Home কবিতা শারদুল সজল / প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন
0

শারদুল সজল / প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

প্রকাশঃ December 31, 2016

শারদুল সজল / প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : ২০১৭ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হবে, এমন কিছু নির্বাচিত গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু লেখা প্রকাশ করছি আমরা। এই আয়োজনে থাকছে বইটির বিষয়আশয় কেমন, কোন ভাবনা থেকে বইটি লেখা হয়েছে এবং কোন অর্থে বইটি গুরুত্বপূর্ণ – এসব বিষয়ে কবি/লেখকের নিজের কথা। সেইসঙ্গে প্রকাশ করছি বইটিতে প্রকাশিত লেখার অংশবিশেষ, প্রচ্ছদ ও ফ্লাপের কথা। সবমিলিয়ে বইটি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়ার জন্যেই এই আয়োজন। সম্ভাব্য পাঠক বইটি কেনার আগে বইটা সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যাবেন নিঃসন্দেহে।]

 

প্রকাশিতব্য বই নিয়ে কবির কাছে তীরন্দাজের ৫টি প্রশ্ন

 

প্রশ্ন ১ : কতদিন ধরে কবিতা লিখছেন আপনি?

প্রশ্ন ২ : এটা কি আপনার প্রথম বই? প্রথম বই না হলে এর আগের বইগুলির নাম বলুন। এবারের বইটার নাম কি?

প্রশ্ন ৩ : আপনি তো এই সময়ের একজন কবি। অনেকেই এখন ভালো লিখছেন। আপনার কবিতা/লেখালেখি তাদের তুলনায় কোন অর্থে আলাদা বলে আপনি মনে করেন – একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

প্রশ্ন ৪ : আপনার নতুন বইয়ের কবিতা/গদ্যের বিষয়আশয় সম্পর্কে কিছু বলুন।

প্রশ্ন ৫ : অনেকেই বলছেন, এখন প্রায় সবাই একই ধরনের কবিতা লিখছেন। এ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা – একটু বলুন।

 

শারদুল সজলের উত্তর

১. প্রায় ১৯/২০ বছর হবে।

২. বই ২টি : অন্ধকারে যতদূর দেখা যায় এবং মাতাল মৃত্যুর ইশারা। এবারের বইটার নাম দেহলিকয়লা

৩. এসময়ে অনেকেই ভালো লিখছেন আবার কেউ কেউ জোর করে শব্দ বসিয়েও কবিতা বানানোর চেষ্টা করছেন। দুটোই সত্য এবং এই সত্য যে শুধু এইসময়ে তা নয়; সবসময় ছিল আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে তবে আমি বিশ্বাস করি কবিতা সম্পূর্ণটাই ভিতরমুদ্রিত বিষয়…যাকে সহজ ও সাবলিল হতে দেয়া উচিত। আর নিজেকে এই শিক্ষায় দেই- মস্ত্যিষ্কজাত শব্দজট যাতে না হয়, ভাবনাগুলো কুড়িয়ে বুকের ভিতর জলতরঙ্গে ছেড়ে দেই যাতে একটা কাব্যিক ঘূর্ণি উঠে আর সেখান জন্ম নেয় এক ধ্যানের। অন্যের সাথে আমার আলাদা হওয়ার জায়গা হচ্ছে নতুন ভাষাভঙ্গি বর্ণনা ও কবিতার বিষয়বস্তু।

