Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ মহাস্থানগড়-লিপি ও ব্যাংক ব্যবস্থার আদিকাল > প্রত্নতত্ত্ব >> আবুল কাসেম

মহাস্থানগড়-লিপি ও ব্যাংক ব্যবস্থার আদিকাল > প্রত্নতত্ত্ব >> আবুল কাসেম

প্রকাশঃ June 27, 2017

মহাস্থানগড়-লিপি ও ব্যাংক ব্যবস্থার আদিকাল  > প্রত্নতত্ত্ব >> আবুল কাসেম
0
0

মহাস্থানগড়- লিপি ব্যাংক ব্যবস্থার আদিকাল

ব্যাংক ব্যবস্থা কবে শুরু হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। আর্থিক লেনদেন, ঋণদান-ঋণগ্রহণ, অর্থ ও সম্পদ গচ্ছিতকরণ, বন্ধক কিংবা সংরক্ষণের ব্যবস্থাকরণ প্রভৃতির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। রণদো ই ক্যামেরুণ তাঁর ‘অ্যা কনসাইজ ইকোনমিক হিস্ট্রি অব ওয়ার্ল্ড : ফ্রম পালেওলিথিক টাইমস টু দ্য প্রেজেন্ট’ বইতে বলেছেন, প্রায় বার হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মজবুত অর্থনীতির আস্থা ও নির্ভরতার ‘হান্টিং এন্ড গেদারিং’প্র্যাকটিস থেকে কৃষি সভ্যতায় উত্তরণের প্রাক্কালেই লেন-দেনের মধ্যে খাদ্যের ঋণ বিনিময়টা ঢুকে পড়ে। দশ হাজার বছর আগে ‘ফার্টাইল ক্রিসেন্ট’ এলাকায় (সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, মিশর, তুরষ্ক) সাড়ে নয় হাজার বছর আগে চীন এবং সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এ ব্যবস্থার পরিচয় মেলে। জে. হিউত্রা দে সোতো তাঁর ‘মানি, ব্যাংক ক্রেডিট অ্যান্ড ইকোনমিক সাইকেল’ বইতে বলেন, ব্যাংকের ইতিহাস অর্থের ইতিহাসের সমান্তরাল। আদিতে অর্থ বলতে বোঝাত ‘গ্রেইন-মানি’এবং ‘ফুড-ক্যাটেল-মানি’। খ্রিস্টপূর্ব নয় হাজার বছর আগে থেকে এর চল দেখা যায়। এশিয়া অঞ্চলেই এই নিদর্শন অত্যন্ত প্রাচীন ।

প্রাচীন বেবিলনে দুই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে লোকজন ষোল ভাগের এক ভাগ সুদ প্রদানের শর্তে স্বর্ণ জমা রাখত। মন্দির বা টেম্পলে খাদ্যশস্য জমা রাখার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। এই ব্যবস্থা দুইশত নয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত চলমান ছিল। এই সময়ে মন্দির বা টেম্পল থেকেও ঋণ হিসেবে লোকজনকে খাদ্যশস্য প্রদান করা হত- যা নতুন ফসল ঘরে তোলার পর লাভসহ ফেরত দিতে হত। খ্রিস্টপূর্ব আঠারশ শতকে মিশরের টেম্পল বা মন্দির এলাকার সীমানার মধ্যে নিরাপত্তার জন্য লোকজন স্বর্ণ বন্ধক রাখত (বি. গাচকোইন, হিস্ট্রি অব ব্যাংকিং)। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে টলেমির সময়ে বিচ্ছিন্ন শস্য-ব্যাংকিংকে রাজকীয় গ্রেইন ব্যাংকিং এর আওতায় আলেকজান্দ্রিয়ায় কেন্দ্রীভূত করা হয়। দে সোতো মনে করেন, রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় এরকম শস্যভাণ্ডার বা শস্যব্যাংকের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক উদ্যেগের মাধ্যমেই বিশ্বে প্রথম সরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। টলেমির সমসাময়িক- তাঁরই ভাইপো সেলুকাস মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্থানসহ সিন্ধু অববাহিকায় গ্রীক-শাসন কায়েম করেছিলেন। তাঁর সময়ে অবশ্য ‘ফার্টাইলক্রিসেন্ট’এলাকাসহ পৃথিবীর বিশাল শস্যভাণ্ডারের এই অঞ্চলে ব্যাংক ব্যবস্থার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় না কারণ তাঁর বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে যুদ্ধে লিপ্ত থেকে। হয়ত পূর্বতন রীতিই চালু ছিল।

