Home কবিতা ফেরদৌস নাহার / প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

ফেরদৌস নাহার / প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

প্রকাশঃ January 4, 2017

ফেরদৌস নাহার / প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন
0
0

সম্পাদকীয় নোট  : ২০১৭ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হবে, এমন কিছু নির্বাচিত গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু লেখা প্রকাশ করছি আমরা। এই আয়োজনে থাকছে বইটির বিষয়আশয় কেমন, কোন ভাবনা থেকে বইটি লেখা হয়েছে এবং কোন অর্থে বইটি গুরুত্বপূর্ণ – এসব বিষয়ে কবি/লেখকের নিজের কথা। সেইসঙ্গে প্রকাশ করছি বইটিতে প্রকাশিত লেখার অংশবিশেষ, প্রচ্ছদ ও ফ্লাপের কথা। সবমিলিয়ে বইটি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়ার জন্যেই এই আয়োজন। সম্ভাব্য পাঠক বইটি কেনার আগে বইটা সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যাবেন নিঃসন্দেহে। আজ প্রকাশিত হল কবি ফেরদৌস নাহারের রূপান্তরের ঘোড়া পাণ্ডুলিপি থেকে ১৫টি কবিতা এবং বইটি নিয়ে কবির নিজের কথা।

রূপান্তরের ঘোড়া পাণ্ডুলিপি থেকে ১৫টি কবিতা

জাদুকর

প্রতিবার জাদুঘরের সামনে এসে দাঁড়ালে

খুব ইচ্ছে করে জাদু দেখাতে

সেই কবেকার ইচ্ছেটি পাকাপোক্ত হতে হতে

ঘূর্ণিচক্র নাচে তাড়িয়ে মারছে

ইচ্ছে করছে, বন্ধুদের চমকে দিয়ে হঠাৎ

সামনে গিয়ে দাঁড়াই, বলি, কেমন আছিস

ওদের বিস্ময় কাটার আগেই মিলিয়ে যাই

আবার অন্য কোথাও অন্য কারো কাছে

এ ধুলোর খেলাঘরে মায়ামন্ত্রের ঘোরে

যেখানে যাবার কথা নয় সেখানেও যাই

জাদুঘরের সামনে এলেই ইচ্ছেরা এভাবে

তাড়া করে, বেড়ে ওঠে, কেন ওঠে

আশ্চর্য কিছুর সাধ, দেবে অপবাদ জেনেও

কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছি না এখনো

বেমক্কা ধাক্কায় শতাব্দীর খেলাঘরে বাতাস ওড়ে

সবকিছু শূন্যে তুলে তালি মেরে মিলিয়ে দেই

অজানা মন্ত্রে, বাহু মেলে ভেসে বেড়াই

পূর্ণিমা ঘোর জ্যোৎস্নায় ব্রিজের উঁচু রেলিঙে                                                                                                                                 এসে দাঁড়িয়েছি। উথাল কাঁপিয়ে এখন

কোথাও উড়াল দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাব

জাদুকর হয়ে ওঠার এই তো সময়

রিং মাস্টার নামে

আমি পড়ছিলাম তোমার চিঠি
দেখতে পাচ্ছি একটি অজানা গোলকধাঁধার ছবি
এগুলো কি সত্যি সত্যি একদিন কেউ লিখেছিল
ভাবছি না,তাও ভাবনা আসছে উড়ে উড়ে
মনে নেই জানি আমাকে তেমন, তোমাকেও তাই

মাঝে মাঝে খুব বৃষ্টি এসে মনে করে দিয়ে যায়
মধ্যদিনের আলোর মাঝে কেউ একজন চাবুক হাতে
সিংহ বাঘের খেলা দেখাচ্ছে, সবার বুক খুব ধুক ধুক
কোন সিংহ কাকে যে খাবে কোনো আঁধারের মাঝে
কেউ একজন খেলা দেখাচ্ছে, রিং মাস্টার নামে

বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে, চিঠি রেখে দেই খামে

ফেসবুক

সেইসব দুঃখ জয়ের গল্প বলতে বলতে রাত পার হয়ে গেল

সচরাচর এমন হয় না। অকারণ বকবক, অহেতুক চ্যাটিং

কিছুই সয় না বলে নেই কোনো অন্ধভক্ত বা বাহারি স্তাবক

নেই মিছিলের মতো রাশি রাশি স্রোতমুখোর বন্ধুত্ব

আয়নাটি চৌচির টুকরো টুকরো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে

মাতাল ঝড় এসে বদলে দিয়ে যেতে চায় সব পরিচয়

কোনো কোনো কণ্ঠস্বর, বিজন নির্জন নিঃশব্দ আপন

জানিয়ে দিয়ে যায় সভ্যতার সিঁড়িগুলো কোথায় লুকিয়ে

জয়-পরাজয় একই শব্দ একই অর্থ হয়ে চেপে আছে

কত যে অসম্ভব এখনো নিঃশব্দ অভিযানে চুপচাপ দাঁড়ায়ে

এমন কিছু খুঁজে চলছে যার নাম ভুলে গেছি সেই কবে

কাচের পৃথিবী ভেঙেচুরে নৌটঙ্কি দেখাচ্ছে খুব হেসে হেসে

উত্তর আমেরিকায় এপিটাফ                                       

একটি রোদঝিল্লি বাতাসে দুলছিল উত্তর আমেরিকা

অবাক হব কিনা ভাবতে ভাবতে

শিকড় উপড়ে ফেলার আনন্দ পৌঁছে দেয়-

এই নাও, তোমার গ্রিনকার্ড

যাও প্রাণ ভরে ভেসে বেড়াও

সেই কবে ঘরবাস হেচকি তুলে

কাঁদতে কাঁদতে বনে চলে গেল

সেই থেকে শুরু হল বনবাস

বৃষ্টি ও তুষারের ব্যবধান

ঘুঁচিয়ে দিয়েছে মৌলিক অন্তর্ধান

ঠোঁটকাটা জ্যোৎস্না বিষণ্ন কণ্ঠ ছেড়ে গান গায়

উত্তরের হাওয়া লেগে হাড়ের চোয়াল হয় কঠিন

দিন মাস বছরের গোনাগুনতি শেষ হলে

ঘরে ফেরার ডাক গোপনে আমেরিকা খোঁজে

এখন এপিটাফের রং পালটে দিলেও

ঝিল্লি রোদে তা ধুসরই দেখাবে

কোলবালিশ

সারিবদ্ধ বিছানায় তুমিই একমাত্র কোলবালিশ

তোমাকে নিয়ে সেকি টানাটানি। জানো তো

বাঙালি ঘুমের সময় একা একা ঘুমাতে পারে না

এসময়টাতে তার কিছু চা-ই চাই। অথচ

এই সারিবদ্ধ চিলেকোটার অন্ধকারে

তুমিই একমাত্র কোলবালিশ, তাই

ঘুমানোর সময়টাতে প্রতিরাতে প্রবল কোলাহল

ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতি, খিস্তি-খেউর

যে পারে সে পারে, এবং নিয়ে যায় তেপান্তরে

কোলবালিশ কোলে টেনে গাঢ় ঘুম টুপটুপ ঝরে

রাত বাড়ে। ঘুমাতে দেয় না তাই বালিশ বসে থাকে

