Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ অভিজিৎ মুখার্জি > হারুকি মুরাকামির ‘সমুদ্রতটে কাফকা’র দার্শনিক জীবনবোধ

অভিজিৎ মুখার্জি > হারুকি মুরাকামির ‘সমুদ্রতটে কাফকা’র দার্শনিক জীবনবোধ

প্রকাশঃ July 13, 2017

অভিজিৎ মুখার্জি > হারুকি মুরাকামির ‘সমুদ্রতটে কাফকা’র দার্শনিক জীবনবোধ
0
0

অভিজিৎ মুখার্জি > হারুকি মুরাকামির ‘সমুদ্রতটে কাফকা’র দার্শনিক জীবনবোধ

[সম্পাদকীয় নোট : হারুকি মুরাকামি। এই সময়ের একজন প্রখ্যাত জাপানি ঔপন্যাসিক। জাপান ছাড়িয়ে বর্হিবিশ্বে তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই শিখরস্পর্শী হয়ে উঠেছে যে, গত কয়েক বছর ধরে নোবেল পুরস্কারের শর্টলিস্টে তাঁর নাম প্রায় শীর্ষে অন্তর্ভুক্ত থাকছে। কিন্তু সহজপাঠ্য বলে জনপ্রিয়তা পেলেও তাঁর উপন্যাসের ভাব ও বিষয়আশয় গভীর দর্শনাশ্রিত বললে ভুল হবে না। সম্প্রতি মুরাকামির কাফকা অন দ্য শোর (ইংরেজি অনুবাদে) উপন্যাসটি অভিজিৎ মুখার্জির বাংলা অনুবাদে সমুদ্রতটে কাফকা (দুই খণ্ডে) নামে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে। মূল জাপানি ভাষা থেকে তিনি উপন্যাসটি অনুবাদ করেছেন। তীরন্দাজের জন্য এই উপন্যাসটিকে কেন্দ্র করেই তিনি লিখেছেন  বর্তমান প্রবন্ধটি। মুরাকামির ভাবনা যে কত গভীর, প্রবন্ধটি পড়লে পাঠক তার কিছুটা হদিশ পাবেন। অভিজিৎ মুখার্জির অনুবাদ পড়ার পাশাপাশি এই প্রবন্ধটি পড়া থাকলে সমুদ্রতটে কাফকা উপন্যাসটি বোঝা যাবে সহজে। ]

“I have seen it and I know that people can be beautiful and happy without losing their ability to dwell on this earth. I cannot and will not believe that evil is man’s natural state.”

[এই পৃথিবীতে বসবাস করার ক্ষমতায় এতটুকু হানি না ঘটিয়েও মানুষ যে সুন্দর ও সুখী হতে পারে, এ আমার নিজের দেখা এবং আমি এটা জানি। অশুভ যে মানুষের অস্তিত্বে প্রকৃতিগত, এ আমি মানতে পারি না, মানবও না।]   

দস্তয়েভস্কির একটা বিখ্যাত ছোটগল্প মূল রাশান থেকে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে নাম হয়েছিল, The Dream of a Ridiculous Man, রাদুগা পাবলিশার্সের জন্য অনুবাদ করেছিলেন Olga Shartse। ওপরের উদ্ধৃতিটা সেই গল্প থেকেই নেওয়া। দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘দি ইডিয়ট’ পড়ে অনিবার্যভাবেই আমরা বুঝেছি যে, স্বীয় বিবেচনাতেই খ্রিস্টীয় দর্শনে আস্থাশীল ছিলেন তিনি। ফরাসি ভাষা শেখা ও তাতে দক্ষ হওয়া তখন বাকি ইয়োরোপের মতই রুশ সমাজেও ছিল সুশিক্ষার প্রধান শর্ত। পশ্চিমী সভ্যতার মধ্যে অবস্থান করে, সেই সংস্কৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত থেকে, সেন্ট পিটার্সবার্গের এই মহান লেখকের যে বিশ্বাস ওপরের কথাগুলিতে উচ্চারিত হলো, প্রাচ্যের আধুনিক সাহিত্যে যদি আমরা কোথাও সেকথা আবার আবিষ্কার করি, সেকি তবে প্রতিধ্বনি হিসেবেই বিবেচিত হবে, নাকি প্রাচ্যের কোনও দর্শনের মধ্যেই রয়ে গিয়েছে তার মূল বীজ? বিষয়টার গুরুত্ব এখানেই যে স্থান, কাল, বিশ্বাস, আদর্শ, নির্বিশেষে মানুষের প্রয়োজন, কী ব্যক্তিগত স্তরে, কী গোষ্ঠিগতভাবে- প্রশান্তি ও আশ্বাসের। একথা সর্বকালের জন্য ও সারা পৃথিবীর জন্য সত্য হলেও জাপানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আশ্বাসের দিকটি সুনির্দিষ্ট এবং ধারাবাহিকভাবে তাদের সাহিত্যের কেন্দ্রে সহজেই চোখে পড়ে। ফলে, এটা মোটেই আপতিক নয় যে এই বিষয়টির চর্চা করতে গিয়ে, একটি আশ্বাসভরা দর্শনের খোঁজে- যা সার্বজনীন ও শাশ্বত- আমাদের একটি জাপানি উপন্যাসকে বেছে নিয়েই শুরু করতে হচ্ছে। আর সেই উপন্যাসটি হচ্ছে হারুকি মুরাকামির সমুদ্রতটে কাফকা

জাপানে একটা জনপ্রিয় খেলার নাম, ‘গো’, দাবার মতই বোর্ডের ওপর ঘুঁটি সাজিয়ে খেলতে হয়। খেলাটা বহু শতাব্দী আগে চিনদেশ থেকে সেখানে এলেও পরবর্তীকালে বিশেষরকম বিকাশলাভ করে জাপানে, এবং এখন এটি সেদেশের সাংস্কৃতিক চিত্রপটে একটা মুখ্য স্থান পেয়ে গেছে। এ খেলায় দেশের সর্বোত্তম খেলোয়াড়ের সম্মান পেতে হলে প্রাথমিকভাবে একটা প্রতিযোগিতায় অন্যান্য সব খেলোয়াড়দের হারিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে, যিনি তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্থানাধিকারীর সম্মান পেয়ে আসছেন, তাঁর মুখোমুখি হতে হয়। সেটাই ফাইনাল খেলা। ১৯৩৮ সালে এরকমই একটা দ্বৈরথ হয়েছিল গুরু ‘শুসাই’ ও তাঁরই শিষ্য চ্যালেঞ্জার ‘ওতাকে’-র মধ্যে। ইয়োমিউরি পত্রিকার একজন রিপোর্টার হিসেবে সেই খেলাটার দৈনিক প্রতিবেদন পাঠাবার ভার পড়েছিল কাওয়াবাতা ইয়াসুনারির ওপর। ১৯৬৮ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৫৪-তে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘মেইজিন’ (ইংরিজি তর্জমায়,The Master of Go)  মূলত সেই খেলার বিবরণীকে ভিত্তি করেই লেখা হয়। খেলাটা চলাকালে দেখা গেল, শিষ্য ‘ওতাকে’ জেতার উগ্র বাসনায়, যাবতীয় শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে, কনিষ্ঠের প্রতি প্রত্যাশিত নম্রতা পরিহার করে, ঐতিহ্যগতভাবে প্রাপ্য গুরুর অধিকারগুলোকে অস্বীকার করে- এক মরিয়া-নীতি অবলম্বন করছে। সেই প্রথম, খেলাটায় খেলার নিয়ম মানা হচ্ছিল কিন্তু খেলার প্রথা মানা হচ্ছিল না একেবারেই। উপন্যাসে কাওয়াবাতা লিখলেন :

বলা যেতে পারে, জীবনের সেই শেষ খেলাটায় গুরু আধুনিক র‍্যাশনালিজমের আক্রমণের মুখে এসে পড়লেন। সেখানে ধরাবাঁধা নিয়মই যেন সব, আর্ট হিসেবে ‘গো’ খেলাটায় সে সম্ভ্রম ও সৌন্দর্যের দিক, সেটা সেখানে অন্তর্হিত, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধার সেখানে কোনও স্থান নেই, মানুষ হিসেবে পারস্পরিক সম্মানবোধকে কোনও গুরুত্ব সেখানে দেওয়া হয় না। ‘গো’ খেলাটার ধরণ থেকে জাপান এবং প্রাচ্যের সুষমা যেন অন্তর্ধান করেছে। সবটাই হয়ে গেছে বিজ্ঞান আর নিয়মভিত্তিক। ক্রমেই উচ্চতর স্থান অধিকার করার যে পথ, সেটাই একজন খেলোয়াড়ের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর এখন, পয়েন্ট অর্জনের খুঁটিনাটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সবটা। লড়াইটা হচ্ছে যেন শুধু জেতার জন্য, কিন্তু আর্ট হিসেবে ‘গো’ খেলাটার যে সম্ভ্রমের দিক ও সুবাস, সেটা মনে রাখার আর কোনও স্থান নেই। আধুনিকতার পথে চলতে গেলে লড়াইতে সবটা জোর এখন এক বিমূর্ত ন্যায়ের শর্তাবলীর ওপর, এমনকি লড়াইটা যখন স্বয়ং গুরুর সঙ্গে, তখনও।

হয়তো এ কারণেই, জাপানবাসীর উদ্দেশ্যে একজন বলেছিলেন :

