Home কবিতা সিপাহী রেজা / পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

সিপাহী রেজা / পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন

প্রকাশঃ January 24, 2017

সিপাহী রেজা / পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুচ্ছ ও কবিকথন
0
0

সিপাহী রেজার কবিতাগুচ্ছ

যে যার দেয়ালের দিকে, অপেক্ষারত ধাক্কার দিকে!

মহানগরের ভেতর গুটিকয়েক লোক শুধু পারে সে গাড়িগুলো চালাতে। তাদেরকে বেরিয়ে আসতে দেখে, দূরের আরও কিছু লোক প্রস্তুতি এঁটে ফ্যেলে। সেসব লোক কিংবা চালক, অযথা ঢুকে পরার মত—টার্মিনালমুখী চলতি বাসে উঠে বসে পড়ে ড্রাইভিং সিটে। কিংবা রাত হয়ে গেলে টার্মিনালে ফেলে রাখা বাসের ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দেখা যায় এদের। এরকম যারা দেখছে, সেসব প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা উপরের প্রস্তুতি আঁটা লোকগুলোর সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে। বহুদিক থেকে বহু বহু গাড়ি এ্যাম্বুলেন্সের মত অস্থির। অস্থিরতা নিয়ে তুলে নিতে থাকে একে একে সবকটাকে। কাউকে তুলে নেয় ব্রীজের উপর থেকে, কাউকে ছাদ থেকে, সিলিঙ ফ্যানের নিচ থেকে, রাস্তার ধাঁর থেকে, নদীর পাড় থেকে, রেল লাইনের স্লিপার থেকেও তুলে নেয়া হয় কাউকে-না-কাউকে। আরও যারা ঘরের মধ্যে ভীতু—ইঁদুরের মত। তারাও গতি বুঝে, রীতি বুঝে, ছুটে এসে উঠে পড়ে বাসে। বাস চলছে। কেউ কাউকে না দেখে, না বুঝে, নানা ভাবনা পুষে, চলছে তো চলছে… এভাবে বাস ভর্তি শরীর নিয়ে, চিন্তার গতি নিয়ে, এগিয়ে যেতে থাকে যার যার কঠিন দেয়ালের দিকে, অপেক্ষারত ধাক্কার দিকে। প্রচণ্ড সে ধাক্কা! তার পরেও যারা বেঁচে গেলো তাদের নড়বড়ে দেয়ালের আঘাতে। তাদেরকেই হয়তো পুনর্বার—মহানগরের ভেতর গুটিকয়েক সেই লোক ভেবে, চালক ভেবে, উঠে পড়তে হয় গন্তব্যের দিকে, নিজস্ব কিছু দেয়ালের দিকে…

 

মৃত্যু

আজকাল। মৃত্যু…

যেখানে সেখানে,

মনের ভেতরকার ভয়ের রাস্তাটা ব্লক করে দিয়ে

একটা টঙ্গের দোকান, গ্যাস লাইট হয়ে ঝুলছে।

চলতে ফিরতে খানিক দূরে দূরেই মৃত্যু।

 

বেমানান

জানালার ওপাশে দূরে একখান হিজিবিজি আকাশ।

খুপরির মত মেঘ, বাড়ি যাবে। – কীভাবে যাবে ?

বাইপাসে নাকি আজ বিচ্ছিরি বাতাস !

 

কাছাকাছিই থেকো আমার সন্ধ্যা খেকো রাত

আবছায় হারিয়ে যাবে, রাখো হাতের মধ্যে হাত।

 

ঘুরে ফিরে রাস্তারা সব কিছুদূর এসে,

বাস নেই দাড়িয়ে থাকা শাহাবাগের মোড়ে…

দেখি বাতাস ক্যামন আজিব হালায়, দোল খায় কারেন্টের তারে!

 

রাষ্ট্র

কাটা মাছ পড়ে রইছে আলাম।

ছাই সুদ্ধ লাল ভেজা রঙ খয়েরি প্রায়

 

মাছের মত আমরাও কেউ কেউ

পড়ে আছি কিনা গিন্নির সামনে—

তা একবার

কর্তাকে জিজ্ঞেস করা দরকার!

 

উদাসীনতা

এমন বিদিক বৈষম্যের রাজ্যে,

মাতালের জন্য জয় হোক- এক পেগ মানবতা !

 

আমি আবার ভুলে যাওয়ার ইশতেহারে মাতাল হব,

 

একবার নিঃসঙ্গ জোনাকি কে চাঁদ ভেবে মাতাল হয়েছিলাম !

এবার জোছনা কে দুপুর ভেবে উদাস হবো, এমন-

অহেতুক পরে থাকা রাতের শরীরে জমুক কুয়াশার ধুলো !

