Home অনুবাদ হোয়াকিম মারিয়া মাচাদো দো আসিস > মধ্যযামিনীতে খ্রিস্টের নৈশভোজের উৎসব >> ব্রাজিলের ছোটগল্প >> সোনালী ঘোষাল অনূদিত

হোয়াকিম মারিয়া মাচাদো দো আসিস > মধ্যযামিনীতে খ্রিস্টের নৈশভোজের উৎসব >> ব্রাজিলের ছোটগল্প >> সোনালী ঘোষাল অনূদিত

প্রকাশঃ May 14, 2018

হোয়াকিম মারিয়া মাচাদো দো আসিস > মধ্যযামিনীতে খ্রিস্টের নৈশভোজের উৎসব >> ব্রাজিলের ছোটগল্প >> সোনালী ঘোষাল অনূদিত
0
0

হোয়াকিম মারিয়া মাচাদো দো আসিস > মধ্যযামিনীতে খ্রিস্টের নৈশভোজের উৎসব >> ব্রাজিলের ছোটগল্প >>> সোনালী ঘোষাল অনূদিত

[সম্পাদকীয় নোট : তীরন্দাজে শুরু হলো লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বা বাছাই করা গল্প। এই নির্বাচন আামদের নয়, ইংরেজিতে অনূদিত ছোটগল্পের সংকলনগুলিতে যেসব গল্পকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, সেখান থেকে বাছাই করে অনুবাদক গল্পগুলি অনুবাদ করেছেন। প্রথমে প্রকাশিত হলো ব্রাজিলের এই ছোটগল্পটি। লেখক হোয়াকিম মারিয়া দো আসিস (১৮৩৯-১৯০৮)। তিনি ব্রাজিলের একজন অগ্রণী কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও নাট্যকার। প্রখ্যাত মার্কিন সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম আসিসকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পশ্চিমী ‘ব্ল্যাক রাইটার’ বা লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এখানে বলা প্রয়োজন, ব্রাজিল হচ্ছে আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশ। প্রায় সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে, প্রতিটি রাষ্ট্রে এসপানোল ভাষা প্রচলিত থাকলেও ব্রাজিলের ভাষা পর্তুগীজ। ]

আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে আমার সঙ্গে এক সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলার যে কথােপকথন হয়েছিল তা আমি পুরােটা অনুধাবন করতে পারিনি, কেননা তখন তার বয়স ত্রিশ আর আমি সপ্তদশ বর্ষীয় এক বালক। তারিখটা ছিল চব্বিশে ডিসেম্বর। আমি আমার এক প্রতিবেশীকে নিয়ে গির্জায় অনুষ্ঠিত হবে এমন একটা উৎসব দেখতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তাই তাকে মধ্যরাতে জাগিয়ে তােলার দায়িত্ব আমার উপর বর্তেছিল।
যে দোতলা বাড়িটায় আমি থাকি সেটার মালিক নোটারি উকিল মেঞ্জেস। তার প্রথম স্ত্রী সম্পর্কে আমার বােন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কনসিকাওয়ের গর্ভাবস্থায় তার মা কয়েক মাস আগেই আমার আগমনকে আতিথ্য সহকারে গ্রহণ করেছিলেন। আমি ম্যাঙ্গারাটিবা থেকে রিওতে এসেছিলাম কলেজে পরীক্ষা দেবার প্রস্তুতি নিতে। পড়াশােনা নিয়ে নির্বিঘ্নেই থাকতাম। কারও সঙ্গে খুব কম সম্পর্ক স্থাপন করতাম। একটু-আধটু হাঁটা-চলা করতাম। খুবই ছােট পরিবার। সেখানে নােটারি, তার স্ত্রী, শাশুড়ি আর দুজন দাসী ছিল। সেকেলে ধরনের সংসার। রাত ঠিক দশটায় সকলকে শুতে পড়তে হতো। সাড়ে দশটার মধ্যে পুরাে বাড়িটা নিঝুম হয়ে যেত।
