Home পঠন-পাঠন হেনরী স্বপন / অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতাপাঠ > পঠনপাঠন

হেনরী স্বপন / অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতাপাঠ > পঠনপাঠন

প্রকাশঃ February 21, 2017

হেনরী স্বপন / অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতাপাঠ > পঠনপাঠন
0
0

“…এই সংকলন থেকেই হয়তো উঠে আসবে বড় মাপের কবি।”

ইতিহাস- ঐতিহ্য, সময় কিংবা দশকীয় লেবেলে সাজানোই হচ্ছে সংকলন সৃষ্টির উদ্দেশ্য। বাংলা কবিতার আগ্রহী পাঠক, ইতিহাস সচেতন গবেষক এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির প্রয়োজনে খুব বেশি সমাদৃত হয়ে আছে এইসব সংকলন গ্রন্থের কদর।

তাই, পৃথিবীর সব ভাষার লেখকের ক্ষেত্রে এ-জাতীয় সংকলন গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন বিরল প্রতিভার অধিকারী কিছু কবি- লেখক এবং সংকলকবৃন্দ। কেননা, এই কাজের ঐতিহাসিক মূল্যও অনেক। যুগে যুগে, দেশে দেশে তেমনটিই ঘটে চলেছে। যেমনটি অহরহ ঘটছে আজকাল, স্বল্প আয়তনের দশকভিত্তিক সংকলন সম্পাদনার দুর্ণিবার আগ্রহ এবং এইসব গ্রন্থের শিরোনামে তেমনটিই ফুটে উঠছে। সেই দশকের যারা অন্তত উল্লেখযোগ্য ভাবুক এবং প্রধান কবি- লেখক তাদের ব্যক্তিত্ব ও বিভা, কাব্যের রীতি-রূপ কিংবা মর্মের গভীরতা আরও নতুনভাবে জানার-বোঝার জন্য, বিদগ্ধ সম্পাদক-কৃত কবিরাই এগুলো করছেন। যদিও আজ পর্যন্ত কারো সংকলনই ত্রুটিমুক্ত বিতর্কবিহীন হয়নি। রাজনৈতিক পক্ষপাত, বন্ধুকৃত্য এবং গোষ্ঠীপ্রীতির কারণে এইসব তর্ক-বিতর্ক ঘনীভূত হয়েছে।

তবুও, শেষ পর্যন্ত অরবিন্দ চক্রবর্তী সম্পাদিত তার ‘অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতা’ সংকলনের সম্পাদকীয় বয়ানে লিখেছেন, ‘অখণ্ড শব্দটি ব্যবহার করার পেছনে যুক্তি হচ্ছে, আমরা যারা বাংলা ভাষায় কথা বলি- এ অঞ্চলের মানুষের আচার-আচরণ, পরিবেশ-প্রকৃতি ও মানবিক বোধ-অনুভূতিগুলো প্রায় এক। ফলে, প্রকাশবৈচিত্র্যে কাব্যভাবনাও প্রায় অভিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই আমরা চেয়েছি, প্রবাসী বাঙালিসহ বিশ্বের যে-প্রান্তেই বাংলাভাষী রয়েছে, বাংলা ভাষার চর্চা হয়, তাদের থেকে দ্বিতীয় দশকের কবিদের কবিতা এক মলাটে আনতে। যেহেতু সারা পৃথিবীর বাংলাভাষীরা একটি অখণ্ড বলয়, তাদের কবিতা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে, সমকালীন/সমবয়সী কবিরা কী ধরনের লিখতে চাচ্ছে, আগামী দিনের বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতি; কোনো বিশেষ বাঁক নিচ্ছে কিনা- এসব জানাতে। একজন কবিতা লিখিয়ে/কবিতাকর্মী হিসেবে, ভেতরে একটা সুপ্ত বাসনা থাকেই, বাংলা কবিতা আরো বিস্তার লাভ করুক, ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বে।’

সংকলনটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও প্রবাসী বাংলাভাষী একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক কালখণ্ডের ২২১ জন কবির নির্বাচিত কবিতা।

এরপরেও বলতে দ্বিধা নেই, অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলনের সমস্ত কবিতা পাঠে একটি বৈশিষ্ট্য দারুণভাবে ফুটে উঠেছে, আর তা হচ্ছে, বাংলা কবিতা যে আজকাল বড়বেশি জীবনঘনিষ্ঠ নয়, এমন দুর্নাম এড়াতে সম্পাদক খুব সচেতন ছিলেন। তাই, তিনি অনেক বেশি আবেগ নির্ভর, মননধর্মী এবং উন্মুখর চিত্রকল্পপ্রবণ কবিতা বাছাইয়ে অনেকটাই সার্থকতার পরিচয় দিয়েছেন। এ-ক্ষেত্রে এই সংকলনের কিছু কবিতার উদাহরণ তুলনামূলকভাবে পড়ে দেখা যাক :

মানুষ এক দ্বিবীজপত্রী পাখি। যৌথ ভাসে তার নৃত্যকায় দোতারার দিন।

ঘোরজমা রোদের বিকেলে খসপড়ে রাত; জলকামী মুদ্রার ভাঁটফুল।

ওড়ে ডাক, নীলাভ অর্কিডে আমিও পান করি চিনিকল;

বিষম বন্ধুর বাহু।

নদী ও শেকড়ের খলবল থেকে আঙুল ভেঙে আনে সন্ধিবিলাস

আর পতিত প্যারাফিনে লিখে দেয় তৃষ্ণার শতনাম। গো শুনছো?

বেলুনে উড়ে যায় কৃষ্ণসাগর- নাকফুল পাঁপড়ির নকশিকাঁথা।

(অনন্যা মন্ডল / বিষম বিন্দু)

 

পূর্বজন্মে আমি ছিলাম আসমানী রফরফ। উড়ন্ত রোদে তাই অভ্যাস করি ডানাহীন শালিকজীবন। আমার মখমল পালকে কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে হাজার কিউসেক অভিমান। পায়ে বাঁধা লাখো মেগাবাইট ট্রাফিকজ্যাম। রাগ-শোক-কাম- এসবের ঊর্ধ্বে নই। ব্যক্তিগত সংসারে আমি এক জোছনাজমির বর্গাচাষী। মৃত চাঁদের আলোয় ভাত আর পোলাও এর পার্থক্য শিখি। আমার গলায় ঝুলছে আত্মহত্যার জরুরি নোটিশ। পরজন্মে বেদুইন হব, নয়তো এক দক্ষ বাজিকর।

অথচ হেমলকের পেয়ালায় স্বেচ্ছা চুমুক দিয়েই দেখি-

শত সহস্র মুখোশের ভীড়ে আমি এক অন্ধ জাতিস্মর!

(অপু মেহেদী / হেমলকপ্রিয় জাতিস্মর)

 

চোখ উপেক্ষা করে ছবি খরগোশ সাজতে পারে না। আনমনা হলে লাফিয়ে পালায়। এখান থেকে ঢের টের পাই। কতগুলো সৌরজগতের আনাগোনা, গোনার সুযোগ নাই। তাই বলে নিজে হারাচ্ছি? না, নিস্তার নাই।

পাড়ায় আকাশ না থাকলে টিনাকে পাওয়া যাবে না, নিশ্চিত। রনি তো সব আকাশ নিয়ে দুবাই থাকে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে রনির আত্মা বদলে নিয়ে চলি। রনি তা করে না, আত্মবদলে সে ওস্তাদ। লোকমুখে রেডিমেড সমাধানের পাশ ঘেঁষে গিয়েও মেলে না হলুদ পাখির ত্রিভুজঠোঁট।

চকচকে তাওয়ায় জ্ঞান ভাজা হচ্ছে। ডেকে ডেকে খাওয়ানো হচ্ছে -ফ্রি। না খেতে চাইলেই হাতকড়া।

দহনযোগ্য কবিতার মতো শাবকদেরকে তিনমাত্রা যোগ করে পালতে চাই- ফল নাই। হিজলের ছায়ার কোলেই শেষমেষ দিয়ে দিতে হবে। চিত্তের কপালে পট্টি লাগিয়ে চিন্তার জেগে থাকার প্রয়োজনীয়তা কী?

