Home কবিতা হিজল জোবায়ের >> কবিতাগুচ্ছ

হিজল জোবায়ের >> কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ May 12, 2018

হিজল জোবায়ের >> কবিতাগুচ্ছ
0
0

হিজল জোবায়ের >> কবিতাগুচ্ছ

 

নদীজল আয়নামহল

ধুলা পবনের দেশে নদী-
য-ফলার মতাে আঁকাবাঁকা,
তার দিকে কাত হয়ে থাকা
পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গ্রাম

গ্রামের ওপরে ছায়া ফেলে-
মেঘের শহর উড়ে যায়,
নদীজলে কুসুমের মতা
মেঘ-ভাঙা রােদ গলে পড়ে;

ছায়ার বেষ্টনীতে ঘেরা
সে নদীই আয়নামহল;
জলের উপরিতলে ছায়া,
কিছুটা গভীরে আবছায়া;
তারও নিচে পেতে রাখা আছে।
-বিস্মরণের যত ফাঁদ।

ধুলা পবনের দেশ থেকে-
প্রতিবিম্বিত হয়ে যা-
ভেসে ওঠে- নদীজলে, তাই
প্রকারান্তরে আদিতম
ধুলা ও পবন বলে খ্যাত।

ধুলা পবনের দেশ ছায়া,
বস্তুত উপাদানহীন;
মনে হয় চোখে দেখা যায়,
আসলে তা যাচ্ছে না দেখা,
খালি চোখে যায় না তা দেখা;

নদী যদি- আয়নামহল

আয়নামহল- আয়নাই,
আয়নার পিছনে সে দেশ
-ধুলা ও পবন যার নাম

পিত্তপাথুরি রােগে ভােগা
জ্যামিতিপাগল মানুষের-
প্রকৃত বসতি সেদিকে।

জ্যামিতির ধারণা থেকেই
সবকিছু পেয়েছে আকার,
উপাদানহীন আকারের
-জ্যামিতিই জগতের মূল

এ বাক্য সতত গােপন
এ বাক্য সতত প্রকাশ

সােনার গিলটি করা বাটি
রুপার গিলটি করা থালা।
সূর্য-চন্দ্র পাশাপাশি-
উঠে এসে ছেয়েছে আকাশ

কাঁটাগাছে ফুলগুলি যেন
অভিবাদনের হাসি হয়ে
থােকায় থােকায় ফুটে আছে;

ফুল বিকশিত হয় নাকি-
চুপচাপ তার রূপ ধরে
সময় নিজেই বিকশিত!

খালি চোখে যায় না তা দেখা।

 

সমর

ধানের মঞ্জরি, আর ঠাণ্ডা বাতাসভর্তি এক ঋতুতে-
আমরা শুরু করেছিলাম,
আমরা আমাদের সবচেয়ে বলবান পশুর রক্ত
উৎসর্গ করেছি-
পবিত্র পাথরের উদ্দেশ্যে।

তুমি এলেই তবু এতটা জলােচ্ছ্বাস,
তােমাকে অনুসরণ করেই আসে ঘূর্ণি
-কালাে কৌপীন ফুলে এলােমেলাে বাতাস!

বাগানে প্লবগ, এঁটো কলা; প্লেগের প্রাদুর্ভাব

কুমারপাড়ার উপরে জ্বলছে পােড়ানাে মাটির চাঁদ

ক্ষেপণাস্ত্রের মতাে-
ধানক্ষেত চিরে ছুটে গ্যাছে নীলগাই,
তাকে তাে আমরা হত্যা করিনি।

অবধ্য সে।

আমাদের অবাধ্য হাত,
সমরসজ্জার শরীর- ফিরিয়ে নিয়েছি কতবার

নীরবতায় শেষে করেছি আমরা সীমানা নির্ধারণ।

দ্বিধা

প্রাচীন কোনাে পুঁথির পাতা থেকে
–খসে পড়া টোটেম জনপদে
কুঠার নিষেধ, শস্ত্র নিষেধ ছিল
হাঁটতে গেলেই- রূপক পদে পদে