প্রাচীন ভারতে, বৈদিকযুগে (খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দে যার সূচনা) ঋণপ্রথা চালু হয়। বেদগ্রন্থে তার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে মুনাফাধারীকে বলা হয়েছে ‘কুসিদিন’, যার অর্থ সুদখোর। ‘সূত্র’এবং ‘জাতকে’ও (৬০০-৪০০ খ্রিস্টপূর্ব) কুসিদিন শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর দ্বারা সুদকে নিরুৎসাহিত করা হয়। মনুস্মৃতিতে সুদকে সম্পদ অর্জন ও জীবিকার উপায় মনে করা হলেও তার পরিমাণ বা হার বিভিন্ন জাতের ওপর বিভিন্ন হওয়া উচিত বলে মনে করেছেন।  তবে, তার দৃষ্টিতে এটা গুরুতর পাপ। জাতক মনে করে, মাপই বা  ঋণচুক্তি সম্পাদন করা উচিত। ধর্মশাস্ত্রের মতও তাই। মৌর্য আমলে (৩২১-১৮৫ খ্রিস্টপূর্ব) প্রথম একটা সাধনপত্র ব্যবহার করা হয়, যার দ্বারা তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে ঋণ বা অর্থ প্রদানের ‘আদেশ’করা হয়। এটাকে বর্তমান কালের ‘বিল অব এক্সচেঞ্চ’বলা যেতে পারে। বৌদ্ধ আমলেও তার ব্যবহার ছিল। বড় শহরগুলোর সওদাগররা একজন অপরজনকে ‘লেটার অব ক্রেডিট’ প্রদান করতেন।

কৌটিল্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রে’র তৃতীয় অধিকরণের একাদশ অধ্যায়ে বর্ণিত ৬৩ নম্বর প্রকরণে ঋণগ্রহণ, ঋণ পরিশোধ, ঋণের প্রকৃতি, ঋণ হতে অব্যাহতিসহ নানা বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। ‘অর্থশাস্ত্র’গ্রন্থটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে লিখিত হয়েছে বলে পণ্ডিতদের ধারণা। এই গ্রন্থ পাঠে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যেমন ঋণদানের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রাতিষ্ঠনিক পর্যায়েও ঋণকে ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। ঋণ প্রদানের ব্যাপারটাকে গুরুত্ব বিবেচনায় এনে অর্থশাস্ত্রের ‘অনন্তর ধর্মস্থীয়’(বিচার বিভাগীয়) অধিকরণে সংস্থাপন করা হয়েছে।

গ্রন্থটির ৩-১১-১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, শতপণ ঋণের বিপরীতে সোয়াপণ হারে মাসিক সুদ প্রদান করাই সঙ্গত বলে স্বীকৃত। বন্ধক রেখে ঋণ নিলেও এই সুদ প্রযোজ্য। আরও বলা হয়েছে, ব্যবসার জন্য ঋণগ্রহণ করা হলে পাঁচ পণ হারে সুদ দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পথে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করলে শতকরা দশ পণ এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণে এ সুদের হার হবে বিশ শতাংশ। তার অতিরিক্ত সুদ গ্রহণ করলে দায়ী ব্যক্তিকে ২৫০ পণ জরিমাণা দিতে হবে এবং নিয়ম বহির্ভূত সুদারোপে যারা সাক্ষী হবে তাদেরকেও ১২৫ পণ জরিমানা দিতে হবে। রাজশাসকেরা ঋণগ্রহীতা এবং ঋণদাতার লেনদেন বা দায়দেনা সম্পর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। এরা ব্যর্থ হলে বিচারকগণ ব্যাপারটা আইন মোতাবেক নিষ্পত্তি করবেন। ৩-১১-২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ধান ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা হলে ফসল তোলার পর সুদ দিতে হবে গৃহীত ঋণের অর্ধেক। অর্থমূল্যেও ঋণ পরিশোধ করা যাবে। সময়মত ঋণ পরিশোধ না করে যদি কোনো ঋণী তা মজুদ রাখে এবং মজুদ ধানের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, সেক্ষেত্রে ঋণদাতাকে ঋণগ্রহীতা বর্ধিতমূল্যের অর্ধেক প্রদান করবে।

দীর্ঘসময় প্রবাসে কাটাবার জন্য কিংবা ঔদ্ধত্যবশত কেউ যদি সময়মতো গৃহীত ঋণের প্রদেয় সুদ বা তার অর্থমূল্য পরিশোধ না করে তা হলে তাকে জরিমানা হিসেবে ঋণকৃত ধানের দ্বিগুণ পরিশোধ করতে হবে। আবার সঠিকভাবে সুদ নির্ধারণ না করে কেউ যদি ধার দেয়, স্বল্প সুদের কথা বলে বেশি সুদ দাবী করে এবং এর জন্য মিথ্যে সাক্ষী জোগাড় করে, তা হলে তার চারগুণ অর্থ প্রদান করতে হবে। অপরাধীকে দিতে হবে তিনগুণ আর মিথ্যে সাক্ষ্য প্রদানকারীকে একগুণ। সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এই অনুশাসন।