অতএব এই আধুনিক সভ্যতার যাবতীয় প্রবণতা, প্রক্রিয়া ও কাঠামো সুদ্ধ হালকাভাবে এটাকে আপনারা গ্রহণ করতে পারেন না। এটি যে একেবারে অবধারিত কিছু, সেই স্বপ্নও দেখা উচিত নয়। প্রাচ্যের যে মনটি পেয়েছেন, সেটিকে প্রয়োগ করতেই হবে, আপনাদের আধ্যাত্মিক শক্তি, অনাড়ম্বরের প্রতি আপনাদের টান, সামাজিক দায়বদ্ধতাকে যে স্বীকৃতি আপনারা দেন, এই সবকিছুকেই প্রয়োগ করতে হবে। প্রগতির যে দিশাহীন জড়ভরত শকট চলার পথে তীক্ষ্ণস্বরে উচ্চগ্রাম বেসু্রো কোলাহল সৃষ্টি করতে করতে চলেছে, তার জন্য একটা নতুন পথ কেটে দিতে, এটুকু আপনাদের করতেই হবে… প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনারা আপনাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট সহকারে উপলব্ধি করেছেন, চিন্তা করেছেন, কাজ করেছেন, উপভোগ করেছেন এবং উপাসনা করেছেন; সেসবকে পুরনো বসনের মত পরিত্যাগ করে যাওয়া সম্ভবই নয়… মানুষের যে সমস্ত সমস্যা, একসময় আপনারা নিজেদের সন্তোষ সাধনের যোগ্য উপায়ে তার সমাধানও করেছেন, আপনাদের একটা নিজস্ব জীবনদর্শন ছিল এবং জীবনধারণ যে একটা আর্ট, নানা বিবর্তনের মাধ্যমে তার একটা পর্যায়ে উপনীত হয়েছিলেন। এর সবকিছুই বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনাদের প্রয়োগের অপেক্ষায় আছে…

মানবসভ্যতার মহাসম্মিলনে যে সমস্ত প্রশ্ন আজ ইয়োরোপ পেশ করেছে, এশিয়া আপনাদের কন্ঠে তার উত্তর যোগাবে। আপনাদের এই ভূখণ্ডে সাধিত হবে সেইসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা যার মাধ্যমে পূব পালটে দেবে আধুনিক সভ্যতার নানা দিককে, আর তাতে প্রতিষ্ঠা করবে প্রাণ…

এই যে কথাগুলি, বলেছিলেন একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৬ সালের ১১ জুন টোকিও ইম্পীরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন এসব কথা। তাঁর কথাগুলো জাপানিরা তখনও বিশ্বাস করতো, এখনও করে। দু’শো বছরের জগত-বিচ্ছিন্নতার অবসানে  (১৮৬৮) ‘মেইজি’ যুগে জাপান যখন আবার বিশ্বের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হল, বিদেশি স্থাপত্য, বিদেশি জীবনযাত্রার ধরন সমাজে প্রবলভাবে প্রবেশ করে সামাজিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলোর দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হতে থাকল, সেই তখন থেকেই জাপানি সাহিত্যে ফুটে উঠতে থাকল নিজেদের আভিজাত্যের সংস্কৃতির, উচ্চ নান্দিকতাবোধসম্পন্ন প্রাত্যহিক অভ্যাসের টিঁকে থাকা ও বহমানতা নিয়ে উৎকন্ঠা, যা আজও অব্যাহত আছে। এমনকি ইংরেজি সাহিত্যের এক উচ্চখ্যাতিসম্পন্ন লেখক, শৈশবেই দেশান্তরিত কাজুও ইশিগুরোর বিভিন্ন উপন্যাসেও এই প্রসঙ্গ অসম্ভব সংবেদনশীলতার সঙ্গে ধরা আছে। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি কি অটুট থাকবে, জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বহু সাধনায় অর্জিত জাপানি সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য কী টিঁকিয়ে রাখা যাবে। না রাখা গেলে সেই বিষময় পরিণতির ট্রাজেডির মোকাবিলা তারা কীভাবে করবে? অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন ও অন্তঃসলিল ধারাবাহিকতার মধ্যে কী আপস সম্ভব? এটাই সেখানকার জাতীয় উৎকন্ঠা, ব্যাপক সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রীয় বিষয়। সময়ের কাছে, বাকি পৃথিবীর কাছে, জাপান কতখানি আত্মসমর্পণ করবে, তারপরে কতটাই বা জাপান হিসেবে অক্ষুন্ন থাকবে সেই দেশ?

মেইজি যুগে জাপানের বুকে নেমে আসা অপ্রতিরোধ্য পাশ্চাত্য-প্রভাবের জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া বয়ে গিয়েছিল দু’টি ভিন্ন খাতে। সম্রাটের পরিবর্তে যখন শাসনভার তুলে নিল নির্বাচিত  সংসদ, সামুরাইদের জায়গায় দেশকে রক্ষা করার ভার ন্যস্ত হল মিলিটারির ওপরে, তখন ‘মিলিটারিস্ট’রা বেছে নিল দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আগ্রাসী কর্মকাণ্ডকে। জাপানের সামরিক শক্তিকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে হবে, এই ছিল তাদের ব্রত। আর অন্যদিকে রইল জাপানের আভিজাত্যের সংস্কৃতির নান্দনিকতায়, ঐতিহ্যে আস্থাশীল শিল্পী, সাহিত্যিকরা। লেখক কাওয়াবাতা ইয়াসুনারি, মিশিমা ইউকিও, এঁরা এই দ্বিতীয় দলে। এঁরা মনে করতেন যে সম্রাট হলেন নান্দনিক প্রেরণার চূড়ান্ত প্রতীক, জাপানের স্থাপত্য, ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক উৎসব, এসবের মধ্যেই ধরা আছে এক মহান ও সার্থক জীবনচর্যার পথনির্দেশ। কিন্তু সময় কী দেবে সেই ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন থাকতে? পাশ্চাত্যের অনুকরণের যে ঝোঁক সাধারণ মানুষের পক্ষে অগ্রাহ্য করা ক্রমেই যত অসম্ভব হয়ে উঠছিল, ততই এঁরা ঐতিহ্য বিলোপের আশঙ্কায় বিষাদাক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন। উৎকণ্ঠার তখন দু’টি মুখ্য উপাদান ছিল : একদিকে অন্য সভ্যতার প্রতি সংশয় ও আশঙ্কার মনোভাব, অন্যদিকে সময়ের থাবা এড়ানোর আকুলতা, সময়ের ঊর্ধ্বে উঠে কি সংরক্ষণ করা যায় সত্ত্বার কোনও অংশ, এই প্রশ্ন। ১৯১৬-তে রবীন্দ্রনাথের বার্তা আমরা শুনলাম, ১৯৫৪-তে কাওয়াবাতার উপলব্ধিও আমরা জানলাম।

১৯৬৪ থেকে ১৯৭০, এই ছ’বছরে চারটি উপন্যাসের এক টেট্রালজি লেখেন মিশিমা ইউকিও, নাম, হোজো নো উমি, অর্থাৎ উর্বরতার সমুদ্র। পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব ও বিস্তার আর প্রাচ্যের, বিশেষত জাপানের জীবনদর্শনের ক্রমেই ঘনিয়ে ওঠা সংকটের চিত্র আঁকলেন, হারুনো ইউকি, হোম্‌বা, আকাৎসুকি নো তেরা আর তেননিন্‌ গোসুই, এই চারটে উপন্যাসে। জানালেন যে যদি সভ্যতার এই অভিমুখ অপরিবর্তিত থাকে, পৃথিবী থেকে সুকুমার বৃত্তি, সৌন্দর্যের ধারণা, জীবনের অধিকাংশ সম্ভাবনা শিগগিরিই একদিন অন্তর্ধান করবে। দেবদূতেরা আর আসবে না। প্রথম উপন্যাসের দেবদূত কিয়োআকি নামের এক অনিন্দ্যকান্তি যুবা, সে ঘনিষ্ঠতম বান্ধব হোন্দাকে বলছে (কাহিনীকাল রবীন্দ্রনাথের ভাষণের দশ কি বারো বছর পরে),

একটা অভিনব যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ; এই যুগটাই হচ্ছে আবেগ নিয়ে যুদ্ধের। এমন একধরণের যুদ্ধ যা কেউ দেখতে পায় না, কেবল অনুভব করতে পারে— সেই কারণেই, যারা অল্পবুদ্ধি আর নির্বোধ, তাদের কখনোই যুদ্ধটা চোখে পড়বে না। কিন্তু পূর্ণউদ্যমে এটা শুরু হয়ে গেছে। যে তরুণেরা এই লড়াইটা লড়বে বলে ঠিক হয়েছে, তারা যুঝতে শুরু করে দিয়েছে।

তাইশো যুগ তখন সবে সাঙ্গ হয়েছে, দেশ ভয়ানকভাবে পশ্চিমী প্রভাব ও পশ্চিমী অনুকরণের কবলে। কেবল এই দু’জনের মানসিকতা তার থেকে ভিন্ন, তারা চায় একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। কিন্তু যদি তারা সফল না হয়? তাহলে কি ওদের প্রতিরোধ আর আপত্তিগুলো অর্থহীন বলে প্রতিপন্ন হবে? কিয়োআকি বলেন,