৪. কবিতা- চিন্তা ও জিজ্ঞাসার শোধিত মাধ্যম। যেখানে জীবনবোধের সন্ধান মেলে, আর এই সন্ধানের ভেতরেই আত্মজিজ্ঞাসার বহিঃপ্রকাশ। এখন যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করেন কেন লিখি- কী লিখি, তার উত্তর লিখি না- লিখতে হয়; তা অভ্যস্ততার জন্যই হোক বা উপলব্ধির জন্যই হোক। কবিতা আমার অক্সিজেন- পরমজন্মের এক বৈদ্যুতিক খুঁটি! যাকে সকল সময়ে নন্দন ও তিয়াসার পথ আবিষ্কার করতে হয়। একজন কবি জীবনদার্শনিকতার মহাকাব্য; তাই কবিতা আমার কাছে প্রার্থনা। পরিমিতবোধে সভ্যতার পরিবর্তন, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, শোষণ-বঞ্চনা, পরিবেশ পরিস্থিতি ও ভবিষ্যত সময়কে নির্ণয়ের পাশাপাশি পরমাত্মার বর্ণনায় এবারের কাব্যগ্রন্থ ২টি প্রেম ও দ্রোহের এক অনবদ্য সিম্পোজিয়াম।

৫. সবায় একধরণের কবিতাই লিখছে কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়, দলে দলে যখন একটি কাজ করে তখন মনে হয় একইরকম হচ্ছে কিন্তু সময়ের সামান্য প্রবাহেই বেশিটুকু ভেসে গিয়ে তীর্থের মতো কিছু দাঁড়িয়ে যায়…আর এই দাঁড়িয়ে যাওয়া যে দাঁড়িয়ে যাওয়া তাও কিন্তু নয়। কারণ কেউ কেউ মিডিয়ার দ্বারা ভেলকিবাজির মতো পুজের সৌন্দর্যগীতির গন্ধ ছড়ায়…তাদেরকে সামনে ধরে একটি দশককে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

পাণ্ডুলিপি থেকে

শারদুল সজলের ২০টি কবিতা

কুয়াশা উত্তোলন

শুভ জন্মদিন

আত্মহত্যা শব ধরা পড়ে যাচ্ছে

পিতলের কলসি ভরে

গলগল করছে জোছনা

 

টুং টাং শব্দে

রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো

আহত আলোকপিণ্ড

সাফাই সাক্ষী দিতে এসে

জেগে উঠছে

নরম ধাতুর লাভায়

একঝাঁক আত্মা সাজিয়ে

আগুনের কাছে দাবি করছে

সংবর্ধনার ফুলেল শুভেচ্ছা

 

কবরসিংহাসন

পৃথিবীর সকল কবর আমার কবরে ঢুকে গেছে

আমি তাদের রাজাধিরাজ; মসনদে বসে তাকিয়ে দেখি

কার কার বুক ফুঁড়ে বৃক্ষ গজিয়েছে…সেখানে কী কী পাখি বসছে

কী গান করছে আমি দেখি- নতুন নতুন আরও কবর আমার কবরে

ঢুকে যাচ্ছে এবং তাদের হৃৎপিণ্ডের ফুটোয় সুখ দুঃখ

পাওয়া না পাওয়াগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে

তাদের মধ্যে কেউ কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কবি মুচি ব্যবসায়ী

চোর খুনি রাজা রাণী রাজনীতিবিদ বুদ্ধিজীবী প্রেমিক ও প্রতারক

 

আমি কবরসিংহাসনে বসে মুনিয়াপবিত্রতায় প্রথম উচ্চারণ করে বলি

রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী পেছনে গিয়ে বসুন যাতে আমার

মেজাজ খারাপ না হয়

প্রেমিক আর খুনি সামনে এসে বসুন

কারণ প্রেমের মতো ধ্যান একমাত্র খুনিই করতে পারে

খুনের মতো ধ্যান একমাত্র প্রেমিকেই করতে পারে

 

দূরত্বের কথা নিয়ে আসিনি 

অন্ধ হতে হতে কী যেন দেখে ফেললাম

কুয়াশার অস্থির পাতাবাহারে হেঁটে ঘেটে দৌড়ে

একটি জন্মের অতীত ব্যবধানে

অনর্থ এই জীবন কতবার গিলে খেয়েছি

গ্লাসভর্তি মদে, কতবার তুলে দিয়েছি নিঃশর্ত

তোমাদের দখলে!

