Home ছোটগল্প হাসান শিবলী > চেক শার্ট >> ছোটগল্প

হাসান শিবলী > চেক শার্ট >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ May 21, 2018

হাসান শিবলী > চেক শার্ট >> ছোটগল্প
0
0

হাসান শিবলী > চেক শার্ট >> ছোটগল্প

 

এক

 

মনসুরের মোড়ের একমাত্র চিকিৎসক মুনির আহমেদ যখন ইফতারির জন্য একটা প্লাস্টিকের লালরঙের গামলায় পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, মুড়ি, বুন্দিয়া একসাথে কচলে কচলে মাখছিলেন তার সহকারি লুতুকে নিয়ে, কারণ ইফতারের বেশি সময় আর বাকি নাই- মাখতে মাখতে একসময় লুতুকে নির্দেশ দিলেন সামনের দোকান থেকে কয়েকটা কাঁচামরিচ আনতে, একটু ঝাল-ঝাল না হলে ইফতারিটা মুখরোচক হয়ে উঠতে পারে না, পানসে লাগে; লুতু রাস্তাটা পার হলো, দোকানে গিয়ে তার প্রথম জবানটা বের হলো কি হলো না ঠিক সেই সময় ক্লাস সেভেন পড়ুয়া ডাক্তার মুনিরের একমাত্র ছেলে জামাল দিনাজপুরের ব্যস্ত রাস্তায় দৌড়ে বাস ধরতে গিয়ে তলায় পড়ে মাথাটা থেঁতলে ফেলে। ব্যাপারটা এমন নয় যে মাথাটা থেঁতলে ফেলবে এই প্রতিজ্ঞায় সে বাসের হ্যান্ডেলটা ধরেনি বা হ্যান্ডেল ধরতে পারেনি বলেই তার মাথাটা থেঁতলে গেছে- কারণ এমনটা অহরহ ঘটে যে প্রতিদিনই অনেক মানুষ হালকা চালে চলতে থাকা বাসের হ্যান্ডেল ধরতে পারে না, অতিসাবধানতা বা অসাবধানতাবশত, কিন্তু সেজন্য তাদের সবার মাথা থেঁতলে যায় না। সুতরাং এটা বলা যেতে পারে জামালের মৃত্যুটা লেখা হয়েই ছিল।
মুনির দেখলেন, লুতু মুঠোভরে কাঁচামরিচ এনেছে। তখন হোটেল বা গোয়ালঘরের মালিক সানোয়ার তাঁর হলদে দাঁতের প্রদর্শনীসহ বলে ওঠে, ‘দাক্তার, কাচাঝালের কেজি আট টেকা করে। মাংনাই কওয়া যায়!’ ডাক্তার এই কথায় কেবল ফিরতি হাসি দেন। লুতুর দিকে তাকায় সানোয়ার। ‘কী রে লতু, আসিপের বাপ টেকা নিছে নাকি?’ লুতু হেসে ডানে-বায়ে মাথা নাড়ায়।
মনসুরের তেমাথা মোড়ে দুইটা মুদি দোকান, একটা তেলের দোকান, একটা খড়ির দোকান, আটা শুকনা মরিচ ও হলুদ কুটার মেশিনসমেত একটা ছোট্ট দোকান আর এই একটাই হোটেল… হোটেল না গোয়ালঘর? তিনটা লম্বা নিরীহ লো বেঞ্চ, সাথে দুইটা হাই বেঞ্চ, একলা হয়ে যাওয়া লো বেঞ্চটা হোটেলে ঢুকবার মুখে একপাশে সেট করা, পানির কলটা ভেতরে, কলের সামনে দিয়ে গেছে নালা, থকথকে কাদা, কলে চাপ দিলে ক্যাঁকৎ ক্যাঁকৎ করে শব্দ হয়। পেছনে ময়লা ডোবা, মাগুর মাছ আবাদ হয়। হোটেলের ভেতরে কোনো আলো নেই, একেবারে সামনে চুলার পাশে একটা টেবিল, তার উপরে ষাট ওয়াটের একটা বিজলী বাতি যেটা এখনো জ্বালানো হয়নি, টেবিলের উপর ছোলা, মুড়ি, জিলাপী, পেঁয়াজু, বেগুনি, বুন্দিয়া, পাপড়ের ঝুরি সাজানো। চুলার উপরে চায়ের কেটলি চড়ানো। হোটেলের ভেতর কোনো কাস্টমার নেই ডাক্তার আর লুতু ছাড়া, আর থাকলেও ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে বোঝা যায় না যতক্ষণ না তারা কথা বলে। সানোয়ার ব্যস্ত হাতে ইফতারি নিতে আসা ক্রেতাদের সামলায়। মোড়ের বেশিরভাগ দোকানি যাদের ইফতারি বাড়ি থেকে আসেনা, তাদের খদ্দের আর তারাই মূলত ইফতারির প্রধান ক্রেতা। মনসুরের মোড়ের যে রাস্তাটা পশ্চিম পাটোয়ারি পাড়ার দিকে গেছে সেখান থেকে কেউ কেউ হয়ত আসে, তবে এদের বেশিরভাগই আসে বুন্দিয়া নিতে, ছোলা-পেঁয়াজু তারা নিজেরাই রাঁধে, হয়ত হোটেলে যা যা আইটেম আছে তার চেয়ে বেশি আইটেমই বানায় তাদের গিন্নিরা। পটলভাজি করে, ওই কড়াইয়ে আরেকটু তেল, পেঁয়াজ মরিচ, হলুদ গুঁড়া দিয়ে সেহরিতে থেকে যাওয়া বাসি ভাত মচমচে করে ভাজে, খেসারির বড়া করে।
তবু সানোয়ারের বেচাবিক্রি খারাপ হয় না। কাঁচাবাজার নিয়ে অস্থায়ী কয়েকটা দোকান বসেছে। ওরাও এখানে আসে। পলিথিনে দশ টাকার ছোলা ভরতে ভরতে সানোয়ার ডাক্তারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে, ‘অ্যাখোনো আমার তিনটা বান্ধা কাস্টমার আসে নাই দাক্তার, ইপতারির আর কতগেলা টাইম আছে?’ ‘এই তো, আর চোদ্দ মিনিটের মতো।’ ডাক্তারের কেন জানি মনটা বিষণ্ণ বিষণ্ণ লাগে। তিনি সানোয়ারকে পানি দিতে বলেন। ট্যাংয়ের গুড়া মিশিয়ে শরবত বানাবেন। তখন বড়জোর এগারো কি বারো বছরের গেঞ্জিপরা একটা ছেলে তার জীর্ণ ফনিক্স সাইকেলটা প্রায় হোটেলের ভেতর ঢুকিয়ে দেয় এবং পাঁচ টাকার করে ছোলা ও বুন্দিয়া চায়। সানোয়ার তার আগমনে খুশি হয়, আহলাদি গলায় তাকে নানা বলে সম্বোধন করে, বোঝা যায় ছেলেটা তার আত্নীয় গোছের কেউ। সে একটা পলিথিনে প্রথমে পাঁচ টাকার ছোলা, পরে সেই পলিথিনেই পাঁচ টাকার বুন্দিয়া দিয়ে গিরা দেয়। ছেলেটা বাম হাতে হ্যান্ডেল ধরে শরীরের ডান অংশের উপর সাইকেলটা হেলিয়ে দেয়, অন্যহাতে পলিথিনটা নিতে যায়, কিন্তু সেই সময় হ্যান্ডেলটা বা’দিকটা নড়ে ওঠে আর সাইকেলের সামনের ময়লা চাকা ডাক্তারের শাদা অ্যাপ্রোন ছোঁয়। ডাক্তার তখন ডান পায়ের উপর বাম পা তুলে অন্যমনস্কভাবে ইফতারির গামলায় হাত বোলাচ্ছিলেন, সম্ভবত তিনি রেগে গেলেন কিন্তু এটা তার স্বভাবের সাথে যায় না, এটা বুঝে তিনি সামলে নিলেও তার বিরক্তি স্পষ্ট হয় কথায়। ‘আহ, ঠিকমত হ্যান্ডেলটা ধরে রাখতে পারিস না?’ একথা বলেই তিনি সানোয়ারের দিকে তাকান। ‘সানোয়ার ভাই, তোমার বুড়া নানাক একখান লাত্থি দিয়ে বাড়িত পাঠায় দ্যাও তো! সাইকেলখান আমার গায়ের উপরে ফালায় দিবে মনে হয়।’ কথা শেষে তিনি দাঁত বের করে হাসলেন, সুতরাং সেটা শোনালো কৌতুকের মতো, ছেলেটাও সলজ্জ হাসিতে আস্তে আস্তে সাইকেলটা পিছিয়ে বেরিয়ে যায়। সানোয়ার আফসোস করে বলে, ‘বাপ-মাও মরা ছোলটা দাক্তার, হামারই সমোন্দী হয়, মামার বাড়িত থাকে। ছোলটাক দিয়ে সারাদিন এটা-ওটা করায় নেয় ওমরা। দুখী ছোল…’
মুদি দোকানি বুড়া কাসেদ আলী হোটেলে ঢুকে একটু ভেতরে অন্ধকারে গিয়ে বসলেন। সানোয়ার গিয়ে তার সামনে হাইবেঞ্চিটা একটু কাছে এনে দিলো, বুড়া সেখানটায় দুই হাতের তালু মুঠোবন্দী করে নির্বিকার চিত্তে সামনে তাকিয়ে থাকলেন, সানোয়ার গিয়ে মেলামাইনের একটা পিরিচে পাঁচ টাকার ছোলা নিয়ে এসে বেঞ্চিতে রাখল। বুড়া চোখের ইশারায় তাকে চামচ দিতে বললেন। মুনির এবার মনে করিয়ে দেন ইফতারির বেশি দেরি নাই, মোটে আর দুই মিনিট। সানোয়ার ভেতরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে দিলো, তারপর কল থেকে জগভর্তি করে পানি আনে। আনতে আনতেই মাগরিবের আজান দেয়, হোটেলে আর কেউ আসে না, মুনির বিসমিল্লাহ বলে শরবত দিয়ে রোজা ভাঙেন, লুতুও তাই। বুড়া কাসেদ চামচে ছোলা তুলে পেটে চালান দেন। সানোয়ার একটা বেগুনি মুখে দিয়ে পানি খায়, ডাক্তার তাদের সাথে তাকে যোগ দিতে বললে সে জানায় ইফতারে সে বেশি কিছু খেতে পারে না, খাইলে বমি-বমি লাগে। সে পিরিচে করে সামান্য ছোলা নেয়, কিছুক্ষণের নীরবতায় সবার খাবার শেষ হয়, গামলার অবশিষ্টাংশ লুতুকে শেষ করতে দেন মুনির। কাসেদ আলীর পিরিচের সব ছোলা তার পেটে গিয়ে গুড়গুড় শব্দে গীত গায়, পিরিচে কেবল হলুদ তেল পড়ে থাকে, একটা কুকুর তার পায়ের কাছে এলে তিনি পা দিয়ে মাটিতে বাড়ি মারেন তারপর তু তু শব্দ করে সেটা তাড়াবার চেষ্টা করেন। কুকুর চলে গেলে ক’দিন ধরে ভুগতে থাকা আমাশয়ের কথা মনে পড়ে, পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা অ্যামোডিস বড়ি বের করে সেটা গিলে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ডাক্তার গলা খাকারি দিয়ে সানোয়ারের কাছে চা চান, তারপর বুড়া কাসেদের দিকে চেয়ে বলেন, ‘এবারের রোজাগুলা যে ক্যামন করে যাচ্ছে, টেরই পাওয়া যাচ্ছে না। আজ দিয়া বোধহয় সতেরটা গ্যালো?’ কাসেদ আগ্রহ দেখান না। উত্তর দেয় সানোয়ার, ‘হয় দাক্তার, সতেরটাই। তোমরা তো খালি চেম্বারত বসি থাকেন, ফ্যানের তলত, রোজা ক্যামন করে নাগিবে?’ এই কথায় ডাক্তার হাসেন, কেমন সরল এই লোকগুলো!
ইফতারি শেষে লুতু নামাজ পড়তে গেল, বুড়া কাসেদ পাঁচ টাকা শোধ করে পেটে হাত দিয়ে দোকান থেকে বেরোলেন, ডাক্তারের চা তখনও শেষ হয়নি। এসময় সানোয়ারের সবচেয়ে ছোট মেয়েটা তড়িঘড়ি করে এসে খনখনে গলায় নালিশ জানায়, ‘আব্বা, আম্মা গরু খুঁজি পাছে না। কোঠে বান্ধি থুইছিস?’ তখন সানোয়ার গামলা-পিরিচ সরাতে সরাতে তাকে আশ্বস্ত করে, ‘তুই বসেক। মুই এনা পরেই যাওছো। বুন্দিয়া খাবু?’
শহর থেকে মাইল পাঁচেক দূরে মনসুরের মোড়ের একমাত্র পশুচিকিৎসক ডাক্তার মুনির আহমেদ ইফতারের পর যখন তার দোকানের সাটার খুলে ভেতরে ঢুকে মোবাইল ফোনটা হাতে নিলেন, দেখলেন- যন্ত্রটার স্ক্রিনে এগারোটা মিসকল জমা হয়ে আছে।