ধরা যাক, ইতিহাস যে পথে চলেছে আমি তা পরিবর্তন করতে চাই। তার জন্য আমি না হয় আমার সমস্ত উদ্যম ও আমার ভাণ্ডারে যা কিছু আছে তা উৎসর্গ করলাম। আমার বাসনা অনুযায়ী ইতিহাসের অভিমুখ বদলে দিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করলাম। ধরা যাক, সে কাজ হাসিল করার মত সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকার আমার আছে। কিন্তু এর কোনোটাতেই এটা নিশ্চিত করা যাবে না যে ইতিহাস আমার ইচ্ছা অনুযায়ীই এগিয়ে যাবে। অন্যদিকে আবার, এমন হতে পারে যে একশো বছর কী দু’শো বছর, এমনকি তিনশো বছর বাদেও হয়তো ইতিহাস হঠাৎ করেই এমন খাতে বয়ে গেল যার সঙ্গে আমার দূরদৃষ্টির, আমার আদর্শের মিল আছে—এবং এটা ঘটায় হয়তো আমার কোনও হাতই রইল না। হয়তো সমাজ এমন একটা রূপ পরিগ্রহ করল যা একেবারে হুবহু, একশো কী দু’শো বছর আগের আমার স্বপ্নের সঙ্গে মিলে যায়; ইতিহাস তার এই নূতন গরিমায়, যা কিনা ধরা ছিল আমার মানসে, আমার প্রতি কিঞ্চিত প্রশ্রয়ের হাসি হাসবে এবং সেটা আমার উচ্চাশাকে খানিক ব্যঙ্গই করেই। আর লোকে বলবে : ‘আরে, ইতিহাস তো এরকমই’।

দু’টো তাহলে মূল চ্যালেঞ্জ : প্রথমটা হল, সভ্যতার অগ্রগতি সম্বন্ধে পাশ্চাত্যের মডেল আর প্রাচ্যের ঐতিহ্যের সংঘাতের পরিণতি কী, করণীয়ই বা কী, আশ্বাসের কিছু থাকলে সেটাই বা কোথায়, আর অন্যদিকে সময়, নিয়তই দিগভ্রান্ত করে তোলা পরিবর্তনশীল সময়ের কবলে পড়ে যে অসহায়তা, তার থেকে মুক্তির কি কোনোই উপায় নেই? অবাক হয়ে যেতে হয়, কতভাবে প্রগাঢ় বিচক্ষণতায় এর চর্চা করেছেন জাপানের সমাজ-চিন্তকেরা, যাদের মধ্যে একটা বড় অংশই চিন্তাকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে অবলম্বন করেছেন আখ্যানমূলক সাহিত্যকে। ২০০২-তে এসে হারুকি মুরাকামির উপন্যাস ‘উমিবে নো কাফকা’ (বাংলা অনুবাদে ‘সমুদ্রতটে কাফকা’) যখন প্রকাশিত হল, তখনও প্রসঙ্গটার গুরুত্ব এতটুকু কমেনি, চিন্তার উদ্যম এতটুকু শিথিল হয়নি। আমরা দেখেছিলাম ইতিহাসের বিচিত্র গতি মিশিমার উপন্যাস ‘হারু নো ইয়ুকি’র নায়ক কিয়োআকির মনে জাগিয়ে তুলেছিল নানা প্রশ্ন আর এক বিপন্ন বিস্ময়। ইতিহাস সৃষ্টিতে এমনকি হারিয়ে যাওয়া, ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে বিযুক্ত সব চিন্তা, উপলব্ধি ও স্বপ্ন কীভাবে অবদান রাখে মিশিমা তাঁর টেট্রালজিতে আভাসে এক ব্যাখ্যা রেখেছিলেন। দার্শনিক অসঙ্গের মহাযান সম্‌পরিগ্রহ শাস্ত্রের থেকে একটি গাথা উদ্ধৃত করলেন তিনি, যার নাম, মহাযান অভিধর্ম সূত্র।

সমস্ত ধর্মই বিধৃত হয়ে আছে চেতনায়
আর, চেতনা বিধৃত আছে সার্বিক ধর্মে,
এই দু’টিই দু’টির পারস্পরিক কারণ
এবং সর্বদাই পারস্পরিক পরিণতি।

ধর্মে বস্তুর বাহ্যিক পরিচয়, আর সেই পরিচয়ের উৎসে রয়েছে চেতনার ভূমিকা। বিপরীত দিকে বস্তুর ধর্মকে অবলম্বন করেই চেতনার প্রকাশ। এক অবিচ্ছিন্ন ধারায় পরস্পর অবিভাজ্য থেকে এরা কার্য ও কারণের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে পালন করে যায়। সেকথাকেই আরো প্রত্যক্ষ ও সহজে অনুধাবনযোগ্য করতে মুরাকামি যেভাবে লিখলেন, তাতে ‘সমুদ্রতটে কাফকা’ উপন্যাসে একজায়গায় আমরা দেখছি :

গোলকধাঁধার আইডিয়াটা সর্বপ্রথম মাথায় এসেছিল, এখন অবধি যা জানা গেছে, অতীতযুগের মেসোপটেমিয়ার লোকেদের। ওরা পশুদের নাড়িভুড়ি, কিংবা হয়তো কখনও মানুষের নাড়িভুড়ি বের করে এনে, সেটার অবয়বের ধরনটা থেকে ভাগ্যগণনা করত। আর সেই জটিল ধরনটার খুব তারিফ করত। অতএব গোলকধাঁধার ভিত্তি হচ্ছে নাড়িভুড়ি। অর্থাৎ কিনা, গোলকধাঁধা জিনিসটার সূত্রটা তোমার ভেতরেই আছে। আর সেটাই হয়ে যাচ্ছে তোমার বাইরের ওই গোলকধাঁধা জিনিসটা।”     

“মেটাফর,” আমি বলি।

“একেবারেই। পারস্পরিক মেটাফর। তোমার বাইরের জিনিসগুলো তোমার ভেতরের জিনিসগুলোর ইমেজ, আর তোমার ভেতরের জিনিসগুলো তোমার বাইরের জিনিসগুলোর প্রতিমূর্তি। সেই কারণে, অনেক সময়ই তুমি তোমার বাইরে থাকা গোলকধাঁধায় পা বাড়িয়ে, তোমারই ভেতরে সেট করা গোলকধাঁধায় পদার্পণ করছ…”

এই যে চেতনা কিংবা ধারণা ও বাহ্যিক বস্তুগত রূপের অবিভাজ্যতা, পারস্পরিক ও পারম্পরিক কার্যকারণ সূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ অস্তিত্ব, এরই বিস্তার যেন মনুষ্যচেতনায় মেটাফরের কার্যকারিতায়। মেটাফর জিনিসটার স্বরূপ, এবং প্রাচীনকাল থেকে কী জাপানি সাহিত্যে, কী গ্রিক নাটকে, তার প্রবল উপস্থিতি, বারবার এই উপন্যাসের একটা মুখ্য প্রসঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মেটাফর জিনিসটার যে মানুষের ধারণায়, চিন্তায়, কল্পনায় কোনও ভূমিকা আছে, এটাই কি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ নয়? বাহ্যিক রূপের নিরিখে, ভৌগলিক অবস্থিতির নিরিখে, সময়কালের নিরিখে কোত্থাও যে দু’টো জিনিসের মধ্যে কোনও সাধারণ লক্ষণ নেই, তারা কী করে অবধারিতভাবে একে অপরের ইঙ্গিত হয়ে দাঁড়ায়? আশ্চর্য না? তবে কি পৃথিবীতে যা কিছু বস্তুগত বৈচিত্র, ধারণাগত বিভিন্নতা, একক মানুষের চেতনার স্বাতন্ত্র্য, সবই আপতিক, মূলে কি কোথাও এরা একই সত্ত্বার ভিন্ন ভিন্ন ছায়া?
মুরাকামি এই উপন্যাসে আবার প্রাচ্যের একটি দর্শনের দ্বারস্থ করালেন জাপানকে। তারপর ধীরে ধীরে সেই দর্শনের পূর্ণতার প্রমাণ হিসেবে, সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে এমনকি ব্যক্তিরও জীবনচর্যা, জীবনবীক্ষার একটা মডেলের আভাস রাখলেন. যা এই অস্থির সময়ে সারা পৃথিবীর পাঠকবর্গকে এক নতুন চোখে দেখতে শেখাল এই জটিল, বহুমাত্রিক সময়কে। প্রাচীন দৃষ্টিকেই নবীন চক্ষুতে স্থাপন করলেন সময়ের প্রয়োজনে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নাকাতা-সান আসলে এই সুনির্দিষ্ট দর্শনেরই একজন মূর্ত প্রতিনিধিত্ব। নাকাতার শক্তি এই দর্শনের শক্তি। শৈশবের এক রহস্যময় দুর্ঘটনায় নাকাতা স্মৃতিভ্রষ্ট, তাই সে পড়তে পারে না, জীবনের সহজ অভিজ্ঞতা ও অন্তরের সাড়াই নাকাতার পথপ্রদর্শক, জীবনযাপনের অতিরিক্ত কোনও বিচ্ছিন্ন জ্ঞানচর্চা থেকে সে কিছু আহরণ করতে পারে না। তার চিন্তা্র ক্ষমতা, বুদ্ধি, হৃদয়বত্তা সেই কারণেই যে-কোনও যুগের যে-কোনও মানুষের মধ্যেই পাওয়া সম্ভব, সময়ের আবরণে তার কোনও সাময়িক রূপ নেই। আর এইভাবেই সে সময়ের ঊর্ধ্বে ওঠা এক মানুষী সম্ভাবনা। নাকাতার চিন্তায় অশুভের কোনও স্থান আমাদের চোখে পড়ে না, আবার নানা জটিল পরিস্থিতিতে দেখা যায় যে সে-ই সবচেয়ে অচঞ্চল অথচ কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে। আর সেইখানেই যেন, এই লেখার একদম শুরুতে দস্তইয়েভস্কির যে বিশ্বাসের কথার উল্লেখ করেছি, তার সঙ্গে চোখে পড়ার মত মিল নাকাতা চরিত্রটার মধ্যে দিয়ে মুরাকামি যে বার্তা দিতে চাইছেন, সেটির। দস্তইয়েভস্কির যেটা নিজের বিশ্বাস, সেটাকে সমস্ত পৃথিবীর আপামর মানুষের মধ্যে জারিত করতে চাইছেন মুরাকামি এই উপন্যাসে— যা শুভ, সেই শক্তি- যা তাকে নশ্বরতার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে আর সে ব্যাত্যয়হীনভাবে বিরাজ করছে মানুষের স্বভাবের মধ্যে, মানুষের ইতিহাসের মধ্যে। দস্তইয়েভস্কির ‘দি ইডিয়ট’ (ইংরিজি অনুবাদে) উপন্যাসের অপাপবিদ্ধ যুবা প্রিন্স মিশকিনের ছায়া কেউ হয়তো প্রৌঢ় নাকাতার মধ্যে দেখতেও পারেন, কিন্তু এই জাপানি উপন্যাসে নাকাতাকে অবলম্বন করে নানা খুঁটিনাটি দিকসহ একটি নির্দিষ্ট দর্শন যে সার্বিকতায়  উপস্থাপিত, সেটা ‘দি ইডিয়ট’ উপন্যাসের উদ্দেশ্য ছিল না। যদি মনে প্রশ্ন জাগে, বাংলা সাহিত্যের কোনও কালোত্তীর্ণ সৃষ্টিতে, সব সংশয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জোর দিয়ে একথা উচ্চারিত হতে কি আমরা শুনেছি, তবে, ঠিক এই মুহূর্তে জীবনানন্দ দাশের অন্তত এই লাইন ক’টা তাকে মনে করিয়ে দিই!

মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভাল হ’ত এই মনে ক’রে ;
এসে যে গভীরতর লাভ হ’ল সে-সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে ;
দেখেছি যা হ’লো হবে মানুষের যা হবার নয়—
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকল অনন্ত সূর্যোদয়।

সময়ের ঊর্ধ্বে ওঠা, ভৌগলিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে ওঠা মানুষী সম্ভাবনাকে যদি বলি মানুষের ধর্ম, তবে তা সর্বকালে, সর্ববৈশিষ্ট্যের মানুষের জন্যই সত্য, রবীন্দ্রনাথের ইউনিভার্সাল ম্যান বা বিশ্বমানবের ধারণার ভিত্তি। কিন্তু সত্যিই কী সেরকম কিছু হয়, আছে কী মানুষের তেমন একটি সত্ত্বা, মানুষ কী তার সন্ধান পায়? এই উপন্যাসে মুরাকামির মুখ্য বার্তাটিই হচ্ছে যে সেই সন্ধানই সভ্যতার, ইতিহাসের আরদ্ধ যাত্রা, আর তার খোঁজ পেতেই হবে। বলাবাহুল্য, আমরা বুঝে নিই যে শুধু জাপানকে নয়, সারা পৃথিবীর যাবতীয় সভ্যতাকেই মানুষের সেই অন্তরতর সত্যের খোঁজে বেরুতে হবে। পনেরো বছর বয়েসি কাফকা তামুরা, হয়ে উঠতে চাইছে অকুতোভয়, অদম্য, অবিচল শক্তির অধিকারি এক কিশোর। মফস্বলের কোওমুরা লাইব্রেরিতে কাজ করতে করতে সে সেখানকার ঊর্ধ্বতন অধিকর্তা, পঞ্চাশোর্ধ্ব সাএকি-সানের প্রেমে পড়েছে, শারীরিক সম্পর্কও হয়েছে। লাইব্রেরির দোতলায় সাএকি-সানের ঘরে একদিন কথা প্রসঙ্গে :

গভীর কৌতূহল নিয়ে সাএকি-সান আমাকে দেখেন। “কিন্তু সময় বলে একটা জিনিস যতক্ষণ আছে, যে কেউই শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায়, চেহারাটাই কেবল যে পালটায়, তা তো নয়। একসময় না একসময়।”

“কখনো না কখনো হারিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু নিজেকে ফিরে পাওয়ার একটা জায়গা থাকাটাও জরুরি।”  

“নিজেকে ফিরে পাওয়ার জায়গা?”

“ফিরে পাওয়ার মত একটা জায়গা যার কোনো মূল্য আছে।”

সাএকি-সান সরাসরি আমার মুখের দিকে শান্ত ভাবে চেয়ে থাকেন…  

 “১৫ বছর বয়েসে, আমার সবসময় মনে হত একটা অন্য কোনও জগতে চলে যাই,” অল্প হেসে সাএকি-সান বললেন। “যেখানে কারুর হাত পৌঁছোয় না। সময়ও যেখানে স্থির।”

ঠিক এরকম একটা সম্ভাবনার কথাই আমরা এতক্ষণ চর্চা করছিলাম—একটা জায়গা যেখানে ফিরতে পারলে তার একটা মূল্য আছে, আর সেই জায়গাটা কালাতীত, সময় সেখানে থাবা বসানোর কথা ওঠে না। সেই জায়গাটাই মানুষের ধর্ম, ভূগোল নির্বিশেষে, পরিচয় নির্বিশেষে, সময় নির্বিশেষে, বিশ্বমানবের স্বরূপটি। কথায় কথায় কিশোর কাফকা তামুরা একদিন সাএকি-সানকে জানিয়েছিল যে সে নিজে হচ্ছে বাসায় ফিরতে গিয়ে পথ হারানো দলছুট কাকের মত। চেক ভাষায় কাফকা মানে কাক, তাই সে কাফকা। ‘কাফকা তামুরা’ উপন্যাসের একটা কল্পিত চরিত্রমাত্র, যে সাহিত্যে একটা জাতির পরিণতির প্রশ্নটাই ব্যত্যয়হীনভাবে কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে একশতাব্দী ধরে, আমরা কি স্বাভাবিকভাবেই ধরতে পারব না যে এটা আসলে সভ্যতা হিসেবে জাপানের নিজস্ব জায়গাটা খুঁজে পাওয়ারই প্রশ্ন? পশ্চিমী সভ্যতার একাধিপত্যে ও পরোক্ষ নির্দেশে চালিত ঠিক এই বর্তমান থেকে যে আশঙ্কায় ক্লিষ্ট হয়ে জাপানের এই বিশেষ বিপন্নতা, উদ্বেগ, তার পরিপ্রেক্ষিতে কোন পথ তবে খুঁজতে হবে, কোন নীতিকে অবলম্বন করে? একদিন সকালে কাছেই একটা ছোট শহরের জিমে গিয়েছিল কাফকা তামুরা, শরীরচর্চা করতে। লাইব্রেরিতে ফেরার পর, সাএকি-সানের ঘরে কফি দিয়ে আসতে গিয়ে বলে :

“ওশিমার থেকে শুনলাম, জিমে গিয়েছিলে” আমার মুখের দিকে তাকিয়ে উনি বললেন।     

“হ্যাঁ, গিয়েছিলাম,” আমি বললাম।

“জিমে গিয়ে কী ধরনের ব্যায়াম কর?”

“যন্ত্র দিয়ে আর ওয়েট নিয়ে.” আমি উত্তরে বলি।

“এছাড়া,” আমি মাথা নাড়ি।

“একার জন্য স্পোর্টস।” সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিই।

“নিশ্চয়ই শক্তিশালী হয়ে উঠতে চাও তুমি?”

“শক্তিশালী না হতে পারলে তো বেঁচে থাকাই যাবে না। বিশেষ করে আমার ক্ষেত্রে।”

“তুমি খুব একা বলে।”

“কেউ তো আর বাঁচাতে আসবে না। অন্ততপক্ষে এখন অবধি কেউ বাঁচাতে আসেনি। তাই নিজের জোরেই টিঁকে যেতে হবে। তারজন্য শক্তিশালী হওয়াটা খুব জরুরি। দলছুট কাকের মত। তাই আমি নাম নিয়েছি কাফকা। চেক ভাষায় কাফকা হল কাক।”

“হুঁউঁ” যেন খানিকটা তারিফের সুরেই উনি বললেন। “তুমি তাহলে কাক।”

“সেরকমই” আমি বলি। 

কারাসু নামের ছেলেটা বলে :

“কিন্তু সেভাবে বেঁচে থাকারও তো একটা সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। শক্তিকে প্রাচীরের মত করে নিয়ে, তার ভেতরে জীবনকে একটা ঘেরাটোপের মত করে রাখতে পারা যায় নাকি। শক্তি মানেই অধিকতর শক্তির কাছে যা পরাস্ত হয়। যুক্তি তো তাই বলে।”

“যেহেতু শক্তি জিনিসটাই নৈতিকতা হয়ে পড়ে।”

সাএকি-সান স্মিত হাসেন। “তোমার বোধবুদ্ধি তারিফ করার মত।”

আমি বলি, “আমি যেটা চাইছি, যে শক্তিটা চাইছি, সেটা জেতা বা হারার শক্তি নয়। বাইরের কোনও শক্তিকে প্রতিরোধ করার মত প্রাচীরের দরকার নেই। আমার দরকার বাইরের থেকে আসা ক্ষমতাকে গ্রহণ করে, সেটাকে সামলে ওঠার মত শক্তি। বৈষম্য কি দুর্দৈব, কিংবা দুঃখ, ভুল বোঝাবুঝি, সহমর্মিতার অভাব—এইসব যেন শান্তভাবে সামলে উঠতে পারি, এমন শক্তি।”