বস্তু যখন- রূপক হয়ে ওঠে
ভেঙে পড়ে পরিসীমার বাধা,
বৃত্ত থেকে কেন্দ্র অতি দূরে,
প্রবেশমুখে পাতা শুধু পাতা

মুখােমুখি দুইখানা আয়নাতে-
বিম্বিত হয়- অসীম সীমারেখা;
বিম্ব-প্রতিবিম্ব পরম্পরায়।
-সীমার ভেতর অসীম ধরে রাখা

দুধের বদল রক্তমাখা মুখ,
ঘুমের ভেতর ডুকরে ওঠে শিশু,
অনেক মানুষ কোথায় চলে গেছে-
একটা ভরত পাখির পিছুপিছু

মর্ত্যে ফোটা- অমর্ত্য ফুল খুঁজে
কোথায় গেছে গন্ধবণিকেরা,
নাম-নিশানা কেউ জানে না আজও,
সমস্ত পথ অপব্যয়ে ঘেরা

বনস্পতি গাছের ডালে ডালে-
মধুর বদল- বিষ জমা মৌচাকে,
কারণ- রূপক; মাতৃমাছের পেটে
ডিমের বদল কাকর জমে থাকে

মধ্যদুপুর- উপচে পড়ে রােদ
দুপুর তাে নয়, বিকাল হয়ে আসে;
এলিয়ে পড়া মিনার ফেলে ছায়া,
-বিকালও না, সন্ধ্যা চতুর্পাশে

ঘুমের ভেতর ডুকরে ওঠে শিশু,
দুধের বদল রক্ত গিলে নিল;
শিমুলগাছে উড়ছিল লালসালু,
কুঠার ফেরে, শস্ত্র ফিরে এল

টোটেম ভেঙে- আবার টোটেম গড়া,
অস্তরাগে জ্বলতে থাকে চিতা;
তুমুল দাবানলের দিকে হাঁটি,

-আগুন পানির মাঝখানে বয় দ্বিধা।

পােড়া জমিন

উলঙ্গ এক শ্বেতাঙ্গ এক
বারবারিয়ান গাইতেছে গান
-রাস্তাফারি রাস্তাফারি

স্ট্রবেরি ফল স্ট্রবেরি ফল
আয় জিহােভার জিভের আগায়,
অর্কিডের এক বন জেগেছে
-ইথিওপিয়ায় ইথিওপিয়ায়।

উলঙ্গ এক শ্বেতাঙ্গিনী
কৃষ্ণে মাতেন বনমালিনী
-রাস্তাফারি রাস্তাফারি।

গমের দানা, ধুম তা না না
সাঁইজি, আমার মন মানে না
পােড়া জমিন বাড়ির পাশে
ছােট্ট দেওরা হাল জুইড়াছে
-রাস্তাফারি রাস্তাফারি

ও নওফিয়া, বাতিল জমি,
কেসুর খুঁড়ে আনব আমি;
আমার ভেড়া দেইখা রাখাে,
-রাস্তাফারি রাস্তাফারি

শ্বেতাঙ্গিনী, ও বােষ্টমি
একতারাতে- কৃষ্ণ নমিঃ
–পায়ে করাে রাস্তা ফেরি;
গাইতেছ গান- গুরুর বাখান

-রাস্তাফারি রাস্তাফারি

মেঘদূতম

খােকা ঘুমাল, পাড়া জুড়াল
বর্গি এলাে দেশে

পূর্বমেঘ

বাড়ির পাশে-
বনবিলাইয়ের ঝােপ,
উঠান-জোড়া
-কবুতরের খােপ

রাতদুপুরেও ভয়;
না-ঘুমে না-ঘুমে আমার
–অনিদ্রা রােগ হয়

পাশের মানুষ ঘুমায় সুখে,
আমাবাইস্যা রাত;
কবুতরের নরম বুকে-
বনবিলাইয়ের দাঁত

বাদলা ঝরে, বাওছিটা দেয়
ব্যাঙের ঘেঙর-ঘেঙ;
পাশের মানুষ নাক ডাকে, তার-
ঘুম ভাঙে না ক্যান