সুদবিহীন ঋণের কথা বলা হয়েছে ৩-১১-৩ অনুচ্ছেদে। দীর্ঘ সময়ে যজ্ঞে নিযুক্ত ব্যক্তি, গুরুগৃহে ধর্মশাস্ত্রে অধ্যয়নকারী, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, রোগাক্রান্ত কিংবা অস্বচ্ছল ব্যক্তিদের ঋণ সুদযোগ্য হবে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ ধরণের ঋণ দেয়ার কথা।

তৎকালীন সমাজে মহাজনী ঋণের ক্ষেত্রে কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়ার পরিচয় মেলে। ঋণদাতারা সময় মত ঋণ পরিশোধ করতে চাইলেও তা গ্রহণ না করে ঋণ গ্রহীতাদের বিপাকে ফেলতো। এক্ষেত্রে অনুশাসনটা ছিল বেশ তীক্ষ্ণ। বলা হয়েছে, ঋণদাতা যদি সম্পূর্ণ পরিশোধ্য অর্থ গ্রহণে অস্বীকৃত হয় তাকে বার পণ জরিমানা করতে হবে। ঋণদাতা যদি অসৎ উদ্দেশ্যে পরিশোধ না করা সত্ত্বেও বলে বেড়ায় যে পরিশোধ করা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে উক্ত ঋণ গচ্ছিত রাখতে পারবে।

ঋণ তামাদি নীতিও রয়েছে অর্থশাস্ত্রে। বলা হয়েছে, কোনো ঋণগ্রহীতা যদি দশ বছর কাল পর্যন্ত ঋণের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, তা হলে তা আর আদায়যোগ্য থাকবে না। তবে ঋণগ্রহীতা বালক, ব্যাধিগ্রস্থ, বৃদ্ধ, সংকটাপন্নব্যক্তি, দেশত্যাগী বা রাজ্যবিভ্রমগ্রস্থ হলে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। অনুশাসনটি স্ববিরোধী বলে মনে হবে। কিন্তু যৌক্তিক। কারণ এমন ব্যক্তিদের বেলায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সময় দেয়াই যায়।

ঋণগ্রহীতা মৃত্যুবরণ করলে দায় পরিশোধ কে করবে সে সম্পর্কে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে ৩-১১-৪ অনুচ্ছেদে। বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা মৃত্যুবরণ করলে তার পুত্র বা সম্পত্তি লাভের উত্তরাধিকারী বা সহঋণগ্রহীতা (যদি থাকে) বা জামিনদার সে ঋণ শোধ করবে। ঋণের জামিনদারিত্ব নাবালকের বেলায় আইনসিদ্ধ নয়। যে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে সময় নির্ধারণ করা নেই, ঋণগ্রহীতার মৃত্যুতে তার পুত্র, পৌত্র ও অন্যান্য উত্তরাধিকারীরা সে ঋণ পরিশোধের জন্য দায়বদ্ধ থাকবে।

পরের অনুচ্ছেদে (০৩-১১-৫) আছে, একজন ব্যক্তি অনেকের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারে। তবে ঋণ পরিশোধ না করা হলে দু’জন ঋণগ্রহীতা সরকারের কাছে একই সঙ্গে বা সময়ে অভিযোগ করতে পারবে না। অবশ্য তার ব্যতিক্রম আছে। ঋণগ্রহীতা দেশ ত্যাগে তৎপর হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যাবে। অনেকের কাছ থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাকে ক্রমানুসরণ করতে হবে। তবে রাজা ও ব্রাহ্মণের ঋণ সর্বাগ্রে পরিশোধ করতে হবে।

স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র এবং একান্নবর্তী ভাইদের মধ্যে পরষ্পর গৃহীত ঋণ বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়, নিজেরাই তা মিটমাট করে নেবে। রাজপুরুষ, রাজকর্মচারী এবং কৃষকদেরকে ঋণখেলাপীর দায়ে কর্তব্যরত অবস্থায় আটক করা যাবে না। স্ত্রী যদি মৃত স্বামীর ঋণ শোধ করতে না চায় তাহলে তাকেও আটক করা যাবে না। তবে গোপালক ও ভূমি বর্গাদানকারীর স্ত্রী মৃত স্বামীর ঋণ পরিশোধ না করতে চাইলে আটক করা যাবে। স্ত্রীর ভরণ-পোষণ নিশ্চিত না করে যে স্বামী প্রবাসে যাবে, স্ত্রীর গৃহীত ঋণের জন্য সে স্বামীকে দায়ী করে আটক করা যাবে।