একবারের বেশি থিয়েটারে যাইনি শুনে মেঞ্জেস জানালেন তিনি থিয়েটার দেখতে যাচ্ছেন। আমি তার সঙ্গে যেতে চাইলাম। এই যেতে চাওয়াটা তার শাশুড়ি সমর্থন করলেন না। দাসীরা মুখ টিপে হাসতে শুরু করল। কোন উত্তর না দিয়ে মেঞ্জেস ধােপদুরস্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন, পরদিন ভােরে ফিরে এলেন। পরে জানতে পেরেছিলাম আসলে থিয়েটারটা উপলক্ষ মাত্র। তার একজন বিবাহিতা মহিলার সঙ্গে ভালােবাসার সম্পর্ক রয়েছে। মহিলাটি স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করে। মেঞ্জেস সপ্তাহে একদিন তার সঙ্গে কাটায়। কনসিকাও প্রথম প্রথম শােকবিহ্বল হয়ে থাকলেও পরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। অভ্যাসটা গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল, ব্যাপারটি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
নম্র, শান্তস্বভাবের কনসিকাকে লােকজন সন্ন্যাসিনী বলে অভিহিত করত, তিনি সেই উপাধি অর্জন করেছিলেন। তাই কোন অশান্তি, ঝগড়াঝাটি ও অভিযােগ ছাড়াই তিনি তার স্বামীর অবহেলা সহ্য করতেন। সত্যি কথা বলতে কী (হাসি ঠাট্টা বা অতিরিক্ত চোখের জল ফেলা কোনটাই নয়) মেজাজের সমতা রক্ষা করাই ছিল তার মানসিক ধাত। তার চারপাশে সবকিছুই ছিল কৌতুহলশূন্য এবং মূল্যহীন। তার মুখশ্রী ছিল মাঝারি ধরনের। না অনিন্দ্যসুন্দর না কুৎসিত। তিনি কারও সম্পর্কে কটু কথা বলতেন না। সবকিছুকে ক্ষমা করে দেওয়াই ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কেমন করে ঘৃণা করতে হয় তা ছিল তার অজানা; খুব সম্ভবত কীভাবে ভালবাসতে হয় তাও তিনি জানতেন না।
১৮৬১ অথবা ৬২-র চব্বিশে ডিসেম্বর নােটারি থিয়েটারে গিয়েছিল। আমার ম্যাঙ্গারাটিবায় ফিরে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমি বড় শহরে খ্রিস্টের নৈশভােজের উৎসবপর্ব উদ্‌যাপন চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করার জন্য খ্রিস্টমাস অবধি থাকা মনস্থ করেছিলাম। পরিবারের অন্য সদস্যরা সচরাচর যেমন ফেরে তেমনি ফিরে এসেছিল। সুসজ্জিত এবং মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আমি বৈঠকখানার সামনে বসেছিলাম। সেখান থেকে না হেঁটেই যে কেউ হলঘরে প্রবেশ করতে পারবে। দরজায় লাগাবার তিনটি চাবির একটা ছিল নােটারির কাছে, একটা আমার আর একটা বাড়িতেই রাখা থাকত।
কনসিকাওর মা জিজ্ঞাসা করলেন, “মি. নােগুয়েরা, তুমি এতক্ষণ কী করবে?”
