Home কবিতা হাসান রোবায়েত > একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান

হাসান রোবায়েত > একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান

প্রকাশঃ August 9, 2017

হাসান রোবায়েত > একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান
0
0

হাসান রোবায়েত > একগুচ্ছ নতুন কবিতা ও কবিতাভাবনা >> পাঠপ্রতিক্রিয়া মাসুদুজ্জামান

সোনাঝুরিবন

কী যে ভাবে দিঘি-জলা

সোনাঝুরিবন

মেদিনী বিদার হয়ে

ঘুরি প্রাণপণ—

ঘোড়ার হ্রেষায় কাঁপে

গৃহদীপাবলী

তারাধূলিপথে আমি

একা একা চলি

এক তার বাজে রোদে

এক তার জলে

সারাদিন চরাচর

সেই কথা বলে

 

 

কে বা কারা সারাদিন

ছড়িয়েছে ঘৃণা

আগুনের গাঙ বেয়ে

ফোটে ব্যালেরিনা

আয়ুর ভেতরে নাচ

চরাচর মৃত

চেরা জিভ সুনসান

কাঁপে আরোপিত

বিষ জ্বলে, জ্বলে হাসি

লকলকে ভোর

কফিন শুকাও রোদে

কাঠের দোসর

 

 

ঐ ট্রেন থেমে গেলো

তোমাকে উঠাবে

স্লিপারে জোছনা জমে

হুইসিল ভাবে

কাদের আসার কথা—

আসবে না আর

গভীর রাতের ধারে

পোড়ে সালফার

এখানে অনেক ঝুল

মাকড়শা ঘরে

এবারে না হোক— এসো

জন্মান্তরে

 

 

কোথাও বেড়িয়ে পড়ো—

যেন বহুদিন

মেঘের শিরীষবনে

বাজে ভায়োলিন

বলিও রূপের কথা

বাতাসে ও মদে

এ শরীর শস্যের

ভরা জনপদে

রেণু ওড়ে সারাদিন

বাঙ্ময় ত্রাশে

যে যায় নিজের কাছে

সে-ই ফিরে আসে

 

 

অরূপে সাধন তুমি

একা চারিধার

সন্তাপ ভাসে রোদে

মেদিনী-বিদার

ঢেউ দাও সে ভিড়ুক

তোমার ভাষায়

দেখেছি কাঠের নিচে

দিন চলে যায়

ঢেউ-অভিনয়ে ভাসি

অন্তর্জলী

তারার অধিক কাঁপে

ভাঙা দীপাবলী

 

রাংতাঝরার দিন

 

এখানে, শেফালির নদী অতসী চরের কাছে এসে
তাদের সমস্ত স্নান রেখে গেল আলেয়ায়—
তবু তুমি মর্মর-ছায়া,
কোথাও ভুলে গেছ রাংতাঝরার দিন
আমাদের আতাফল বন থেকে বনে ক্ষয়ে গেছে হেম, রাত্রির অভিন্ন হিংসায়

মরণ-শরীর তার খুঁজে পায় সাঁকো-পারাপার

 

একা বাড়ি
এখানে, সমস্ত ঢেউ লীন—
সারি সারি বাবলাগাছের বসন্তে পড়ে আছে নদীতীর—
একা বাড়িটির কল্পনায়
কীসের সঙ্কেত অহেতুময় এক অর্থের ছড়ায় মৌনতা—
উড়ো এই জুলায়ের ধারে
ফাঁপা যে দুপুর বনভূমে ছড়িয়েছে তাস
তাদের আওয়াজ ঘুমন্ত লোহার গায়ে বেঁকে দেয় রোদ— যেন তোমার শিরায়
মৃদু সেই শিশুটিও হেঁটে যায়
ফাঁকা মাতৃত্বের দিকে—

 

তুমি কি শ্রান্ত ডোমের নিচে হারিয়েছ নাবিকের ঘ্রাণ—?
নিজেরই ইগোর সাথে ভেবে গেছো সারা-ঋতু থাকা যায় একা—?