 

দুই

 

এই দেশের শীতকাল জেফরিন খানমের ভালো লাগে না। কেমন জানি ম্যাড়ম্যাড়ে লাগে সবকিছু। কুয়াশায় ঢেকে যায় চারিদিক। রাস্তায় বেরোলে হাড় জিরজিরে নেড়ি কুত্তাগুলাকে দেখলে ঘেন্না লাগে; ফুটপাত রাস্তার কোণায় চট নোংরা কম্বল পেঁচিয়ে মানুষ টোপলা বেঁধে পড়ে থাকে, কোথাও সৌন্দর্য নেই! বরং বিদেশের শীতকাল ভীষণ আকর্ষণীয় লাগে তার কাছে। শাদা শাদা বরফে ছেয়ে থাকে চারপাশ, রাস্তা ঢেকে যায়, উলের মোটা জ্যাকেট জুতো পরে তখন ঘুরে বেড়াতে নিশ্চয়ই ভালো লাগার কথা।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে কম্বল একপাশে সরিয়ে বিছানা থেকে নামলেন তিনি। সাতটা পার হয়ে গেছে। চা বানাতে গেলেন। তার স্বামী ঘুম থেকে উঠতে উঠতে তিনি নিজেই দুই কাপ শেষ করবেন। তারপর ফ্রিজ থেকে ডিম বের করে ডিম ভাজি ও পরোটা বানাবেন দুইজনের জন্য। এসব করতে আর ভালো লাগে না। একটা কাজের বুয়া রাখলেই তাকে আর এত কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু মুনিরকে এই কথা তিনি মুখ ফুটে বলতে পারেন না।
রান্নাঘরে জানালার ধারে একটা জারুল গাছ। সকালে চা বানাতে এলেই দেখেন গাছের ডালে একটা হলদে পাখি টুই টুই করে ডাকছে। কী খেয়াল এই পাখির! এসব পাখির মতলব তো ভালো নয়। এত জায়গা থাকতে কেন তার জানালায় এসেই টুই টুই করতে হবে? তবু এই ব্যাপারটা খারাপ লাগে না তার। এতদিন ধরে আসে, যায়, চেনা হয়ে গেছে। এমন কোনোদিন কী হয়েছে যে সকালে পাখিটা আসেনি, মনে করতে পারেন না জেফরিন। অসাবধানে দুই চামচ চা-পাতি বেশি দিয়ে ফেলেন। চা আজ বেশ কড়া হবে।
মুনির ঘুম থেকে উঠে ব্যালকনিতে এসে বসলেন। গ্রীনরোডে এক প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখেন তিনি, বলা যায় অনেকটা সময় কাটানোর জন্য। এটা না করলে তার আর করার কিছু থাকত না, দিনক্ষণ অসহ্য ঠেকত। যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন অতীতে, সেটা সাপ হয়ে বার বার দংশন করত তাকেই। এখনও, অবসর পেলেই হতাশা গিলে খায় তাকে- নানান দুশ্চিন্তা পেয়ে বসে এমনভাবে যেন তারা অধীর হয়ে অপেক্ষা করে থাকে তার নিঃসঙ্গতার, সুযোগ পেলেই পেখম মেলে বসবে।
জেফরিন কফি নিয়ে ব্যালকনিতে এলেন।
‘চায়ে লিকার বেশি পড়ে গেছে। আরেকবার বানাতে ইচ্ছা করল না। কফি খাও। ভালো হয়েছে।’
জেফরিনের মুখের দিকে তাকালেন মুনির। হাসি হাসি মুখ নিয়ে কফি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তার স্ত্রী। মুনির একটু হেসে কফির কাপটা নিজের হাতে নিলেন।
জেফরিনের বয়স কত হবে? বড়জোর পঁয়ত্রিশ কী ছত্রিশ। কিন্তু সেটা শুধু ক্যালেন্ডারের হিসাবেই, চেহারায় সেই ছাপ নেই। পঁচিশ বছরের তন্বীর দেহসৌষ্ঠব নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে। গোলগাল ফর্সা মুখ, মোটা ভ্রু আর চোখা বা থ্যাবড়া নয় এমন নাক জেফরিনের, বেশ মানিয়ে গেছে। চোয়ালের একপাশে ইঞ্চিখানেক একটা রেখা স্পষ্ট হয়ে আছে। ছোটবেলায় বোনেরা মারামারি করতে গিয়ে বটির কোপ লেগেছিল। তবে সে দাগ তার মুখের সৌন্দর্য বরং বাড়িয়ে দিয়েছে যেন-বা। একহাত দিয়ে আরেক হাতের চামড়া টেনে ধরলেন মুনির। চামড়া কেমন জানি খসখসে ও ঢিলা হয়ে গেছে, চোখেও কম দেখেন ইদানিং। জেফরিনের পাশে কী তাকে খুব বাজে দেখায়?
খেতে বসে স্ত্রীর দিকে তাকালেন মুনির। জেফরিন তার মামলেটটা উলটে দিলেন। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে মুচকি হেসে বললেন, ‘কী দেখছ? কিছু বলবে?’
ইতস্ততবোধ করলেন মুনির। আসলে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না প্রসঙ্গটা তোলা এখন উচিত হবে কি না। জামালের মৃত্যুর পর জেফরিন স্বাভাবিক হতে খুব বেশি দিন সময় নেয়নি। হ্যাঁ, এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এই এক বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে, তিনি নিজেও প্রতিনিয়ত ঘটনাটা ভুলে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু, তবুও- ইদানিংকালে জেফরিনকে কখনও শোকগ্রস্ত দেখেছেন তিনি, মনে করতে পারেন না। এটাই তাকে অবাক করে দিয়েছে, পুত্রমৃত্যুর শোক ছাড়িয়ে স্ত্রীর উচ্ছলতাই ইদানিং চোখে লাগছে তার। এমন হওয়াটা তো অস্বাভাবিক নয় যে মা’য়েরা খুব আয়োজন করে তাদের মৃত সন্তানের জন্য শোক প্রকাশ করে। এমন কিছু চাইছেন মুনির? নাহ, এসব তার মনের শয়তানি। নিজে ভুলতে পারছেন না বলে জেফরিনকেও তেমনভাবে চাওয়াটা তো ঠিক নয়। সবকিছু ভুলে সে যদি ঠিক থাকতে পারে, সেটা খারাপ কিছু নয়। আবার এমনও হতে পারে, পুত্রশোক ভুলতে আবার এমনকি, হয়ত মুনিরকে ভুলিয়ে রাখতেই জেফরিন নিজেকে চঞ্চল রাখার চেষ্টা করছে। আর এটা তো সত্য, জামাল যতখানি তার, তার চেয়েও অনেকগুণ বেশি জেফরিনের।