তার হিশেব বা ফর্দি নিয়ে আসিনি আমি আসিনি

পিথাগোরাসের জটিল ধাঁধায়

 

শীত আসে! বিস্মৃতির পরাস্ত মাঠে গান গেয়ে

যে কোকিল গেছে ভুলে

স্বর্ণলতা যেভাবে পেঁচিয়ে বাড়ে একটি আস্ত জীবনে

তার চোখ হারানো

দূরত্বের কথা নিয়েও আসিনি আমি

 

আমার মতো এভাবে কেউ আসে না

ক্ষতির সংবর্ধনা দিয়ে বিপরীত ভাঙাবোতামে

সূর্য ছড়াতে!

 

থিয়েটারের প্রথম দৃশ্য

শরীর জানালা খুলে দিলাম- দেখে নাও

ভিতর বাহির

 

পৃথিবীর শস্যক্ষেত

সিনার রোদে চাষ দিয়ে

 

আদমের বুকে আদর ছড়াচ্ছে হাওয়া

হাওয়ার ঠোঁটে গলছে গন্দমের নেশা

কলসি ভরে

 

মাটির শরীরে বুনে যাচ্ছে

শস্য দিগন্তের ছায়া

যেখানে ঈশ্বর আর প্রেম পরস্পর টিউটর

গন্দমটা ঈশ্বরের গুঁটি!

 

লীনসূত্র 

উপহার হিশেবে চাই কিছু অন্যমনষ্কতা

নিজের মুখ ভুলে- তোমার মুখে নখে চোখে ঠোঁটে

হৃৎপিণ্ড ও নিঃশ্বাসে মাখোমাখো দেখতে চাই আমাকে

 

আমি আর কতটুকু আমার হিশেবে

আমি রবো তোমার হাত ধুয়া জলে বিছানা বালিশে

শরীরের ওমে ঘামে- দুই পাহাড়ের গোপন পুলসিরাতে

 

প্রেম ছাড়া কিছুই চাইতে শিখিনি যে

কতদূর যাবে কতটা লুকোবে প্রেম এসে ঠিক ঠিক ছুঁয়ে দেবে

 

আমি জানতে চাই না আমার নাম…আমি কে

 

অন্যমনষ্ক হয়ে শুধু বুঝতে চাই আমি কতটা তোমার বিলীনে!

 

চুম্বক আবিষ্কারের ইতিহাস

চুমুর দৈর্ঘ্য মেপে উড়ে যায় বালকবয়স। আলবিরুনীর

গণিতসূত্রে নেচে ওঠে জাফরানি আনারস

তোমার বুক ম্যাগনেশিয়া অঞ্চল

আমাকে টেনে টেনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে

কীভাবে ভুলে যাবো চুম্বক আবিষ্কারের ইতিহাস?

 

নবম শ্রেণিতে প্রথম চুমুর বিনিময়ে চুম্বকের আবিষ্কার

সবল-স্বাস্থ্যের শহরে দেড়শ ডিগ্রি তাপের ধারাপাত

ঠোঁটের ডগায় রেখে

বৃত্তের মডেল দেখালে তোমার শরীরে এঁকে

তারপর বুঝালে চুম্বকশক্তি চুমুর তরলে কতটা জ্বলে

জ্বলতে জ্বলতে কত ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে টানে

 

ও মহলার বড়দি পিথাগোরাসের উপপাদ্য বুঝতে গিয়ে

তোমার কাছেই প্রথম শিখলাম- বৃত্ত থেকে বিন্দু বড়

সেদিন যদি স্বীকার করতাম, তবে কি জোছনার ভেতর

গলে পড়ত আস্ত ডালিমের নেশা!

 

শাহ আব্দুল করিম

দুই আঙুলে নাচে দশ জনমের মহাকাল

অন্ধকার সতীচ্ছেদ প্রথম এই ঘরে- হুঁড ছড়ানো হাওয়ায় ছড়িয়ে

এখানে হুকুমকর্তা ও পালনকারী একই ব্যক্তি

বুদ্ধের ধ্যানে অনন্য এক অধিকারী

 

এ ঘরের বালিশে তোশকে রুটিছেকা তাওয়ার ওমে ও ঘুমে

জোছনার গৃহস্থালি

আউশ ধানের গন্ধ মাখামাখি

 

হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে কে যেন নামলো; তিনি আদেশ করলেন

কে কোথায়, দেখতো- সদর দরজায় কে এলো?