“সে জিনিস সম্ভবত, এমন শক্তি যা হাসিল করা সবচেয়ে কঠিন।”

“সে আমি জানি।”

ওঁর স্মিত হাসি যেন আরেক প্রস্থ গভীর হল। “তুমি অবশ্যই যেকোনো কিছুই জান।”    

পশ্চিম থেকে যা কিছু গ্রহণ করতে হচ্ছে জাপানকে, যা মোটেই জাপানের ঐতিহ্য নয়, তা কি জাপানের সমাজকে গ্রাস করে নেবে? নাকি পশ্চিমকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে তার থেকে যথাসাধ্য দূরত্বই বিধেয়? কিশোর কাফকা তামুরার জায়গায় জাপানি জাতিটাকেই প্রতিস্থাপিত করে দেখুন কত স্পষ্ট একটা সামাজিক দিকনির্দেশ আছে এই অংশটুকুতে। জাপানকে শক্তিশালী হতে হবে তার নিজের সত্ত্বার যেটুকু মানবধর্মের আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে, সেটাকেই অভীষ্ট হিসেবে সামনে রেখে। বাকি যেটুকু বাইরে থেকে সে নেবে, তা যেন জাতিকেই পরাভূত করে চরিত্রের কেন্দ্রে আসীন হয়ে বসতে না পারে। পশ্চিমী সাহিত্য সমালোচকেরা এই ‘কারাসু’ নামে ক্ষণে ক্ষণে কাফকার মনে আবির্ভূত হওয়া চরিত্রটিকে কিশোরের ‘অলটার ইগো’ বলে চিহ্নিত করে ভারি তৃপ্তি পেয়েছে, কিন্তু জাপানি কারাসু শব্দের অর্থ কাক হলেও, কিশোরের মনোভূমিতে বিচরণ করা এই কাক বা কারাসু নামে ছেলেটি আসলে তার (মানুষ হিসেবে) ধর্মবোধ ও তজ্জনিত প্রজ্ঞা, যা ভূগোল ও গোষ্ঠিগত পরিচয় নিরপেক্ষ এবং শাশ্বত। নৈতিকতার প্রশ্নে যখনই বিবেকের নির্দেশ প্রয়োজন তখনই সে কিশোরের অন্তরে আবির্ভূত হয়ে সঠিক বিচারটি যুগিয়ে দিতে থাকে।

মানুষের, জনগোষ্ঠীর, সভ্যতার এই শাশ্বত সত্যের মুখ্য দিকগুলো তাহলে কী কী বলে এই উপন্যাসে প্রতিপন্ন করা হচ্ছে? বোকাসোকা নাকাতাকে দয়া করে নিজের ট্রাকে তুলে গন্তব্যের দিকে কিছুদূর পৌঁছে দিতে রাজি হয়েছে ট্রাক-ড্রাইভার হাগিতা-সান। যাওয়ার পথে তাদের মধ্যে একথা সেকথা হতে থাকে :

“কিছু মনে করবেন না, নাকাতার মাথাটা ভাল নয় কিনা, এই ধরণের ব্যাপার সবটা জানা নেই” নাকাতা জানায়।

“নিজের একটা মত থাকা, আর মাথাটা ভাল কিংবা মন্দ হওয়া তো আলাদা ব্যাপার।”

কিন্তু হা-গি-তা সান, মাথাটা ভাল না হলে, কিছু নিয়ে চিন্তাই তো করা যায় না।”

“কিন্তু আপনার ঈলমাছ ভালো লাগে, তাই তো?”

“হ্যাঁ, নাকাতার ঈলমাছ ভাল লাগে।”

“সেটাকেই একটা সম্পর্ক বলে বলা হয়।”

“আচ্ছা।”

“নাকাতা-সানের ওয়য়াকো দোমবুরি (ভাতের ওপর চিকেন আর ডিম) ভাল লাগে?” 

“হ্যাঁ, ওয়য়াকো দোমবুরিও নাকাতার ভাল লাগে।”

“সেটাও আবার একটা সম্পর্ক”, ড্রাইভার বলে। “এইভাবে সম্পর্ক একটা একটা করে একত্র করলে, তাতে আপনা থেকেই অর্থ জিনিসটা জন্ম নেয়। অজস্র সম্পর্ক জড়ো করতে পারলে অর্থও অনেক গভীর হয়। ঈলমাছ হোক, ওয়য়াকো দোমবুরি হোক, বেক্‌ড্‌ ফিশের পদ হোক, যাই হোক না কেন। বুঝলেন?”

“ভাল বুঝলাম না। খাবার দিয়ে সম্পর্ক হওয়ার ব্যাপারে কিছু বললেন কি?”

“খাবার বলে কথা নেই। ট্রেন হতে পারে, সম্রাট হতে পারেন, যে কোনো কিছুই হতে পারে।”

“নাকাতা ট্রেনে চড়ে না।”

“সে ঠিক আছে। তাই বলছি যে, আমি যেটা বলতে চাইছি, সেটা হল, অন্য যার কাছেই হোক, এভাবে বেঁচে থাকতে থাকতে, আশেপাশের যাবতীয় কিছুর মাঝখানে আপনা থেকেই যে একজন লোকের একটা অর্থ তৈরি হয়ে যায়। যেটা সবচেয়ে জরুরি, সেটা হল জিনিসটা স্বাভাবিক বলে বলা যায় কিনা। মাথাটা ভাল না খারাপ সেটা কিছু নয়। যেটাই হোক, নিজের চোখ দিয়ে সেটা দেখছে কি দেখছে না।”  

স্বচ্ছ চেতনায় সৎভাবে যুক্ত হওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়—এটাই অর্থবহ অস্তিত্ত্বের প্রাথমিক শর্ত বলে সাব্যস্ত হচ্ছে হাগিতার কথায়। ঔপন্যাসিকও আমাদের এই চিন্তাটার মধ্যে নিক্ষেপ করে তাঁর কাহিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। সংস্কারাবদ্ধ, রীতি নির্দেশিত মনোভাব নিয়ে দূরত্ব তৈরির দায় বিচ্ছিন্নতার উৎস। আর বিচ্ছিন্নতাই নানা অনর্থের মূলে। কাহিনির নানা অংশে আমরা এর স্পষ্ট ইঙ্গিত পাই। বসতির একটু দূরে, পরিত্যক্ত ঘাসজমিতে একটা বিচ্ছিন্ন জায়গায় যখনই বিড়ালেরা গিয়ে পড়ে, লম্বা টুপিপরা একজন লোক এসে তাদের ধরে নিয়ে যায়। নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওষুধ দিয়ে তাদের সর্বাঙ্গ অসাড় করে নিয়ে, মাথাগুলো কেটে নেয়, জমিয়ে রাখে ফ্রিজের ভেতরে। এই বিড়ালদের আত্মাগুলোকে একত্র করে সে একটা বিশাল বাঁশি বানাবে। মুরাকামির অজস্র কাহিনিতে আমরা দেখেছি, বিড়ালেরা হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উষ্ণ সম্পর্কের আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। বর্তমান পৃথিবীর প্রতিটি পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে যে বিচ্ছিন্নতার অপ্রতিরোধ্য উপস্থিতি এবং ক্রমব্যাপ্তি, তার ভিত্তিতেই ওই বেড়ালধরা লম্বা টুপি পরা লোকটার বাঁশির পরিকল্পনা ও উপযোগিতা। খুঁজে খুঁজে সেই টুপি পরা লোকটার আস্তানা বের করে নাকাতা দেখে, ব্ল্যাক লেভেল জনি ওয়াকার হুইস্কির বোতলে যার ছবি থাকে, এ হচ্ছে সেই লোকটা, হুবহু একই পোশাক, একই চেহারা! বিশ্বজুড়ে ভোগবাদী জীবনের যে নেশা আর তাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা বিশাল বাণিজ্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সে প্রতীক। এই জনি ওয়াকার নাকাতাকে জানায় যে সে একটা বাঁশি বানাবে।

জনি ওয়াকার খিকখিক করে হাসল।

“বলি তাহলে, আমি যে এভাবে বেড়াল মারছি, সে কেবল মজা পাচ্ছি বলে মারছি, তা নয়। শুধুমাত্র মজা পাওয়ার জন্য অতগুলো বেড়াল মারার মতো অসুস্থ মানসিকতা আমার নয়। বলতে কি, আমি ততটা বেকার লোক নই। কেননা, এভাবে বেড়াল জড়ো করে মেরে ফেলতেও বেশ পরিশ্রম লাগে। আমি বেড়াল মারি, ওদের আত্মাগুলোকে একত্র করতে। ওই জড়ো করা বেড়ালের আত্মা দিয়ে একটা বিশেষ রকমের বাঁশি বানাব। তারপর সেই বাঁশি বাজিয়ে, আরো বড় আত্মা সব জড়ো করব। সেই আরো বড় সব আত্মা একত্র করে, আরো বড় বাঁশি বানাব। সবশেষে, সম্ভব হলে একটা মহাজাগতিক বিশাল বাঁশি বানানোর কথা। কিন্তু সবার প্রথমে বেড়াল। বেড়ালের আত্মা জড়ো না করলে চলবে না। ওটা স্টার্টিং পয়েন্ট। সবকিছুতেই একটা কোনো সুনির্দিষ্ট অনুক্রম মেনে এগোতে হয়। এই অনুক্রমটিকে নিখুঁতভাবে পালন করাটা হচ্ছে, এককথায় এটাকে মর্যাদা দেওয়া। আত্মা নিয়ে কিছু করা তো, এরকমই হওয়া উচিত। আনারস কি তরমুজ নিয়ে কাজ করার চেয়ে এ আলাদা। ঠিক কিনা?”