“আমি পড়ব, ম্যাডাম ইগনাসিয়া”।
আমার কাছে, “দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের” পুরনাে অনুবাদের একটা কপি ছিল, যতদূর মনে পড়ছে “দ্য জার্নাল অফ কমার্সে” এটা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বাড়ির সমস্ত লােক যখন নিদ্রামগ্ন তখন আমি ঘরের কেন্দ্রস্থলে একটা টেবিলে বসে কেরােসিনের বাতিতে আরও একবার ডি. আর্টাগ্লানসের সুন্দর ছােট্ট ঘােড়ায় আরােহণ করে রােমাঞ্চকর অভিযানে বের হওয়ার গল্প পড়ছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি সম্পূর্ণ মগ্ন হয়ে গেলাম। প্রায় অলক্ষেই আমি ঘড়িতে এগারােটা বাজার শব্দ শুনলাম। এর কিছুক্ষণ পরে গৃহের ভেতর থেকে আসা একটা শব্দ আমাকে বই ছেড়ে উঠতে বাধ্য করল। সেটা ছিল বৈঠকখানা আর খাবার ঘরের লাগোয়া হলঘর থেকে উত্থিত একটা পদধ্বনির শব্দ। আচম্বিতে মুখ তুলে আমি দরজার সামনে কনসিকাওকে সশরীরে আসতে দেখলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার! তুমি যাওনি?” “না, যাওয়া হয়নি। এখনও মধ্যরাত হতে দেরী আছে মনে হয়।” “আশ্চর্য ধৈর্য!” শয়নকক্ষের চটি পায়ে কনসিকাও ঘরে প্রবেশ করলেন। তিনি কোমরের সঙ্গে হালকাভাবে বাঁধা একটা সাদা আটপৌরে পােশাক পরেছিলেন।।
আমার উপন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাঁর পাতলা গড়ন তাকে কাল্পনিক অপদেবতা বলে বিবেচনা করতে সাহায্য করল। বইপড়া স্থগিত রাখলাম। তিনি সােফার সামনে আমার মুখােমুখি একটা চেয়ারে বসলেন। তাঁকে কোনােভাবে উত্তেজিত করে জাগিয়ে তুলেছি কী-না এই প্রশ্নের উত্তরে তাড়াতাড়ি জানালেন,
“না-না, স্বভাবধর্ম অনুসারেই আমি জেগে উঠেছি।” তার মুখের দিকে তাকালাম।
তার কথায় সন্দিগ্ধ হলাম। সদ্য ঘুম থেকে জেগে ওঠা লােকেদের মতো লক্ষণ তার চোখ দুটোতে ছিল না। যাই হােক, মনে মনে এটাই ভাবলাম যে তিনি মিথ্যা কথার দোষে দুষ্ট। তাকে জাগিয়ে দিয়ে থাকতে পারি এই সম্ভাবনা এবং আমাকে অসুখী-না করার উদ্দেশ্যে তাঁর এই মিথ্যাভাষণ সেইসময় আমার মনে কাজ করছিল না। আমি আগেই বলেছি যে তিনি একজন সৎ এবং দয়ালু মহিলা।
বললাম, “আমার অনুমান আর বেশি সময় লাগবে না।”
“যখন তােমার বন্ধুরা ঘুমে অচেতন, তখন তােমার এভাবে জেগে অপেক্ষা করার ধৈর্য দেখে আমার অবাক লাগছে। আবার একা একা অপেক্ষা!
তােমার কী ভূতপ্রেতের ভয় নেই? আমায় দেখতে পেয়ে তুমি আকস্মিক বিস্ময়ে চমকে উঠলে বলে মনে হল।”
“পদধ্বনি শুনে আমি প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম। তারপরই আপনাকে আসতে দেখলাম।”
“কী পড়ছ? আমাকে বলবে না, মনে হয় নামটা আমার জানা; “দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স” পড়া হচ্ছে তাে?”
“হ্যা, ঠিকই ধরেছেন। ভারি আকর্ষক বই।” “তােমার উপন্যাস পড়তে ভাল লাগে?” “হ্যাঁ।” “তুমি কী কখনও “দ্য লিটল সুইট হার্ট” বইটা পড়েছ?” “মি. ম্যাসিডাের লেখা? ম্যাঙ্গারাটিবায় বইটা পেয়েছিলাম।”
“আমিও উপন্যাসের ভক্ত, কিন্তু সেগুলাে পড়ার মতো সময় পাই না। কোন কোন বই তুমি পড়েছ?”