অর্থশাস্ত্রের ঋণ সংক্রান্ত অধ্যায়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ঋণের সাক্ষীর ওপর। চারটি অনুচ্ছেদ জুড়ে সাক্ষীর নানা দিক নিয়ে অনুশাসন দেয়া হয়েছে।

৩-১১-৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ঋণ গ্রহণ করে স্বীকার করা ঋণ সমস্যা বা বিরোধ নিষ্পত্তির উত্তম উপায়। ঋণ গ্রহণ করে অস্বীকার করা হলে প্রত্যক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্যের মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। সাক্ষীর প্রকৃতি ও সামাজিক অবস্থান কি হবে, সংখ্যা কত হওয়া উচিত, কে সাক্ষী হতে পারবে না- এই অনুচ্ছেদে তা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সাক্ষীকে হতে হবে বিশ্বস্ত, বিশুদ্ধ এবং দু’পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য। সাক্ষীর সংখ্যা হবে কমপক্ষে তিন, দু’জনের সাক্ষ্যেও চলবে, তবে কোনো অবস্থাতেই একজনের নয়। বাদী-বিবাদীর শ্যালক, সহায়ক, আশ্রিত, ঋণদাতা, ঋণগ্রহীতা, শত্রু, বিকলাঙ্গ ও দণ্ডপ্রাপ্তরা সাক্ষী হিসেবে অযোগ্য। এছাড়া ইতিপূর্বে নিষিদ্ধ ঘোষিত ব্যক্তি, রাজা, শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ, গ্রামসেবক, কুষ্ঠরোগী, ক্ষতব্যক্তি, ধর্মভ্রষ্ট, চণ্ডাল, কদাচার ব্যক্তি, অন্ধ, বধির, অহংবাদী, স্ত্রীলোক এবং রাজকর্মচারীরা সাক্ষ্যের জন্য অনুপযুক্ত। তবে এরা নিজেদের মধ্যে উত্থাপিত অভিযোগের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে পারবে। মালিক ভৃত্যের পক্ষে, গুরু শিষ্যের পক্ষে এবং পিতামাতা পুত্রের সাক্ষ্য দিতে পারবেন। অনুরূপভাবে ভৃত্য, শিষ্য ও পুত্র মালিক, গুরু ও মাতা পিতার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারবে।

৩-১১-৮ অনুচ্ছেদ থেকে বোঝা যায় সাক্ষীরা সত্য গোপন করে, সাক্ষ্য দিতে চায় না, অথবা মিথ্যে সাক্ষ্য দেয়। বলা হয়েছে, সাতদিন সময় দেয়ার পরও যদি সাক্ষীদের দ্বারা সত্য উদঘাটন সম্ভব না হয় তা হলে অষ্টম দিবস থেকে তাদের ওপর প্রতিদিন বারপণ হারে জরিমানা আরোপিত হবে এবং পয়তাল্লিশ দিন পরও যদি সাক্ষীদের অসহযোগিতার কারণে বিরোধ অনিষ্পন্ন থেকে যায় সে ক্ষেত্রে সাক্ষীদের জরিমানা বাবদ বিবাদ-সম্পৃক্ত অর্থমূল্যের সমপরিমান অর্থ বাধ্যতামুলকভাবে পরিশোধ করতে হবে। সাক্ষীদের সাক্ষ্যে স্ববিরোধিতা বা বৈপরীত্য পরিদৃষ্ট হলে অধিক সংখ্যক বিশুদ্ধ ও সর্বজনগ্রাহ্য সাক্ষ্যের পক্ষে রায় দিতে হবে। উভয়পক্ষ জোড়ালো হলে উভয়পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় আনতে হবে। বিরোধ যদি তারপরও অনিষ্পন্ন থাকে তা হলে বিরোধীয় সমুদয় সম্পদ রাজার অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। এক্ষেত্রে বিরোধীয় সম্পত্তির মধ্যে তারতম্য থাকলে দায়ীদের শাস্তি  পেতে হবে। শাস্তির অর্থ রাজকোষে জমা হবে।

মিথ্যে সাক্ষ্য নিয়ে কৌটিল্য ছাড়াও আরো অনেক আচার্য প্রাচীনকালে তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আচার্য উশনার কী ভেবেছেন তাঁর মতাবলম্বীদের বক্তব্যে তা প্রকাশ পায়। এরা বলেছেন, সাক্ষীদের প্রশ্নকালে যদি দেশ, কাল ও কার্যসম্পর্কিত বক্তব্যে বৈপরীত্য দেখা যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রথম (২৫০ পণ), মধ্যম (৫০০ পণ) এবং উত্তম (১০০০ পণ) জরিমানা আরোপ করতে হবে। মনুর অনুসারীরা বলেন, মিথ্যুক সাক্ষীরা অর্থ সম্পর্কিত বিষয়ে অসত্যকে সত্য বললে তাদের দশগুণ জরিমানা করা উচিত। বৃহস্পতির লোকেরা বলেন, মূর্খতাবশত যদি সাক্ষ্য প্রদানের জন্য বিচার বিঘ্নিত হয়, অসঙ্গতি বা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় তাহলে সাক্ষীদের উৎপীড়ন করে হত্যা করতে হবে। এসব আচার্যরা কৌটিল্যের আগের।