এত এত শীর্ণ জামা— যেন একেকটি সম্পর্কের ছাঁচ
উড়ছে বারান্দায়—

শান্ত কাঠের পাশে এইসব ঝরে পড়ে মাতৃদিন—

 

শোর 

 

কী যেন গাছের নিচে
একটি ছায়া
এতদূর ফেলে আসা রাজহাঁস
তারই বাৎসরিক ডাকে ছিল ক্লান্তিশোর—
তুলাও বদ্ধপরিকর উড়ে যেতে খাখা সন্দেহে

হায় উড়ন্ত জায়মান!

অতিরিক্ত এই হাওয়া গন্ধগোকুলের স্বীয় পরিখায়
নাচে বক্রতার অভিরূপ ধরে
তবু কি পিতা ও পুত্রাদিক্রমে এইসব অনুচয়নের সাধ
ক্ষিপ্র ফুলের সাথে নিভে যায়!
এখনো শুয়ে থাকা মহিষের পিঠে
বিশাল পালিত এই আবহাওয়ায়—পরন্তু শ্বেত হিংসায়
আকস্মিক বেজে ওঠে স্নান—

হায় উড়ন্ত জায়মান!

ঘামের দিকেই ক্রমশ ঝুঁকে পড়া ইস্পাত
যেহেতু গান বন্দরে
উটের ছায়ায়
অভিলম্বের দিকে নতজানু তাই সটান ছিলায় বসে থাকা পাখি
শুধু প্রতিধ্বনিময় বাদামের তীরে
ডুবে যায় সারি সারি নির্মিত লয়—

হায় উড়ন্ত জায়মান!

আরোহী দুপুর থেকে হে ঈষৎ নীরব—
নতজানু হয়ে এসো রক্তনালির পাশে
হ্রদের গভীরে কোনো ভায়োলিনে
বাজে নৈশজাতকের সুর—
সুমিত তারার নিচে
বেড়ালেরা খেলা করে ঘুমের বলয়—
স্প্রিং শেষে কিছু রোদ
কী দারুণ অভিনিবেশে, লেগে আছে করাতের দাঁতে

হায় উড়ন্ত জায়মান!

মানুষ বিবিধ প্রাণী সমনীল রৌদ্রের নিচে

 

না হওয়া দেখার মাঝে

 

হওয়া
অথবা না হওয়া দেখার মাঝে
সমস্ত নিহিলিজম
মাশরুম ছড়িয়ে পড়া সন্ধ্যায় ভারী হয় জটিলতা—
কাগজ উল্টাতে
তুমি দেখে নিচ্ছ যোগাযোগ—
হালকা ইগোর পাশে একটি নির্জন বাস
থেমে যাচ্ছে প্রতিদিন—

এই না হওয়া দেখার মাঝে
গড়িয়ে দিচ্ছ তুমি
শাদা, এক লোনলি আপেল—

কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে
দূরের রেডিয়োতে ঝরে যাচ্ছে শেফালি—

 

হৃদিতা

 

হৃদিতা, বাড়ি নেই
বাড়ি তাকে আনতে গিয়ে
গিঁট বেঁধে বসে আছে টগরের বোঁটায়
মিছিল ভুলে ট্রেনগুলো ঘুমাচ্ছে কম্পার্টমেন্টের বেঞ্চিতে

লেবু চায়ে মিশিয়ে পালাগান
এখানে হলুদ এলো বাগানের দোষে
খেলাটার ধূলো-সুখ—

হৃদিতা, বাড়ি নেই
নামতার সংখ্যায় টান লাগে

*

না-মহুয়া না-সাকিন। পুড়ে গেলো আলোতার, সন্ধ্যা-শঙ্খের বিড়বিড়
মেয়েটার আঙুল কেটে গেলে হ্যালুসিনেশন ধুয়ে-মুছে
বাড়ি আসে টক চা—

 

শেমিজ

তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা

বেলায়

আমি অন্ধ ছিলাম

ভেবে

বহু দূরের ঠুমরি ছিল ভেজা

বারান্দাতে এঁটো বাসনগুলি

অন্ধকারে দেখিয়ে দিল

ছাঁচ—

 

তোমার দিকে ভিড়েই আছে শুধু

চোখের পথে

উড়ন্ত সে ডোরা

শোভন সিটে আমিও বসি

ইগোর সাথে

কথ্য ঢঙে—

 

আমায় তবে চাকরি দিয়ো

জবের ভবে

যেমন তুমি শেমিজ রাখো

তারের ’পরে!