ঘুমায় না এতটুকু, হাঁটে চলে কথা বলে নিজেরই সাথে

আবার কখন কে কাছে টানে, ঘন নিঃশ্বাস ফেলে

চেপে ধরে দু উরুর মাঝে

অ্যাকুয়া অ্যাকুইস্টিক খেলা

ঘুমাতে ঘুমাতে এত যে বিষমন্ত্রের ছবি এঁকে যাই

তাও তো ভাঙে না ঘুম

জীবন শুয়ে আছে মরফিন মিডিয়ায়

চুপ করে থাকা ঠোঁটে গান শুরু হলে কার কী আসে যায়

খেলাদিনে চেনা হল লংকা পোড়া ঘ্রাণে

দেখা যাবে দূর জমানো বরফ ঠেলে বেরিয়ে আসা এক

মৌলিক ছবি চেনাজানা শেষ করে

অ্যাকুয়া অ্যাকুইস্টিকের ধ্বনি মেখে দেয় জলপৃথিবীর সুরে

এমন কী হারিয়ে যাওয়া কথাগুলোতেও

সত্যিই কি খেলা শেষ হল, নাকি বাকি আছে আরও

চমক লাগানো ওই গন্ডোলা ভেসে যায় ভেনিসের জলে

পাথরের সিড়িতে একজন দেবদূত জলে ঝাঁপ দেবার ভঙ্গিতে

একঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে, অপেক্ষার মন্ত্রজাল বাহবা টানে

সবই খেলা এইবেলা। দেবদূত জানে

কতবেলা বয়ে গেলে খিদে পাবে আর সে তখন

দেবদূত থেকে মানুষ হয়ে সিঁড়ি বেয়ে মাটিতে উঠে আসবে                                                                                                             বিশ্বাস না হয় অপেক্ষা করো, প্রমাণ পেয়ে যাবে

হুডিনির জাদুবিদ্যা থেকে

অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম। ফিরিয়ে আনতে একজন পিছু পিছু
চেনা জানা ছিল না বলে কেউ একজন সারাজীবন পেছন পেছন
ডাকও দেয়নি, অথচ ফিরিয়ে আনতে ঠিক এসেছিল

এটা জেনেছিলাম হুডিনির জাদুবিদ্যা থেকে। কী করে জানলে

তার গায়ের গন্ধে মিহিন কুয়াশা কাঁপছে। সারা পথ একাকী
চিত্র চলচ্চিত্র ছবি ছুঁয়ে দীর্ঘশ্বাস ঘুমিয়ে পড়ে, কুয়াশা কাঁপে

পাখা মেলে। ঘুমছুট দৌড়ে একটানা ছুটতেই থাকে
এসব ঘটনা বেছে বেছে আমাতেই ঘটে জাদুকর জানে

মনোহর, দেখো মন হরণের উপায় না বলো ক্ষতি নেই

শুধু শুনশান দুপুরে স’মিলে কাঠ চেরায়েই শব্দে তাকে

ফিরিয়ে আনতে গিয়ে ভুল করে নিজেরেই চিরে ফেলো না

হুডিনির জাদুবিদ্যা এতসব শেখায় না

পাখিরা তাদের ডানা দিয়ে

পড়ছি নিজে নিজে নিঃশব্দ কথা। একা লেখা, তবু মনে হচ্ছে

কার সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কখনো খানিকটা হয়েছিল দেখা