কৌটিল্য উল্লিখিত আচার্য বা তাঁদের অনুসারীদের মত সমর্থন করেন না। তিনি বলেন, যেসব সাক্ষী সত্য বলবে আদালত তাদের বক্তব্য শুনবে। যারা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বিচারকের সামনে আসবে না তাদের চব্বিশ পণ জরিমানা করতে হবে। আর যারা মিথ্যে সাক্ষ্য দেবে তাদের বারপণ জরিমানা দিতে হবে। এছাড়া কাছাকাছির লোকদেরই সাক্ষী মানা উচিত।

সাক্ষীদের বেলায়ও তৎকালীন সামাজিক শ্রেণিবৈষম্যের চিত্রটি স্পষ্ট। অন্যান্য মামলার মত ঋণ আদায়ের মামলায়ও বিচারকরা ব্রাহ্মণ, অগ্নি এবং জলপাত্রের সামনে হাজির করে জেরা করতেন। সাক্ষী যদি ব্রাহ্মণ হত তা হলে বিচারক তাকে শুধু সত্য বলতে বলতেন। যদি সাক্ষী ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য হত তা হলে তাকে এই মর্মে সতর্ক করতেন যে, সত্য কথা না বললে তার ইষ্ট ও যজ্ঞাদির ফল সিদ্ধ হবে না, তাকে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে শত্রুর দারস্থ হতে হবে। আর সাক্ষী যদি শূদ্র হত তাহলে তাকে বলা হত, সে যদি সত্য না বলে তাহলে তার অর্জিত সকল পুণ্য রাজার মধ্যে সঞ্চারিত হবে, সে কোনো পুণ্যফল ভোগ করতে পারবে না এবং রাজার সমস্ত পাপ তার মধ্যে সঞ্চারিত হবে। সে কোনো কিছু গোপন করলে তা একদিনতো প্রকাশ পাবেই, তার জন্য তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।

অর্থ বা শস্যঋণ হিসেবে গ্রহণ করলে মুনাফা, লাভ বা সুদ  সমেত তা পরিশোধ করার ক্লেশ অতীতে অর্থাৎ প্রাচীনকালে বেশ ভালোভাবেই ছিল কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র তার সাক্ষ্য দেয়। আমাদের বৃহত্তর প্রাচীন বঙ্গে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের চর্চা যে ছিল দশম শতকের শ্রীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ পট্টলিতে তার উল্লেখ আছে। অর্থশাস্ত্রের ‘অধ্যক্ষ প্রচার’ অধ্যায় পড়ানো হত রাজা শ্রীচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত ব্রহ্মপুর শ্রীচন্দ্রপুরের শিক্ষা কেন্দ্রে। বৌদ্ধ রাজা শ্রীচন্দ্র এখানে ছয় হাজার ব্রাহ্মণকে বসতি দিয়েছিলেন। এদের কেউ কেউ অধ্যাপক ছিলেন। এক অধ্যাপক চান্দ্রব্যাকরণ পড়াবার জন্য দশ পাটক ভূমি লাভ করেছিলেন। শ্রীচন্দ্র অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের পিতামত।

সেখানে কৌটিল্যের ব্যংকিং কিংবা অর্থ ও শস্যঋণ সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো পড়ানো হত কিনা সে তথ্য পাওয়া যায় না। শ্রীচন্দ্রের সবগুলো তাম্রশাসনের পাঠ উদ্ধার করাও যায়নি। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য যে বৃহত্তর প্রাচীন বঙ্গে সবচেয়ে প্রাচীন যে শিলালিপি পাওয়া গেছে [কভারের ছবিতে দেখুন] তা হল শস্যঋণ সংক্রান্ত একটি দলিল।  এটি পাওয়া গেছে মহাস্থানগড়ে। তাই একে বলা হয় ‘মহাস্থানলিপি’ এবং ব্রাহ্মী হরফে লিখিত বলে আরও বলা হয় ‘মহাস্থানব্রাহ্মী লিপি’। লিপিটির পাঠোদ্ধার করেন দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভান্ডারকার। ইপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকার একুশতম ভলিউমে এটি প্রথম প্রকাশ পায় তাঁরই সম্পাদনায়। লিপির পাঠ নিম্নরূপ :

নেন সবগীয় (আ) নং [গলদনস] দুমদিন

[মহা-] সাতে সুলখিতে পুডনগলতে এ [ত] ঙ [নি] বহি-পয়িসতি। সংবগীয়ানাং [চ দি] নে [তথা]