 

তিনিই এগিয়ে গেলেন, দেখলেন

বাউলমনের শালপাতায় নেচে যাচ্ছেন জিব্রাইল!

 

একটুকরো হাসি রান্না করতে চেয়েছিলেন  

চাঁদের বারান্দায় এ কার লাশ? কার বিরহে

ভেসে গেছে গোলাপ-গন্ধের ইতিহাস

আলফা সেনচুরির নিকটবর্তী হয়ে

কষ্টগুলো আমাদের ঘরে বড় হয়েছে, মা-ও

আহ্লাদি

ওগুলো যত্ন করে করে রোয়া চৌকাঠে

একের পর এক

সাজিয়ে রেখেছে

 

আর বাবা নিরুদ্দেশ

ভোরের বাজার থেকে প্রতিদিন

ব্যাগভর্তি অন্ধকার কিনে বাড়ি পাঠাতেন

 

মা যতই একটুকরো হাসি রান্না করতে চাইতেন

দুঃখগুলো ততই আমাদের হাঁড়িতে নেচে উঠত

মা আড়ালে তা লোকমা ভরে গিলে খেয়ে

আমাদের প্লেটে দানা দানা শাদা আনন্দ

ঢেলে দিতেন!

 

হাড়ের মিউজিয়াম

বেদনাসুন্দর অহংকার আমার ভোরের বিশালতায় ফুটে আছে আনন্দময়! বিবেকগলিতে- রাত হলেই মৃত্যুর নাম রাখি কথোপকথন, রাস্তার ওপাশ থেকে এ্যাম্বুলেন্সে জড়ো করি লাশের ইচ্ছে! ডেঁয়ো পিঁপড়েদের বাড়াবাড়ি, ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দেই ব্যর্থসময় শূন্যতার হাহাকার, হাহাকাররা কলম্বাসের সান্তামারিয়া জাহাজে চড়ে আবিষ্কার করে আমার ভিতরই স্বর্ণমুদ্রার ঝলমলে খনি, অবিনশ্বরবাদের তত্ত্বকথা! মরণের নাম লুকিয়ে থাকা, সূর্যপুড়িয়ে পশ্চিমে জেগে ওঠে অন্ধকার অজগর! আয়ুরেখার ইশারাসুইচে তখন জড়ো করি ভবিষ্যত সকালের নাভিনিপল রোদ!

২.

ঘুম এতই ছোট যে- আমার দুচোখে তার অস্তিত্ব নেই!

কল্পনা করে একবার ঘুমের শরীর ছুঁয়েছি, হালকা ওজনহীন শান্তির ওমে শুয়ে আছে, শান্তি এতই নিরব যে আমার অগ্ন্যুৎপাত বুকে থাকার সাহস শক্তি কোনটিই তার নেই। শক্তি এক জড়পদার্থ। অন্ধকার রাত দিনের আলো- টিকটিকির লেজের চেয়েও মসৃণ। কোন মসৃণ পথই আমাকে ভাবায় না। যে জীবন আগুন লাল, বেদনার মত সুন্দর সৌভাগ্যের- ফাঁসির মঞ্চের কাছাকাছি! হুইসেল দিয়ে যে জীবন রাজপথের মিছিল তার ভেতর আমি এবং তুমি…হত্যা করতে নিচ্ছি দারুণ প্রস্তুতি!

৩.

