Home কবিতা কাজী নাসির মামুন / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

কাজী নাসির মামুন / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ February 10, 2017

কাজী নাসির মামুন / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ
0
0

পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

কাক তার ভোরের কোকিল কাব্যগ্রন্থ থেকে

 

রিয়েল এ্স্টেট

বহুতল ভবন-সমাজ।

বস্তর শিখর-স্বপ্নে শাসিত আমরা।

বাসনার চাপ শুধু উপরে ওঠার।

আমি ওই সুপক্ক আকাঙ্ক্ষা ধরে

ঝুলতে ঝুলতে রোজ নগর ভবনে গিয়ে শুনি:

পলেস্তরা খসে গেলে লাল ইটে দেখা যায়

আমাদের সকল আদিম।

তখন  আকাশ জুড়ে নীল পাতা, সূর্যের কাগজ।

মেঘের কলমে লিখা বাতাস-দেহের সিলিকন ইতিহাস।

আজ আমি ভেজা ইট; বাস্ত্তহীন।

দেখছি শপিংমল, কাচের চামড়া দিয়ে বানানো দেয়াল।

সময় স্তম্ভের নিচে আর কত একা থাকি ?

সৌরভ নিহত দিন। ডাস্টবিন পেরিয়ে এলাম।

গগন চুম্বনে যদি আবাসন হই,

কেউ কি আসবে ?

অনন্ত জ্যামের ঘোরে গাড়ির বহর।

গতির সংগ্রামে থেমে আছি বিকল নবাব।

যাকে ভালোবাসি সে তো ডামি

মোমের  পুতুল।

সকল উদ্দীপনায় দেয় শুধু বিষ, অপূর্ণ বিচ্ছেদ….

আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে নিভৃত চতুর কোলাহল।

শরীর গুঁড়িয়ে দিলে মনে হয় বসত ভাঙলো

আসলো নতুন করে রিয়েল এ্স্টেট…..

এবার উচ্ছেদ !

 

 

স্ফুলিঙ্গ

 

শ্বেত ভালুকের ক্ষুর্ধাত পঙ্কিলে

সাদা পৃথিবীর মতো তোমাকে খুঁজছি।

নতুন গুগল খুলে তথ্যের সূচাগ্র বীণা

তুমি বাজো….

 

শীত-বরফের করতলে অন্ধ নরপতি

চুমুকে চুমুকে যাকে নেয় মাতাল ফেনায়,

তুমি তার উষ্ণ অমরতা ।

নিকট কদমফুলে যাতনার ভয় দাও।

 

আজ ভেজা দিন। বিজিত সৌরভ।

শ্রাবণের বিনোদনে ডেকো না আমায়।

আমি হুইসেল। শ্রবণ-কুহরে জেগে থাকি।

বাগানের আসন্ন সুবাস পোকাদের হল্লায় খুন হতে দিয়ে

ফুলের যৌবন কাটি

মালি ও জল্লাদ।

Top of Form

Bottom of Form

Top of Form

Bottom of Form

বিচূর্ণ সন্ধ্যায়

আকাশের তাড়া খেয়ে

ফেরারি বারুদ আমি জ্বলি…

চন্দ্র-পুরোহিত

আমার আগুন দেখে ভয় পায়।

 

বুদ্বুদ

 

কলাগুলো ঝুলছে।

কারো কারো ব্যস্ততা চা খায়

যখন শহর জেগে থাকে

পর্ণ-ঘুঙুরের মতো।

মুখরিত প্রত্যক্ষ দোকান

তটস্থ বুদ্বদ

হাওয়া হাওয়া গান…

লোভ করি,

হলুদ প্রপঞ্চভরা কলার শরীর।

চতুর্থ নারীর কাছে হেরে

জেনেছি সরল বলে কিছু নেই।

কম্পমান ভণিতাটুকুই আসল বিদ্যুৎ

 