[ধা] নিয়ং নিবহিসতি। দ [ঙ] গ (আ) তিয়া [ ই ] য় [ এ ] ক [ এ ] দ [ বা- ]  [ তিয়ায়ি ] কসি।

সুঅতিয়ায়িক [ সি ] পি গংডি [ কেহি ] [ ধানিয়িকেহি]

এস কোঠাগালে কোসং [ ভর ] নীয়ে।

এই লিপির যে বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে তা এ রকম : ‘এতদ্বারা সকল নাগরিকের কর গ্রহণকারী দুমদিন মহামাত্য সুরক্ষিত পুণ্ড্রনগর থেকে এটি করবেন। সকল দরিদ্রকে ধান দেয়া হল। তা দিয়ে অভাব দূর হবে। সুদিন  এলে এই কোষাগারের কোষ যেন কাকনিক, গণ্ডক মুদ্রা ও ধান দিয়ে পুরণ করা হয়।

এর ভিন্ন পাঠও রয়েছে। সকল নাগরিকের জায়গায় ‘শববর্গীয়’বা ‘ষড়বর্গীয়’ লোকেদের পাঠগ্রহণ করেছেন কেউ কেউ। ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় এ শববর্গীয় লোকদের সম্পর্কে বলেছেন, এরা বৌদ্ধদের বিনয়শাসন মানতেন না।

১৯৩১ সালের ৩০ নভেম্বর বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ের বারুফকির নামে এক কৃষক জমি চাষ করার সময় এ শিলালিপিটি পান। তবে এটি পুরোলিপির ভগ্নাংশ মাত্র, পুরোলিপিটি পাওয়া যায়নি।

পণ্ডিতেরা মনে করেন শিলালিপিটি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে উৎকীর্ণ। মিশ্র-প্রাকৃত ভাষার নিদর্শন রয়েছে এতে। সে সময় সম্রাট অশোকের মৌর্যসাম্রাজ্যভুক্ত ছিল এই মহাস্থানগড় এবং পুণ্ডুনগর।

মহাস্থানলিপি নানা কারণে বিখ্যাত। প্রথমত বৃহত্তর বঙ্গে পাওয়া এটিই হচ্ছে সর্বপ্রাচীনলিপি। এখনো পর্যন্ত  এইলিপির আগের কোনো লিপি পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, এই লিপিটি প্রমাণ করে পুণ্ড্রবর্ধন। মৌর্যসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, অর্থাৎ বঙ্গেও মৌর্যদের শাসন কায়েম হয়েছিল। তৃতীয়ত, এই অনুশাসন-পত্রটির ভাষা প্রাচীন মাগধী বা প্রাচ্য প্রাকৃতের লক্ষণাক্রান্ত। তা প্রমাণ করে বঙ্গের অনার্যভাষাকে গ্রাস করে তখন আর্যভাষা অগ্রসর হচ্ছিল। চতুর্থত, লিপিতে যে জনগোষ্ঠীর (শববর্গীয়) কথা বলা হয়েছে, সেকালে বিপুল সংখ্যক বৌদ্ধ, জৈন ও আজীবিক ধর্মে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর বাইরে এই জন বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর পরিচয় আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়েই ধর্ম প্রসারের বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ভিন্নধর্মের লোকদের নিধন করার উদ্যোগও ছিল একটি। ‘অশোকাবদান’গ্রন্থে আছে, তাঁর নির্দেশ পুণ্ড্রবর্ধনে আঠার হাজার আজীবিককে হত্যা করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, তাঁর পিতৃধর্ম ছিল আজীবিকধর্ম। শুধু তার পিতা বিন্দুসারই নয়, মহামন্ত্রী চাণক্যও এক সময় আজীবিক ধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে তাদের সময় পুরো মৌর্য সাম্রাজ্যেই আজীবিক ধর্মের প্রসার ঘটে। অশোকের সময় এই ধর্ম তাই দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বৌদ্ধধর্মের মুখোমুখি দাঁড়ায়। শববর্গীয় আজীবিকরা সম্ভবত একারণেই সম্রাটের কাছে গুরুত্ব লাভ করে। পঞ্চমত, প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এই লিপি প্রমাণ করে সম্রাট অশোক, যিনি এ অনুশাসনটি দিয়েছেন, তাঁর সময়ে পুণ্ড্রনগরে একটি জনহিতকর শাসন ব্যবস্থা কায়েম ছিল এবং জরুরি অবস্থা বা দুঃসময়ে প্রজাদের হিতার্থে রাজকোষ থেকে অর্থ ও খাদ্যশস্য (ধান) ব্যয় করা হত। এছাড়া লিপিতে যে দু’টি মুদ্রার (গণ্ডক ও কাকনিক) উল্লেখ রয়েছে তার একটি (কাকনিকা)র কথা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রয়েছে। নীহাররঞ্জন রায় মনে করেন ‘গণ্ডক’ছিল শীল মোহরিত নিম্নতম মুদ্রা আর কাকনিক ছিল ঢালাই করা তঙ্কশালার মুদ্রা। এই মুদ্রার বৈশিষ্ট্য প্রাচীনতম ঢালাই মুদ্রার পরিচয়ও বহন করে। উল্লেখ্য, মৌর্যদের রাজকীয় মুদ্রা ছিল পণ। পাশাপাশি কাকনিক এবং গণ্ডক মুদ্রার চল ছিল।