 

রিয়ালিজমে
কখনো যদি এই সুরকি ভাঙা রোদে
যে কথা আমাদের, অনেক প্রিয় ঋণ
ক্রমশ ক্ষয়ে যায় অভিপ্রায়ে দুলে
মোবিলে পোড়া রোদে চাকুরিরত দিন—

 

একাকী তুমি সেই ব্যক্তিগত বোধে
কামিজে বসে থাকা দারুণ কোনো ঘামে
শুনেছো ইগো আর খয়েরি দেখা হওয়া
অথচ কাঁপে সাঁকো হাওয়ার পরিণামে—

 

এভাবে রোদ এসে প্রচুর বিস্ময়ে
ফ্যালাসি মেলে দেয় অপার নাইলনে
আমরা তবু দেখি মেশিনে বাজে আয়ু
প্রতিটি দিন যায় মেট্রোপলিটনে—

 

যেন এ থাকাটুকু পুরোই অশরীরী
কেবলই মিন করে আউটসাইডার
এসব ফেঁপে ওঠা রিয়ালিজম ধরে
বাতাসে ওড়ে ছল আত্মহত্যার—

 

তটরেখা
মা, তার সমস্ত শ্রাবণ ঢেলে আটকাচ্ছেন পরাগ
বেঞ্চিতে ফাঁকা ফাঁকা রোদ—
কেউ বরফ বললেই থেমে যাবে ওড়া !

যেন বুদ্বুদের পাশে প্রতিটি তারাই ভাষাহীন ইস্পাত—

*
মাকে পাথর ভেবে পাশবাড়িতেই ঘুমিয়েছে রোদ মাঝে মাঝে উল ছড়ানো হাওয়ায় দেয়ালে ফুটে ওঠে রোদ—তখন গোল গোল রুটিই শিশুদের ভ্যানগঘ—

কে যেন ঘুমের ভেতর সরায় পাতার ফাঁক—

 

শূন্য ব্যক্তিত্বের দিকে
একদিন, খুব অতীতকালের পাশে আমাদের কথা হবে বাদুড়ের গান নিয়ে— কেন তারা অচেনা বাঁশির থেকে উড়ে শান্ত পাহাড়ের খাদ, রক্তের সানুদেশ ছেড়ে নেমে আসে বক্রতায়— নিচে বীজ। ঝরে পড়া রেলবাঁশি।  লোহার অর্জন।  সমস্ত পাখনায় রাত্রির সমমেল নিয়ে চলে আসে রাশি রাশি তরঙ্গ-বিক্ষেপ— তামাম রোহিণীর নিচে এই শব্দপ্রভা অকস্মাৎ ক্লান্ত করে দূর-রশ্মির জাল—

শীর্ণ দৃষ্টি তুলে আবার কি আমাদের দেখা হবে সেইসব পাখি— মরণ-জন্ম ধরে যেখানে ঘাসের প্রার্থনা নুয়ে পড়ে তাদের হাওয়ায়— ঢেউ কেবল দূরবীক্ষণে ফুলে ওঠে— যেন সমুদ্র-শেখার নাচে ধু ধু বালিয়াড়ি, দৈব-পিচ্ছিল ছাঁচ— শূন্য ব্যক্তিত্বের দিকে তুমি কী ভীষণ রমণীয়! তবু আশ্চর্য হ্রদে ফেলে যাও মুখ— সামান্য তার দিয়ে যায় রোদ এপারের জারুল-ফুলে—

 