জেফরিন তার দিকে তাকিয়ে আছেন। শশব্যস্ত হয়ে মুনির বললেন, ‘না, কিছু না। তুমি খাও।’
ছেলে মারা যাওয়ার মাসখানেক পর ঢাকার ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন মুনির। তার পৈতৃক ভিটেবাড়িতে তালা দিয়ে এসেছেন, মনসুরের মোড়ের চেম্বারটায় এখন লুতুর মুদি দোকান। তার দুই বোনের একজন স্বামীর সাথে কানাডায়, তাদের দুই মেয়ে, আরেক বোন পালিয়ে বিয়ে করেছে কোথাকার এক স্টেশন মাস্টারকে- যোগাযোগ রাখে না। বাবা মারা যাওয়ার পর, মায়ের মিনতি সত্ত্বেও অনেক পরে বিয়ে করেছিলেন মুনির, সত্যি বলতে যখন তার মনে হলো যে তিনি মরে গেলে তাদের বংশপ্রদীপ জ্বালানোর তো কেউ থাকবে না। নিজের অক্ষমতার ব্যাপারটা ভালো করে জানতেন বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিয়ে করবেন না কিন্তু জেফরিনের সাথে পরিচয় ও তার পূর্ববর্তী চিন্তা তার ভাবনা নিমেষেই বদলে দিতে পেরেছিল।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিলেন মুনির। কখন যে তার স্ত্রী ঘরে ঢুকেছেন খেয়াল করেননি। জেফরিন তার ভূঁড়িতে মৃদু টোকা দিয়ে শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতে লাগলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘একটা বোতাম উপরে লাগিয়েছ, কী যে ভাবো সারাক্ষণ!’
মুনির মনে মনে খুশি হলেন। স্ত্রীর কাছ থেকে অযথাই অনেকটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে তার। এর পেছনে তিনিই অনেকাংশে দায়ী। তার শুধু বার বার মনে হয়েছে জেফরিনের প্রতি তিনি অবিচার করে ফেলছেন কি না। স্ত্রীর চেয়ে উত্তরাধিকাররূপে তার সন্তানই কী তার কাছে বেশি আরাধ্য ছিল না? সেই সন্তান যখন আর নেই তখন সম্পর্কটা যেন- তিনি ভাবছিলেন, জোর করেই বয়ে বেড়াতে হবে। তাই বিছানায় জেফরিন যখন ইশারায় তাকে কাছে চাইতেন, মুনির চতুরতায় আবহ পাল্টাতেন, ভিন্ন প্রসঙ্গ এনে তাকে নিবৃত্ত করতেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠতেন। ভয়ে থাকতেন যদি কোনোদিন তার স্ত্রী ইনিয়েবিনিয়ে সন্তান নেওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন! সব জমি আবাদী হয় না- এই সত্য জানার পরে জেফরিন নিজেকে কীভাবে সামাল দেবে?
মুনির স্ত্রীর ঘাড় দুই হাতে ধরে তার পাশে দাঁড় করালেন। ‘দ্যাখো তো, জেফ, আমাদের কী একসাথে মানাচ্ছে না?’
জেফরিন কেঁপে উঠলেন। দ্বিধা জড়ানো চাহনি অসম্ভব দ্রুততায় সংযত করে হাসলেন। স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে বললেন, ‘মানাবে না কেন?’
মুনির কিছু বললেন না। চুপ করে রইলেন। আয়নায় তারা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। এই নৈঃশব্দ্য সহ্য করতে পারলেন না জেফরিন। ডুকরে কেঁদে উঠলেন। হুট করে মুনিরের শার্টের কলার দুহাতে খামচে ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন। কথা জড়িয়ে আসছিল তার মুখে। ‘তুমি… তুমি কেন ওকে ভুলতে পারো না? তুমি তো ওর জন্মদাতা পিতা নও… আমি ওর মা, আমি পারলে তুমি কেন পারবে না? আমার ছেলে তোমার কে? যা গেছে, গেছে। নতুন করে শুরুর সময় তো এখনও আছে। তুমি স্বাভাবিক হও… আমি… আমি আজকেই ওই শার্ট পুড়িয়ে ফেলব…’
‘না।’ দৃঢ় গলায় ধমক দিলেন মুনির। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে স্ত্রীকে ধাক্কা দিলেন। মেঝেতে পড়ে গেলেন জেফরিন। মুখ রক্তাভ, চোখ বড় বড় হয়ে গেছে মুনিরের। ওয়ারড্রোবের চাবি ঘুরিয়ে লক করে চাবি নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। সবকিছু ঘটল এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে।
মুনির চলে যাওয়ার পর বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদতে শুরু করলেন জেফরিন।