“হ্যাঁ” নাকাতা উত্তরে বলল বটে, কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ব্যাপারটা কী। বাঁশি? সোজা বাঁশি না আড়বাঁশি? আর তার আওয়াজই বা কেমন হবে? প্রথমত, বেড়ালের আত্মা জিনিসটাই বা কেমন জিনিস? এ তো নাকাতার বুদ্ধির নাগালের অনেক বাইরের সমস্যা। সে শুধু জানত, যেভাবেই হোক, তিনরঙা বেড়াল গোমাকে খুঁজে বের করে, সঙ্গে নিয়ে কোইজুমি-সানের ওখানে ফিরতে হবে।

“কিন্তু, আপনি যে করে হোক, গোমাকে নিয়ে ফিরতে চান” জনি ওয়াকার যেন নাকাতার মনের কথা পড়তে পেরে বলল।

“হ্যাঁ। ঠিক তাই। আমি গোমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইছি।”

“সেটা আপনার উদ্দেশ্য”, জনি ওয়াকার বলে। “আমরা সবাই নিজের নিজের উদ্দেশ্য অনুসারে বাঁচি। সেটাই স্বাভাবিক। সেটা যেরকম, আপনি তো বেড়ালের আত্মা জড়ো করে তৈরি বাঁশির আওয়াজ কখনও শোনেননি, তাই না?”

“হ্যাঁ। শুনিনি।”

“সেটাই স্বাভাবিক। ওটি কিন্তু কানে শোনার জিনিস নয়।”

“আওয়াজ শোনা যায় না এমন বাঁশি তো?”

“সেরকমই। তবে, আমি অবশ্যই শুনতে পাই। আমি শুনতে পাই না, এরকম কিছু হয়ই না। তবে, সাধারণ লোকের কানে পৌঁছোয় না। সেই বাঁশির শব্দ শুনতে পেয়েও, শুনতে যে পেয়েছে সেটা বুঝতে পারে না। কখনও শুনে থাকলেও, মনে করতে পারে না। অদ্ভুত এক বাঁশি। তবে, এমন হতে পারে, নাকাতা-সানের কানে হয়তো ধরা পড়ল। এখানে সত্যিই বাঁশিটা থাকলে পরীক্ষা করে দেখা যেত, দুর্ভাগ্যবশত, এখন নেই” জনি ওয়াকার বলল।

বেড়ালদের এই নারকীয় পরিণতির হাত থেকে বাঁচাতে নিরীহ নাকাতা মরিয়া হয়ে জনি ওয়াকারকে হত্যা করে সেখানেই। যদিও উপন্যাসে দেখা যায় যে জনি ওয়াকারের কখনোই সম্পূর্ণ মৃত্যু হয় না। কাহিনির শেষাংশেও জনি ওয়াকার এবার রেড লেবেলের জনি ওয়াকার হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। তখন তাকে হত্যা করার চেষ্টা করে সেই কাক, যা কিনা মানুষের অন্তরতর সত্য, সভ্যতা টিঁকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মিক শক্তি। জনি ওয়াকার এবারও প্রস্থান করে। কিন্তু আমরা জানি বারবারই সে সভ্যতার পরীক্ষা নিতে ফিরে ফিরে আসবে।

নাকাতা হত্যা করেছিল জনি ওয়াকারকে। কিন্তু, নিজে অকুস্থলে উপস্থিত না থেকেও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ থেকে কাফকা তামুরা জানে যে নিহত হয়েছে আসলে তার নিজের বাবা। আরেক সমাজ-বিচ্ছিন্ন মানুষ, নিষ্ঠুর মানুষ, যার পরিবারের বাকি সবার থেকেও যে ক্রমে একদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু কেন এই ধন্দ, কে তাহলে নিহত হয়েছে আসলে? আর এভাবেই গভীর দর্শন, অর্থাৎ প্রজ্ঞার বিষয়টি সামনে চলে আসে, যা আজ বিজ্ঞানের দ্বারাও স্বীকৃত। বলা বাহুল্য, এই উপমহাদেশের মানুষ এই দর্শনের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই কিছুটা পরিচিত। ‘কর্ম’- মানুষের কর্মই তার চারপাশের বাস্তবতাকে নির্ণয় করে দিচ্ছে। একই পরিসরে অবস্থান করেও একাধিক মানুষের আপাত বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে যায় যার যার কর্মফলের কারণে। যেভাবে ভাস্কর বড় একখণ্ড পাথর থেকে খোদাই করে করে বের করে আনে অর্থবহ মূর্তিকে, সেইভাবেই সমস্ত অস্তিত্বের এক কালাতীত সার্বিক ভাণ্ডার থেকে একক মানুষ তার কর্ম অনুযায়ী প্রত্যক্ষ করে তার নিজস্ব বাস্তবতা। এযুগের বিজ্ঞানে কোয়ান্টাম  ফিজিক্সও এই ধারণাকে অনুমোদন দেয় যে ‘অবজার্ভার’ সাপেক্ষে ‘অবজেকট’ রূপ পরিগ্রহ করে, তার চরিত্রে প্রভেদ আসে। জাপানের ধর্মশাস্ত্রে সেই সার্বিক ভাণ্ডারের নাম হচ্ছে, ‘মু’—আভিধানিক অর্থ ‘শূন্যতা’। কাওয়াবাতা ইয়াসুনারি তাঁর নোবেল বক্তৃতায় এই ‘মু’র প্রসঙ্গ এনেছেন, খানিকটা ধারণা দিয়েছেন, এবং সাবধান করেছেন যে একে যেন কিছুতেই পশ্চিমের নিহিলিজমের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা হয়। ‘সমুদ্রতটে কাফকা’ উপন্যাসের এক জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পাওয়া নাকাতা তার সঙ্গী তরুণ হোশিনোকে প্রশ্ন করে, শূন্যের সঙ্গে শূন্য যোগ হলে কি শূন্য বেড়ে যায়? হোশিনো ভেবে কূল পায় না- শূন্যের তো বাড়ার উপায় নেই! বস্তু, চিন্তা, সময়, স্মৃতি, যাবতীয় কিছু এমন চূড়ান্ত সামঞ্জস্যে ও সাযুজ্যে সেখানে বিরাজ করে যে কোনও পৃথক লক্ষণ বা চরিত্রকে সেখানে চিহ্নিত করা যায় না। চির অজ্ঞেয়, অনুধাবনের অতীত এই ‘মু’, ফলত শূন্যতা। প্রতিটির সঙ্গে প্রতিটির সম্পর্ক যখন একেবারে সমসত্ত্বভাবে সমান তাৎপর্যে বিদ্যমান, চিহ্নবিজ্ঞান বা সেমিওটিকসের বিচারেও তখন অন্য সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে সিগনিফায়ার এবং সিগনিফায়েডের সম্পর্কের অভাবে সাইন জিনিসটারই আর পৃথক করে কোনও অস্তিত্ব থাকে না।

জাপানের জাতিগত পরিণতির প্রশ্ন উপন্যাসের উৎস হলেও, ক্রমেই মুরাকামি তার পাঠকদের এই স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন যে একটা উন্নততর পৃথিবীর জন্ম দেওয়াই যায়, শুধু উপযুক্ত স্বপ্ন দেখে, উপযুক্ত সৎ আচরণ করে, বিভাজনবিহীন জ্ঞানের চর্চার মধ্য দিয়ে ‘মু’ থেকে ভাস্করের মত করে এই পৃথিবীটাকে খুঁদে-ছেনে বের করে আনতে হবে। আর তাই ৫৩টা ভাষায় অনুবাদ হয়ে এযাবৎ ২৫ মিলিয়ন কপির বেশি বিক্রি হয়ে গিয়েও মুরাকামির এই উপন্যাসটি নিত্য নতুন পাঠক খুঁজে পাচ্ছে, নতুন নতুন অনুবাদও হচ্ছে।

কিশোর কাফকা যে সাএকি-সানকে বলেছিল, “…আমার দরকার বাইরের থেকে আসা ক্ষমতাকে গ্রহণ করে, সেটাকে সামলে ওঠার মত শক্তি…” তারই বিস্তৃত চর্চার অনুষঙ্গ হিসেবে মুরাকামি আরেকটি পশ্চিমী আইকন চরিত্রের আমদানী ঘটিয়েছেন উপন্যাসে—কেনটাকি ফ্রায়েড চিকেনের বিজ্ঞাপনে যাঁকে দেখানো হয়, কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল স্যান্ডার্স হচ্ছে সেই চরিত্র। ইনি কিন্তু ভোগবাদের নয়, পশ্চিমী জীবনীশক্তির, কর্মোদ্যমের নমুনা। কাহিনীর সেই অংশে তরুণ হোশিনো আর কর্নেল স্যান্ডার্সের কথোপকথনের মধ্যে ১৯২৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া অঁরি বার্গসোঁর নামটা উল্লেখ করে ইঙ্গিতকে আরো স্পষ্ট করলেন মুরাকামি। ইনি সাহিত্যে এনেছিলেন বিশ্বব্যাপী ঘটনাস্রোতের অন্তঃসলিল প্রাণশক্তি, জীবনীশক্তির প্রবাহ। জীবনানন্দ দাশ সেই উপলক্ষ্যেই তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতার লাইনগুলো লেখেন :