গুপ্তচর

আমার জীবনে তুমি পাথরের প্রজাপতি হও।

দুরন্ত বিক্ষোভে ফেটে-পড়া
বিমুক্ত টিয়ার গ্যাসে শহরের বিপুল আবাস
অমূলক অসুস্থ কান্নায় ভেসে গেলে
প্রস্তর ডানায় তুমি সুখ নিয়ে এসো।
ক্ষরণখাতায় আমি এঁকে নেব
তোমার বিদ্যুৎ, জন্ম বৃত্তান্ত, আলো ও
মধুমক্ষিকার সব আড়াল রাত্রিকে।
তুমি কি বধির গোপনতা?
বাণিজ্যকীর্তির শুল্ক বাড়িয়ে অমর
দূরত্বে আমাকে রাখো? সোডিয়াম বাতির নিঃশ্বাস
গলিত চাঁদের হাড়গোড় কর্পোরেট প্রেমিকার
বিলুপ্ত সংসারে চুরি করে নিলে
আমিও প্রবল প্রতারক
গোপন স্নানের মতো
তোমার জীবনে গুম হই।

 

নাইটগার্ড

নাইটগার্ড গাঁজা খায়।
কুণ্ডলি পাঁকিয়ে ওঠে তার চারুক্লান্তি
যেন সে একটি বিন্দু, নিষ্পন্ন জীবন
সরল রেখায় টেনে টেনে
.         অসীম অন্তিমে রাজপথ হয়ে গেছে।
তার দুঃখ চাঁদের চোখের জল,
ছড়ায় দারুণ অর্ঘ্য-নিরাময়।

ঘুমের চক্রান্ত ঘোঁচে; আর
আকাশে তারার বিজ্ঞাপন দেখে বুঝে ফেলি
লৌহ-জং-ধরা আমাদের মন ধাতব রঙের, তবু জোছনাকাতর।
একজন নাইটগার্ড ছড়ি হাতে তাকেই শাসন করে রাতভর।
নিঝুম স্বাস্থ্যের এই প্রোজ্জ্বল দ্যুতিকে
.         মানুষ বানালো কে? কে তার অন্তর্লোক?.

 

জ্যামিতি

নিজেকেই ছড়িয়ে ছড়িয়ে গেলে, ছাড়িয়ে গেলে না।
আর ছায়া, যাকেই সন্তুষ্টি দাও
অন্তিম মুহূর্তে ঠিক কলজে টানার মতো
অমর লজ্জায় এসে বললে,
.         লাটিম প্রীতির ঘূর্ণি নিয়ে
.         এসেছি গরম সখ্য। দাহ, ফিরিয়ে নেবে না?
এই জল-কৌণিক উত্তাপ নিয়ে
.         আমাদের ব্যাধি— সাঁতার অথবা অগ্নি-হাসি।

বর্ষার জ্যামিতি আগুনের চুল ধরে টানে।
জীবন তাহলে আঁকি-বুকি।
আগুন স্বর্ণালী খাতা? নিয়তি পেন্সিল?
.

 

বিষমাধুরি

আমাদের বাড়ির উঠোনে

একটা পেয়ারা গাছ নিশ্চুপ দাঁড়িয়েছিল।

আজ নেই।

তার এই না-থাকা সম্পূর্ণ স্মৃতিসান্ত্বনার মতো

                ফলপ্রতিভার নিঝুম প্রয়াস

আলোকজঠরে ফেলে গেছে।

তুমি তাই ফলবতী—নিদ্রামোহময়;

ঘুমের অন্তিমে টোকা দিলে সাড়া দাও

                স্বপ্নসহযোগী আমার প্রথম।

 

তুমি আছো, তবু তোমার না-থাকার

অস্তিত্বসংকট পেয়ারার লুপ্ত পাতার নিঃশ্বাসে

বৃক্ষবেদনার মতো জেগে থাকে নিজের ভেতর।

এই মর্মসংসারের অমূর্ত গল্পের ছাদে বসে

আমি তবে কোন পাখি? শালিকের ডিমের ওপর

আকাশরঙের নীল মাতোয়ারা দেখতে দেখতে

                হারানো গানের জন্য কাঁদি?