 

তিন

 

জামালকে উপহার হিসেবেই মনে করতেন মুনির। সে ছিল শান্ত শিষ্ট ও সুগঠিত দেহের বালক। ছেলেরা, বিশেষত বয়ঃসন্ধিকালীন যে রুঢ়তা ও ঔদ্ধত্য দেখায়, সে তেমনটা ছিল না। এগারো বছর বয়সে তাকে পেয়েছিলেন। তখন, প্রথম প্রথম তাকে বাবা ডাকতে ইতস্তত করত জামাল। প্রতিদিন তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন, প্রচুর কথা বলতেন, কিন্তু জামাল সেসবে আগ্রহ দেখাত না। একবার বাড়ির উঠানে সমবয়েসি কয়েকজনের সাথে সে ক্রিকেট খেলছিল। বল গড়িয়ে মুনিরের কাছে এসে পড়ল, তিনি সেটা না কুড়িয়ে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। মনে মনে ভাবছিলেন জামাল তাকে সম্বোধন করে বলটা চাইবে। কিন্তু গুটি গুটি পায়ে সে নিজে এসে বলটা কুড়িয়ে নিয়ে গেল। সেদিন মন খারাপ হয়েছিল মুনিরের।
কিন্তু সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। যেন কী এক আশ্চর্য বোধ এসে খুব শীঘ্রই জামালকে সমস্ত বাস্তবতা বুঝিয়ে দিয়ে গেল। সে তার মায়ের নতুন সংসার মেনে নিতে শুরু করল, মুনিরের বুড়ি মা’কে দাদি বলে মেনে নিলো নতুন এক অভিজ্ঞতা হিসেবে, তার ভালো লাগে যেহেতু আগে তার দাদা-দাদি বলতে কেউ ছিল না। এক সন্ধ্যায় সে মুনিরকে সহসা বাবা ডেকে ফেলে, প্রায় শোনা যায় না এমন মিনমিনে স্বরে। মুনিরের কান সে ডাক হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তাকে শুনতে দিলো। জামাল বলে- স্কুলের টিচার তাকে দেখা করতে বলেছে। মুনির বুঝতে পারেন ছেলের স্বরের আড়ষ্টতা, হতে পারে স্বেচ্ছায় নয়- জেফরিনের চোখ রাঙানিতেই হয়ত সে বাবা ডেকেছে, কিন্তু তিনি খুশি হন। জামালও সহজ হতে থাকে ধীরে ধীরে।
মুনির সবসময় চাইতেন, তার ছেলের মন থেকে পূর্বস্মৃতিগুলো মুছে ফেলতে অথবা সেটা নাহোক- যেহেতু স্মৃতি কখনও মুছে ফেলা যায় না, তাই অন্তত সেগুলো যেন সে ভুলে থাকতে পারে। জামাল প্রতি মুহূর্তে তাকে আগের বাবার সাথে তুলনা করছে এটা ভেবে নিয়ে আরও বেশি সতর্ক হয়ে যেতেন, ছেলের প্রতি স্নেহ ও আন্তরিকতার কমতি রাখতেন না।
একরাতে জেফরিনের সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে মুনির প্রশ্ন করে বসেন জামালের বিগত বাবার কথা। ছেলেকে স্নেহের ক্ষেত্রে তিনি নিজে কোনও ত্রুটি করছেন কি না সংকোচে জানতে চান। জেফরিন তার স্বামীর চুলে আঙুল বুলিয়ে শুধু বলেছিলেন, ‘জামাল এখন তোমার ছেলে। যেভাবে চাও, তাকে সেভাবেই তৈরি করে নাও। অতীত ভাবলে ভুল করে বসবে। আর আমিও আগের কিছু মনে করতে চাই না।’
ভুল করেননি মুনির, ছেলেকে জয় করে নিতে পেরেছিলেন। বাড়ির কাছে মনসুরের মোড়ের চেম্বার ছাড়া কোথাও বসতেন না। বলা যায়, একেবারে গ্রামীণ ডাক্তার হয়ে গেলেন। জীবনে অনেক অর্থ উপার্জনের প্রয়োজনীয়তা তার ছিল না। একবার ভেবেছিলেন পরিবার নিয়ে ঢাকায় আসবেন। কিন্তু তার অসুস্থ মা ভিটে ছাড়বেন না, জীবনের শেষ ক’টা দিনে নাতনিকেও কাছছাড়া করতে চান না। জেফরিনও তেমন আপত্তি জানাননি। কোনও কিছুরই তো অভাব নেই এখানে। কয়েক মাইল দূরেই দিনাজপুর সদর, সেখানকার স্কুলেই পড়ছে জামাল, গাড়িতে করে তাকে রেখে আর নিয়ে আসার দায়িত্ব মুনিরের।
বছরখানেকের মাথায় মা মারা যাবার পর জামালের সাথে সখ্য আরও বাড়ে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভালো রেজাল্ট করায় ছেলের জন্য একটা ক্রিকেট ব্যাট ও শাদা-কালো চেক শার্ট কিনে এনেছিলেন মুনির। শার্টটা পছন্দ হয়নি জামালের। স্ত্রীর কাছে এটা শুনে ছেলেকে ডেকে জানতে চাইলেন, ‘শার্টটা তোমার পছন্দ হয়েছে?’ জামাল মাথা উপর-নিচ করে হ্যাঁ-সূচক মাথা দোলায়। পরে মুনির লাল ঝকমকে রঙের একটা শার্ট কিনে এনেছিলেন। সেই শার্ট পেয়ে জামাল খুশি হয়েছিল। ছোট্ট করে ‘থ্যাংকস’ জানিয়েছিল বাবাকে।
আনমনেই হাসলেন মুনির। দরজায় টোকা মেরে ভেতরে ঢুকলেন এক সহকারী। ‘স্যার, রোগী পাঠাব?’
হাতের ইশারায় না করে দেন তিনি। ‘এখন না, একটু পরে।’
কিন্তু, জেফরিনের প্রতি একটা ব্যাপারে প্রচ্ছন্ন রাগ এখনও পুষে রাখেন তিনি, সম্ভবত এটাই সবচেয়ে কার্যকর কারণ হতে পারত তাদের মধ্যে একটা তুমুল ঝগড়ার। কিন্তু মুনির নিজেকে সামলে রেখেছেন। জেফরিনকে কিছু জানতে দেননি, পাছে সে মনে করে মুনির ছেলেকে নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছে অথবা আলগা স্নেহ দেখাচ্ছে এই ভয়ে। সেদিন তাকে না জানিয়ে কেন জামালকে শহরে একলা যাওয়ার অনুমতি দিলেন তার স্ত্রী, প্রাথমিক পুত্রশোক কেটে যাওয়ার পর এই চিন্তাটাই তার ভেতরে আক্রোশ বাড়িয়েছিল। ধীরে ধীরে সে আক্রোশ পরিণত হয় নীরব গোস্বায়। দূরত্বও বাড়তে থাকে তাদের মধ্যে, সেই গোস্বাটাকে ভালো করে বুঝতে না পেরে বাড়তে দিয়ে।
ভাবনার এই পর্যায়ে হঠাৎ মুনিরের মনে হলো জেফরিন ছাড়া তার আত্নীয় বলতে তেমন কেউ নেই। যেহেতু কানাডাপ্রবাসী বোন সেখানেই থিতু হয়েছে, সে আসে কালেভাদ্রে, দায়সারাভাবে, যেন সম্পর্ক রক্ষা করতে হয় এমন এক ঠেকায়। মা’য়ের মৃত্যুর পর এলেও জামালের মৃত্যুতে আসার তাগাদা অনুভব করেনি। পারতপক্ষে সেজন্য তাকে দোষারোপও করেন না তিনি। উচ্ছন্নে যাওয়া বোনটিকে কোনওদিন খুঁজে পাবেন- সে আশাও ছেড়ে দিয়েছেন। এসব ভেবে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আরামদায়ক চেয়ারে বসেও অসহায় বোধ করতে লাগলেন মুনির। তখনি, ঝড়ো হাওয়ার মতো তার ভাবনা মোড় নিলো, জেফরিনের প্রতি তার তীব্র মায়ার স্রোত উথলে পড়ল। তিনি ভাবলেন, ভবিষ্যতের দিকে চোখ রেখে স্বাভাবিক হতে চাওয়া তার স্ত্রীকে তিনিই বার বার পেছনে ফেরাতে বাধ্য করছেন। জটিলতার জন্য দায়ী মূলত তিনিই।