কয়েকটা বইয়ের নাম স্মৃতি হাতড়ে বার করে বলতে থাকলাম। মাথাটাকে চেয়ারের পেছনে বিশ্রামের ভঙ্গীতে রেখে অর্ধনিমীলিত চক্ষে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি মনােযােগ সহকারে শুনতে লাগলেন। মাঝে মাঝেই ঠোট দুটো জিভের লালায় আর্দ্র করে নিচ্ছিলেন। আমি বলা শেষ করলেও তিনি নীরব রইলেন। এইভাবে কয়েক সেকেণ্ড অতিক্রান্ত হলো। তারপর মাথা তুলে, দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় স্থাপন করে তার উপর চিবুক রেখে কনুই দুটি চেয়ারের হাতলে ফেলে বিশ্রাম করতে লাগলেন। কিন্তু তার বড় বড় আর সহজে উপলব্ধি করতে পারে এমন চোখ দুটি আমার দিক থেকে সরালেন না।
ভাবলাম, এমনও তাে হতে পারে তিনি আমার সান্নিধ্যে বিরক্ত বােধ করছেন, তাই জোরে চিৎকার করে জানালাম, “ম্যাডাম, দেরি হয়ে যাচ্ছে তাই আমি…”
“না, না এখনও সময় হয়নি। আমি এইমাত্র ঘড়িতে সাড়ে এগারােটা বাজতে শুনলাম। এখনও সময় আছে। যখন একটা রাতের ঘুম তুমি নষ্ট করেছ, পরের দিন কী তুমি জেগে থাকতে পারবে?”
“একবার পেরেছিলাম। “আমার দ্বারা সম্ভব হয় না। একটা বিনিদ্র রজনী কাটালে আমাকে পরদিন অন্তত আধঘন্টা ঘুমােতে হয়। অবশ্য সেটা বছরে একবারই ঘটে।”
“ওঃ, ম্যাডাম, এরকম কিছু নয় !”
এত ঐকান্তিক আগ্রহে কথা বলছিলাম যে তিনি হাসতে বাধ্য হলেন। সচরাচর তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি সংকেত জ্ঞাপন করে খুবই ধীরে। তার আচার ব্যবহার খুব শান্ত। যাই হােক, তিনি হঠাৎই উঠে দাঁড়ালেন, ঘরের অপর প্রান্তে গেলেন। রুচিতে মার্জিত আর অসম্ভব বিনয়ী ভদ্রমহিলা শৃঙ্খলাভঙ্গ করে জানলা ও দরজার মাঝে অবস্থিত তার স্বামীর পড়ার ঘরের দিকে হেঁটে গেলেন। ক্ষীণ তনুর অধিকারী হলেও তিনি সবসময় এমন হেলেদুলে হাঁটতেন যে মনে হতো নিজের দেহভার বহন করতে তার কষ্ট হচ্ছে। আগে কখনও এই আবেগ এত প্রবলভাবে অনুভব করিনি। পর্দাটা পরীক্ষা করা অথবা টুকিটাকি জিনিসপত্র রাখার ছােট টেবিলের কিছু কিছু জিনিসের অবস্থান ঠিকঠাক জায়গায় সাজিয়ে রাখার জন্যে বারবার থামছিলেন। অবশেষে আমাদের দুজনের মাঝে রাখা টেবিলের সামনে সরাসরি আমার মুখােমুখি হলেন। তার ধারণার পরিধি বাস্তবিকই খুব সংকীর্ণ; জাগ্রত এবং সুসজ্জিত আমাকে দেখে বিস্মিত হয়ে ফিরে গেলেন। এরই মধ্যে জেনে ফেলেছেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে বললাম, আমি কোনােদিন কোনাে শহরের মধ্যযামিনীতে অনুষ্ঠিত খ্রিস্টের ভােজন উৎসব পালন করা দেখিনি। তাই এই সুযোেগ হারাতে রাজি নই।
“ওই উৎসবটা ছিল গ্রামে পালিত অন্যান্য উৎসবের মতোই; সমস্ত উৎসবই এখানে একইভাবে পালন করা হয়।”