বাইনাকুরার চোখে লাগিয়ে পাখি খুঁজি

তার মানে এখন জঙ্গলে আছি

জ্যাকেট ও কারগো প্যান্টের পকেটে

অনেক কিছু রেখেছি, জলের বোতলও

একটি কলম ও নোটবুক

দেখাটা তো লিখে রাখতে হবে

খস খস শব্দ হয়। ওই তো পাতা ঝরে

পাখিদের চোখে মানুষের চোখ দেখে চমকে উঠি

কেমন ভয় ভয় লাগে, এ ঘটনা কী করে হয়

এমন তো হবার কথা নয়

বাইনাকুয়ার নামিয়ে ফেলি, জল তেষ্টা পায়

গা ছমছম করে। পালাতে হবে নাকি ভাবতেই

পাখিদের দিকেই ফিরে তাকাই

গাছের ডালে বসে কী নিয়ে ওরা খুব হাসাহাসি করছে

আমাকে নিয়ে তো নয়!  মাথা ঝিম হয়ে আসে

বরং এইবেলা ঘুমিয়ে পড়ি

যে দৃশ্য দেখব বলে চল্লিশ বছর মানুষের জঙ্গলে ঘুরছি

বিকেল গড়ানো রোদে ঘুম ভাঙা চোখে তাই দেখে চমকে উঠি

পাখিরা তাদের ডানা দিয়ে ছায়া আঁকছে, বাতাস করছে আমাকে

হিউম্যানমাস্ক মাইম দেখায়

পথে পথে রক্ত ধুয়ে যাই। যেতে না যেতেই আবারো নতুন রক্তবন্যা
পরিষ্কার করতে করতে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, শতাব্দী যায়
হাওয়া কাঁপিয়ে হুংকার ওঠে!তা শুনে কেঁপে উঠি কিনা তাই দেখতে
গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু চোখ। কোটি বছরের পুরনো মাটিতে
কী দেখতে চায় ওরা, হাওয়ার উল্লম্ফন না পৃথিবীত যাবতীয় শোক

একটি হিউম্যান-মাস্ক মাইম দেখায়, বাজারে দাঁড়িয়ে সেসব দেখায়
মাঝে মাঝে হাসতে হাসতে একে তাকে ধরে ধরে খুব জিজ্ঞেস করে-
মানুষের মতো লাগে না যখন, তখন মানুষ বলে ডাকি কী করে

তারচে’ একটি নতুন শব্দ ভাবো। যদি নাই পাও

না হয় মুখোশ নামেই ডাকো
অনেকেই মুখ চাওয়া-চায়ি করে, নিঃশব্দে কেটে পড়ার রাস্তা খোঁজে