সহকারিকে ডেকে রোগী পাঠাতে বললেন। দুপুর হতে হতেই রোগী দেখার ইতি টানলেন। বিকেলটা তিনি স্ত্রীর সাথে কাটাবেন। সকালের ব্যবহারে সে হয়ত কষ্টই পেয়েছে, সম্ভবত অনেকখানি। যতদিন জেফরিনকে সুখী দেখাবে তার অসুখী হওয়ার কারণ নেই। যদি এমন ক্ষণ আসে যে মুনিরকে তার দুর্বলতার কথা বলতে হচ্ছে তিনি তখন আর গোপন রাখবেন না। এবং তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের লাটাইটাও দিয়ে দেবেন জেফরিনের হাতে। মোটের উপর, একলা নিঃসঙ্গ কুমার জীবনই তো তিনি আগে প্রত্যাশা করেছিলেন। তাই তার স্ত্রীর থেকে যাওয়াটাও উপহারই বটে। ভাবনার এমন পরিণতি যেন সুর সুর করে উচ্ছ্বল বায়ু বইয়ে দিলো মুনিরের অন্তরে।
অ্যাপার্টমেন্টে এসে দেখলেন তালা ঝোলানো। মোবাইলে জেফরিনকে কল করতে গিয়ে দেখেন অনেকক্ষণ আগে আসা তার টেক্সট- ‘বোনের বাড়ি যাচ্ছি কয়দিনের জন্য। কিছু মনে করো না। ফিরে আসব। চাবি কার্পেটের তলে।’
স্ত্রীর বোনের বাড়ির ঠিকানা মুনির জানেন না। কোনোদিন যাওয়ার প্রয়োজনও পড়েনি। জেফরিনকে কল দেওয়ার আগ্রহ নিমেষে উবে গেল মুনিরের।
চার
জেফরিনের যাওয়াটাকে খুব স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টাটা এক পর্যায়ে মুনিরের মানসিক যুদ্ধে রূপ নিলো। তিনি ভয় পেতে শুরু করলেন, ক্রমশ সন্দিহান হয়ে উঠলেন তার স্ত্রীর প্রত্যাবর্তন নিয়ে। সে ফের ফিরবে তো? এমন নীরবে সম্পর্কচ্ছেদ করবে জেফরিন? হ্যাঁ ও না- দেহরূপ নিয়ে প্রোথিত হয়ে গেল তার মস্তিষ্কে, দ্বন্দ্বেরা শেকড় ছড়িয়ে দিশেহারা করতে লাগল তাকে। তবে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চেম্বারে যাওয়া ছাড়লেন না।
দিন কয়েক যেতেই তার দুশ্চিন্তা লঘু হয়ে এলো। জেফরিনকে বারকয়েক ফোনে চেষ্টা করেও না পেয়ে তিনি অনেকটাই বিভ্রান্তিমুক্ত হলেন। বুঝতে পারলেন তার জীবনের বাঁকবদলের সংবাদ। স্ত্রীকে নিয়ে ভাবনা বাদ দিয়ে রোগী, চেম্বার, বইপড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ফ্রিজে অন্তত সপ্তাহখানেক চলার মতো বাজার থাকলেও রান্না করার ঝামেলায় গেলেন না। বাইরে থেকে খাবার কিনে আনেন। একদিন রোগী দেখে সন্ধ্যায় ফেরার পথে খাবার নিয়ে এলেন রাতের জন্য। একটা কোয়ার্টার চিকেন গ্রিল, কোক আর ফ্রেঞ্চফ্রাই। বসার ঘরে সোফায় বসে টিভি চালু করলেন। একটা নিউজ চ্যানেলে চোখ আটকে গেল তার। এক বাবা কড়াইয়ে সিমেন্ট-বালি-খোয়ার মশলা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় খানাখন্দ ভরাট করছেন হাত দিয়ে, এমন একটা ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন। ছয় মাস আগে তার ছেলে মারা যায় তারই মোটরবাইকে করে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময়, রাস্তার এক গর্তে পড়ে বাইকটা উলটে যায়- সামলাতে পারেননি বাবা। নিজে বেঁচে গেলেও সন্তান বাঁচেনি। তখন থেকেই লোকের ভাষ্যে মাথায় গণ্ডগোল, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সিমেন্ট বালি দিয়ে গর্ত ভরাট করে বেড়ান আর কারণ হিসেবে বলতে থাকেন গর্তে পড়ে আর কোনো ছেলেকে মরতে দিতে চান না তিনি। টিভিতে চোখ রেখে অল্প অল্প করে খাচ্ছিলেন মুনির। টিভির ছবি ঝাপসা লাগল তার চোখে। খাবার ফেলে রেখে ধীরপায়ে শোবার ঘরে গিয়ে ওয়ারড্রোব খুললেন। এক কোণে পলিথিনের ব্যাগে মোড়ানো শাদাকালো সেই চেক শার্ট, যেটা তিনি উপহার দিয়েছিলেন তার ছেলেকে, শার্টটা অপছন্দ করেছিল সে। সেদিনের দৃশ্য চোখে ভাসতে শুরু করল তার। সে-ই শার্টে এখন তিনটা রঙ, শাদা কালো আর লাল। মুনিরের চোখ দিয়ে টুপ করে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুজল, যেভাবে ঘাসের দেহ থেকে ঝরে পড়ে শিশির। মন ঘোরাতে তিনি জোর করে মনে করতে চান বাবার কথা, মায়ের মুখ, বোনের মুখ, উচ্ছন্নে যাওয়া বোনটা? এই বোনটাকেই দেখতে চাওয়ার জমানো বাসনা একজোট হয়ে বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে মুনিরের। কিন্তু তার চেহারা আর মনে পড়ে না। চেহারা মনে পড়ল জেফরিনের, তাকে পরিত্যাগ করে চলে যাওয়া স্ত্রীকে। জানালার কাছে এলেন মুনির, অন্ধকারে জারুলের ডাল থেকে পাখির ডাক শোনা গেল হঠাৎ- টুই…
একসময় বিছানায় আধোশোয়া হয়ে বই হাতে তুলে নিলেন। হঠাৎ ফোন বেজে উঠতেই চমকে গেলেন। জেফরিনের ফোন, এতদিন পর! কতদিন হলো আসলে? মনে করতে গিয়েও পারলেন না মুনির, সম্ভবত মনে রাখার চেষ্টাও করেননি। সে নিশ্চয় ডিভোর্সের বিষয়টা নিয়ে চূড়ান্ত আলাপের জন্যই ফোন দিয়েছে, মেজাজ খিঁচড়ে গেল তার। অভিমান বা বিরক্তিতে ফোনের স্ক্রিন থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। পাখিটা ডাকছে তখনও। ফোন কেটে গেল, কিন্তু অবচেতন মনে দ্বিতীয়বার তিনি স্ত্রীর ফোন আশা করছিলেন হয়ত; কিছুক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন সেটা হলো না, অস্থির হয়ে নিজেই কলব্যাক করলেন। ফোন ধরলেন জেফরিন। বললেন,
‘কেমন আছ?’
‘ভালো।’
নৈমিষকাল নিরবতার ঢোল। ভাঙলেন জেফরিন।
‘কালকে আসছি। শাহবাগে জাদুঘরের সামনে থাকব। এসে নিয়ে যাবে আমাকে।’