(আরিফ শামসুল / ব্লাকহোলে বেড়াই তো হারাই না)

এসো। এসো এইখানে। এইখানে তুমুল বিষাদ। এইখানে নীল আগুনের ফুলকি উড়ায় যে অনুরাগী, সে-ই ছিলো আজ্ঞাবহ তোমার যুবক। তার প্রার্থনা ও প্রতীকের আড়ালে, দেখ ঐ, নিদারুণ ভেসে যাচ্ছে রুপোর বুদ্বুদ। কিছুটা বেড়াল স্বভাব আর প্রতিবন্ধুর মগজের ব্লু-প্রিন্ট, এর বাইরে, আর কোন সত্য জেনেছিলে? পরিযায়ী পাখিরা এসেছে আজ। চলেও যাবে। তোমার কাজল চোখে তবু থেকে যাবে যুগপৎ ঘুণ ও ঘুমের কোলাজ। থেকে যাবে ছদ্মবেশ, রস ও রূপকে আড়াল।

তোমার সিথানে রাখা আছে স্বেচ্ছাতুর কাঠি, পৈথানে কাচের কলস আর প্রহরায় সুচতুর কাব্য-প্রতারক। ডালিমকুমার আজ নগরের প্রিয় পরিহাস!

(বিধান সাহা / রুহুচণ্ডালের বায়স্কোপ)

 

মাংস কাটার দোকানের কাছে বসে আছে

এক পরিযায়ী বেহালাবাদক

ছাল উঠছে, রক্ত ঝড়ছে টুপটাপ

বেহালায় জোৎস্না সুর, চোখ বন্ধ

পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে মাংস কাটার গান

ছাল উঠছে, রক্ত ঝড়ছে টুপটাপ

বসন্তের পশুরা সার সার গান শুনছে

ঝরে ঝরে পড়ছে লোম, পোকা

সোনালি চামড়ায় ভেসে যাচ্ছে মাংস

সোনালি ছাল জমছে আর জমছে

বেহালার সুরে এবার শুধু

ঘুমিয়ে পড়ার গান, ঝরা লোমের গান…

(চিরশ্রী দেবনাথ / মাংসাশী সুর)

 

মাঝবয়েসী স্বামী-স্ত্রীর সমুদ্রস্নানের মধ্যে

একটি সমঝোতা ঢেউহীন দাঁড়িয়ে থাকে

কোমরজলে না গেলে স্বামীটির স্নান তেমন জমে না

অথচ স্ত্রী হাঁটুজলের বেশি যাবেনই না

কোমরজল ও হাঁটুজলের মাঝামাঝি কোথাও একটা দাঁড়িয়ে তারা

একটি হনিমুন কাপলকে দেখতে থাকেন যারা তাদের পেরিয়ে যায়

এবং আরও, আরও গভীরের জলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে…

(আষিক / আবশার)

 

ক্ষমতা বাঁ দিক থেকে ডান দিকে সরে এলে

আমি বুদ্ধ! শান্তির আড়ালে Co2

ছিলাম মধ্যপর্বের পরবে এখন অন্তিম শিকারী

আমার কাব্যডালে সুখা মাছ গড়িয়ে পড়া রক্তিম

এসো তো প্রাণপ্রিয় দেখি শব্দের কি ঘাটতি!