কিস্তিতে কেনা বিষাদগুলো হারিয়ে যাক মায়াবতী শীতে।

যেভাবে পাতার শিহরণ গুম হয়ে যায় শিশিরের চোখে।

 

তাতে আমার কি ? আমার কোন কিছুতেই, কিছু যায় আসে না !

 

প্রতিবিম্ব

পুকুর ভর্তি মাছ, আমরা জাল ফেলি আকাশে।

আকাশে খুব পুকুরের প্রতিবিম্ব।

 

মেঘ সরিয়ে নীল জলে ঘাই মারে মাছ

তার ঢেউ ছড়িয়ে যায় মেঘের চারপাশে।

 

আকাশ ভর্তি মাছ, এবার বড়শী ফেলি পুকুরে।

ফাতনা ভেসে যায়

ভেসে যায় পুকুরীয় আকাশ

মেঘের মত যে জল, সেও ভেসে যায় বেহুদা বাতাসে…

 

জমানো ক্ষুধা

জানলা খুলে দেই

ঢুকে পড়ে সকাল

 

আলো

পেয়ে

ইঁদুরের মতো কিছু ক্ষুধা

আচমকা! দৌড়ে পালায়

নাভির অন্ধকারে…

 

খোলা মুখের কুয়ায়

হাত রাখা ইশারায়

বললাম ‘আপনি ঘুমান’

ফের দেখা হবে সকালে।

 

সরে যাই যে যার জায়গা থেকে

ক্রমশ সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছি, আবছা হয়ে যাচ্ছি, ঝুম বৃষ্টিতে কাছের গ্রামগুলোকে যতো দূরের মনে হয়, আবছা মনে হয়, তার থেকেও বেশি। এতটা আবছায়ের ভেতর যা স্পষ্ট বলে জানতাম, সেখাটায় দাড়িয়েও নিজেকে দেখলাম— মধ্যবর্তী অঞ্চল জুড়ে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি, আড়াল অগ্রাহ্যকারী বৃষ্টি, সেখান থেকে আমাকে দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি বাড়ছেই… মাত্রা বেড়ে কখন যে মিলিমিটারের জায়গায় মিটার হয়ে গেছে টের পাইনি।

 

রমনা

জুলাইয়ের ডানা ভাঙা হরিণ ফড়িঙের বনে

হেঁটে হেঁটে যায়… বসন্ত বাঁধানো পথের

ভেজা আশাঢ়ীয়া ঠোঁটে

 

আধুনিপাতেরও পর

বেলা উত্তরের ওয়াক্তে

 

একঝাক পাজামা ছাড়া রোদ

জোনাকির মত উদোমল্যাংটা

জ্বলে আছে চিকচিক, আধশোয়া রমনার লেকে।

 

আর হারতে পারব না!

পিছনের দেয়ালটা হেরে যেতে যেতে হঠাৎ আমার পিঠের সাথে এসে ঠেকল। দেয়ালটা কি এখন ঘুরে দাঁড়াবে? ঘুরে দাঁড়ালে তো আমার পিছনে দেয়াল বলে আর কিছু থাকবে না! তাহলে কিছুদিন পর আমি কিসের সাথে গিয়ে ঠেকবো? আমারও তো হেরে যাওয়ার একটা লিমিট থাকতে হবে…!

 

কবিকথন / কবির কাছে তীরন্দাজের প্রশ্ন ও তার উত্তর

প্রশ্ন : কতদিন ধরে কবিতা লিখছেন আপনি?

সিপাহী : কবিতা কবে থেকে লিখছি সেটা এভাবে জিজ্ঞেস করলে বলাটা মুশকিল হয়ে যায়। তার আগে বলে নেওয়া ভালো কবিতা কাগজে কলমে না লিখলেও কবিতা কীভাবে যেন তৈরি হতে থাকে নিজের মধ্যে। এখন প্রশ্ন অনুযায়ী এই তৈরি হওয়াটা কবে থেকে শুরু হয়েছে সেটা বলা যেতে পারে কিন্তু সেটাও স্পস্ট করে বলতে পারছি না কবে থেকে। ডায়রি থেকে পাওয়া পুরনো সাল ২০০৯, এর আগের কিছু লেখা নাই কাগজে বা অনলাইনে।

প্রশ্ন : এটা কি আপনার প্রথম বই? প্রথম বই না হলে এর আগের বইগুলির নাম বলুন। এবারের বইটার নাম কি?