হাসান রোবায়েত > কবিতাভাবনা
কবিতা-ভাবনা— এই শব্দবন্ধটি শুনলেই কেমন ‘ইমান’ ‘ইমান’ লাগে  আমার কাছে।  মানে, কোনো বিশেষ চিন্তাপ্রক্রিয়ায় বিশ্বাস স্থাপনে মতো। সত্যি বলতে, শিল্পে কোনো ধ্রুব অ্যাস্থেটিক্স আছে বলে আমার মনে হয় না।  নানান সময়ে নানান ফর্ম আমাকে ট্রিগার করে আমি সেভাবেই সেগুলোকে ধরার চেষ্টা করি।

তবে, ভাবনা যদি বলতেই হয়— সেইটা আমার ভাষা। মূলত আমি একটা ভাষার মধ্যে বাস করি।  আমার চিন্তার সবকিছুই ভাষাপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। আমার ভাবনা মূলত ভাষাভাবনা আদৌ কবিতাভাবনা নয়। আমার সমস্ত দ্বৈরথ কেবল ভাষার সাথেই।

 

মাসুদুজ্জামান > হাসান রোবায়েতের কবিতার পাঠপ্রতিক্রিয়া

 

কবিতা সম্পর্কে শেষকথা বলে কিছু নেই। প্রতিটি কবিতাই যেহেতু অনন্য, ফলে কোনো ছকে ফেলে এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায় না। তার মানে কী এই যে রচিত কবিতামাত্রই পাঠকের ভালো লাগবে? পাঠক বলার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা প্রসঙ্গ প্রতিপাদ্য হয়ে ওঠে। কোন কবিতার ‘পাঠক’ কে? ধরে নিচ্ছি যিনি রবীন্দ্র-সত্যেন্দ্রনাথ-নজরুলের কবিতা পড়তে ভালোবাসেন, তিনি সেই কবিতাকালের পাঠক। আবার যিনি জীবনানন্দ-উৎপল-জয়ের কবিতা পড়তে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তিনি এই সময়ের পাঠক। পাঠকেরও তাই কালসীমা থাকে। এরই সূত্র ধরে কোন কবিতা কোন পাঠকের ভালো লাগবে সেটা নির্দিষ্ট হয়ে যায়। আবার এমন দীক্ষিত পাঠকও আছেন, যারা একটা সময় থেকে আরেকটা সময়ের ভেতরে ঢুকে গিয়ে, সবধরনের কবিতা পাঠ করে তা উপভোগ করতে পারেন। তিনি সচেতনভাবেই তখন কার কবিতা পড়ছেন এবং কার কবিতা থেকে কোন রসটুকু আস্বাদন করতে পারবেন, জেনেশুনেই সেই ধরনের কবিতা পড়েন। তবে এই ধরনের দীক্ষিত পাঠকের সংখ্যা কম। এখানে, আমার আলোচনায়, একধরনের বিভাজন টানা হয়েছে- সেকালের কবিতা আর একালের এইসময়ের কবিতার মধ্যে। এখানে আরেকটা কথা বলা দরকার, প্রতিটি ভালো কবিতাই যেহেতু অনন্য, মানে যাঁর কোনো পূর্বদৃষ্টান্ত নেই, ফলে, কবিতাকে কোনো ছকে ফেলে খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। শেষ অব্দি যা দাঁড়ায় তা হলো, কবিতা বড্ড পিচ্ছিল জিনিস। কবিতার ব্যাখ্যা দেওয়া শুধু কঠিন বলবো না, অসম্ভবই। প্রতিটি কবিতাই অনন্য, কিন্তু সেটা ভালো কবিতার ক্ষেত্রেই অনন্য হয়ে ওঠে। এবার ‘ভালো’ বলতে কি বোঝায়, তাই নিয়ে বাগবিস্তার করতে হবে। এককথায় এর উত্তর দেয়া কঠিন। খুব সহজ করে বললে, যা ভালো লাগে তাই-ই তো ভালো। ভালো কবিতাও তেমনি। সুনির্দিষ্ট করে বললে, যে-কবিতা যে-পাঠকের ভালো লাগবে, সেটাই তো তার কাছে ভালো কবিতা। এইসময়ে, যারা এইসময়ের কবিদের কবিতা পড়েন বা পড়তে অভ্যস্ত, তাদের কাছে সেই কবিতাই ভালো লাগবে। গত বিশ-তিরিশ বছরে এই ধরনের যে কবিতার ধারা গড়ে উঠেছে, এই সময়ের পাঠক সেই কবিতাই উপভোগ করছেন। এই উপভোগের একটাই দিক খুব স্পষ্ট- কবিতাটা পাঠকের অনুভূতিতে ভালো লাগার সমানুকম্পন তুলছে কিনা। অর্থাৎ কবিতাটা পাঠকের ভালো লাগছে কিনা। এই কবিতা আগের মতো নয়, এমনকি একটি কবিতার মতো নয় আরেকটি কবিতা। প্রতিটি কবিতা, তাই যেহেতু অনন্য, তার সবকিছুই- শব্দ ব্যবহার, ভাবচ্ছবি নির্মাণ আলাদা হবেই। শুধু ছন্দের কিছু নীরিক্ষা ছাড়া বাংলা ছন্দের ছকটাকেই অনুসরণ করবে। কবিতা শেষ অব্দি ওই ভাষা বা নির্মাণের কারণেই আলাদা হয়ে যায়। অনেক আগে বিষ্ণু দে এরকম একটা কথাই বলেছিলেন, কবিতার রূপবদলের অর্থ হচ্ছে ‘টেকনিকের পরিবর্তন’। টেকনিক বলতে তিনি ও নির্মাণকৌশল কথাই বলেছিলেন। এবার, এই দীর্ঘ গৌড়চন্দ্রিকার পর হাসান রোবায়েতের কবিতায় আসি। আসলে রোবায়েতের কবিতায় ঢোকার দরোজাটা খুঁজে পাওয়ার জন্যেই আমি এতসব কথা বললাম।