মুদ্রা এবং খাদ্যশস্য বিতরণ করার পর সুদিনে আবার রাজকোষে ফেরত দেয়ার ব্যাপারটা পণ্ডিতদের কাছে একটা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে যে, রাজা দুর্দিনে প্রজাদের মধ্যে অর্থ ও খাদ্যশস্য দান করেন, ফেরত চাইবেন কেন? তাহলে কি সম্রাট অশোক শববর্গীয় বা ষড়বর্গীয় প্রজাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন? এ প্রশ্নের জবাব আসলে এতদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ বিশ্বের প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় এবং কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রের’র মধ্যেই এ প্রশ্নের উত্তর রয়েছে।

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে রাজকোষ থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে ঋণ দেয়ার কথা বলেছেন তার বাস্তব নিদর্শন পুরো ভারতের অন্য কোথাও নয়, পাওয়া গেল বঙ্গে এবং তা মহাস্থানগড়ে, বৃহত্তর অর্থে পুণ্ড্রবর্ধনে। সঙ্গে সঙ্গে শুধু শস্য নয়, মুদ্রায়ও ঋণ বা ব্যাংক ব্যবস্থার পরিচয় জানা গেল। ‘গ্রেইন ব্যাংকিং’-এর পরবর্তী ধাপ হচ্ছে ‘মানি ব্যাংকিং’, যা বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র চালু আছে। টলেমির সময়ে ‘গ্রেইন ব্যাংকিং’কে কেন্দ্রীয়ভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। অথচ সমসাময়িককালেই ভারতবর্ষে, কিংবা তার আগে মানি-ব্যাংকিং যে চালু হয়ে গিয়েছিল কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে সে পরিচয় রয়েছে এবং তার বাস্তব রূপ দেখা গেল মহাস্থানগড়ে, বাংলাদেশে, লিপিবদ্ধ আকারে, অনুশাসনপত্ররূপে।

নতুন এই পরিচয়ে মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপি নতুন এক মাত্রা লাভ করল। উপমহাদেশের ঋণ বা প্রাচীন ব্যাংক ব্যবস্থার একমাত্র বাস্তব নিদর্শন এটি। তবে এ শস্যঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফা রাজকোষে জমা দিতে হয়েছিল কিনা তা জানা যায় না। লিপিটির সম্পূর্ণ অংশ পাওয়া গেলে তা নিশ্চিত হওয়া যেত। তবে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রে’বলা হয়েছে ধান ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা হলে ফসল তোলার পর সুদ দিতে হত ঋণে গৃহীত ধানের অর্ধেক। অর্থাৎ একজন দশ সের ধান গ্রহণ করলে তাকে পনের সের ধান দিতে হত। আর মুদ্রার বেলায় শতপণ ঋণের বিপরীতে সোয়াপণ হারে মাসিক সুদ প্রদান করাই সঙ্গত বলে স্বীকৃত ছিল।

লিপিটিতে বলা হয়েছে ‘কর গ্রহণকারী দুমদিন মহামাত্য সুরক্ষিত পুণ্ড্রনগর থেকে’একাজটি করবেন। অর্থাৎ ঋণ দেয়া-নেয়ার কাজটিও করতেন স্থানীয় কর কর্মকর্তা। বহু পণ্ডিত ব্যক্তি মনে করেন অনুশাসনটি জারি করেছিলেন স্বয়ং সম্রাট অশোক। তা বাস্তবায়নের দায় ছিল কর-কর্মকর্তা বা ‘দুমদিন মহামাত্য সুরক্ষিত’দের ওপর। ঋণ আদায় কিংবা প্রদানে কোনো সমস্যা বা ব্যত্যয় সৃষ্টি হলে নিশ্চয়ই কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বর্ণিত ব্যবস্থার আলোকে প্রথমে রাজ-অমাত্য, তিনি ব্যর্থ হলে বিচারকরা তা নিষ্পত্তি করতেন। লিপির ভাষ্যমতে ঋণ গ্রহীতারা সবাই ছিলেন দরিদ্র। চাষী বলেই মনে হয়। কারণ সুদিনে ধান অর্থেও পরিশোধের শর্ত রয়েছে। কৃষকদের প্রতি মৌর্য সম্রাটদের ঋণের হস্ত প্রসারণের কথা নানা দলিলপত্রে পাওয়া যায়। কোথাও নতুন বসতি স্থাপন করা হয়েছে, সম্রাট কৃষকদের ঋণ দিয়েছেন সেখানে ফসল ফলাবার জন্য। কৃষক এই ঋণে হালের বলদ, লাঙল জোয়াল, বীজ, সেচের সেঁউতি প্রভৃতি জোগার করেছে। এখানে ঋণটা দেয়া হয়েছিল অভাব নিরসনকল্পে।

