্পর্শী হতে পারে, সেটা তোমাকে একেবারে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে পারে কিন্তু উপন্যাসের এই প্রসারতা- ওরহান পামুক তুমি যদি না পড়ো, ‘স্নো’ যদি না পড়ো, তাহলে দেখা যাবে যে, আচ্ছা এই মুহূর্তে তুরস্কের যে চেহারাটা, মৌলবাদী যে চেহারাটা, সেটা কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। তেমনি আমারও এখন মনে হয় যে, উপন্যাসের এই জিনিসগুলো আমি ধরতে পারি কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ একদম ডোবার পানির মতো, মোটা পানি, উপরে সর পড়া স্থির হয়ে রয়েছে। এখানে উপন্যাস লিখতে চাইলেই কি লিখতে পারা যাবে? মানে জীবনের জঙ্গমতা এবং জনপদের জঙ্গমতা তো থাকতে হবে, তাই না? আর তা নাহলে ওই পুতুলনাচের ইতিকথার মতো লিখতে হবে স্থির হয়ে আছি, তাই না? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো তাই বলেছেন, সব পুতুল, কিছুই করার নেই, স্থির হয়ে আছে। তো তিনি অসাধারণ একটা গদ্যরূপ দিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই-

চিহ্ন : এবং মেসেজটাও স্যার অনেক…

হা. আ. হ. : অনেক বড়, অনেক বড়, অনেক বড়। ঐ শশীর স্বাদটা শুধু শশীর স্বাদ নয়, আমাদের সকলের জীবনের স্বাদ ঐটাতে- উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়টা দেখবো। সে তো আর কোনোদিন, তাঁর জীবনে হলো না। আমার অবশ্য সেইরকম মনে হয়, গল্প তো লেখা হলো কিছু, গল্পের প্রতি আমার কোনোরকম বিরাগ জন্মায়নি, গল্প লেখাই যাবে, একটু নভেলা জাতীয় গল্প লেখা যায়, একটু বড় সাইজের গল্প তো লেখা যায় আরকি। আমি সে রকম একটা গল্পের কথা ভেবেছি, হয়তো সেই গেসটা লিখবো। ইতিমধ্যে আরও দু-একটা গল্প লিখেছি, এখানো ছাপা হয়নি। দুইটা-দুইটা তো বটেই। আমি আরও কিছু গল্প লিখি, পাশাপাশি ছোটদের জন্য লিখতে থাকি। এইভাবে দুহাত বাড়িয়ে কেবল লিখতে ইচ্ছা করে, ধরতে ইচ্ছা করে। যদি জীবনের স্বাদটা না থাকতো এখনো তাহলে এটা বোধহয় পারতাম না। বাঁচার যে স্বাদ এটা যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষের যায় ততক্ষণ পর্যন্ত সে কিন্তু খুব ‘অ্যাকটিভ’ থাকে।

চিহ্ন : স্যার এখন যদি আপনি আবার লিখছেন, লিখতে গিয়ে কি স্যার মনে হয় যে, এইরকম কথা আপনি আগে বলেছেন? এইরকমতো মনে হয়না বোধহয়। বা…

হা. আ. হ. : আমি তো তাই মনে করিনি। কিন্তু সেদিন আমাকে প্রশান্ত কি বললো ঠিক বুঝতে পারলাম না। প্রশান্ত বোধহয় বললো, ‘না স্যার, আমি কিন্তু তা মনে করি না।’ তার মানে সে বোধহয় হয় বলতে চায় যে, আপনার এখনো অনেক রিপেটেটিভ হয়ে গেছে বা- এই জিনিসগুলো পাঠক বলতে পারবে। কিন্তু আমার মনে হয় না যে আমি বারবার রিপিট করছি, স্মৃতিকথাতেও নয়। স্মৃতিকথার প্রথম খণ্ডের গদ্যর সাথে দ্বিতীয় খণ্ডের গদ্য, দ্বিতীয় খণ্ডের গদ্যর সঙ্গে তৃতীয় খণ্ডের গদ্য এবং এখনকার গদ্য একটু একটু চেঞ্জ হচ্ছে কারণ আমার অভিজ্ঞতার উপরে জিনিসটা নির্ভর করছে আর কি। কাজেই নরম স্মৃতিগুলি তারপর একটু শক্ত- সেজন্য আমি সবসময় মনে করি যে আমার ভাষাটা মানে যে খাপে যে কলমটা ঢুকবে সেই খাপে যেনো সেই কলমটা থাকে। সেজন্য আমার ভাষাটা আমার সেই মুহূর্তের যে চিন্তা এবং ইয়ে তার সঙ্গে যেনো একদম মিলে যায়। তাহলে আমি নিজেকে কেনো পুরানো মনে করবো? আমিতো মনে করতে পারবো না যে আমার ভাষা পুরানো হয়ে গেছে, মনে করতে পারিনা। এখনো গদ্য লিখলেই আমার মনে হয় যে আমি, একটু যা গল্প-গদ্য লিখছি কিছু নতুনত্ব সেখানে একটুখানি থাকবেই থাকবে।