সিপাহী : হ্যাঁ মৌলিকভাবে ‘সিরাপ’ই আমার প্রথম হবে।

প্রশ্ন : আপনি তো এই সময়ের একজন কবি। অনেকেই এখন ভালো লিখছেন। আপনার লেখালেখি তাদের তুলনায় কোন অর্থে আলাদা বলে আপনি মনে করেন – একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

সিপাহী : অনেকেই কবিতা লিখছেন বা করছেন তাদের তুলনায় আমার কবিতা কতখানি আলাদা বা কীরকম সেটা বলতে যাওয়াটা আরেকটা কবিতা লিখে ফেলার মতো হবে। কারণ এই ভিন্নতা ইচ্ছে করে করা হয়নি কখনো। কীভাবে যেন ঢুকে পড়েছে নিজের মধ্যে। যেমন একজন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছেন, তাকে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনার সঙ্গে একজন প্রমিত ভাষার লোকের তফাত কী, সে উত্তরে কিছু বলতে পারবে না। এটা এমনই একটা নিজস্ব ঢং যে ব্যাখ্যা নয় শুধু আবার আঞ্চলিক ভাষায় কিছু একটা বলে তফাতটা বোঝানো যাবে, মানে কবিতা দিয়েই কবিতার তফাতটা বোঝানো সম্ভব। আর প্রশ্নটিতে থাকা একটা বিষয় আমি অন্যভাবে দেখি সেটা হচ্ছে ‘অনেকেই এখন ভালো লিখছেন’ এখানে এই ‘ভালো’ শব্দটিকে আমি কবিতা বা সাহিত্যের জন্য প্রযোজ্য মনে করি না, কবিতার আবার ভালো খারাপ কী? একটা লেখা শুধু ‘ভালো’ আর ‘মন্দ’ দিয়েই কি বিচার করা যায়? কবিতা বিস্তৃত। এর সীমারেখা ভালো বা মন্দ দিয়ে মাপা যাবে না।

প্রশ্ন : আপনার নতুন বইয়ের বিষয়আশয় অন্য কিছু সম্পর্কে পাঠকদের বলার থাকলে বলুন।

সিপাহী : সিরাপ। বইটি আগাগোড়াই একটা সিরাপ। প্রচ্ছদে বইটির একটা বর্ণনা আছে। চারপাশে গ্রাম মফস্বলের যাবতীয় ক্রিয়ার মাঝে শহুরে একফোঁটা ওয়াসার জল। বইটিতে থাকা কবিতার মধ্যে এই ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া জীবন, এই জীবনের বাইরে, এই গ্রাম-শহর, এই কোথাও না, রক্ত, শূন্যতার স্বাদ ফোঁটা ফোঁটা গিলে আগানো, আবার কিচ্ছু নেই, ফাকা।

তবে একটা ভিন্নতা রয়েছে কবিতারও বাইরেও কিছু কবিতা ঢুকে যাচ্ছে বইটির শেষ, সেটা এখনই বলছি না।

প্রশ্ন : অনেকেই বলছেন, এখন প্রায় সবাই একই ধরনের কবিতা লিখছেন। কেউ কেউ বলছেন, বৈচিত্রও আছে। এ সম্পর্কে, সমকালীন বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা/মতামত – একটু বলুন।

সিপাহী : আমার কাছে ধারা বলে কিছু নেই। আমি ধারা, কাঠামো, তফাতের ব্যাকরণ না জেনে কবিতা লিখেছি। আমি সবার কবিতাকে কবিতা বলেই পড়েছি। এর বাইরে কিছু জানি না। আর সমকালীন শব্দটা শুনলে ঈর্ষা জাগে, যদি চিরকাল সমকালীন হতে পারতাম! ‘সমকাল’ শব্দটা চিরকালই তরুণ, যার যার সময়ে এই শব্দটা ‘সমকালীন’ হয়ে ধরা দিচ্ছে। আমার সময়ে আমার দাদাকে না রাখার নাম এই ‘সমকাল’। কবিতা একটা আবহ তৈরি করে, সে আবহটা পেতে আমি যদি ধারা বহির্ভূত কোন কবিতা আওড়াই তাতে কার কী আসে যায়। বৈচিত্র্য যা আছে সেটা মস্তিষ্ক প্রসূত। আমার কাছে একটা কবিতা হাজারটা আবহ তৈরি করে আবার ওই কবিতাই কখনো কিছুই তৈরি করে না, স্রেফ শব্দ হয়ে পড়ে থাকে কাগজে।

প্রকাশিত বই সম্পর্কিত তথ্য

বইয়ের নাম : সিরাপ / প্রকাশক : র‌্যামন পাবলিশার্স / প্রচ্ছদ শিল্পী : সিপাহী রেজা / মূল্য : নির্ধারিত হয়নি।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close