এদিকে সেনা শিয়রে পিঠছুরি চলছে চলুক

আমরা তো বেশ আছি হাইলাইটস্ এ

এখন যদি প্রশ্ন করো নিহত বিবেক উঠবে জেগে!

(বিশ্বজিৎ / হাইলাইটস)

 

আবহাওয়া গড়িয়ে যাচ্ছে সংলাপের দিকে

সহজ আলোয় চোখ রাখাই যখন অনায়াস হয়ে উঠছে,

তুমি, বই আর জন্মান্তরের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় নির্বিকার

লিখে যাচ্ছ আলো-ছায়া অক্ষর…পরিধি বরাবর বিচ্যুতি, আমাদের

ভারসাম্যের দিকে ঝুঁকে আসছে, নিঝুম

চোখের পাতায় মানিয়ে নেওয়া

এই নিরিবিলি

বাতিল না হওয়া সোহাগ

(অনিন্দিতা ভৌমিক / সংলাপ)

এই সংকলনের তালিকা থেকে আরও অনেকের কবিতার উদ্ধৃতি দেয়া যেত। বলা যায়, অধিকাংশ কবির কবিতারও আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু তা-ও বলা হয়, এখনকার কবিতার জগৎ বড়োই নিষ্প্রভ। বড় মাপের কবি কোথায়! অবশ্য ধরে নেয়া যায় কবিতার ক্ষেত্রে এই যে নৈরাশ্যবাদিতা, এই যে শূন্যতা! এরই পূরণ ঘটবে হয়তো ২২১-জনের নির্বাচিত কবিতার মধ্যে থেকেই। হয়তো এদের ভেতর থেকেই কেউ একজন বা কয়েকজন বড় মাপের কবি হয়ে বেরিয়ে আসবেন, হয়তো এদের হাতেই থাকবে বাংলা কবিতার সেই হারানো ক্রিয়েটিভ গৌরবের আদর্শ।

এই সংকলনে অনায়াসেই যুক্ত হতে পারতেন, কিংবা যুক্ত রাখা উচিত ছিল আরও অনেককেই। যারা কেবল নানা কারণে বাদ পড়ে গেছেন। শুনেছি, এদের কেউ কেউ তাদের কবিতা মুদ্রণের অনুমতি থেকে বিরত ছিলেন নিজেদের অহংকারে। আবার, কেউ হয়তো বাদ পড়েছেন দল-গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের কারণে সিদ্ধান্তে না আসতে পারায়। কাউকে বাদ দেয়া হয়েছে মিথ্যাবাদী রাখালের গোয়ালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মৌলবাদে দীক্ষিত গো-আদর্শের কারণে। বলা যায় এর সবকিছুই নির্ধারিত হয়েছে এই সংকলনের নিজস্ব আইডোলজিতে।

তবুও হয়তো, অখণ্ড বাংলার দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলনটি কবি ও সম্পাদক অরবিন্দ চক্রবর্তীর বিশ্বাস, বৈদগ্ধ্য উদ্দেশ্যের নিরপেক্ষতায় যতটাই পবিত্র হোক না কেন? অদ্যাবধি এ-রকম কোনও সংকলনই আজ পর্যন্ত ত্রুটিমুক্ত, বিতর্কবিহীন হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে এক্ষেত্রেই বা ব্যতিক্রম ঘটবে কেন? এটাই মূলত একটা সংকলনের শক্তি, সীমাবদ্ধতা নয়।

এই সংকলনে দুটি মূল্যায়নধর্মী গদ্য আছে- লিখেছেন কবি ফেরদৌস মাহমুদ এবং জুবিন ঘোষ।

সংকলনটি প্রকাশ করেছে বেহুলাবাংলা। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী শতাব্দী জাহিদ। মূল্য > শোভন ৫০০ টাকা, সুলভ ৩৫০ টাকা।  পাওয়া যাচ্ছে অমর একুশের গ্রন্থমেলায়।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close