টের পাই যুথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালবাসে।

রক্ত ক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি;
সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কেটের খেলা কতো দেখিয়াছি।

ঘনিষ্ঠ আকাশ যেন—যেন কোন বিকীর্ণ জীবন
অধিকার করে আছে ইহাদের মন;

কর্নেল স্যান্ডার্সকে দিয়ে মুরাকামি বলালেন, আমি নিজে কিছু করি না, কিন্তু করাই, আমার সূত্রেই পৃথিবীটা চলছে। এঁকে কিন্তু মুরাকামি গ্রহণ করতে বলছেন স্পষ্টতই, কাহিনিতে টের পাওয়া যায় যে ইনিই সমাধানকর্তা।

কিশোর কাফকা তামুরা কিন্তু সেই জগতটাতে গিয়েছিল, যেখানে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। সেই সুযোগে কিশোরী সাএকি-সান আর বয়স্কা সাএকি-সান দু’জনের সঙ্গেই তার দেখা হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে কিছুই যেহেতু সেখানে হারায় না, তাই সেখানে লিখে রাখার চল নেই, বইও নেই। কিশোরী সাএকি-সান কাফকা তামুরাকে বলেছিল যে সে যখনই মনে মনে কিশোরী সাএকি-সানের প্রয়োজন অনুভব করবে তখনই সে এসে উপস্থিত হবে। মানুষের অবশ্য-প্রয়োজনীয় ন্যূনতম উপকরণ ছাড়া সেখানে আর কিছু নেই ব্যবহার্যের মধ্যে। পুরনো একটা টিভি কাফকার থাকার ঘরে ছিল বটে, কিন্তু সেখানে কোনও চ্যানেলেই কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না, কেননা, সময়কে জয় করা সংস্কৃতি কি সবসময় সৃষ্টি করা সম্ভব হয়? অবশ্য এখানে একটা ভারি মনোরম রুচির প্রসাদ আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন লেখক। আমরা সত্যিই আমোদিত হয়েছি! কিছু কিছু চ্যানেলে নাকি একটা প্রোগ্রাম দেখা যাচ্ছিল। ইঙ্গিত হচ্ছে যে, সেটা সত্যিই কালজয়ী একটা সৃষ্টি। সাউন্ড অব মিউজিক সিনেমার অ্যাডেলভাইস গানটা হচ্ছে সেই সৃষ্টি। আমরা একমত!

জগতটা সম্বন্ধে কিশোরী সাএকি-সান কাফকাকে জানিয়েছিল :

যেটা সবচেয়ে জরুরি কথা সেটা হল, আমরা সক্কলে জনে জনে এখানে নিজেকে গালিয়ে দ্রবীভূত করে ফেলেছি। যতক্ষণ সেটা বজায় রাখছি, কোনও সমস্যাই দেখা দেবে না।”

 “নিজেকে গালিয়ে দ্রবীভূত করে ফেলব?”

 “মানে আর কি, ধর তুমি যখন বনের মধ্যে, নিশ্ছিদ্রভাবে বনেরই একটা অংশ হয়ে রয়েছ। যখন বৃষ্টিপাতের মধ্যে, নিশ্ছিদ্রভাবে বৃষ্টিপাতের একটা অংশ তুমি। সকালবেলায় তুমি, সকালবেলারই একটা অংশ, ফাঁক নেই কোনও। আমার সামনে যখন তুমি, তখন তুমি আমারই একটা অংশ হয়ে যাও। সেরকমই ব্যাপার। সহজ করে বললে।”

 “তুমি যখন আমার সামনে, তখন তুমি নিশ্ছিদ্রভাবে আমারই একটা অংশ হয়ে যাও?”  

  “হ্যাঁ।”

খুব বিস্তারিতভাবে এখানে বলার সুযোগ নেই, কিন্তু প্রকৃতই প্রাচ্যের নানা সাধনার মধ্যে এই সাধনাটির কথা অনেকেরই অপরিজ্ঞাত নয়। আর সেই সাধনার পরে মানুষ যে মনোভাবের অধিকারী হয়, সেটার সঙ্গে নাকাতার যে কী বিষম মিল! পুরো উপন্যাসটা ধরে নাকাতার চরিত্র চিত্রায়ণকে নিবিষ্টভাবে অনুসরণ করে গেলে যে-কোনও পাঠক ক্রমে তার নিজের জীবনেও প্রয়োজনের আর অপ্রয়োজনের সংজ্ঞাগুলো খানিকটা পালটে ফেলতে পারবে, তার উৎকণ্ঠার উপলক্ষ আর তত ঘনঘন ঘটবে না, কী এক আশ্বাস, নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকেই অনেকটা স্থিতিশীল করে তুলবে। কিন্তু কথা হল, ‘আমাদেরই পৃথিবীর প্রান্তে কোথাও এই যে জগতটা’ আছে, সেখানে কাফকা তামুরা গিয়েছিল কী করে? গিয়েছিল একটা বনের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করে। সেই বনপথের বিবরণ পড়তে পড়তে পাঠক একসময় খেয়াল করতে পারবেন যে এই যাত্রা প্রকৃতপক্ষে নিজের মনের ভিতর দিয়ে ঘটছে। সামনে পথ খুঁজে খুঁজে যাওয়া, যে-কোনও সময় ফিরে আসার পথ হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি, পুনরাবৃত্তিময় সেই পথের ছবিটায় কোথাও বা অনেক আগের কোনও প্রবাহের মজে যাওয়া খাত, কোথাও বিশাল পাথরের গায়ে পুরনো মাকড়সার জাল। আর মাঝে-মাঝে কাক ডেকে ওঠা, ঠাহর হয় না ঠিক কোথায় পাখিটা! কিন্তু সেই যাত্রাশেষের যে প্রবেশপথ, একটা পাথর দিয়ে বন্ধ থাকে তার দ্বার, সেখান থেকে তাকে পথ দেখিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল দু’জন যুবক, তারা সৈনিক কিন্তু যুদ্ধকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

প্রবেশপথের পাথরটা সরানো কিন্তু সহজ নয়। শর্তসাপেক্ষ। সরাতে পারবে কেবল সে-ই যে একবার নিজের থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে। এ কেমন শর্ত? একবার তাহলে রবীন্দ্রনাথের গানের লাইন মনে করুন, ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া / বুকের মধ্যে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।’ আইডেনটিটির একটা খোলসে আটকে না থেকে পৃথক একটা অবস্থান থেকে একবার জগতটাকে দেখলেই অনেক সত্য পরিস্ফুট হয়, অনেক মিথ্যার জাল কেটে যায়। ভিন্নতা তখন আর আতঙ্কের উৎস না হয়ে স্বাভাবিক বৈচিত্র হয়ে ওঠে। এই কাহিনিতে নাকাতা তার কৈশোরে এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যে দেহ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল, তা থেকে নির্গত হয়ে বহুদিন পরে আবার ফিরে আসায় সেই অচৈতন্য দেহে চেতনার লক্ষণ দেখা দেয়। তাই একমাত্র নাকাতাই পারে সেই প্রবেশ পথের পাথরকে সরাতে। সে সেটা সরালোও, কিন্তু অন্যত্র অবস্থান করে। এই উপন্যাসের ভিত্তিতে যে দর্শন বা মেটাফিজিকাল ভাবনার মুখোমুখি আমরা হই, তাতে সময়ের কিংবা পরিসরের দূরত্ব আদতে মায়া বলেই মনে হয়। উপন্যাস পড়তে পড়তে কখনো কখনো পাঠকের মনে একথাও উঁকি দেবে যে নাকাতার চরিত্রে স্বয়ং মুরাকামির ছায়া পড়েনি তো! মুরাকামি নিজেও তো প্রথম যৌবনে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে অন্যত্র অজ্ঞাতবাসে কাটিয়ে পরে ফিরে এসেছিলেন জাপানে। নিজের সৃষ্টিশীল লেখালেখির পাশাপাশি আসুরিক উদ্যমে জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন স্কট ফিটজেরাল্ড, রেমন্ড কার্বার, রেমন্ড শ্যান্ডলার, ট্রুম্যান কাপোতির লেখা, যাতে জাপানি সাহিত্যমোদীরা নিজেদের বলয় থেকে বেরিয়ে মার্কিনি সাহিত্যের অন্দরমহলে প্রবেশ করে ফিরে আসতে পারে।

মুরাকামি বারবারই বহিরঙ্গের আইডেন্টিটির জটিলতা ও বিভ্রান্তির দিক সম্বন্ধে ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন তার উপন্যাসে। কখনো পলাতক কিশোর কাফকা তামুরা ঢাকনা সরিয়ে ঢুকে পড়ছে এমন একটা খোলসের মধ্যে যেখানে সে যেন সহজে ধরা পড়ে না যায়। কখনো আমরা অনুভব করছি ওশিমার বিপন্নতা, আপাতদৃষ্টিতে একটি (প্রায়) পুরুষের শরীরে যেন আশ্রয় নিয়েছে প্রকৃতপক্ষে একটি মেয়ে। নিজের পুরুষাঙ্গের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে কাফকা তামুরা ভাবে, সেটি যেন তার নিজের বাইরের কোনও সত্ত্বা, নিজের মর্জিমত সাড়া দেয় পরিস্থিতিতে, কাফকার কোনও নিয়ন্ত্রণ তার ওপর খাটে না। ‘সেলফ’, এই ধারণাটাই যে গভীরভাবে খতিয়ে দেখার মত একটা জিনিস, অত সরল ও সহজ নয় আইডেনটিটির এই প্রশ্নটি। এটাই বারবার নানা অছিলায় কাহিনিতে মুরাকামি মনে করিয়ে করিয়ে দিচ্ছেন।