হাসান, তাঁর কবিতাভাবনাতেই বলেছেন, তিনি কবিতা বলতে কবিতার ভাষাকেই প্রাধান্য দেন। অর্থাৎ ভাষাটা যদি আলাদা হয়ে ওঠে, তাহলে তা তার স্বকীয়, স্বচিহ্নিত কবিতা হয়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন। এটাই হাসানের কবিতা ‘তাঁর নিজের’ কবিতা হয়ে ওঠার মৌলবীজ, যা থেকে উদ্গত হয়ে উঠছে হাসান রোবায়েতের নানান কবিতা। পাঠক, আমি কিছুটা বিরতি দিই, ফিরে পড়ুন হাসানের কবিতা। দেখবেন, ভাষাটাকে তিনি কতটা আলাদা করবার চেষ্টা করছেন এবং সফলও হয়েছেন। এখানে একটু পাদটীকা দিয়ে রাখি, ভাষা বলতে তিনি কিন্তু ভাষাই বোঝাননি। বুঝিয়েছেন নির্মাণকৌশলকে, যা ভাষারই নির্মাণ। কিছুটা এগিয়ে যদি বলি এটা নির্মাণও নয়, এটা বিনির্মাণ বা হয়তো দেরিদীয় অবিনির্মাণ। হাসানের এই ভাষিক অভিনবত্বকে কেউ কেউ আবার ‘ডিফ্যামিলিয়রাইজেশন’ বা অপরিচিতি করণের সঙ্গেও মিলিয়ে ভাবতে পারেন। তবে, সব কবিরেই কিন্তু এই লক্ষ্য থাকে- সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনে। তাত্ত্বিকতার গভীরে না গিয়ে সহজ ভাবে বলতে পারি, হাসান তার কবিতাকে ভাষিক বা ভাবচ্ছবি নির্মাণের দিকে থেকে নিজের মতো করে তুলতে চান। ফলে, লক্ষ করলেই দেখা যাবে, তিনি প্রচলিত সম্ভাব্য বাকপ্রবাহের আশ্রয় না নিয়ে বাঁকাপথ ধরেছেন। যেমন একটা চকিত উদারহণ দিই উপরের একটা কবিতা থেকে-