দান এবং ঋণের মধ্যে পার্থক্যটা মর্যাদার। এর সঙ্গে রয়েছে সভ্যতা বা সিভিলাইজেশনের নিবিড় সম্পর্ক। সিভিলাইজেশনের অর্থ ও ব্যাংক ব্যবস্থার ভূমিকাও গুরুত্ব অপরিসীম, সে কথা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভিক্ষা বা দান গ্রহণের হাত থাকে নিচে। দাতার হাত থাকে সবসময় ওপরে। মাথা নিচু করে দান গ্রহণ করতে হয়। ঋণ গ্রহণের সময় মাথা এতটা নিচু থাকে না, মুখোমুখি প্রায় সমান্তরালই থাকে। হয়ত এতটা সাইনিং বা উজ্জ্বল থাকে না, কিন্তু ভিক্ষার গ্লানি বা অমর্যাদা বোধ থাকে না। সিভিলাইজেশনটা শুরু এখান থেকেই।

মৌর্যদের সময়ে সিভিলাইজেশনের আলোয় আলোকিত ছিল পুণ্ড্রবর্ধন। এখানে প্রাপ্ত খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ-৩য় শতকের ছাঁচে ঢালা ও ছাপযুক্ত তাম্রমুদ্রা, বিখ্যাত উত্তর ভারতীয় চকচকে কালো মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ, শুংগযুগের আদিমাতার প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ অর্ধ ডজন চিত্রফলক, মূল্যবান পাথরগুটিকা, বোতাম, গহনা, পোড়ামাটির মূর্তি ও অন্যান্য সামগ্রী প্রমাণ করে এখানে সভ্য মানুষেরাই সে সময় বসবাস করেছেন। অন্য সব কিছুকে বাদ দিলেও শিলালিপিটিতে উল্লিখিত ‘দুমদিন মহা-অমাত্য সুরক্ষিতে’র উপস্থিতি প্রমাণ করে সে সময়ে এই জায়গা কতটা উন্নত ছিল এবং এখানে কাদের বসবাস ছিল। এরকম একটি পরিবেশে অভাবী দরিদ্র মানুয়েরা ভিক্ষা নয়, রাজকোষ থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন, সুদসহ ফেরত দেবেন বলে। তাদের সামর্থ, সক্ষমতা ও মর্যাদাবোধের প্রশংসা করতেই হয়। এরা নিশ্চয়ই ঋণখেলাপী ছিলেন না, যা গ্লানি ও অমর্যাদাকর। আইনের মানদণ্ডে ঋণখেলাপীদের শাস্তি সুনির্দিষ্ট এবং সুনিশ্চিত ছিল, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে তা আমরা জেনেছি। মৌর্যদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বলেই মনে হয়।

সহায়ক গ্রন্থ

১. কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, নালন্দা, ২য় মুদ্রণ, ২০১৬, ঢাকা।

২. বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব, ড: নীহাররঞ্জন রায়, দে’জা পাবলিশিং, চতুর্থ সংস্করণ-আষাঢ় ১৪১১, কলকাতা।

৩. বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, ১৯৮৪, ঢাকা।

৪. বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস (সম্পাদিত) মুহ: মমতাজুর রহমান, ১৯৯৮, রাজশাহী।

৫. অনার্যজন, আবুল কাসেম, অ্যাডর্ন, ২০১৬, ঢাকা।

৬. A Concise Economic History of the World: from Paleolithinic Times to the Present, Cameron E. Rondon, Oxford University Press, 2001.

৭. Religion in the Emergence of Civilization: Catalhoyuk as a case study, lan Hodder, Cambridge University Press, 2012.

৮. Money, Bank Credit and Economic Cycles, J.Huerta de Soto, 2012.

৯. The Ancient Near East: History, Society and Economy, Mario Liverani, 2015.

১০. Cleopatra, J. Abbott, 2012.

১১. Evolution of Payment System in India, Reserve Bank of India, Archive From the original 2014.

১২. Inscriptions of Bengal, N.G. Majumder, Rajshahi.

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close