“আমিও সেরকমটাই অনুমান করেছিলাম। কিন্তু শহরের উৎসবে নিশ্চয়ই অনেক বেশি জনসমাগম ঘটে, অনেক বেশি চমক থাকে। রিওতে পূতপবিত্র সপ্তাহ উদ্‌যাপনের ব্যাপারটি শহরাঞ্চলের অন্যান্য উৎসবের চাইতে অনেক বেশি আনন্দদায়ক হয়ে থাকে। আমার সন্ত জনের দিন কিংবা সন্ত আন্তোনিসের দিনটি কীভাবে পালন করা হয় তার কিছুই জানা নেই।”…
ধীরে ধীরে তিনি সামনের দিকে ঝুঁকলেন। মর্মর প্রান্তরে তৈরি টেবিলের উপরিভাগে কনুই দুটো আর হাতের তালুর মাঝখানে মুখখানি রাখলেন। তাঁর বােতাম খােলা জামার হাতাটা স্বাভাবিকই ছিল, তার পুরাে বাহু আমার নজরে এল। সেই হাত দুটো কল্পনা করা যায় না এমন সাদা বা শুভ্র। কিন্তু কৃশ নয়। যদিও মাঝে মাঝে তার বাহু প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, কিন্তু এই উপলক্ষে সে দুটি হাতের দর্শনলাভ আমার মনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করল। হাতের শিরাগুলি এতই নীল যে ঘরের ক্ষীণ নীলাভ আলােতেও আমি সেগুলিকে পৃথক পৃথকভাবে খুঁজে বের করতে পারতাম। বই ছাড়া কনসিকার সান্নিধ্য আমাকে জেগে থাকতে সাহায্য করল। শহরে এবং গ্রামে পবিত্র উৎসব পালন সম্পর্কে এবং আরও যা কিছু আমার ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এল- সেইসব ঘটনা নিয়ে আবােল-তাবােল কথা বলতে থাকলাম। একটা বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে, মাঝে মাঝে আবার পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে আসছিলাম। তাঁর শ্বেতশুভ্র, উজ্জ্বল সাজানাে দাঁতগুলাে দেখার আগ্রহে নিজে হেসে তাকেও হাসাতে চাইছিলাম, তার চোখ দুটি প্রকৃতপক্ষে কালাে নয়—কাজল কালাে, তার পাতলা, সামান্য বাঁকানাে নাক তার মুখমণ্ডলকে প্রশ্নাতীতভাবে শ্রীমণ্ডিত করে তুলেছে। যখনই আমি কোনাে কথা উত্থাপন করতে গেছি তিনি আমাকে চুপ করিয়ে দিচ্ছিলেন।
“নিচু স্বরে কথা বলো, না হলে মা জেগে যেতে পারেন।”
তিনি তার অবস্থান থেকে একচুলও সরলেন না যাতে আমার মন আনন্দে ভরে উঠতে পারে। এত কাছাকাছি আমাদের মুখ যে সত্যিই শােনা বা শােনানাের জন্য জোরে বলার প্রয়ােজন হয় না। আমরা দুজনেই ফিসফিস্ করে কথা বলছিলাম। অবশ্য তার তুলনায় আমিই বেশি কথা বলছিলাম। কারণ, আমার প্রাণের ভিতর অনেক কথাই জমেছিল। মাঝে মাঝে দুজনকে সামান্য কুঞ্চিত করে তিনি অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পরে ক্লান্ত হয়ে স্থান পরিবর্তন করলেন। টেবিলের চারপাশে ঘুরে সােফায় এসে বসলেন। বসার জন্য যতটা সময় লাগল, সেই সময়ের মধ্যে আমি মাথা ঘুরিয়ে তাঁর চটির সরু প্রান্ত দেখতে পেলাম। তার পােশাক এতটাই লম্বা যে প্রান্তটা ঢাকা পড়ে গেল। মনে হলো চটিটা কালাে রঙের। কনসিকাও খুব নরম স্বরে বলে উঠলেন :
“যদিও মায়ের ঘরটা অনেক দূরে তবু তার ঘুমটা পাতলা। তিনি যদি এখনই জেগে ওঠেন তবে আবার ঘুম আসতে অনেক সময় লেগে যাবে।”
“আমারও ঠিক এমনই হয়।”
ভালােভাবে শােনার জন্য সামনে ঝুকে তিনি বললেন, “কী?”
সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে সােফার কাছে গিয়ে আমি কথাটার পুনরাবৃত্তি করলাম। এতটা মিল দেখে তিনি হেসে ফেলে জানালেন তার ঘুমও খুব পাতলা, আমরা প্রত্যেকেই হালকা ঘুমের অধিকারী।
“আমি ঠিক আমার মায়ের মতো, একবার জেগে গেলে আর সহজে ঘুম আসে না। বিছানার চারপাশে গড়াগড়ি দিই, উঠে পড়ি, বাতি জ্বালাই, পায়চারি করি, আবার শুই কিন্তু ঘুম আসে না।”
“আজকের রাতটার মতো।”
“না-না”—তিনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন।
আমার কথা মেনে না নেবার কারণ বােধগম্য হলো না। খুব সম্ভবত তিনি বুঝতে পারেননি, তিনি তার বেল্টের শেষ প্রান্তটা দিয়ে ডান হাঁটুর উপর মৃদু আঘাত করলেন। তিনি তার পা দুটি আড়াআড়ি করে বসেছিলেন বলে হয়তো অস্বস্তি লাগছিল। তারপরই তিনি স্বপ্নদর্শন সম্পর্কে বলতে আরম্ভ করলেন। বললেন, সারাজীবনে মাত্র একবারই তিনি নিশিস্বপ্ন দেখেন আর সেটা ঘটেছিল নিতান্তই ছােট বয়সে। আমার কখনও নিশাকালীন স্বপ্নদর্শন হয়েছে কী না জানতে চাইলেন। এইভাবে কথােপকথন, ধীর কিন্তু বিরামহীন গতিতে এগিয়ে চললো আর আমিও ক’টা বাজে, গির্জার উৎসব দেখতে যাবার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। যখনই আমি বর্ণনা দিয়ে বা ব্যাখ্যা দিয়ে কোনো কথা শেষ করি, তিনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন অথবা নতুন কোনো পয়েন্ট তুলে ধরেন। আমি আবার তখন বলা শুরু করি। মাঝে মাঝে তিনি সতর্ক করে দেন।
“আস্তে, আস্তে…”
মাঝে মাঝে বিরতি, দু’বার ভেবেছিলাম তিনি বােধহয় ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু দেখলাম পলকের মধ্যে মুদিত চোখ আবার খুলে যায়, সেখানে তন্দ্রা বা ক্লান্তির লেশমাত্র দেখা যায় না। ব্যাপারটা এমন যে তিনি আরও ভালো করে দেখবার জন্য চোখ বুঁজে ছিলেন। মনে হয় এরকম কোনাে এক বিশেষ সময়ে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন আমি নিমগ্ন কিনা। মনে হলো তিনি আবার চোখ বন্ধ করলেন—দ্রুত না ধীরে মনে পড়ছে না। সেই বিকেল বেলার পূর্বস্মৃতিগুলােকে এখন মনে হয় ব্যর্থ অথবা তালগােল পাকানাে কিছু। আমি আসলে সবকিছু গুলিয়ে ফেলি, নিজেকেই অস্বীকার করি। একটা জিনিস আমি সুস্পষ্টভাবে স্মরণ করতে পারি, কোনাে এক বিশেষ মুহূর্তে তিনি (যিনি তখনও আমার সান্নিধ্যে রয়েছেন) হঠাৎই আমার চোখে সুন্দরী, পরমাসুন্দরী হয়ে উঠলেন। হাত দুখানি আড়াআড়িভাবে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। তার প্রতি শ্রদ্ধাবশত আমিও উঠে দাঁড়াতে গেলাম। কিন্তু তিনি তা চান নি। তার একখানি হাত আমার কাঁধে রাখলেন। আমাকে বসে থাকতে বাধ্য করলেন। ভাবলাম তিনি আমাকে কিছু বলতে চাইছেন, যেন হঠাৎ শীত লেগেছে এমনভাবে কাঁপতে শুরু করলেন, পিছন ফিরলেন, যে চেয়ারে বসে আমি পড়ছিলাম সেখানে বসলেন। সােফার উপরে রাখা আয়নায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। দেওয়ালে ঝােলানাে দুটি খােদাই কাজযুক্ত চিত্র সম্বন্ধে বলতে শুরু করলেন-