‘কখন?’
‘সকাল এগারোটায়। গাড়ি নিয়ে এসো না। শুধু তুমি এসো। একলা।’
‘ঠিক আছে।’
‘ওকে। এখন ঘুমাও।’
মন্ত্রমুগ্ধের মতো বইটা বালিশের পাশে রেখে বাতি নিভিয়ে দিলেন মুনির। গায়ে কম্বল জড়িয়ে চোখ মুদলেন। হাজারো চিন্তা-দুশ্চিন্তা-ভালোলাগা এসে মস্তিষ্কের দরজায় টোকা মারতে লাগল, তিনি দরজা খুলতে চাইলেন না, কিন্তু ওরা দল বেঁধে ভূতের মতো এসে তাকে গ্রাস করতে লাগল, উদ্দাম নৃত্যে সারারাত জাগিয়ে রাখল।
ঘিয়া রঙের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছেন জেফরিন। এগারোটা বাজেনি এখনও। একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে চা অর্ডার করলেন।
মুনির অনেক আগে থেকেই, সম্ভবত নয়টা থেকে শাহবাগে ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছেন। দশটা পার হতেই জাদুঘরের সামনের রাস্তার বিপরীতে বসা ফুলের দোকানগুলোর একটাতে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পরেই দেখতে পেলেন একটা নীলরঙা লেক্সাস নামিয়ে দিয়ে গেল জেফরিনকে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে তার স্ত্রী গিয়ে বসলেন চায়ের দোকানে। তখনই মুনির যেতে পারতেন তার কাছে, কিন্তু গেলেন না। ঘড়ির কাঁটা এগারো ছুঁই ছুঁই করতেই একগুচ্ছ গোলাপ কিনে জেফরিনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। জেফরিন হেসে হাত বাড়িয়ে গোলাপ নিলেন।
‘শুকিয়ে গেছ অনেক। খাওয়া দাওয়া বোধহয় করো নাই ঠিক মতো, তাই না?’
ভেতর ভেতর ছটফট করতে থাকেন মুনির। স্ত্রীর- যে হয়ত কিছুক্ষণ বা কিছুদিন পর আর তার স্ত্রী থাকবে না, তার এমন আলগা ন্যাকামি তার অসহ্য লাগা উচিত। কিন্তু হুট করে কোথা থেকে আবাবিল পাখির ঝাঁকের মতোন ছোট ছোট আলগা অভিমান এসে দলা বেঁধে ভর করল তার বুকে। সেটাকে পাত্তা না দিতে চেয়ে অথবা আসলে পাত্তা দিয়েই তিনি মুখ ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। জেফরিন সেটা দেখেও না দেখার ভান করলেন। তারপর মুনিরের সম্মতির তোয়াক্কা না করে গলা উঁচিয়ে দোকানিকে দুই কাপ চা করতে বললেন।
‘কার গাড়িতে করে এলো জেফরিন?’ এই প্রশ্নটা নীল মাছি হয়ে বন বন করে ঘুরতে লাগল মুনিরের মাথার ভেতর। সামলে নিলেন, তাড়িয়ে দিলেন মাছিটাকে। জেফরিন নিজে থেকে না বললে কী দরকার যেচে অধিকার ফলানোর? চাইলেন না তিনি। ইতিমধ্যে ভেতর ভেতর তুমুল যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছেন নিজেকে সংযত রাখার। তার স্ত্রীকে তিনি চেনেন। মিষ্টি কথার মতো অবলীলায় সে একসময় ডিভোর্সের প্রসঙ্গটা তুলবে, যেন প্রসঙ্গটা খুব স্বাভাবিক। তারপর সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে চলে যাবে নিজের মতোন। মুনির আহমেদ জলে ভেসে যাক কী আস্তাকুঁড়ে পড়ে থাক- এই খবর তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ঠেকবে না কোনোদিন!
‘তোমার জন্য দারুণ এক উপহার এনেছি আমি।’ জেফরিন তাকিয়ে হাসছেন তার দিকেই। বিভ্রান্ত লাগল মুনিরের।
‘কী?’
‘সেটা এখুনি পাবে না। কিন্তু উপহারটা কী সেটা জানাতে পারি, যদি শুনতে চাও।’ জেফরিনের এমন নাটকীয় দুষ্টুমি ও রহস্যময় চোখের ইশারা মুনিরকে কৌতূহলী করে তোলে। বললেন, ‘বলো, শুনি।’
‘বলব। কিন্তু তার আগে তোমার তরফ থেকে আজকের দিনটা আমাকে উপহার দিতে হবে। আজ সারাদিন তুমি আমার সাথে ঘুরবে। বাসায় গিয়ে বলব। রাজি?’
‘ঠিক আছে।’ স্ত্রীর এই খেয়ালিপনার জট মুনির ভাঙতে চাইলেন না।
‘তাহলে চলো, শিশুপার্কটা দিয়েই শুরু করি।’
‘শিশুপার্ক বন্ধ এখন। বিকেলে খুলবে।’
‘তাহলে রমনা পার্ক?’ জেফরিন সহাস্যে উঠে দাঁড়িয়েছেন। ‘চা-এর বিল মিটিয়ে আসো।’
মুনির হঠাৎ বুঝতে পারলেন তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে যা ঘটে গেছে তা লঘু করতেই সম্ভবত জেফরিনের এই বালখিল্যতা। এটা ভেবে খানিকটা বিহ্বল হয়ে গেলেন তিনি। জেফ কী তবে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে চায়? স্ত্রীকে নিয়ে পার্কের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলেন মুনির। অনেকক্ষণ দুইজনের নীরবতা চারপাশের শাব্দিক আয়োজনকে অনবরত লাই দিয়ে গেল। মুনিরের ভেতরটা আকুলিবিকুলি করছিল কিছু একটা বলার জন্য, কিন্তু বাক্যগুলো গোছাতে না পেরে মুখাপেক্ষী হয়ে রইলেন স্ত্রীর কাছে। কিছু একটা বলুক সে। অনন্তকাল ধরে তারা হাঁটছেন যেন! একটা কংক্রিটের বেঞ্চের কাছে এসে অবশেষে জেফরিন থামলেন, দু’জনে ক্ষণকাল চোখাচোখি করে সেখানে বসলেন। নৈঃশব্দ্যের ডঙ্কা। হঠাৎ কুঁকড়ে গেলেন জেফরিন। উচ্ছলতা হাওয়ায় মিলিয়ে মুনিরের চোখে চোখ রেখে তার হাত ধরে প্রশ্ন করলেন থেমে থেমে, ‘আচ্ছা, তুমি কী রাগ করো নাই একটুও আমার উপর?’ এই প্রশ্নে মেশানো ছিল উদ্বেগ আর ভয়। চোখ আটকে রইলো চোখে। কীসের ভয় জেফরিনের? অভিমান-পাহাড় ধসে পড়ে অশ্রু হলো মুনিরের চোখে। নিজেকে সামলালেন না তিনি। স্ত্রীর হাত ধরে আধো আধো স্বরে বলতে থাকলেন, ‘ওই শার্টটা আমি আর ঘরে রাখব না। তোমার গায়ে কোনোদিন হাত তুলব না। সেদিনের জন্য মাফ করে দাও। ঘরে চলো প্লিজ।’
কোত্থেকে কী জানি হলো! খুশিরা রঙিন প্রজাপতি হয়ে ডানা ঝাপটাতে লাগল জেফরিনের চারপাশে। তাদের ডানার রঙ লেগে রইলো তার গালে-গলায়।
এক অমায়িক বিহ্বলতা নিয়ে তারা তখনও তাকিয়ে থাকলেন পরস্পর পরস্পরের দিকে।