দীপ্যমান হাসির দরজা খোলা রেখে

অশ্রুসঙ্গীতের এই পিচ্ছিল সংসারে

তোমাকে সবুজ হতে দেখি।

আর দেখি শ্যাওলাসেঁতার হাতে নিয়ে

আমাকে শোনাও গান: স্নেহসুষমার

স্বর্ণমন্দিরায় মূর্ত আগুনের মতো

তাইতো তোমার সুর আমাকে পোড়ায়।

আমি জলমুকুরের ঘুমন্ত আত্মায়

শুধু এক নীরব ঝিনুক

প্রদাহপ্রতিমা নিয়ে মুক্তোমায়াবন ফেলে রাখি।

                         তোমার পাশেই।

সত্যশৃঙ্খলের ফুল্ল কাঁটায় নিজেকে বেঁধে

একদিন তুমিই বলেছ: ভালোবাসা মানে

অন্ধের আকাশে রংধনু হয়ে থাকা।

বধিরের শ্রবণসন্ধ্যায় রাতভর ঘুঙুরের

অনন্য প্রস্বর; আর

        বোবার জীবনে স্বপ্নব্যাকুল কথার ফুলঝুরি।

রংতুলি শব্দ আর ভাষার অতলে বসে

এই-যে মায়াবি হও স্নেহদরবেশ

ঘোড়ার খুড়ের শব্দ রূপায়নে যে আসে প্রবল

কেড়ে নিতে আমাদের আজন্ম নশ্বর

তার আগে দেখো, ভাতবাগানের লোলোপ ধোঁয়ায়

ক্ষুধার নিতম্ব দোলে যেন এক বাঘিনীকরাত।

সবজিশকট ভেঙে একদিন পাতে আসে মাছেরা মলিন।

তবু শঙ্খবেদনার মতো রাত্রি পোহালেই

চিরুণিবিন্যাসে রমণীয় প্রসাধন

গন্ধরাজ তেলের সৌরভে যত মোহ দিক

জীবন এখানে রোজ মুধ ও কণ্টক

নিয়ে থাকে; পাতা ঝরে; ফুলসখীদের বাড়ি ছেড়ে

মাটির ডেরায় নেমে ভেঙে যায় পাপড়ির রঙিন কুহক।

এই গৃহে, অরণ্যমুঠোয়

যতটা কুড়াতে পারো শস্যসঙ্গীদের

        তারো বেশি কণ্ঠনিরামর

চেয়ো না, চেয়ো না কবি।

দুঃখ পাবে।

 

চাইনি; বলেছি: শুধু এক রাত্রিগহিন তমসা বুকে নিয়ে

জন্মান্ধ যেভাবে দেখে একাঙ্গ দৃশ্যকে—পরিণত, ঝুরঝুর

পতনে পতনে শুধু চিরদিন ব্যথিত শ্রদ্ধায়—

আয়ুশূন্যতার মেঘমালায় আমাকে

সেইমতো ঝরে যেতে দাও।

                মুহূর্তরঙিন এক ইন্দ্রীয়পৃষ্ঠায়

তোমার নিবিষ্ট করতলে গুম হয়ে থাকি।

ময়ুরের নাচ হয়ে পরাজিত ভাষার পেখম

যৌবন গড়িয়ে দিই বোবার আগুনে পোড়া কথার শয্যায়।

যদি চাও সর্পনীরবতা, পেয়ারার ডালে ডালে বধিরের

শ্বাপদ নির্জন, আমি তবে ছোবলসন্ন্যাসী; বিষমাধুরির

প্রথম অন্যায় ভালোবেসে একরতি প্রেম

                কেবল তপস্যা করি সারারাত।

মণি হয়ে বসে থাকি মন্ত্রপরাধীন

ঘন কালো তোমার ফণায়।

যেন চুলবসন্তের কাশফুলে কোনো এক অদ্বৈত সন্ধ্যায়

স্বপ্নফিতা দিয়ে প্রেম বেঁধে

আমরা পেয়েছি চন্দ্রদ্বীপ

চাঁদের কাজলপড়া রাতের প্রহর।

খোঁপাকলঙ্কের দাগ নিয়ে

তারপর যাপিত জীবন হলো বিনুনি সহায়।

পিকসিক্ত ঠোঁটের দিগন্তে লাল সূর্যাস্তসময়

আমি নিজে হয়েছি বিস্তর।

আজ খোলা তৈজসে, রান্নার ব্যঞ্জনায়

আগুনপ্রতিভা হয়ে তুমিই আমাকে রাঁধো।

যেন তুমি সন্তান সঞ্চালনের খেয়াঘাট।

রক্তপূর্ণিমার মতো সময় নোঙরে বেঁধে

        আমাকেই শুধু বলো, ভালোবাসি।

 