“এই ছবিগুলাে পুরনাে হয়ে যাচ্ছে। আমি চিকুইনহােকে নতুন ছবি কিনতে বলেছি।”
তাঁর স্বামীর ডাক নাম চিকুইনহাে। ছবিগুলাে ব্যক্তির আসল আগ্রহের দিকটি স্পষ্ট করে। একটা ছবি ক্লিওপেট্রার; অন্য ছবিটির বিষয়বস্তু আমি মনে করতে পারি না, তবে সেখানেও অনেক মহিলার ছবি ছিল। সব ছবিই ছিল তুচ্ছ ধরনের। সেই সময়ে ছবিগুলাে যে কুৎসিত কিছু ইঙ্গিত করছে, সেটা বুঝতে পারি নি। বললাম, “ছবিগুলাে তাে খুব সুন্দর।”
“হ্যা, কিন্তু এগুলাে নােংরা ধরনের ছবি। তাছাড়া সত্যি কথা বলতে কী আমি সাধুসন্তদের ছবি পছন্দ করি। এই ছবিগুলাে ব্যাচেলারদের কোয়ার্টারে অথবা নাপিতের দোকানেই ভালাে মানায়।”
“সেলুন! আমি তাে ভাবতেই পারছি না ওখানে আপনি কখনও…”
“কিন্তু সেখানে অপেক্ষারত খদ্দেররা কী নিয়ে আলােচনা করে তা কল্পনা করতে পারি। আলোচনা করে নারী আর খেলাচ্ছলে প্রেমের অভিনয় করা- এইসব বিষয় নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই খোদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য নাপিতরা মালিকদের রুচি অনুসারে ছবি টাঙায়। আমার মনে হয় এই ধরনের ছবি বাড়িতে টানানাে শােভন নয়। তবে আমার ধারণা খুবই বিচিত্র। যাই হােক, এই সব ছবি আমার পছন্দ নয়। আমার কাছে যিশুর জননী মেরীর একটা ছবি আছে। তিনিই আমার রক্ষাকর্তা- সাধ্বী মহিলা; ছবিটা খুব সুন্দর। কিন্তু এটা মূর্তি বলে দেওয়ালে টাঙাতে পারি না, আমি এখানে কোনােভাবেই তাকে রাখতে চাই না। আমার ছোট্ট ভোজনালয়ে সেটা টাঙিয়েছি।”
ভোজনালয় কথাটি আমাকে খ্রিস্টের নৈশকালীন ভােজের উৎসবের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার মনে হয়, এবার যাবার সময় আর তা নিয়ে আলােচনা করার সময় হয়েছে। কিন্তু যতবারই মুখ খুলতে যাই, ততবারই বলার আগেই মুখ বন্ধ করি, যাতে তিনি নরম সুরে, মাধুর্যের সঙ্গে, শান্তভাবে যেসব কথা বলেন তা শুনতে পাই। এই শ্রবণ আমার আত্মাকে মাদকতায় পূর্ণ করে। শৈশবে এবং যুবা বয়সে তিনি যে গভীর ধর্মীয় অনুভূতির দ্বারা আচ্ছন্ন ছিলেন সেসব কথা বলেন। তারপর তিনি তার নৃত্য, প্যাকুয়েটা দ্বীপপুঞ্জে যাত্রার কথা অবিরাম মিলিয়ে মিশিয়ে বলতে থাকেন। অতীতের কথা বলতে বলতে যখন তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখনই বর্তমানে ফিরে এসে গৃহ সংক্রান্ত বিষয়ে, পরিবারের যত্নের কথা বলেন, যা বিয়ের আগে অনেক অসহনীয় হযয়ে উঠেছিল। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী এরকম কোনাে ঘটনােই আসলে ঘটেনি। যদিও তিনি বলেননি, কিন্তু আমি জানি সাতাশ বছর বয়সে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন।