মানুষের জীবন কাঁকড়ার ভূগোলে বিঁধে গেছে! পৃথিবী তার কংকাল ছেড়ে নিকোটিনের শরীরগ্রন্থি- যেন পরকীয়া প্রেমরস, যেন অদম্য রৌদ্রের ভ্রুণ- গোধূলিমূখর, যেন

স্তনওঠা বালিকার ঘুঘুগোপন স্বপ্নজাগানিয়া, আয়নার ভিতর জেগে উঠছে নায়িকা! যেন জিপসি আত্মার ভ্রমণ- ফিনিক্সের ডানায় উড়ানো মদ মূর্ছনা

ঘুম নেই- এইসব দিন-রাত্রির। সুঁই সুতোয় বুনে যায় চোরাবালক ঢেউ!

৪.

জলের গন্ধে তুলে রাখি এই শহরের সকল আদর! আমি ভালোবাসা চাইনি

এক আগুন ছাড়া পৃথিবীর কোথাও কোন সরলতা নেই- যেখানে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারি, তাই- অস্পর্শের ঔরসে লিখে যেতে চাই প্রিয় আগুন আর গোলাপের প্রতি সমবেদনা!

আবহাওয়ার স্যাটেলাইটে চোখের বৃষ্টি কখনো ধরা পড়ে না; জানা যায় না কত ঘনফুট রক্ত গলে এক ফোটা চোখের জল

আণবিক শহরে- এই বেঁচে থাকা এখন কথার কথা!

৫.

কাচের ভিতর থেকে আত্মপরিচয়হীন একবৃদ্ধ রক্তিম মদে খোদায় করে লিখছিল অন্ধছায়ার ফুটফুটে বয়স! হালকা হাওয়ার ঘন সন্ধ্যার চাঁদে চুন ও খয়েরে- মুখ লাল করে কীভাবে নির্বোধ দাঁড়িয়ে ছিল দেবতা- ১১ বার জন্মের দিকে, ১১ বার মৃত্যুর দিকে… বৃদ্ধটি তার লুকানো হাতের তালুতে ক্রস কেটে রোদের বায়োস্কোপে স্পষ্ট দেখালেন- তারার ঔরষে জন্ম নেয়া কাচের ভাঙন, মুখোশের উদ্ভিদ সেতু পার হয়ে অন্ধকারে তরবারি চালানোর কৌশল কীভাবে শিখেছিল; কীভাবে ছড়িয়েছিল সবকটি আঙুলের চুরি হওয়া অক্সিজেন…এইবার বৃদ্ধটি ডাক দিল  জীবন- সাথে সাথে রক্তিম মদের বোতল ভেঙে গেল, ভিতর থেকে বের হলো অসংখ্য তরতাজা লাশ!

৬.

এই কথাগুলো আমার তোমার তোর। জীবনকে খুচরা করে দেখ্- স্খলন ঘটবে না

বড় হ- বীর্যের ফেনার বদলে, বল- কাচভাঙার ভিতর উদ্ধার করা মুখটি কার? হায়েনার মতো লোলুপ লালায় নেংটা!

 

এখন আগুন জ্বালিয়ে যদি নিজেকে বলতে পারিস বদমাশ, মিথ্যুক! তবে ভাববো

মানুষ পরিচয়ে তোরও কিছু সত্য আছে, ধূলোভর্তি চোখের নরকে

তোরও কিছু কান্না আছে

 

রক্ত থাকলে বলা কথাগুলো আমার তোমার তোর

 

জন্মতারিখের মৃত্যু

প্রিয়সুধী

আমার কোন জন্মবার নেই

আমার জন্মতারিখে আগুন ধরিয়ে দিয়েছি

সেই থেকে পুড়তে পুড়তে

আমি একটা

অগ্নিগোলক

রাতনর্তকীর সাপখেলায়

হাসতে গিয়ে

দাঁত নয়

পুরো কলিজা বের করে

চিবুচ্ছি

 

বিশ্বাস করুণ

আমার কোন জন্মতারিখ নেই

জন্মবার নেই

 

আমার হৃদয়ের জন্য একগুচ্ছ বদনাম  

নিকোটিন-বিষ কিছুই খেল না আমাকে

যে খেল সে তুমি!

খ.