তাদের নীরবতার গুণকীর্তণ করব নাকি নতুন রক্ত ধোব, ভাবছি

ভিনগ্রহে পাঠিয়েছি বখাটে সংবাদ

যখন যেখানে যত দুঃখ ছিল, সকলের বুকে

আগুনের চাড়া লাগিয়ে দিয়ে বলেছি, জ্বালাও

যতটুকু শক্তি আছে তাই দিয়ে জ্বালাতেই থাকো

হে অনল-অহং এসো, পরিচিত হই এইবার

তোমাদের দেশে নাকি জিপসিদের আনাগোনা খুব বেড়ে গেছে

ওদের ঝুলিতে থাকে চরস-গাঁজার বিবরণ। দুএকটি পুরিয়া কিনে

টান দিয়ে পেতে পার যার যা খুশি। কী মজা, দেই হাততালি

কুড়াতে থাকি বিনিসুতোর সম্পর্ক, বেঁচে থাকার জারিজুরি

কাল পরশুর গল্প রাখ তো বাপু, আজকের কথা বলো। জানো নাকি

জিপসি নারীদের মতো জিপসি পুরুষেরাও কমোর দোলাতে পারে

তাদের দুলে ওঠায় সিটি বাজায় তামাটে নারী, শীৎকারে কাঁপায় স্তন

না এসব মিথ্যে নয়। না মানলে এই বেলা তবে পরীক্ষা হয়ে যাক

হা হা হা ওতে আমার কিচ্ছু হবে না। এর চেয়েও আরও বেশি

তীব্র নেশার ঘোরে কেটে যাচ্ছি বাতাসের নাড়ি, সঙ্গম যন্ত্রণা

উজার করে গিলছি হাজার হাজার ক্রীতদাস আগুন এবং

মরচে ধরা সিংহ দরজায় উড়িয়েছি বুদ্ধের রংহীন চীবর

তারপর? ভিনগ্রহে পাঠিয়েছি বখাটে সংবাদ

এখন অপেক্ষায় আছি

যৌবন

দূর মাঠে সন্ধ্যার তরল অন্ধকারে তোমার তলপেটে

হাত না দিয়েই বুঝেছিলাম একটি প্রলম্বিত ক্ষুধা

আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে সরিসৃপ আঁধারে, যেখানে

সাঁতার কাটছে লক্ষকোটি বছরের প্লাবন। নীরব শ্বাসে

উঠে আসছে যাবতীয় যৌবন ছেঁড়া দিন, টুকরো পাল

মাঝি মাঝি খেলা আর আকাশের গান

মহাপ্লাবনের প্রাক প্রস্তুতিতে

বুনোপাখিদের শীৎকার অরণ্যকেও চিনিয়ে যায় তৃষ্ণা

যা কিছু বহমান রন্ধ্রে ও রোমে প্রাচীন পালকে লেখা থাকে

কত যে নতুন পরিচয় জন্ম নেয় পুরানো সঙ্গমে

ফাগুনের প্রথমদিনে, ফুলের মুকুট মাথায় গ্রিকদেবীরা

অলিম্পাস থেকে নেমে এসে ঘুরে বেড়ায় আমাদের শহরে

হাসি ভরা মুখ। ফাগুন বলতে ওরা এখন পূর্বদেশ বোঝে

এসব দৃশ্য দেখব বলে উড়াল দেই আটলান্টিক মেঘে

বসন্ত সন্ধানে আজও ক্লান্তিহীন যাযাবর নারী, প্রলম্বিত

ক্ষুধা তৃষ্ণা রটিয়ে দেই বসন্ত ফুরাবার আগেভাগেই

ক্যাপ্টেন কুকের টুপি

আমার শহর আজ কুয়াশায় ঢাকা
সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল

তবু তার মুখখানা পুরোপুরি দেখা হল না

আমার শহর আজ কুয়াশায় ঢাকা

যে সব বন্ধুদের অনেক কাছের জানতাম

তারা আজ ছেলেখেলার ধুলো হয়ে গেছে
জেগে উঠতে গিয়েও ঘুমিয়ে পড়ি, নামহীন

ঘুম শোক সাগরে ভাসিয়ে তাথৈ-তাথৈ তালে
কী সব বলে যাচ্ছে

নাচের মুদ্রা নয়, এক বিষবৃক্ষের রক্তক্ষয়

সারাবেলা সাঁতার কাটে

বেশ তো, না হয় ভুলে যাবে সব ঘুম

নামমাত্র দামে বেচে দেবো ক্যাপ্টেন কুকের টুপি

সে এখন ভেসে চলছে এনডেভার জাহাজে চেপে

কুয়াশার সর কেটে অনন্ত রহস্য সন্ধানে

আমার শহর আজ কুয়াশাখোর বটে

ভেসে যায় তাহিতি দ্বীপে ডুবু ডুবু চোখে

বিচ্ছেদি গেয়ে উঠবেন রাধারমণ

ছাদে দাঁড়িয়ে চুল শুকাচ্ছে কেউ

দূর থেকে দেখা একটি মধ্যেহ্নের ভেতর

প্রগাঢ় দীর্ঘশ্বাসে উড়ছে জমানো ঘুমগুলো

ঝিমধরা মন্ত্রে কামারশালার আগুনে

একটানা গুঞ্জরিত হতে থাকে একই শব্দ-

শাঁ শাঁ উড়ে যা উড়ে যা! কী আশ্চর্য

 সেই সব আগুনে কেউ চুল শুকায়

কেউ নাচে একাগ্র

সারাদিন বেসবাস খুলেটুলে একাকার

কাউকে খুঁজে নিও না হয় নতুন করে

আজ তোমার ঘরে প্রাণনাথ আসুক চাই না আসুক

ঠিক ঠিক বিচ্ছেদি গেয়ে উঠবেন রাধারমণ

পরজন্মে কমলা রোদ রঙে

ক্ষমা কর, ওগো ভিনদেশি বালক। পৃথিবী কমলালেবু

সূর্যকে ভোগ করা যাবে। এভাবেই ঋণশোধ ধরো

বেশ বুঝতে পারছি

কেউ একজন কোথাও বসে অবহেলা করছে
কিন্তু সে কি জানে আমিও সব টের পেয়ে যাচ্ছি

অবহেলা দিয়ে সাঁকো বানাচ্ছি
সব টের পাচ্ছি, সাঁকো বানাচ্ছি
টের পাচ্ছি, সাঁকো বানাচ্ছি প্রতি মুহূর্ত

স্রোতের বিরুদ্ধে রেগে থাকা শ্বাস ওঠা নামা করে
ভালোবাসা মৃতগ্রহে নির্মম নিমগ্ন প্রহার