একটুও না নড়ে তিনি পূর্বের স্থিতাবস্থা বজায় রাখলেন। তার চোখ দুটোকে ছােটো লাগছিল। তিনি অলসভাবে দেওয়ালের চারদিকে ইতস্তত দেখছিলেন।নিজের মনেই তিনি বলে উঠলেন, “এই ওয়ালপেপারটা পাল্টাতে হবে।”
আমার সম্মােহিত ভাববিহ্বল অবস্থা- যা আমার জিভকে আড়ষ্ট আর ইন্দ্রিয় চেতনাকে অসাড় করে তুলেছিল- তিনি এড়িয়ে যেতেই কিছু বললো বলে ইঙ্গিত করলাম। কথাবার্তার পরিসমাপ্তি ঘটার ব্যাপারে আসলে আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। তার প্রতি শ্রদ্ধাবশত আমি চোখ দুটো সরিয়ে নিতে চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পাছে তিনি ভেবে বসেন আমি তার চোখের দিকে তাকাতে অস্বস্তিবােধ করছি, এই ভয়ে (যদিও সত্যি সত্যি তা ঘটেনি) আমি পুনরায় তার দিকে তাকালাম। আলাপ আলােচনার রেশ ধীরে ধীরে কমে আসছিল। রাস্তায় চরম নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল।
আমরা কথা বলা বন্ধ হলো (কতক্ষণ জানি না)। মৌনব্রত অবলম্বন করে আমরা সেখানেই বসে রইলাম। একমাত্র পড়ার ঘর থেকে ভেসে আসা ইঁদুরের চিঁহি চিঁহি রব শ্রুতিগােচর হচ্ছিল। এই শব্দ আমার ঘুম ঘুম অবস্থাকে উত্তেজিত করে তুললো। এ সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার মনে করে আমি সচকিত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু কীভাবে আরম্ভ করবো বুঝতে পারছিলাম না। কনসিকাওকে উদাসীন বলে মনে হচ্ছিল। হঠাৎ আমি জানলায় করাঘাত শুনতে পেলাম। উচ্চকিত কণ্ঠে কেউ যেন বলছে, “মধ্যযামিনীতে খ্রিস্টের নৈশকালীন ভােজোৎসব হবে। মহামান্য যীশুর ভােজের উৎসব।”
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “তােমার বন্ধু তােমাকে ডাকতে এসেছে। তুমি তাকে জাগাবে ভেবেছিলে, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই তােমায় জাগিয়ে তুলতে হাজির হয়েছে। তাড়াতাড়ি করাে, দেরী হয়ে যাবে। শুভ বিদায়।”
নৃত্যচপল ভঙ্গিতে কনসিকাও ধীরে ধীরে হলঘরের দিকে চলে গেলেন। আমি রাস্তায় বেরিয়ে বন্ধুর সঙ্গে গীর্জার দিকে রওনা হলাম। নৈশভােজ চলাকালে কনসিকাও আমার আর পুরােহিতের মাঝখানে আবির্ভূত হতে লাগলেন। পরদিন প্রাতঃরাশের সময় কনসিকাওর আগ্রহকে উদ্দীপ্ত করা যায় এমনভাবে আমি খ্রিস্টের নৈশভােজের কথা, গীর্জায় উপস্থিত লােকজনের কথা ছাড়াও অনেক অনেক আবােলতাবােল বলছিলাম। আগের দিনের সন্ধ্যার আলাপচারিতার কথা উল্লেখ না করে সেদিন সারাটা সময় আমি তাকে অনেক দিন ধরে চলে আসা স্বাভাবিক, সদয় আচরণ করতে দেখলাম।
দিন কয়েক পর আমি ম্যাঙ্গারাটিবায় গেলাম। এরপর মার্চ মাসে যখন আমি রিওতে প্রত্যাবর্তন করি, তখন জানতে পারলাম নােটারি সন্ন্যাস রােগে মারা গেছেন। এখন কনসিকাও ইনজেনহােনােভাে জেলায় বসবাস করছেন। কিন্তু আমি তার সঙ্গে আর দেখা করতে যাইনি। পরে শুনেছিলাম কনসিকাও তার স্বামীর শিক্ষানবিশ কেরানির সঙ্গে বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close