 

পাঁচ
আমাদের ঘরের বেড়াল ঘরে থেকে যায়। নিজেকে সংযত রাখার সমস্ত চেষ্টারা মাঝে মাঝে ভরাডুবি খায় একই কারণে, যে কারণে সেই সংযত রাখতে চাইবার আয়োজন। নিয়ম যেভাবে নিয়ম ভেঙে দেয়। মুনির স্ত্রীর হাতে চুমু খেলেন প্রেমবশে। লেক ধরে তারা হাঁটলেন অনেকক্ষণ। পেছনে পড়ে গেল জামাল ও বাসি হয়ে যাওয়া স্মৃতিরা, তাদের আলগা হয়ে যাওয়ার উপলক্ষটুকু। জেফরিনের ভেতর থেকে চলে গেলেন তার বিগত স্বামী। তারা উভয়ে নতুন শুরু ভালবাসলেন, নিজেদের ভালবাসলেন।
তাদের ঘরে ফিরতে ফিরতে নেমে এলো সন্ধ্যা নামার পূর্বক্ষণ। আলো জ্বালাবার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। জেফরিন বাথরুমে গিয়ে দেখলেন পানিও নেই। কোনোমতে বালতির জমানো পানি দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে কাপড় বদলে ঢোলা ম্যাক্সি পড়লেন তিনি। বসার ঘরের ফ্রিজ খুলে বের করে আনলেন সফট ড্রিংকসের দুইটা বোতল। একটা নিজের হাতে রেখে অন্যটা বাড়িয়ে ধরলেন মুনিরের দিকে। কিন্তু মুনিরের কোনও খেয়াল নেই, নিবিষ্টমনে কী যেন ভাবছেন তিনি সোফায় বসে। জেফরিন ভাবলেন তিনি বুঝতে পেরেছেন মুনিরের এই নীরবতা। ঘরে ফেরার আগেই বাসে বসে তিনি স্বামীকে বলেছিলেন তার উপহারের কথা- না, মুনির জোর করেননি, আসলে জেফরিনই আর না বলে থাকতে পারেননি। ভেবেছিলেন সারাদিনের এই খুশি আরও বেড়ে যাবে এটা বলার পর। কিন্তু শোনার পর মুনির অবাক চোখে তাকিয়েছিলেন স্ত্রীর দিকে, জেফরিন লজ্জা পেয়ে তাকিয়ে ছিলেন রাস্তার আইল্যান্ডে। ফলত মুনিরের বিস্ময়ের প্রকৃত অর্থ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তার কাছে।
বোতল রেখে স্বামীর কাছঘেঁষে বসলেন তিনি। চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন, ‘আমি জানি তুমি কী ভাবছ! তোমার কিন্তু খুশি হওয়া উচিত। তুমি তো সন্তানই চেয়েছিলে, আল্লাহ মুখ তুলে তাকিয়েছে। জামাল নেই, কিন্তু আরেক সন্তান তো আসছে। এই সন্তান একান্ত তোমার ও আমার।’
হাসলেন মুনির। এই হাসির মর্মভেদ করতে পারলেন না জেফরিন। দুইজনে ড্রিংকস শেষ করলেন। মুনির স্বভাবতই শান্ত। স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গেলেন শোবার ঘরে। জেফরিনকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে চুমু খেলেন তার কপালে। মরতে থাকা বিকালের রোদ ছড়িয়ে আছে ঘর জুড়ে। ওয়ারড্রোবের চাবি ঘুরিয়ে বের করে আনলেন পলিথিনে মোড়ানো শার্ট। জেফরিন উঠতে চাইতেই তাকে নিবৃত্ত করলেন, ‘তুমি রেস্ট নাও। আমি আসছি একটু।’
ঢাকায় দূষিত শিরার মতো ছড়িয়ে থাকা রাস্তায় মানুষ ও বাহনে তফাৎ নেই একঅর্থে। দুই-ই চলেছে নিজেদের মতোন। শুকিয়ে যাওয়া রক্তসমেত শাদাকালো চেক শার্ট পরা মুনির আহমেদকেও কেউ লক্ষ করল না অথবা মুনির আহমেদ অন্য কাউকে। তার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে বাস ও মানুষ। তিনি হাঁটছেন। সন্ধ্যা নেমে গেলে তার হুঁশ হলো, গন্তব্যে ফেরার কথা মনে পড়ে গেল। তার কাছ দিয়ে যেতেছিল বাস, ধীরলয়ে। কিন্তু তার তাড়া আছে পৌঁছুবার। আরও মানুষ বাসের দিকে এগোনোর আগেই তিনি ধরতে চাইলেন বাসের দরজার হ্যান্ডেল, কিন্তু পারলেন না কেনো জানি- হাতটা পিছলে গেল। সাথে তিনিও। পৃথিবীও।
এবার মানুষেরা ফিরে তাকাল। জটলা বেঁধে অনিয়মিত ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকতে চাইলো তারা। এদের সবার দৃষ্টি মুনিরের দিকে, অথচ মুনির তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। তাদের কেউই মুনির আহমেদকে চেনে না।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close