এতকাল শুধু শুধু উপহার ভাবা হল তাকে

আস্তে আস্তে সেই ব্যথাগুলোকে ভুলে যেতে হবে

প্রহার উপহারের মাঝে লুকানো ব্যবধান ঘুঁচে দিয়ে

কয়েকটি বিজ্ঞাপন উন্মাদ পর্যটক বেশে নাইটশো ভেঙে

দংশন জর্জর ব্যথাদের সাথে হাত মিলাবে

যে ব্যথারা জন্ম নেবে পরজন্মে কমলা রোদ রঙে

রূপান্তরের ঘোড়া

আমিও গেয়েছি তার গান
মাঝেমাঝে দীর্ঘশ্বাসের মতো এক একটি যতিচিহ্ন

দাড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে

আমিও চিনেছি সেই স্তব্ধতার মানে

শব্দাবেগে ঝড় ওঠা বিমূর্ত আবেগ

যাবার আগেই যারা হাত টেনে বিদায় জানাবে

তাদের ভরা চোখে জলকারবার ঝুঁকে বৃষ্টি নামাবে

অনেক কিছুই তো ফুরায় না

রূপান্তরের ঘোড়া চলে যায় কত না দ্বারে

কত না কিছু যেতে যেতে কত মুখ ছুঁয়ে

শপথের কথা বলে আমাকে ক্ষমা কর

আমিও কি গেয়েছি সেই গান

জটিল ধাঁধার উত্তরে মৃদু হেসে চুপ করে গেছি

চাইনি নতুন করে চক্রপাক ঘূর্ণি তুলুক

নেমে আসুক দুরারোগ্য গোধূলি আলো

নিঃসন্দেহে এ-কথায় নেই সন্দেহ

কবি ফেরদৌস নাহারের কাছে তীরন্দাজের ৫টি প্রশ্ন

 

প্রশ্ন : কতদিন ধরে কবিতা লিখছেন আপনি?

প্রশ্ন : এটা কি আপনার প্রথম বই? প্রথম বই না হলে এর আগের বইগুলির নাম বলুন। এবারের বইটার নাম কি?

প্রশ্ন : আপনি তো এই সময়ের একজন কবি। অনেকেই এখন ভালো লিখছেন। আপনার কবিতা/লেখালেখি তাদের তুলনায় কোন অর্থে আলাদা বলে আপনি মনে করেন – একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

প্রশ্ন : আপনার নতুন বইয়ের কবিতা/গদ্যের বিষয়আশয় সম্পর্কে কিছু বলুন।

প্রশ্ন : অনেকেই বলছেন, এখন প্রায় সবাই একই ধরনের কবিতা লিখছেন। এ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা – একটু বলুন।

ফেরদৌস নাহারের উত্তর

উত্তর : ত্রিশ বছর হয়ে গেছে কবিতার সঙ্গে বসবাস করছি।

উত্তর : এবারের প্রকাশিত কবিতার বই ‘রূপান্তরের ঘোড়া’ আমার তেরোতম কবিতার বই। আমার সাম্প্রতিক কালে প্রকাশিত কবিতার বইগুলি হচ্ছে : পাখিদের ধর্মগ্রন্থ (কৌরব ২০১৫), নাভি ও নন্দন (২০১৫)।                                                                       উত্তর :  হ্যাঁ অনেকেই ভালো লিখছেন। এসময়ের অনেকের কবিতাই ভালো লাগে, পড়ি। পাশাপাশি এও মনে করি, অবশ্যই আমার কবিতা তাদের থেকে আলাদা, যেমন তাদের কবিতাও আমার থেকে আলাদা। প্রত্যেকেই আলাদা বলেই প্রকাশের ভঙ্গিও ভিন্ন ভিন্ন এবং ইউনিক। আমি আলাদা হয়ে যাই তখনই, যখন আমার উপস্থাপন আমার ভেতরকে উৎসারিত করে। আমার অন্তর্লোক, সে একান্তই আমার। সেক্ষেত্রে সচেতন-অবচেতন সবভাবেই আমি সবার থেকে আলাদা, কেউ কারও মতো নয়। আমার লেখা কবিতাগুলোর প্রতিটি শব্দ-ই সবার, কিন্তু লেখা শেষে পূর্ণাঙ্গ কবিতাটি কিন্তু আমার, কারণ সেই কবিতা আমারই বোধার প্রতিনিধি, আর কারও নয়।