চিহ্ন : এ ক্ষেত্রে আমার একটা জিনিস, আমার ক্ষেত্রে মনে হয় যে, আপনার গদ্যটা একধরনের মানে চৌম্বক একটা ব্যাপার আছে। এই বিষয়টা যেমন এখানেও (কিলিমাঞ্জারোর তুষারপুঞ্জ) যদি বলি, ‘তুষারাচ্ছাদিত কিলিমাঞ্জারোর উচ্চতা এতো মিটার, এটা আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত’- এই যে চলছে কিংবা শকুন-এর শুরুটা, এইসব জিনিসের মধ্যে আমার স্যার মনে হয় যে, ভাষার যে শক্তি এবং আপনি যে ভাষাটা প্রয়োগ করেছেন সেটা কিন্তু আমরা একটু অন্যভাবেই বলি, সমাজের অনুশাসন কিংবা যে কনভেনশনাল কালচার কিংবা ধর্মীয় যে সমস্ত রীতি-নীতি, অনুশাসন, আচার-আনুষ্ঠানিকতা কিংবা আমি তখনকার বা এখনকার এ সমস্তগুলো ঝেড়ে ফেলে একেবারে সার্বভৌম একটা…

হা. আ. হ. : অবিকল, অবিকল তুমি যেটা বলছো- ঠিক প্রকাশ করলে আমার কথাটি, যে আমি সমাজের চেহারা, সমাজের দৈনন্দিনতার এটা-ওটা-সেটা কোনোটাই দেখবোনা তো। আমিতো ‘ক্রিয়েট’ করছি। আমার কাজটাতো তোমরা বলো সৃজনশীল কাজ। তোমরা যারা কবিতা লেখো, কি গল্প লেখো, তোমরাতো সৃজনশীল কাজ করো। সৃজনশীল কাজ মানে হচ্ছে যা আগে কেউ দেখে নাই। সেটা বোঝা গেলো এই প্রথম। যদি আগে দেখে দেখে তোমার চোখ ক্ষয়ে গেছে, আবার সেইটা দেখছো তাহলে সেইটা তো সৃজনশীল কাজ বলা যাবে না। আমার গদ্য লেখার ব্যাপারটাও তাই, গদ্য লেখার ব্যাপার যদি হঠাৎ করে মনে হয়, না এতো অসম্ভব পুরানো জিনিস স্যার আবার শুরু করলো, আমি যদি পাঁচটা লাইনও লিখি…

হু, আরোপ বা ভয়ে আছি, তাইনা? যে এটা লিখবো-

চিহ্ন : হ্যাঁ। আরও একটা জিনিস আমার বলার ব্যাপার আছে যে, একজন লেখকের ভাষা; হয়ার অ্যাজ আমি কাউকে খাটো করে বলছি না, সৈয়দ হকের গল্পের ভাষা আমার কাছে ঐ পর্যায়ে কিন্তু টানছে না যতোটা টানছে পরাণের গহীন ভিতর কিংবা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কিংবা নুরুলদীনের সারাজীবন; কিন্তু তার যে শেষ দিকের লেখাগুলো তা কিন্তু স্যার ঐভাবে একটা উপরে উপরে ভাব আছে মনে হয়। তারপর এইরকম আরও আছে অনেকের লেখায় আমি দেখেছি যে, এক ধরনের জোলো ব্যাপার। কিন্তু আপনার কোনো লেখায় আজ পর্যন্ত যতই আপনি তাড়াহুড়ো করে লেখেন, যত সংক্ষিপ্ত সময় নিয়ে লেখেন, এই জোলো জিনিসটা আমি পাইনি কখনো। এটা আমার ক্ষেত্রে একটা মনে হয়েছে- এই ইন্টারভিউয়েও যেটা বললেন, আপনার যে বেড়ে ওঠার জায়গাটা; এতো নিরঙ্কুশভাবে, এতো ফ্রিলি, এতো হজম করে তৈরি হওয়া- সে কারণে বোধহয় ভাষাটার তাপ ও শক্তিটা এতো বেশি। আমি আসলে…