ইমারত

জিজ্ঞাসার সমাধিপ্রস্তরে আজীবন
অবোধ মৃত্যুর মতো জেগে আছি; বিষণ্ন কবর
নিজের ভিতরে নিয়ে পুনরুত্থানের নিরুপায়
ইচ্ছের জগৎ পাখিসান্ত্বনার নিজস্ব ডানায়
তুমিও কি করেছ স্মরণ?
ও মাধুর্য, নিত্য বৈমানিক
নগর প্রপঞ্চে শুধু সঙ্গ দিয়ে আমাকে ওড়াও।
তবু রোজ সুনীল শিখর হয়ে
ফিরে আসি আকাশে তোমার।
উড্ডীন স্বপ্নের পাশে
তোমার শরীর যেন স্পর্শসমতল;
ইট বালি সুরকির সুমন্তর ঢেলে
আঙুলে আঙুলে গড়ি ইমারত।

 

রায়ট

পুরনো দিনের স্মৃতি পাপ ও পঙ্কিল ধ্রুবতারা
পুণ্যসংহতি ও প্রেম-যাপনের সঙ্গী ছিল যারা
সমূহ বন্ধুরা ছিল, ছিল নারী, মনোবিকলন
আয়ুর নিমেষ মেনে ধুলো-মাটি সবুজ আপন
ঘাসের নরম প্রাণে ছাপ রেখে ঘুমিয়েছে সব
আমিও ফড়িং, বন্ধু, আজ হোক উড়ার উদ্ভব।

ডানার অভ্যস্ত বায়ু-ঝেড়ে ফেলি ব্যস্ততা-সংকট
জীবনের সাথে হোক তারুণ্যের নতুন রায়ট
যৌবনের পুষ্পধামে চিরদিন কাঁটার বয়ান
জেগে ওঠো শাদা দুধ, ফোঁটা ফোঁটা পাথরের গান।

 

কবির কাছে প্রশ্ন ও তার উত্তর

 

প্রশ্ন ১ : কতদিন ধরে কবিতা লিখছেন আপনি?

উত্তর : অনেক ছোটবেলা থেকে। তবে কবি নয়, নাট্যকার হওয়ার ইচ্ছে ছিলো। ক্লাস নাইন টেন এবং ইন্টার মিডিয়েটে পড়ার সময় তিনটি নাটক লিখি। তখন গ্রাম থিয়েটার করার সুবাদে প্রখ্যাত নাট্যকার সেলিম আল দীনের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়। মূলত তার অনুপ্রেরণায় সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেলি নাট্যকার হবো। বয়সের আবেগ। তাছাড়া স্কুল কলেজের মঞ্চে লিখিত নাটকগুলো মঞ্চস্থও হয়েছিলো। তাৎক্ষণিক প্রশংসা আমাকে ওই দিকে তাড়িত করে। কিন্তু ঢাকায় অনার্স করার সময় থিয়াটারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলা সম্ভব হয়নি। তখন কিছু কিছু কবিতা লিখতে থাকি আবার। মাস্টার্সে পড়ার সময় এক বন্ধুর সূত্র ধরে পুরনো ঢাকার ‘ নতুন প্রজন্ম নাট্যদল’ – এর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আমার লেখা ‘ অচিন পুরের অগ্নিগাথা ‘ নাটকটি ঢাকার গাইড হাউজ মঞ্চে অভিনীত হয় এই নাট্যদল থেকেই। ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধা তারু ভাই মারা গেলেন। তারু ভাই ছিলেন এই নাট্যদলের সভাপতি। আর নাট্যদলের সদস্যদের মধ্যেও নানাবিধ দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফলে নাট্যদলটিও আর টিকে থাকেনি। তখন আমি জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, জয় গোস্বামীর কবিতার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকতাম। আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ও আলোড়িত করেছিলো বেশ। তখনই মনে হলো কবিতাই আরাধ্য আমার। সেই বিবেচনায় আনুষ্ঠানিকভাবে কবিতা লিখছি প্রায় ২০ বছর যাবৎ।

 

প্রশ্ন ২ : এটা কি আপনার প্রথম বই? প্রথম বই না হলে এর আগের বইগুলির নাম বলুন। এবারের বইটার নাম কি?