উত্তর : ‘রূপান্তরের ঘোড়া’। মাথার ভেতর একটা অবারিত চলাচল। একটা গভীর খনন। শুনতে পাই, তেপান্তর পেরিয়ে  ছুটে আসছে রূপান্তরের ঘোড়া। অবশ্যই ব্যক্তিগত অনুভূতির আলো পড়ছে পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে। পাশাপাশি জীবন, প্রেম, প্রকৃতি, সম্পর্ক, সমাজ, পৃথিবী, রাজনীতি, রক্ত বাসনা, স্বদেশ, উত্তর আমেরিকা, মহাকাল, সব দাঁড়িয়ে পড়ে কবিতার প্রান্তরে। যে প্রান্তর ব্যাপি ছুটছে রূপান্তরের ঘোড়া। এ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারি না। সব মিলিয়ে এ যেন একটি জাদু ঘোর।

ওই রূপান্তরটিই স্যুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববতার প্রতীক হয়ে জীবন-অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়  মিথস্ক্রিয়া।  সমাজ-সংস্কৃতি এবং চলমান প্রবাহেও যুক্ত হয়েছে অবিচ্ছিন্নভাবে। আমি ইচ্ছে করে এই যুক্ত করাটা ডেকে আনিনি, ওরা এসেছে নিজের প্রয়োজনে। কবিতার বুকে ভর করে। কারণ জীবনের শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করব, মানুষের মৌলিক জ্ঞান মনুষ্যত্বতেই লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে। সেখানে কবি ও কবিতারও বিশাল একটি ভূমিকা রয়ে গেছে।

এ সবকিছুকে প্রকাশ করার ভাষা ও জায়গাটিকে  অযথা জটিলতার থেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছি। চেনা জগতের বাইরে কিছু নয়, বরং সেখান থেকেই তার উৎপত্তি। তারপরও কত শত চোখ এক একটি কবিতাকে, কত রকম ভিন্নতায় দেখবে, ভাবা যায়! এর শেষ নেই। কারণ, কবিতা যে জীবনেরই অংশ। ‘রূপান্তরের ঘোড়া’ এই সহস্র বোধকে তুলতে তুলতে ছুটেছে। কোন কিছুর বিনাস নাই, আছে কেবল রূপান্তর। যে কোনো রূপান্তরই ছুটে চলছে ঘোড় দৌড়ের গতিতে।

অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন গ্রিক দেশীয় শিল্পী ক্যাতেরিনা দ্রামিতিনো। গ্রিসের একটি অসম্ভব সুন্দর দ্বীপে বসবাস করেন এই শিল্পী। আমি তাঁর শিল্পের ভক্ত। কবি হিসেবে ক্যাতেরিনা আমাকে যথেষ্ট প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। গতবছর কৌরব থেকে প্রকাশিত আমার কবিতাগ্রন্থ ‘পাখিদের ধর্মগ্রন্থ’এর প্রচ্ছদও তিনি করেছেন।

উত্তর : আমি তা মনে করি না। ‘একই ধরনের কবিতা’ বলতে যদি ভাব, স্ট্যাইল, বিষয়কেও ইঙ্গিত করা হয়, তারপরও কিন্তু বলব, একই ধরনের কবিতা কখনই হবে না। কারণ একটু আগেই একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছি, প্রত্যেকেই আলাদা এবং স্বতন্ত্র কাজেই, প্রকাশ ভঙ্গির ক্ষেত্রেও সেই ভিন্নতা স্পষ্টতই থাকবে এবং তা আছেও।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close