ঐ ট্রেন থেমে গেলো

তোমাকে উঠাবে

স্লিপারে জোছনা জমে

হুইসিল ভাবে

কাদের আসার কথা—

এই কৌশলটা নতুন নয়, নতুন হওয়ার কারণও নেই। কবিরা এটাই করেন। কিন্তু ওই যে পাঠককে কতটা ভালো লাগাতে পারছেন- অনুভবে ও মননে- সেটাই মূল কথা। আমার বিবেচনায় হাসান পরিচিতি দৃশ্যকে বা ছবিকে অপরিচিতকরণের মধ্য দিয়ে ভালো লাগানোর কাজটি সফলভাবেই করতে পারেন। শুধু তার এই কবিতাগুলি নয়, অন্য কবিতা পড়েও আমার সেই ধারণাই হয়েছে।

হাসানের কবিতার আরেকটা দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আমার কাছে। তিনি একটা ছবি বা ভাবনাকে হঠাৎ করে ঘুরিয়ে অন্য একটা ছবি এনে পাঠককে এই বাঁক-পরিবর্তনের বিস্ময়ের মধ্যে নিয়ে আসতে পারেন। অর্থাৎ তিনি একটা ইমেজ থেকে দ্রুত আরেকটা ইমেজে চলে যেতে পারেন, কিন্তু যেখান থেকে কবিতাটা শুরু হয়েছিল, তা থেকে ওই ভাবপুঞ্জ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে না। অর্থাৎ তাঁর ইমেজগ্রন্থনায় একধরনের ঐক্য থাকে, তবে তা খুব দৃশ্যমান নয়, সূক্ষ্ণ। ফলে, পাঠক এই ধরনের বাঁক পরিবর্তন থেকেও অন্য একধরনের রস আস্বাদন করতে পারেন। যেমন উল্লিখিত কবিতারই পরের লাইনগুলি লক্ষ করুন, ‘কাদের আসবার কথা’ বলবার পরই তিনি কবিতাটির ভাবপ্রবাহের দিক পরিবর্তন করিয়ে দিলেন এইভাবে :

আসবে না আর

গভীর রাতের ধারে

পোড়ে সালফার

এখানে অনেক ঝুল

মাকড়শা ঘরে

এবারে না হোক— এসো

জন্মান্তরে

পাঠক, প্রতিটি কবিতা লক্ষ করুন, দেখবেন এরকমই হাসানের নির্মাণ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওই অনুভবের তীব্রতা। তিনি যে ভাবপ্রবাহ কবিতায় সঞ্চারিত করে দেন, তা বুদ্বিপ্রবণ নয়, হৃদয়প্রবণ। ভালো কবিতা যাঁরা রচনা করেন, তাঁদের এটাই প্রধান বৈশিষ্ট্য। হাসান এমন কোনো ভাবচ্ছবি নির্মাণ করেন না যা প্রচণ্ড রকমের অভিনব, দিগভ্রষ্ট। বরং আর্দ্র, অন্তরঙ্গ স্বরে কবিতার দিকে পাঠককে টেনে রাখতে চান। যেমন পরের কবিতার শুরুটাই দেখুন :

এখানে, শেফালির নদী অতসী চরের কাছে এসে
তাদের সমস্ত স্নান রেখে গেল আলেয়ায়—
তবু তুমি মর্মর-ছায়া,
কোথাও ভুলে গেছ রাংতাঝরার দিন
আমাদের আতাফল বন থেকে বনে ক্ষয়ে গেছে হেম, রাত্রির অভিন্ন হিংসায়

পাঠক, স্বরটা কী ঘনীভূত, অন্তরঙ্গ নয়? নস্টালজিয়ার নম্রতা কি আপনাকে অভিভূত করছে না?