উত্তর : না, এটি আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। নাম হলো ‘কাক তার ভোরের কোকিল’। আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লখিন্দরের গান’ ২০০৬ সালে ‘লোক’ প্রকাশন থেকে বের হয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অশ্রুপার্বণ’। ২০১১ সালে ‘আবিষ্কার’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া ‘লখিন্দরের গান’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ Song of Lokhindar Translated by Ahmed S. Kaderi বাংলাদেশ ও লিভারপুল থেকে প্রকাশ করে Antivirus Publications এবং সেটি ২০১৪ সালে

 

৩ : আপনি তো এই সময়ের একজন কবি। অনেকেই এখন ভালো লিখছেন। আপনার লেখালেখি তাদের তুলনায় কোন অর্থে আলাদা বলে আপনি মনে করেন – একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

উত্তর : এই প্রশ্নটি আসলে সমালোচকদের জন্য খাটে। নিজের কবিতার স্বাতন্ত্র্য ধরিয়ে দেয়া বিব্রতকর। আমি কবিতাকে সংশ্লেষধর্মী মনে করি। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, দর্শন ভূগোল বা জ্ঞানের অপরাপর শাখা থেকে উপাদান নিয়ে কবিতা স্পেস বাড়াবে। বিশেষত আজকের এই ফিকশনের জয়জয়কারের সময়ে টুকরো অনুভূতির কিছু কিছু কোলাজ রচনা করে ইমিডিয়েট প্লেজার তৈরি করা আমার কবিতার ধাঁত নয় বলেই মনে করি। তাই আমার বেশির ভাগ কবিতাই দীর্ঘ হবার প্রবণতা রাখে। আমি ঐতিহ্যকে সময় তথা বিশ্বায়নের অভিঘাতের আলোকে বিবেচনা করি। আর আমাদের কৃষি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রকৃতি অনেক বেশি আয়রনিক্যাল বা পরিহাস প্রবণ। বর্ষা এখানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আবার মাছের চাষের কারণে ধান ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। তাই অবজারভেশন থেকে লিখলাম :

ধানগাছ চিরদিন থাকে না

কদম্বে থাকে না ভোরের জবা

ওই নীল আকাশপাতায় বৃষ্টিরা দেখে না গাছ

ধানগাছ চিরদিন

থাকে না।

এখানে বৃষ্টি না থাকাটাই আয়রনি। এর ভিতর দিয়ে আমাদের অর্থনীতি এগোয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থেও এই আইডিয়ার সম্প্রসারণ আছে। এখানে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর ওপর বিশাল একটি এলিজি আছে। হতে পারে এটি বাংলা কবিতার দীর্ঘতম এলিজিগুলোর মধ্যে একটি। ‘পরস্পর’ ছেপেছে। পড়ে দেখতে পারেন। অর্থাৎ কবিতাকে কেবলি প্রাণস্পর্শী ব্যক্তিগত অনুভূতি দিয়ে সাজাতে চাইনি আমি। ওভাবে আম পাঠকের কাছে কিছুদিন জনপ্রিয় থাকা যায়। কিন্তু স্বতন্ত্র বা ভিন্ন কিছু করা যায় না। আমি চেয়েছি সামাজিক প্রক্ষাপটের সংবেদনশীল দ্রষ্টা হতে। এই জায়গাগুলোয় আমাকে আলাদা ভাবতে পারেন। মালার ভিতরে সুতো যেমন আড়াল থাকে, কবিতায় চিন্তাকে আমি আড়াল রাখতে চেয়েছি কিন্তু পরিহার করতে চাইনি। কেননা কবিতায় চিন্তার পরিচর্যা খুবই জরুরী জিনিস। কিন্তু চিন্তা কটমট করলে পাণ্ডিত্য হয়, কবিতা হয় না। সেই দিকটায় খেয়াল রেখেছি। ২০০৯ – এ ‘লোক’ এ কবিতা ভাবনায় লিখেছিলাম :

জীবন হচ্ছে যাপনের। আর মৃত্যু হচ্ছে উদযাপনের। জীবনের ভিতরে উদযাপনের মহিমা দেওয়ার জন্যই কবিতা লিখি। আমার কবিতাগুলো এই চিন্তার অন্তর্গত প্রতিফলন। এই চিন্তাই হয়তো স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। আলাদা করেছে আমাকে। আর জনপ্রিয়তার জন্য লিখি না আমি। জেনুইন রাইটার হতে চাই। অনিশ্চিত পারফেকশনের দিকে মৃত্যু অবধি চলমান থাকতে চাই। নিজের আনন্দের বাইরে পাঠকের প্রশংসা  অনুপ্রেরণা ও বোনাস হিসেবেই দেখি।