মানুষ যেমন কৃত্রিম সেলফ তৈরি করে বিভ্রান্ত হয়ে দিকনির্দেশহীন আকুলতায় সেটা সংরক্ষণের পেছনে ছোটে, তেমনি আবার সেলফকে হারায় একই সঙ্গে। ভেতরটা ফাঁপা হয়ে যেতে থাকে, আর সেটা কখনো কখনো অনুভবও করে। এক রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারির কফির দোকানে শান্ত পরিবেশে পশ্চিমী ক্লাসিকাল সংগীতের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলো শুনতে শুনতে সেগুলোর প্রতি জীবনে এই প্রথমবার নেহাতই অপ্রত্যাশিতভাবে আকৃষ্ট বোধ করতে করতে, জীবনের প্রকৃত সম্ভাবনার যে কী বিস্তার, কী গভীরতা, সেসবের খানিক আঁচ পেতে পেতে নানা কথা তরুণ হোশিনোর মাথায় ভীড় করে।

দেখা গেল, অকৃত্রিম উন্মুক্ত মনই হচ্ছে সেই জিনিস যা নাকাতার আছে, কিন্তু বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অধিকাংশের মতই হোশিনোও অনেক কিছু হারাতে থাকে আর এভাবে জীবনের প্রাপ্তি থেকে নিজেকে নিজেই বঞ্চিত রাখায় ভেতরটা ফাঁপা হতে শুরু করে। প্রকৃত উন্নত জীবন হচ্ছে সহজ জীবন, শান্ত মনোনিবেশের জীবন, উচ্চাকাঙ্ক্ষার চৌকস জীবনের হাতছানি এক বিভ্রম। এই প্রার্থিত প্রত্যক্ষতার উদাহরণ হিসেবে মুরাকামি এই আশ্চর্য উপন্যাসে এনেছেন বুদ্ধকে, খ্রিস্টকে। মানুষ এদের কাছে এই সহজ অকৃত্রিম প্রত্যক্ষতাই পেয়ে গিয়ে এদের আশ্রয় অভিলাষী হত, কোনও জ্ঞান, প্রতিভা কিংবা অন্য যাদুময় ক্ষমতা প্রদর্শনের কারণে নয়।

উপন্যাসে বেশ ক’বার মেটাফর আর তার একটা তাৎপর্যপূর্ণ নমুনা হিসেবে ঈদিপাস ট্রাজেডির কথা এসেছে। সোফোক্লিস যখন এটা লিখেছিলেন তখন কি কোনও কিছুর মেটাফর হিসেবে লিখেছিলেন? তখনকার গ্রিস সম্বন্ধে খুব খুঁটিয়ে না জানলে সেটা নির্ণয় করা কঠিন। কিন্তু এই উপন্যাসে এ প্রসঙ্গ কেন আসছে সেটা তত অস্পষ্ট রাখেননি মুরাকামি। সময় যেখানে কিছু কেড়ে নেয় না, সেই জগতটাতে গিয়ে কাফকা তামুরা বয়স্কা সাএকি-সানের দেখা পেয়েছিল। উনি ওকে বলেছিলেন এই মর্ত্য-পৃথিবীতে ফিরে আসতে। ওঁর নিজের বাহুতে পিন ফুটিয়ে একটা ক্ষত তৈরি করেছিলেন আর সেখানে ঠোঁট ছুঁইয়ে রক্ত টেনে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসেছিল কিশোর কাফকা। সমস্ত সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে আমরা পাঠকরা বুঝতে পারি যে সাএকি-সানই ওর মা। আদি অন্তহীন কাল ধরে মা’র রক্ত নিয়ে পুষ্ট হয়ে মানুষ জন্ম-জন্মান্তর ধরে পৃথিবীতে আসছে। তার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়া তাই অসম্ভব, প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু আত্মরতির মতই মাতার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক একধরনের ট্রাজেডি। জাতি হিসেবে নিজেদের সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এসবের প্রতি মাত্রাহীন পক্ষপাত আর তাতে নিজেদের অভিভূত রাখার চূড়ান্ত প্রবণতারই মেটাফর হিসেবে এখানে মুরাকামি ঈদিপাস ট্র্যাজেডির প্রসঙ্গকে টেনে এনেছেন। বারবারই এনেছেন, যাতে ইঙ্গিতটা অধরা রয়ে না যায়। এই আত্মবিমুগ্ধতা এক ট্রাজেডি বলেই সাবধান করেছেন।

এই পৃথিবীতে সময় পালটাবে। নতুন নতুন মানুষেরা আসবে প্রেম নিয়ে অন্য মানুষের কাছাকাছি। কৈশোরে এই বিশাল জীবনসমুদ্রের তীরে একবার সাএকি-সান তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে বসে যে ছবি আঁকা হতে দেখেছিলেন, আবারও বহু পরে দ্বিতীয়বার যখন গেলেন, তখনও দৃশ্যটা প্রায় একই দেখেন, মেঘেদের অবস্থান হয়তো একটু পাল্টেছে, দূরে কযেকটা দ্বীপের যতটা চোখে পড়ে, তাতে হয়তো সামান্য পরিবর্তন হয়েছে, সময় ঢেউ হয়ে এসে আছড়ে পড়েছে এই বিশাল সৃষ্টির কূলে, কিন্তু প্রেম রয়ে গেছে সৃষ্টির অপরিবর্তিত ধ্রুবসত্য হয়ে।

অবিচ্ছিন্নতা আর প্রেম এ পৃথিবীর সেই শেষ সত্য- সময় তাতে থাবা বসাতে পারে না। অবিভাজ্যতাই আজকের সভ্যতাকে শিখে নিতে হবে অটুট থাকতে গেলে। সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। আজকের সভ্যতার অসুখকে অন্তত একজন মনীষী যেভাবে দেখেছেন, তা থেকে শিক্ষা নিতে পারলে কাজ এগোতে থাকবে, এ একেবারে নিশ্চিত।

জাঁ-জাক রুশো সভ্যতার সংজ্ঞা দিয়েছেন এইভাবে যে সভ্যতার জন্ম হয়েছিল তখনই, যখন মানুষ বেড়া দিতে শিখেছিল। অন্তর্দৃষ্টি যে ছিল, তা তো অবশ্যই বলতে হবে। সেই অনুসারে, সমস্ত সভ্যতাই বেড়া দিয়ে সীমায়িত করে দেওয়া পরাধীনতা থেকে উৎপন্ন। তবে কিনা, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের অ্যাবরিজিনালরা কেবল ব্যতিক্রম। ওরা সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিভাজনহীন সভ্যতা বজায় রেখেছিল। ওরা একেবারে মূলতই স্বাধীন সত্ত্বা। যখন খুশি, পছন্দমত জায়গায় গিয়ে পছন্দমত কিছু করতে পারত। আক্ষরিক অর্থেই ওদের জীবন ছিল হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। হেঁটে বেড়ান জিনিসটা ছিল ওদের বেঁচে থাকার এক গভীর মেটাফর। ইংরেজরা এসে যখন পালিত পশুদের রাখার জন্য বেড়া তুলছিল, ওরা এ জিনিসের যে কী উদ্দেশ্য এক্কেবারেই বুঝে উঠতে পারেনি। তারপর এই প্রথার অর্থ বোঝার আগেই, ওরা নিজেরাই অপসারিত হল রুক্ষ অনুর্বর জমিতে, ওদের অস্তিত্বই সমাজবিরোধী ও বিপজ্জনক এই অপবাদে। ফলত তোমারও এটা যথাসম্ভব খেয়াল রাখাই শ্রেয়, শ্রীমান তামুরা কাফকা। শেষ বিচারে, এই জগতে উঁচু করে পোক্ত পাঁচিল যারা তুলে দিতে পারে সেইসব মানুষেরাই মোক্ষমভাবে বেঁচে থাকে। সেটা মানতে না চাইলেই তোমাকে মরুভূমিতে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।

উপন্যাসে একথা বিচক্ষণ ওশিমা শ্লেষভরে বলেছিল কিশোর কাফকা তামুরাকে।

আর যারা মোক্ষমের চেয়েও মোক্ষমভাবে বেঁচে থাকতে সক্ষম, যেমন নাকাতা, যার মৃত্যুর পরে তরুণ হোশিনোর মনে হয়েছিল, এরপর থেকে সমস্ত বিপন্নতার মুহূর্তে, সমস্ত পরিস্থিতির জটিলতায় তার মনে পড়বে, জানতে কৌতূহল জাগবে- এইসময় নাকাতা-সান থাকলে কী করতেন, কী বলতেন। নাকাতা-সানের স্মৃতিই হবে তার ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক, সেই নাকাতা জানতো যে দেওয়াল আসলে ভাঙতে হয়। তাই জনি ওয়াকারকে খুন করার পরে যখন সে টের পেল ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটে গেছে। তার অন্তর থেকেই কেউ তাকে জানালো, এবার টোকিওর নাকানো ওয়ার্ডে নিজের ছোট গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে, যেতে হবে পশ্চিমমুখো আর পেরোতে হবে একটা বড় ব্রিজ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close