হা. আ. হ. : যেটা বললে, এটা তোমার ‘অবজারভেশন’। আমার কাছে মনে হচ্ছে যে তোমার ‘অবজারভেশন’। আমার মনে হচ্ছে যে অবজারভেশন তোমার নাইন্টি পার্সেন্ট ঠিক। আজকে ধর, শেষ হয়ে গেলো আমার, স্মৃতিকথার চতুর্থ খণ্ড। (স্মৃতিকথার কিছু অংশ পড়ে শোনাতে শুরু করলেন) ‘গাঁয়ের নিভৃত ছোট্ট দুয়ার দিয়ে বাইরে এসে চারদিকে শত শত দুয়ারের দেখা পাই। তাদের কোনোটি খোলা, কোনোটি বন্ধ। হাট করে খোলা, আধা খোলাই, ঠেলা দিলেই খোলা যাবে কিংবা চিরকালের জন্য বন্ধ। এখন উই ধরা, বুনো, ঘাসগজানো, পরিত্যক্ত, সামান্য চেষ্টাতেই ঢোকা যায়। কতো না দুয়ার এই মুহূর্তে পৃথিবীতে, সব ফেলে আমি দাঁড়িয়েছি অজানার অথচ নির্দিষ্ট একটি দুয়ারে’- এই পর্যন্তই।

চিহ্ন : এগজ্যাক্টলি! এগজ্যাক্টলি, এক্কেবারে নির্ভুলভাবে। এটা মানে আমি আর এখানে, কোনো মন্তব্য নাই।

হা. আ. হ. : এখন কি জানি, হয়তো তুমি যেটা বলছো সেইটাই ঠিক। হয়তো কিছুতেই ওই যাকে বলা যায়, ব্যবহারে-ব্যবহারে, ঘর্ষণে-ঘর্ষণে যেটা একেবারেই ধার নষ্ট হয়ে গেছে যার, সেটা কিন্তু করা যাবে না সেইটা নিয়ে আমি সবসময় মনে হয় যে কামারের ঐ হাপরটা বুঝলে- ওটা আর হাতুড়িটা ছাড়া যাবে না। ভাষাটাকে বিবেচনা করতে হবে যে মাঝে মাঝে গরম করে, পিটিয়ে ঠিক করে নিয়ে পানিতে ডুবিয়ে ঠাণ্ডা করে, আবার সেটাকে গরম করে যতক্ষণ পর্যন্ত ঠিক জায়গাটা না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত এই কাজটা করে যেতে হবে। ভাষাকেও তাই মনে করি আমি যা বলতে চাই, তুই বল সেটা। যতক্ষণ না বলছিস ততক্ষণ আমি তোকে ছেড়ে দেবো না। এবং আমি এই করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে, বাংলা ভাষা খুব শক্তিশালী ভাষা। ইংরেজি ভাষার চাইতে কোনো অংশে কম নয়। এইটা আমরা কেন প্রচার করি না জানি না। আমাদের ভাষা, আমাদের বর্ণ অসম্ভব রকমের বৈজ্ঞানিক একটা ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। তারপরেও আমরা এই ভাষা নিয়ে লোকের কাছে মন ছোটো করে-করে ঘুরে বেড়াই, এটা ঠিক না। সে জন্যই ভাষার উপরে আমি এতোটা গুরুত্ব দিয়ে থাকি। লেখার সময় বারবার ওই কথাটাই মনে হয় আরকি, আমি যতদূর পারি অন্তত করি। আমি যেনো চর্বিতচর্বন না করি, আমি যেনো একটু নতুন করে লিখতে পারি, ভাবতে পারি, বলতে পারি আরকি। এইটা আসলে করা হচ্ছে।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(2)

  1. কেউ না! কেউ-ই না! পড়ছেও না। কোনো খবরই রাখছে না এইসব গল্পের কি হয়েছে, এমন কি বাংলা সাহিত্যেরও কি হয়েছে না হয়েছে একটু উঁকি দিয়ে দেখা। সেটাও কেউ করছে না। পশ্চিম বাংলায় এখনো তো কিছু লেখা হয়। তাঁদের লেখা, আমাদের লেখা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা দেখো? কোনো লেখক কোনো আলোচনার মধ্যে যায়? লেখকরা মনে করে যে, ওরে বাবা! আমার নিজের জনপ্রিয়তা চলে যায় নাকি? সেখানে লেখকরা সাহিত্য সম্পর্কে কিছু লিখতে চায় না, খেয়াল করছো তো? তাঁরা ভাবে, ও যারা সমালোচক আছে তারা করুক। আমাদের এই বিষয়ে কোথাও কোনো মন্তব্য করতে গেলে ঝামেলা হয়ে যাবে, এই মনে করছে কিনা? তরুণরা সাহসী হবে, এগুবে এই জানি। কিন্তু তরুণরা আমার দেশে এমন মনমরা এবং তেজহীন কি করে হলো, জানি না আমি!”””’

  2. মগ্ন হয়ে পড়লাম। এতো ভালো লাগলো ! জানতে পারলাম কত যে! না পড়লে কী যে মিস্‌ করতাম!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close