 

প্রশ্ন ৪ : আপনার নতুন বইয়ের বিষয়আশয় সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তর : ‘কাক তার ভোরের কোকিল’ এই নামকরণের মধ্যেই একটি নাগরিক প্রণোদনা কাজ করছে। আমি ঢাকায় পড়াশোনা করেছি। আবার সরকারি আদেশে ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এসিসট্যান্ট ডিরেকটর হিসেবে কিছুদিন প্রেষণে নিযুক্ত ছিলাম। সেই সব যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাকে নান্দনিক ও শিল্পিত সততায় তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। উচ্চবিত্তীয় গহন যন্ত্রণা এখানে নেই। সেই সুদূর হাতছানি আমাকে টানেনি। আমি দিতে চেষ্টা করেছি মধ্যবিত্তের অন্তর্গহন। বেদনা ও টানাপোড়েন। কেননা আমি এই শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত। আমার মনে হয়েছে কাকই হচ্ছে ঢাকার নাগরিক জীবনের পাখিসঙ্গী। কাক তাই কোকিলের মতো রুক্ষ সুরের প্রণোদনায় মানবিক জীবনে অভ্যস্ত রেখেছে ঢাকার নাগরিকদের।

 

প্রশ্ন ৫ : অনেকেই বলছেন, এখন প্রায় সবাই একই ধরনের কবিতা লিখছেন। কেউ কেউ বলছেন, বৈচিত্রও আছে। এ সম্পর্কে, সমকালীন বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা/মতামত – একটু বলুন।

 উত্তর : কবির সংখ্যাধিক্যই এই বিভ্রম ঘটায়। একই রকম লিখা হচ্ছে এটা যেমন সত্য আবার কেউ কেউ স্বকীয়তার দিকেও এগোচ্ছেন বলে আমার মনে হয়। তবে সংখ্যায় কম। তবে টানা গদ্যে কবিতা লিখার প্রবণতা বেড়েছে। আর প্রায় সবাই স্ফূর্ত ভাবের অনুগামী হয়ে নিটোল আবেগের মধ্যে চমক সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছেন। চটকদার কথাকে সংবরণ না করে বরং তাকেই কবিতার সর্বস্ব ভাবছেন। কেননা এতে আম পাঠকের লাইক ও কমেন্ট পাওয়া যায়। ভাব বেশি হলে পরিশীলনের অভাব থাকে। ফলে ভাবের তাৎক্ষণিক সাবলীলতাকেই অধিকাংশরাই কবিতা ভাবছেন। এ ক্ষেত্রে সবার ধরণ একই। স্বাতন্ত্র্য মেলে না। কবিতা সিরিয়াস আর্ট। স্বতস্ফূর্ততার সঙ্গে নির্মিতি প্রয়োজন। কিন্তু নির্মিতিকে কেউ কেউ বানানো কবিতা মনে করে। ফলে প্রকরণচেতনার অভাব অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কবিতাকে এক করে দিয়েছে। দ্বিতীয় দশকের সংকলন থেকে এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যায়। কবিতা হচ্ছে সৃষ্টিশীল নির্মাণ। এটা ম্যাকানিক্যাল নয় বরং টেকনিক্যাল। প্রাণে টানে বলেই বা স্বতস্ফূর্ত হলেই কবিতা মহৎ হয়ে উঠে না। বরং তা প্রচল হয়। জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথের চাইতে অনেক পরিশীলিত। উৎপল কুমার বসু তো অবশ্যই। এই বিবেচনা যারা করছে তারা আলাদা হচ্ছে এ সময়ে। তাদের নিয়ে আমার আশাবাদ। আমি আশাবাদী। কেউ কেউ ছন্দ নিরীক্ষা করছেন। ছন্দ মানছেন, ভাঙছেন বানাচ্ছেন। এই নিরন্তর প্রচেষ্টা কবিরই তো কাজ।

প্রাসঙ্গিক তথ্য

কাক তার ভোরের কোকিল [কাব্যগ্রন্থ]

প্রকাশক : প্লাটফর্ম, স্টল নং ১৩০, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

প্রচ্ছদ রাজীব দত্ত

দাম ১৬০ টাকা

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close