আমার ভালোবাসা

যায় না কোথাও

পায় না কিছুই

মুমূর্ষও নয়

এতদিন!

পড়ে আছে

অভুক্ত

হৃদয়ের ঋণ

 

গ.

আমি কারও

মান ভাঙাতে পারি না বলে

একা হয়ে যাই

কবরের মতো একা!

 

তিন টুকরো সংগীত!

মৌমাছি 

সংশয় ও হলুদ পাতার দুঃখকে

পলক তুড়িতে উড়িয়ে

রাত নর্তকীর এলোমেলো ওম থেকে

চুমুগুলো

ফিরিয়ে আনছি

 

সাজাচ্ছি

 

মধু ও চুমুর

মৌমাছি!

 

পথ

মজার ভেতর দুঃখকে ছেড়ে দিয়ে দেখি

সে কেমন করে হাসে! কতটা দাঁতের ভেতর

ভাঙন রেখে জীবনে ফেরে

 

পথ আর কতদূর নিয়ে যাবে মানুষ যদি না হাঁটে

এই পথ রোদ্দুর হিমালয় পাথর ভেঙে

মজার ভেতর দুঃখকে ছেড়ে দিয়ে দেখি

সে কেমন করে হাসে!

 

মানুষ   

 

মানুষ স্বভাবতই শিকারি

এখন মানুষ একা- কৌশলী

 

কৌশলী পৃথিবীতে যারা অকৌশলী

তারা মৃত!

 

মনোজগতের ইশারা                               

না গেলেও থাকা যায় না

বুকের বা’পাশের সোনালি মাছ

লাফিয়ে পড়ে অদৃশ্য অ্যাকুরিয়ামে

 

অ্যাকুরিয়ামে তুমুল অস্থিরতা

সময় পেরিয়ে হলুদ দিনের রজনীগন্ধা

অবর্ণনার গভীরে শনাক্ত করে

 

পেয়ে গেলেও- পাওয়া হয় না

পাওয়া যায় না

 

একজীবনে এ দুচোখ যত মানুষ দেখে

অর্ধেক পড়ে থাকে তার না-দেখা চোখের আড়ালে

আর অর্ধেকের ৯৯ ভাগ বিস্মৃতির বির্বণ বলয়ে

বাকি ১ ভাগ ভোগ ও বিনাশে

রূপান্তর করে কাফকার মনোজগত

 

পেয়ে গেলেও- পাওয়া হয় না

পাওয়া যায় না

 

সিজদামিতি

এটি একটি প্রস্থান। ফেরার সকল দরজা-জানালা বন্ধ করে

খুব কাছ থেকে ধূলিময় বাতাসে রাত আরতির অনুপম হাতে কেউ

দাঁড়াবে না আর উঠোনের বাগানে

ভেজা ওঁশের পাতা ঝরার গন্ধে

বৃষ্টির লিরিক মিশে গিয়ে উড়ে যাবে দূরের দিগন্তে; বিমূর্ত আকাশের

রঙ আলো… টুপটুপ করে ঝরে পড়বে অদূর গাছের ঘন ছায়ায়

কেউ দেখবে না- মাটির পৃথিবী ভেঙে অতলকুসুমে

দেহলি বৃক্ষের গতি রেখে কীভাবে মৌলিক হ’লে!

 

এটি একটি প্রস্থান। মা বাবার মৃত্যুর শিকড় গভীরে

নুনের গল্প চেখে যে সিজদামিতি রচিত হলো

তা কেউ জানবে না; অন্ধ জ্যোতিষীর রোদের রওজায়

সুদীর্ঘ কালোবিষ কতবার জন্মেছে! কতবড়

আকাশ ছুঁয়েছে তার দৃশ্যত ছিল কেবল ঈশ্বর

আর অনুমান করেছিল যে একজন- সে বেদনাবিশ্বাস

সে আমার তৃতীয় মৃত্যু!