যদি নাই করে, তাহলে আরেকটা দৃষ্টান্ত দিই ঠিক পরের কবিতা থেকে :

এখানে, সমস্ত ঢেউ লীন—
সারি সারি বাবলাগাছের বসন্তে পড়ে আছে নদীতীর—
একা বাড়িটির কল্পনায়
কীসের সঙ্কেত অহেতুময় এক অর্থের ছড়ায় মৌনতা—
উড়ো এই জুলায়ের ধারে
ফাঁপা যে দুপুর বনভূমে ছড়িয়েছে তাস
তাদের আওয়াজ ঘুমন্ত লোহার গায়ে বেঁকে দেয় রোদ— যেন তোমার শিরায়

কোথায় যেন এই স্বরের একটা দূরবর্তী কিন্তু মিল খুঁজে পাচ্ছি। মনে পড়ে যাবে জীবনানন্দের কথা বা নরেশ গুহ (যারা পড়েননি তারা পড়ে নিতে পারেন), কিংবা আরও পরের আবুল হাসান- পূর্বজ কবির ধারাক্রম হালকা পালকের মতো ভেসে এলো যেন। তবে রোবায়েতের কবিতার ভাষা রোবায়েতেরই। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তার নির্মিত ছবি- হোক তা নির্জলা ছবি, কিংবা ভাবচ্ছবি- এক্ষেত্রে তার অনন্যতা প্রশ্নাতীত।

আরেকটা কথা না বললেই নয়। সেটা হলো তার ছন্দের ‍উপর নিঃসংশয় অধিকার আর ছন্দে কবিতা লেখার ক্ষমতা- সহজাত আর স্বতঃস্ফূর্ত। ছন্দে লেখা হলেও কোনো কবিতা, যে-কবিতা ছন্দই দাবি করে, টাল খায় না। ছন্দ নিয়ে তিনি অক্ষম অনেক কবির মতো গদ্যে লিখবো বলে গোয়ার্তুমি করেন না, আস্ফালনও নয়।

আমি পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখতে লিখতে অনেক দূর চলে এসেছি। লেখা যায়, আরও অনেক কিছু। কিন্তু এবার বোধহয় আমার থামা দরকার, না হলে পাঠক, আপনি, বিরক্ত হবেন। আপনারা পড়ে নিন তার ভালো, অনন্য কিছু কবিতা।

হাসান রোবয়েতকে আমি ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু চিনি, তিনি কবিতাঅন্তপ্রাণ একজন মানুষ। ওর ভাবনায় কবিতা ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে হয় না। চারপাশের জনকলরোলের মধ্যে থেকেও কীরকম যেন মগ্ন, আচ্ছন্ন থাকেন তিনি নিজের মধ্যেই। বাইরে থেকে এটা খুব বোঝার উপায় নেই, তবে কিছুক্ষণ কথা বললেই সেটা উপলব্ধি করা যায়। নিরন্তর, আমার মনে হয় তিনি খুঁজে চলেন নতুন নতুন কবিতা রচনার নানারকম নতুন নতুন সূত্র। কবিতার সঙ্গেই তার যাপন। একবার ‘গীতা’- এই ধর্মগ্রন্থটি কিনবেন বলে খুঁজছিলেন। আমার বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি, তাতেও তিনি খুঁজে পেতে চাইবেন কবিতার কোনো সূত্র। আরও আগে আরেকটা কথা বলেছিলেন, যা আরও মারাত্মক। বলেছিলেন, তিনি পঞ্চাশ বছর পরের কবিতা এখন লিখছেন। কথাটার মধ্যে অতিশয়োক্তি আছে ঠিকই, কেননা ভবিষ্যতের বাংলা কবিতা কোন দিকে যাবে এখনই বলা মুস্কিল। কিন্তু তিনি যে এই সময়ের একজন শীর্ষকবি হয়ে ওঠার মতো কবিতা লিখে চলেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার জন্যে থাকলো শুভকামনা।

[তীরন্দাজে প্রকাশিত এই কবিতাগুলির সঙ্গে একটা ভিডিও সংযুক্ত করা হল, যে ভিডিওটিতে এই কবিতাগুলিই পাঠ করেছেন হাসান রোবায়েত নিজেই। পাঠক আপনি ইচ্ছা করলে ভিডিওটি ইউটিউবে দেখতে পাবেন নিচের লিংকে।]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close