কবুতরের হ্যাঁচড়প্যাঁচড়,
গলায় পড়ে নখের আঁচড়

পানিভরা মাটির ঘড়া,
জিওল মাছের ঘাই;
পাশের মানুষ ঘুমায় সুখে,
-অনিদ্রা রােগ নাই।

উত্তরমেঘ

বাদলা বাতাস বওয়া, এ ভর-
সন্ধ্যাবেলার মুখে,
-নদীর ধারে গুরুগুরু
ভিনদেশী মেঘ ডাকে
অন্ধকারে- ঝিঝি পােকার-
কণ্ঠ-চেরা গান,
অন্ধকারে নদীর ধারে
চোরাস্রোতের টান

এমন শ্রাবণ-সন্ধ্যাবেলা-
ঘােমটাতে মুখ ঢেকে,
বাড়ির বাহির হয়েছিলে
কোন-বা মেঘের ডাকে

কোন সে গাছের তলে,
নলখাগড়ার বনের আড়ায়-
বাসনা-ধানের সুবাস ভরা-
শরীর ধুয়ে এলে;
কোন-বা মেঘের জলে

এ কোন ভীষণ জংলি ফুলের কাঁটা,
-ক্ষীরের মতন নরম বুকে-পিঠে
দাগ বসাল- আঁচড় কেটে কেটে

কোথায় গেল মাকড়ি কানের,
কোথায় সে নাকছাবি;
তেপান্তরের পাতকুয়াতে-
হারিয়ে এলে চাবি;
সােনা-রুপার চাবি রে বউ,
-আমার ঘরের চাবি

হাটবারি এই দিনে,
-সদাইপাতি আনাজ কেনা
কিসের প্রয়ােজনে!

বসন্তে সেই রাতে,
ফাগুন বাতাস বইতে থাকা
-আনন্দ-শয্যাতে,
তােমার গর্ভে উবু হয়ে,
আমি দিয়েছিলাম রুয়ে
-আকাশভরা তারা
আকাশ আমার, তারা আমার
-মেঘ করেছে সারা

ভরাকাটাল

বাড়ির পাশে যগডুমুরের বন,
আবডালে কীট করেছে দংশন;
-আমি বুঝতে পারিনি

বাড়ির পাশে যগডুমুরের বন
উধাও হয়ে গিয়েছে কখন;
-আমি বুঝতে পারিনি

অসুখ- অসুখ আচম্বিত,
শরীর পচছে ভিতরে;
আমার যগডুমুরের বন,
-এমন করলে কী করে

কাজলা নদীর কালাপানি,
বুকে গাঙের ধড়ফড়ানি,
-মরা ঘড়িয়াল,
সোঁতায়-পাকে ডােবে ভাসে;
বান ডেকেছে চতুর্পাশে;
–ভরাকাটালকাল

কোথায়- কাহার কাছে যাই,
আমার তিন কুলে কেউ নাই,
আমি করব কী এখন

বলাে, যগডুমুরের বন?

মাতৃগান

ও মা, মুখ ফেরাও;
সময়ের নদী ফুড়ে-
ডুবসাঁতার শেষে ঢেউ হয়ে আসি তাের ঘাটে

‘আমি’ আর ‘তুমি’র ব্যবধান
যেন অবলুপ্ত হয়;

মাগাে, রূপ নেহার,
উরুসন্ধি-জোড় খুলে দেখ,
-ঠিকই আজও তাের বীজেই আমি সম্ভূত,
জরায়ুর ভিতর আজও কম্পমান

আমি বনছাড়া তাের সেই পাখি,
যদি জানতে চাস, মেলে দুই ডানা
এত পথ ঘুরে, আমি ক্লান্ত কি?