 

ওমকাতর সেই দারুণ ক্ষত, যেখানে সমুদ্র আর চোখের

কোনও পার্থক্য নেই, যেখানে সমুখ সকল সবুজবৃক্ষদের ভেঙে

গুঁড়িয়ে মহাকালের নিচে নিজেকে করেছি জীবন্ত ফসিল

এটি আমার সেই তৃতীয় ও চূড়ান্ত মৃত্যু- যা হারালে জীবন

ক্রমশই পাথর হয়ে ডুবে!

 

বয়সের ফড়িং সময়

কাম ও ক্রোধের আগুনে মফস্বলের উঠতি ডালিমবাগান পুড়ে যাচ্ছে

সূর্যের রঙ ধূসর-তামাটে হয়ে আছড়ে পড়ছে বেগানা যুবকের ঘামে

এই সময়ে বলোকীকরে চুপ থাকি, কীকরে কামকে

কার্পাস তুলোর হালকায় উড়িয়ে দিই!

 

প্রতিনিয়ত শরীরের সেমিনারে আমি প্রধান বক্তা

গোলাপ বাগানে গর্জে ওঠা বিদ্যুৎতরঙ্গে রাজহাসের সাঁতার

এসব টাটকা জীবন থেকে কীভাবে তুলে রাখি

ঘামের কাহিনি!

 

চুমুর সাথে তোমার বিরোধ মেটাওএই বলে

চুমুগুলো আমার উড়ে চলছে

ঠোঁটের কর্মশালায়!

 

স্পর্শ

দূরের যেমন কিছু কথা আছে

কাছেরও তেমনি

 

কাছে থাকলেই কাছে থাকে না সব!

দূরে গিয়েও কি দূরত্ব গিয়েছে দূরে?

 

আছড়ে কি পড়েনি

মেঘ-তোলপাড় চোখের ব্যাকুলতা!

 

কাছে থাকাকেই স্পর্শ বলে না

স্পর্শ সবার ভিতরেও থাকে না

 

স্পর্শ অন্যরকম

বাতাসকে যেমন ধরতে পারো না

 

জলকুসুমের সংগীত

শহরজুড়ে ভিড়ছে কামবর্তী উড়োজাহাজ

জলপাই জনমের ধোঁয়া নিয়ে

সাইরেনদিন

জলকুসুমের সংগীত ছাপিয়ে

শোপেনহাওয়ারের দার্শনিক চোখ

ডাউনলোড করে

মনমাধুরীর সফট্ওয়্যার

 

যেন

উৎসাহ ইশারায়

আকাশ কাঁপিয়ে বলছে

 

ভেজাও

ভিজে যাও

 

মায়া

কেউ কেউ ঘুড়ি নাটাইয়ের তারহীন

বাতাসে বেলুন উড়ায়

দিগন্তে হারানো অসীম শূন্যতায়

আঙুলে ঝুলানো সময়ের খাঁচায়

ঘুণপোকায় খেয়ে যাওয়া

সূর্য

ও শৈশবের দিনপোড়া শরৎ-শরীর

অক্সিজেনের শীতমায়া জলের বুদ্বুদ

 

মাটির কলসে সুতাহীন সুরে

বেঁধেছিল একদিন মাটির পৃথিবীর ঘর

মাটির এত রঙ! মাটি বুননী সমুদ্র ঘরে

সংসার পেতে মাটির মানুষ একদিন

মাটিতে ঘুমায়

মাটির ঘর ছিঁড়ে পোষামুনিয়া

কুমকুম বাতাসে নিঃশব্দ উড়ে যায়

 

আমরা কেউ দেখি না- মাটির ব্যাংকভাঙা

জমানো পয়সায় চিকচিক করে

অফুরান দিনের স্মৃতি ও সংলাপ

একটি চিঠি হয়ে

ডাকবাক্সে আজও পড়ে আছে প্রযত্নে রওশন

 

যোদ্ধা

একাধিক রাক্ষসের চেয়ে

আজরাইল সত্যিই চমৎকার

তার চেয়েও চমৎকার

যদি কাউকে না পুছ!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close