বড় ক্লান্ত রে,
তাের বন ছেড়ে, শাখা গাছ ছেড়ে
-কভু আর কোথাও যেতে চাইব না

দেঁতাে, শিংঅলা দানব আর শ্বাপদ
বাসা, ডিম, পালক পায়ে থেঁতলে যায়,
আমি ছিন্নমূল শিশু বাচ্চা তাের
দুটি হাত বাড়াই;
মা গাে, কর কৃপা,
চামারের দলে ঠেলে দিস না মা,
বড় ক্লান্ত তাের শিশু বাচ্চাটা,

প্রজনন শেষের স্মৃতিটুকরা ফুল

আমি তাের

জবা

মরিয়ম

বকুল

আমি এক ত্রিভুজ,
মেলে দুই ডানা- আছি উদ্বাহু;
আছি এক বাহুর বিনে দুই বাহু
ওগো আম্মাজান,
বাকি এক-বাহু জোড়া দাও তোমার;
সম-তিন বাহু মিলে এক হলে-
তাতে তিনটা কোণ হবে একসমান

-ও মা, মুখ ফেরাও

বিটাধারী

কথা কও, শব্দে আইসাে
বিটাধারী- অয়ি অধ্বনীন,

জন্মেও নড়ে না যা- ডিম
কথা কও, শব্দে আইসাে

শনৈঃ শনৈঃ ঐ
বেগে বাড়ে নদী।

জন্মেও নড়ে না যা- ডিম
জল ছিল মাতা, আর-
তুমি ছিলে ধ্যানরত প্রলয়ের জলে সমাসীন

আমার শরীরে যদি- এতকাল থেকেছ শায়িত,
তােমার সমাধি আমি;
এসেছি সেখান থেকে- ছিলাম না যেখানে কখনাে,
অথচ সেখানে আজও আমাকেই পাবে বর্তমান

আলাের অনেক দাগ- তারও নিচে ঘন অন্ধকার,
আলাের ওপরে আলাে ক্রমাগত করে আরােহণ,
সমাহিত হলে ধ্যানী- ধ্যানরত শরীরে আমার

সবুজ তুঁতের গাছ, পােকা খায়- পাতার শরীর

ঘাস ওড়ে, পাতা ওড়ে,
মাটিতে যাচ্ছে ঢুকে ঘাসের শিকড়;
ঐরাবতের শুঁড়ে-
ভর করে যায় উড়ে,
-মনােবিকলন আ রে মনােবিকলন

গােধুমে গােধিকা চলে,
উঁকি মারে ঘড়িয়ালে,
গােচরীভূত;
আমারও তাে জিগমিষা-
কুয়াশায় ভাসা ভাসা,
—অবিকশিত
আর আমি- তােমাকে এবার বিদায় জানাতে চাই,
ঝরা পাতায় মােচড়াচ্ছে মৃত্যুকাতর খরিশের লেজ;
আমাদের মাঝখানে নদীর প্রস্থ মেলে ধরা,
মেছােগন্ধ, জলজ বাতাস,
ডিমভর্তি পেট নিয়ে লাফাচ্ছে-
শৈবালে ছাওয়া অন্ধ সবুজ মাছ

ডিম্বিনী মা, পােনাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে- ‘জল’ নামক অপর মায়ের কাছে

জল ছিল মাতা আ রে
তুমি ছিলে বিটাধারী

-অয়ি অধ্বনীন,

জন্মেও নড়িল না- ডিম

কথা কও, শব্দে আইসাে

 

উৎস : ধুলা পবনের দেশ / হিজর জোবায়ের / প্রচ্ছদ রাজীব দত্ত / প্রকাশক  মেঘ / ঢাকা ২০১৮ / গায়ের মূল্য ১৬০ টাকা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close